১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

মদ, নাচানাচি ও রাষ্ট্রের নৈতিক পাহারাদারি

প্রশাসনিক বক্তব্যে যদি একটি ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মদ ও মাতলামিকে প্রায় সমার্থক করে তোলা হয়, তাহলে তা শুধু অসংগত নয়, অপমানজনকও।

মদ, নাচানাচি ও রাষ্ট্রের নৈতিক পাহারাদারি

দুর্গাপূজায় ‘মদ খেয়ে নাচানাচি’ করলে পুলিশ ঘাড় ধরে নিয়ে যাবে বলে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং এর পেছনে রাষ্ট্রের ‘নীতিপুলিশি’ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

চিররঞ্জন সরকার চিররঞ্জন সরকার

Published : 12 Oct 2026, 04:39 PM

Updated : 12 Oct 2026, 04:55 PM

বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়—এই প্রবাদটি আমাদের প্রশাসনিক জীবনে মাঝে মাঝে এমনভাবে সত্যি হয়ে ওঠে যে, বাঁশও লজ্জায় মাথা নিচু করে। ক্ষমতার পালাবদল হলেই কেউ কেউ হঠাৎ আবিষ্কার করেন, কঠোরতা দেখানোই দেশপ্রেমের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। নাগরিকের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আইনের সমান প্রয়োগের মতো কঠিন কাজের বদলে তারা খুঁজে নেন সহজ শত্রু: সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের আনন্দ। তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, দুর্গাপূজায় কে মদ খাবে, কে নাচবে এবং কে কার ঘাড় ধরে আনবে।

সম্প্রতি ফেনী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেছেন, “দুর্গাপূজায় কেউ মদ খেয়ে নাচানাচি করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ঘাড় ধরে নিয়ে যাওয়া হবে।” এই কয়েকটি বাক্যই আজকের প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের এক অদ্ভুত, এমনকি অস্বস্তিকর আয়না। একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা দুর্গাপূজার আগে মদ খাওয়া ও নাচানাচিকে এমনভাবে সামনে আনছেন, অথচ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর, হামলার আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা ও সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ নিয়ে মানুষের প্রশ্ন আছে। তখন প্রশ্ন উঠবেই: নিরাপত্তার আসল সংকটটি কোথায়? প্রতিমার সামনে নাচতে থাকা মানুষ, নাকি প্রতিমা ভাঙার সাহস পাওয়া মানুষ?

এখানে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ধারণাটিও সামনে আসে। দুর্গাপূজা মানে কি তবে মদ খেয়ে নাচানাচি? আমরা ছোটবেলা থেকে দুর্গাপূজা দেখে আসছি। পূজার সময় মদ খেয়ে কেউ নাচানাচি করছে, এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। অথচ একজন জেলা পুলিশের একজন প্রধান এমনভাবে হুঙ্কার দিচ্ছেন, যেন দুর্গাপূজা মানেই মদ, মাতলামি আর নাচানাচির উৎসব! কী ভয়ঙ্কর পূর্বধারণা! এমনিতেই আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভিন্ন ধর্মের মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা কম নয়। একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য সেই বিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করতে পারে। তাই প্রশ্নটি নিছক রুচির নয়, জবাবদিহিরও। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা কেন এমন একটি ধারণাকে সামনে আনবেন, যার সঙ্গে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবকে জড়িয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়?

পূজার আগে পুলিশ প্রশাসনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল মণ্ডপের নিরাপত্তা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, গুজব প্রতিরোধ, উসকানি ঠেকানো, চাঁদাবাজি বন্ধ, ছিনতাই দমন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা প্রতিরোধ এবং সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকানোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। কিন্তু এসবের বদলে যদি সবচেয়ে জোরালো বার্তা হয়, মদ খেয়ে নাচলে ঘাড় ধরে নিয়ে যাওয়া হবে, তাহলে মনে হয় রাষ্ট্রের দূরবীনটি ভুল জায়গায় তাক করা। চোরের বদলে নর্তক, হামলাকারীর বদলে মাতাল, ভাঙচুরকারীর বদলে উৎসবকারীকে যদি নিরাপত্তার প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে: এ কেমন নিরাপত্তা দর্শন? নাকি আসল বিপদকে আড়াল করার সবচেয়ে সহজ কৌশল হলো এমন এক বিপদ তৈরি করা, যার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দেওয়া সহজ?

