ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য হতে দেওয়া যাবে না: ড. কামাল হোসেন
সংবিধান সংস্কার করতে হলে আগে গণপরিষদ গঠন ও গণভোটের প্রয়োজন, বলেন অধ্যাপক সাইয়িদ।
বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. কামাল হোসেন বলেছেন ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য হতে দেওয়া যাবে না।
সংবিধান দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য হতে দেওয়া যাবে না।”
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। সেই দিনটি সংবিধান দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা হয়।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী।
‘সংগ্রামের ফসল সংবিধান’
সভায় প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান আয়োজক সংগঠনের প্রচার সম্পাদক সানজিদ রহমান।
লিখিত বক্তব্যে গণফোরামের এমিরেটাস সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি। জনগণই রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের এক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বে সরকারি চাকরিতে কোটা বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর গৃহীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদ বাস্তবায়নে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়।
‘জুলাই সনদ জনগণ কেন মানবে’
অনুষ্ঠানে সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।
জুলাই জাতীয় সনদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রণয়ন করা হলেও এটি কোনো গণপরিষদে গৃহীত হয়নি।
আবু সাইয়িদের প্রশ্ন, “যে সনদ কোনো গণপরিষদে হয় নাই, যে সনদ কোনো গণপরিষদ দ্বারা গৃহীত হয় নাই, সেই সনদ আজকের ক্ষমতাসীন সরকার, তারেক রহমানের সরকার এবং বাংলার জনগণ কেন মানবে?”
সংবিধান সংস্কার করতে হলে আগে গণপরিষদ গঠন ও গণভোটের প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আলবদর-রাজাকারদের ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অপচেষ্টার সমালোচনা করেন অধ্যাপক সাইয়িদ।
‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে সংবিধান সংশোধন নয়’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “সংবিধান সংশোধন হতে পারে, প্রয়োজন হলে সংশোধন হবেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য যদি কেউ সংশোধন করি, সেই সংশোধনী টিকবে না। অতীতেও থাকে নাই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।”
ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা থেকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন তিনি।
শক্তিশালী বিচারব্যবস্থাকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে তুলে ধরে আইনজীবী খোকন বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা সাবেক ও বর্তমান এমপিদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার নৈতিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী ফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বাহাত্তরের আদি সংবিধানে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান।
এরশাদের আমলে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে ১৫ দল, ৭ দল ও ৫ দলের তিন জোট একসঙ্গে আন্দোলন করেছিল বলে তুলে ধরেন তিনি।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, ওই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীও ছিল। তখন তিন জোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, এরশাদের এই সিদ্ধান্ত তারা মানেন না এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রধর্মের বিধান বাতিল করবেন।
তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গিয়ে কী হল? আপনারা দেশের জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এরশাদের করা রাষ্ট্রধর্মের বিধান এখনও রেখে দিয়েছেন।”
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় সংশোধন প্রয়োজন’
ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, গত ৫০ বছরে সমাজ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, যার প্রতিফলন সংবিধানে থাকা প্রয়োজন।
তবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান প্রণয়ন ও আলোচনায় নারী এবং অবাঙালিদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অভাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, ‘আমরা’ বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি। সংবিধানে বিভিন্ন মত, ধর্ম, জাতিসত্তা, বর্ণ ও লিঙ্গের মানুষের যথাযথ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
