বিতর্ক চর্চা কেন পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে না?

“আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতর্ক চর্চার মৌসুমী ব্যবস্থা থাকলেও তা গুটিকয় শিক্ষার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দু-চারজন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় আর বাকিরা শুধু দর্শক হয়ে থাকে। কতটুকু লাভ হয় তাতে? আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি ছেলেমেয়েকে যুক্তিতর্কে পারদর্শী করা, নচেৎ এরা সবাই কর্মজীবনে আফসোস আর হতাশায় ভুগবে।”

কামরুল হাসান কচিকামরুল হাসান কচি
Published : 7 August 2022, 05:55 PM
Updated : 7 August 2022, 06:00 PM

সম্প্রতি একটি সংখ্যা নিয়ে খুব উৎকণ্ঠার সাথে আলোচনা হচ্ছে- ‘৫ বিলিয়ন ডলার’! অর্থাৎ প্রতি বছর বিদেশিরা এ দেশ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো একটি বেকারবহুল দেশের জন্য অবশ্যই উৎকণ্ঠার বিষয়। বিভিন্ন পত্রিকার তথ্যসূত্রমতে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করে যাদের মধ্যে মাত্র এক লাখের মতো সরকারিভাবে নিবন্ধিত। বেসরকারিমতে, গত এক দশকে যে পরিমাণ অর্থ বিদেশিরা কর ফাঁকি দিয়েছে তা দিয়ে বাংলাদেশ একাধিক পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারত।

বিদেশি কর্মীদের একটি বড় অংশ কাজ করে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে এবং তারা সবাই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবেই নিয়োজিত রয়েছেন। অধিকাংশ ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসে (বাইং-হাউজ/বাইং-অফিস) সর্বোচ্চ পদগুলো বিদেশিদের দখলে থাকার কারণে সৃষ্ট অনেকগুলো অসুবিধার মধ্যে অন্যতম হলো, বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমশ মূল্য হ্রাস। ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসে চাকুরি করলেও একজন বাংলাদেশি যে ধরনের দায়িত্ববোধ নিয়ে পোশাক কারখানাগুলোর (বিক্রেতা) পক্ষে তাদের ন্যায্য ও যৌক্তিক সমস্যার যথাযত ব্যাখা ও বিশ্লেষণ মূল ক্রেতাদের (ব্র্যান্ড) কাছে উপস্থাপন করবেন, অবশ্যই একজন বিদেশি সেই বাড়তি দায়িত্ববোধ কখনোই অনুভব করেন না। ফলে পোশাক কারখানার মালিকেরা অনেকসময় অনেক জটিল সমস্যায় বিদেশিদের কাছ থেকে যথাযত সহযোগিতা না পেয়ে বিব্রত বোধ করেন। শুধু বাইং-হাউজ/বাইং-অফিসেই নয়, এখন অধিকাংশ উচ্চসারির পোশাক কারখানার উচ্চপদগুলোতেও বিদেশিদের একচেটিয়া কদর। বিশেষত ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মরিশাসের মতো দেশ থেকে কাজ করতে আসা নাগরিকদের সাথে চাকরির প্রতিযোগিতায় নেমে বাংলাদেশিদের চোখে-মুখে কেবল হতাশা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। প্রতিবছর বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বস্ত্র-প্রকৌশলী (টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার) চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, এর বাইরেও অন্যান্য বিভাগ থেকে পাশ করা কমপক্ষে আরও পাঁচ হাজার স্নাতক পোশাক শিল্পে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন। যেখানে প্রতি বছর একটি দেশে কমপক্ষে দশ হাজার বেকার একটি নির্দিষ্ট শিল্পে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেন সেখানে বিদেশিদের একচেটিয়া আধিপত্য খানিকটা ভাবাবেগের সৃষ্টি করে বৈকি।

অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তার পেছনে দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, কমপক্ষে তার চারগুণ বেশি অর্থ গুণতে হয় একজন বিদেশির জন্য। স্বভাবতই সকলের মুখে অনায়াসে একটি সরল কিন্তু কঠিন প্রশ্ন চলে আসে- “তাহলে বিদেশিদের কেন চাকরিতে নিচ্ছে?” কিন্তু বিষয়টিকে শুধু আবেগের সাথে ক্ষোভের খিচুড়ি করে, বিদেশিদের প্রতি শুধু বিরক্তি আর রাগের তীর ছুঁড়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। বরং একটি বাস্তবিক ও যথার্থ পর্যালোচনা আবশ্যক যে, কেন দেশি/বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন পদে বাংলাদেশিদের উপেক্ষা করে বিদেশি নিয়োগে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