প্রশ্ন আরও আছে। মদ খাওয়া নিষেধ, নাকি নাচানাচি নিষেধ? মদ খেয়ে চুপচাপ বসে থাকলে কি রাষ্ট্র সন্তুষ্ট? মদ না খেয়ে প্রাণ খুলে নাচলে কি অপরাধ হবে? কেউ যদি মদ খেয়ে কারও ক্ষতি না করেন, আর কেউ যদি মদ না খেয়ে মারামারি করেন, তাহলে পুলিশের অগ্রাধিকার কার দিকে হওয়া উচিত? আইন নিশ্চয়ই উত্তর দেবে। কিন্তু প্রশাসনিক বক্তব্যের ভাষা যদি এমন হয় যে একটি ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মদ ও মাতলামিকে প্রায় সমার্থক করে তোলা হয়, তাহলে তা শুধু অসংগত নয়, অপমানজনকও।

আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে। মদ যদি এত ভয়ংকর হয়, তবে তার বৈধতা, উৎপাদন, বিক্রি, লাইসেন্স এবং রাজস্বের ব্যবস্থা থাকে কেন? রাষ্ট্র একদিকে বোতল থেকে কর নেয়, অন্যদিকে বোতল হাতে নাগরিক দেখলেই নৈতিকতার ঘণ্টা বাজায়। অর্থাৎ মদ বিক্রেতা অর্থনীতির অংশ, রাজস্ব রাষ্ট্রের সম্পদ, কিন্তু মদ্যপ নাগরিক হঠাৎ নৈতিকতার জাতীয় বিপর্যয়! রাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নৈতিকতা এমন এক আয়না, যেখানে নিজের মুখটাই সবচেয়ে কম দেখা যায়।

দুর্গাপূজা কোনো অপরাধ উৎসব নয়। এটি বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এর সঙ্গে ধর্মীয় আচার আছে, পারিবারিক মিলন আছে, সামাজিকতা আছে, সংস্কৃতি আছে, আনন্দ আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই আনন্দকে নিরাপদ করা, আনন্দের অভিভাবক হওয়া নয়। কেউ মদ খেয়ে মারামারি করলে ব্যবস্থা নিন। মাতাল হয়ে গাড়ি চালালে ব্যবস্থা নিন। জনশান্তি নষ্ট করলে ব্যবস্থা নিন। অন্যের নিরাপত্তা বিপন্ন করলে ব্যবস্থা নিন। মাদক বিক্রি করলে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু আইন প্রয়োগের জায়গায় নৈতিকতার লাঠি তুলে একটি ধর্মীয় উৎসবের আগে নাগরিকদের কীভাবে আচরণ করতে হবে তার পাহারাদার হয়ে ওঠা রাষ্ট্রের কাজ নয়।

সংখ্যাগরিষ্ঠের উৎসবকে আমরা স্বাভাবিক আনন্দ হিসেবে দেখি, সংখ্যালঘুর উৎসবকে অনেক সময় নিরাপত্তা প্রকল্প হিসেবে দেখি। ফলে পূজা এলেই শুরু হয় নির্দেশ, নিষেধ, নজরদারি, সতর্কতা এবং নৈতিক উপদেশের বৃষ্টি। যেন হিন্দু নাগরিকেরা উৎসব করতে বের হননি, রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় বসেছেন। তারা কী পরবেন, কী করবেন, কী খাবেন, কীভাবে আনন্দ করবেন, কে নাচবেন, কতটুকু নাচবেন—সবকিছুর ওপর অদৃশ্য লাল দাগ টেনে দেওয়া হয়। অথচ তাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: আমরা কি নিরাপদ?

এই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয় যখন দুর্গাপূজার আগে দেশের কোথাও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, কোথাও হুমকি আসে, কোথাও গুজব ছড়ায়, কোথাও মানুষ আতঙ্কে থাকে। তখন প্রশাসনের কণ্ঠে সবচেয়ে জোরে শোনা দরকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। প্রতিটি মণ্ডপে নিরাপত্তা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, হামলার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, গুজব প্রতিরোধ এবং অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ—এসব হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। নাচের তাল গোনার চেয়ে ভাঙা প্রতিমার হিসাব রাখা অনেক বেশি জরুরি।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার শক্তি কতজনের ঘাড় ধরতে পারলেন, তাতে নয়; কতজন নাগরিককে ভয়মুক্ত রাখতে পারলেন, তাতে। পুলিশ যদি পূজামণ্ডপে দাঁড়িয়ে মানুষের মনে নিরাপত্তার বদলে আতঙ্ক তৈরি করে, তবে ইউনিফর্ম থাকলেও কিন্তু আস্থার জায়গাটি ফাঁকা। পুলিশের চোখ থাকা উচিত অপরাধীর দিকে, পূজারীর নাচের দিকে নয়। হাত থাকা উচিত হামলাকারী ঠেকাতে, আনন্দরত নাগরিকের ঘাড় ধরতে নয়।

সাগরময় ঘোষের ‘সম্পাদকের বৈঠকে’ মাতালদের একটি গল্প আছে। দুই মাতাল রাতে রাস্তার মাঝখানে একে অন্যকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ তাদের বাড়ি যেতে বললে তারা ছাড়তে পারছিল না। তাদের যুক্তি ছিল, ‘United we stand, divided we fall’। দুজন আলাদা হলেই নাকি দুজনেই পড়ে যাবে। প্রশাসনের ভাষা শুনলে আজ মনে হয়, সেই গল্পের পুলিশও যেন আমাদের চেয়ে বেশি রসবোধসম্পন্ন ছিল।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’-এর সুশোভনের কথাটিও মনে পড়ে। মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফেরায় বাবা বলেছিলেন, ‘তোর এতটা অধঃপতন হয়েছে?’ সুশোভনের জবাব, ‘পতন তো চিরকাল অধঃলোকেই হয় গুরু...কে আর কবে ঊর্ধ্বলোকে পড়েছে বলো!’ মাতালের মুখে এমন দর্শনও যদি থাকে, তাহলে প্রশাসনের ঘোষণায় অন্তত কিছুটা বোধ থাকা কি খুব বেশি দাবি?

আর রাষ্ট্রের এই নৈতিক পাহারাদারির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে আসল বিপদকে আড়াল করে। যখন মঞ্চের আলো নাচের ওপর পড়ে, তখন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙচুরকারীর মুখ দেখা যায় না। যখন মাইকে মাতলামির বিরুদ্ধে হুঙ্কার ওঠে, তখন আতঙ্কিত পরিবারটির কান্না চাপা পড়ে যায়। যখন প্রশাসন উৎসবের আনন্দ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে, তখন দুর্বৃত্তরা সুযোগ খোঁজে। তাই প্রশ্নটি সরল: পুলিশ কি উৎসবকে ভয় দেখাবে, নাকি ভয়কে উৎসবের কাছ থেকে দূরে রাখবে? রাষ্ট্রের মর্যাদা কঠোর কথায় নয়, ন্যায়সঙ্গত কাজে। একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে হিন্দু নাগরিকেরা বিশেষ সুবিধা চাইবেন না; তারা চাইবেন সমান নিরাপত্তা, সমান মর্যাদা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সমান কঠোরতা। সেটুকু নিশ্চিত করাই যথেষ্ট। কারণ পূজার মণ্ডপে নিরাপদে দাঁড়াতে না পারলে নাচের স্বাধীনতা কাগজের ফুল। নিরাপত্তা ছাড়া উৎসব শুধু সাজসজ্জা; আইনের সমতা ছাড়া রাষ্ট্র শুধু ইউনিফর্ম পরা ক্ষমতা। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নির্মম প্রমাণ।

আসল কথা হলো, দুর্গাপূজায় হিন্দু নাগরিকদের নৈতিক পাহারাদার দরকার নেই; দরকার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তারা কীভাবে আনন্দ করবে, তার শিক্ষক হওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। রাষ্ট্রের কাজ হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নিরাপদে, নির্বিঘ্নে এবং মর্যাদার সঙ্গে পূজা করতে পারেন। কেউ আইন ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক, কিন্তু ধর্ম দেখে নয়; অপরাধ দেখে। আর ফেনীর এসপির বক্তব্য যদি সত্যিই প্রশাসনের অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে, তাহলে তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করা দরকার: প্রতিমা ভাঙার বিরুদ্ধে আপনার বার্তা কোথায়, নিরাপত্তাহীন মানুষের পাশে আপনার ঘোষণা কোথায়, সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে আপনার কঠোরতা কোথায়? একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা মানে তাকে অপমান করা নয়; বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। দুর্গাপূজার মণ্ডপে নাগরিকের ঘাড় ধরার আগে রাষ্ট্র যেন নিজের দায়িত্বের ঘাড়ে হাত রাখে। কারণ নিরাপত্তাহীন নাগরিকের সামনে নৈতিকতার বক্তৃতা ঠিক সেই রকম, যেমন ডুবন্ত মানুষকে সাঁতার শেখানোর বদলে তার পোশাক ঠিক আছে কি না, তা নিয়ে বক্তৃতা দেওয়া।

চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com