দীর্ঘদিন এই পোশাক শিল্পে কাজ করার সুবাদে এবং একজন গবেষক হিসেবে এই বিষয়টির যথাযত অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার তীব্র তাগিদ অনুভব করছি। শুরুতেই একটি অনুরোধ, বিদেশিদের প্রতি অন্ধ ক্ষোভ প্রকাশ না করে বা সরকারের ওপর সহজ দোষ না চাপিয়ে, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে সক্ষমতার পার্থক্যটা অনুধাবন করে নিজেদের মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করি তাহলে এর চেয়ে ভাল আর কি-ইবা হতে পারে।

পোশাক শিল্পে বাংলাদেশি ও বিদেশিদের দক্ষতা ও গুণগত মানের সঠিক তুলনা করতে দুই শ্রেণির সম্মানিত কর্ণধারদের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। তারা হলেন প্রথমত, বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসের প্রথমসারির কর্ণধারবৃন্দ যারা দীর্ঘদিন যাবত এই দেশে কাজ করছেন এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মালিকবৃন্দ যারা তাদের প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে বিদেশিদের প্রতি আস্থা রেখেছেন। ব্যক্তিগত আলোচনায় বিভিন্ন ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসের কয়েকজন প্রধান সারির কর্ণধারবৃন্দ আমাদের গুণগত মানের ব্যাপারে প্রায় একই মতামত দেন, এই সকল অভিজ্ঞ ও গুণী কর্ণধারদের মতে বাংলাদেশি ছেলে-মেয়েদের জন্য যে জায়গাগুলোতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে তা হলো; যোগাযোগ দক্ষতা (কমিউনিকেশন স্কিল) ও উপস্থাপনা শৈলী (প্রেসেন্টেশান স্কিল)। তবে হ্যাঁ, সবাই একটি ব্যাপারে নিরঙ্কুশ মতামত দিয়েছেন যে, কাজের প্রতি একাগ্রতা, পরিশ্রম ও কারগরি দক্ষতায় বাংলাদেশি ছেলে-মেয়েদের কোনো সমস্যা নেই। অন্যদিকে পোশাক কারখানার মালিকবৃন্দ মনে করেন যে, বাংলাদেশি ছেলে-মেয়েদেরকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে তিনটি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে: ১) ইংরেজিতে সাবলীলভাবে অনর্গল কথা বলার অভ্যাস, ২) সমস্যা নিরসনে ক্রেতাদেরকে (বায়ার) উপযুক্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে বোঝানোর সক্ষমতা এবং ৩) পণ্যের মূল্য-নির্ধারণী বৈঠকে ক্রেতাদেরকে সাথে সঠিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে উপযুক্ত পণ্য মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা।

শুধু গুণগত পোশাক উৎপাদন করলেই হবে না, তার গুণগত বাজারজাতকরণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ না করতে পারলে পোশাক রপ্তানি ব্যবসায় বিপর্যয় অবধারিত। একমাত্র সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, বন্ধ হচ্ছে এবং আরও বন্ধ হবে। কিন্তু সঠিক মূল্য অর্জনে কেবল বিদেশি ক্রেতাদের (বায়ার) একচেটিয়া দোষ দিলে চলবে না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিধি-চক্রে তারা সবসময় চাইবে বাংলাদেশি পণ্যের দাম যেন প্রতি বছর কমে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পোশাক কারখানার কর্মকর্তাদের মূল কাজটা কি? সঠিকভাবে দরকষাকষি করে কাঙ্ক্ষিত মূল্যে রপ্তানি করাই হলো কারখানার কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যে কারখানার বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা দরকষাকষিতে অত্যন্ত দক্ষ ও সাবলীল সেই কারখানা দ্রত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। তবে হ্যাঁ, রপ্তানি বাণিজ্যে বিদেশি ক্রেতাদের সাথে সঠিকভাবে দরকষাকষির জন্য যেমন প্রয়োজন যুক্তি উপস্থাপনের মতো অনন্য গুণ তেমনি প্রয়োজন তাদেরকে একটি টেকসই সুসম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ রাখার অপরিহার্য ক্ষমতাও, ঠিক যেন এক লবন-চিনির অসাধারণ যাদুকরী মিশ্রণ।

শুধু মূল্য-নির্ধারণী বৈঠকেই নয়, পোশাক শিল্পের কর্মকর্তাদের প্রায় প্রতিটি দিনই পার করতে হয় নানা যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে। পোশাক শিল্প এমনই একটি জায়গা যেখানে প্রতিনিয়ত বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে পার করতে হয় রপ্তানি বাণিজ্যের এক একটি ধাপ। ক্রেতাদের কাছ থেকে কাজের অধ্যাদেশ পাওয়ার পর বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়, সেগুলো হল: নমুনা তৈরি ও অনুমোদন, সুতা-কাপড়ের অনুমোদন ও ক্রয়ীকরণ, কাঁচামাল পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, ক্রেতাদের দেওয়া বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ মেনে পণ্য উৎপাদন, যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন সমাপ্ত করে হস্তান্তর। এই ধাপগুলোতে ক্রেতা ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে কারখানার কর্মকর্তাদেরকে প্রতিনিয়ত সৃষ্ট সমস্যাগুলোর নিশ্চিত সমাধান করতে হয়, এটাই এই পেশার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে। কখনো ক্রেতা-প্রতিনিধিরা জয়ী হন কখনোবা বিক্রেতারা (পোশাক কারখানা) জয়ী হন, অথবা তারা সার্বিক ব্যবসায়িক সুসম্পর্কের কথা ভেবে ছাড় দেন। সবকিছু নির্ভর করে দু-পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরাজমান পারস্পারিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কের ওপর। বাস্তবতা হলো, এই শিল্পে যুক্তিতর্ক উপস্থাপণ ও বাচনভঙ্গিতে যিনি যতটা আকর্ষণীয়, তার প্রতিষ্ঠানও অন্যদের কাছে (ক্রেতা বা বিক্রেতা) ব্যবসায়িকভাবে ততটা আকর্ষণীয়।

লোকে বলে, ‘শুধু কথায় চিড়ে ভেজে না’। কিন্তু চিড়ে নিজে ভেজার জন্য জলে নামবে কি নামবে না- সেই সিদ্ধান্ত বদলাতেও সুন্দর ও সাবলীল ভঙ্গিমার কোনো বিকল্প নেই। যিনি যতটা সুন্দর করে উপস্থাপন করে তার ক্রেতা বা বিক্রেতাকে বোঝাতে পেরেছেন তিনিই দ্রত সমস্যা সমাধানে নিজেকে ততটা দক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। শুধু কারখানার কর্মকর্তাদের বেলায় যে এটি প্রযোজ্য তা নয়, ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসের (বাইং-হাউজ/বাইং-অফিস) কর্মকর্তাদের বেলায়ও একই গুণাবলী প্রয়োজন। এমন অসংখ্য ঘটনা দেখা যায় যে, ক্রেতা-প্রতিনিধি অফিসের কর্মকর্তাদের যুক্তিতর্ক এবং অমায়িক উপস্থাপনার কারণে পোশাক কারখানার মালিকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেন না। সুতরাং, ক্রেতা-প্রতিষ্ঠানে (বাইং-হাউজে) অথবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে (কারখানায়), আপনি যেখানেই চাকরি করুন না কেন, আপনাকে উপস্থাপনা শৈলীতে অবশ্যই পারদর্শী হতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা হয়তো সারাদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি রিপোর্ট তৈরি করলেন, কিন্তু তিনি তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্ণধারদের কাছে বা মূল ক্রেতাদের কাছে এটি উপস্থাপনের কোনো সুযোগ পেলেন না, কারণ তিনি সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারেন না অথবা তার উপস্থাপনা দক্ষতা নিয়ে সবার মধ্যে সংশয় রয়েছে। অথচ তার তৈরি করা রিপোর্টটি নিয়ে তারই কোনো বিদেশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শুধু সাবলীল উপস্থাপনা দক্ষতার কারণে স্বীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুরো কৃতিত্বটা নির্বিচারে আহার করেন। লক্ষ্য করুন, এমনিভাবে হাজারও বাংলাদেশি কর্মকর্তা প্রকৃত দক্ষতার বিচার থেকে কর্মজীবনে বঞ্চিত হচ্ছেন; কাজ করছেন একজন বাংলাদেশি অথচ তার কৃতিত্ব ও সুফল ভোগ করছেন একজন বিদেশি। এটি কোনো মনগড়া বিচ্ছিন্ন গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের একটি চিরায়ত চিত্রকল্প।

শুনতে তেতো লাগলেও এটাই সত্যি যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও অন্যান্য দেশের সমমনাদের থেকে দুটি বিষয়ে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি, তা হলো সাবলীলভাবে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলা এবং উপস্থাপনা শৈলী ও বাচনভঙ্গি প্রয়োগে। এই কারণেই বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা চাকরির বাজারে (পোশাক শিল্পে) বিদেশিদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

চাকরির মৌখিক পরীক্ষাগুলোতে দেখা যায়, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যেকোনো বিষয়ে অনেক গভীর জ্ঞান রাখেন কিন্তু সবাই অতি অল্প সময়ে সুন্দর করে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারেন না। মালিকবৃন্দ মনে করেন, যে গুণগুলো এদেশের ছেলেমেয়েরা কর্মজীবনে এসে শেখার চেষ্টা করেন বা তাদেরকে কর্মপ্রতিষ্ঠান থেকে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হয়, ওই গুণগুলো বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সহজাত বলে মনে হয়। অর্থাৎ, ওইসব বিদেশিরা যেন আগে থেকেই প্রস্ততি নিয়ে এই দেশে এসেছেন, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি কোনো ব্যয় বা ভাবনা নেই।

তাহলে সমাধান কী?

সমাধানটি হতে হবে গাছের গোঁড়ায় জৈবিক সার দেওয়ার মতো। ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে বয়স্ক পাতাগুলোর ওপর কীটনাশক ছিটিয়ে এক মৌসুমে ভালো ফল পাওয়া গেলেও তাতে কোনো প্রকৃত সমাধান আসে না। ইদানীং বিভিন্ন কর্মপ্রতিষ্ঠান এই সকল দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের পেছনে বিভিন্ন করপোরেট ট্রেনিং বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে। কিন্তু এসব দু-একদিনের সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং/কোর্স খুব একটা ফল দেয় না। ব্যাপারটা অনেকটা মোম-পালিশের মতো, কীটনাশক দিয়ে পাকানো ফল আর গাছে থাকা অবস্থায় পেকে যাওয়া ফলের কি তুলনা হয় কখনো? হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, চাকরির বাজারে আসার আগেই কীভাবে এই বিশাল ফুরফুরে তারণ্যের ঢলটাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তৈরি করা যায় যাতে তারা কর্মজীবনে এসে হতাশায় না ডুবে অন্য দেশের ছেলেমেয়েদের মতো মনের আনন্দে কাজ করতে পারবে, অনেক কিছু শিখে না আসার ভয় তাদেরকে যেন কুরে-কুরে না খায়। যে সব বিষয় আমরা কর্মজীবনে এসে শেখার চেষ্টা করি তা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শিখে আসতে হবে, নইলে অন্য দেশের ছেলেমেয়েদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব।

গত এক দশকে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনো আমরা ছেলেমেয়েদেরকে পরিপূর্ণরূপে তৈরি না করেই কেবল সনদপত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে চাকরির বাজারে ছেড়ে দিচ্ছি। চাকরির বাজারে তারা কতটা সফল তার দায়ভার হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নয় কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যদি আমাদের ছেলেমেয়েরা হোঁচট খেয়ে ছিটকে যায়, কর্মজীবনে যদি তারা অন্যদের থেকে বড় ধরনের পার্থক্যের শিকার হয় তবে সেই দায়ভার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুতেই এড়াতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে প্রকৃতপক্ষে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে, বাস্তবতার নিরিখে। এক্ষুণি ভাবতে হবে, আমরা যদি আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে উপযুক্ত গুণাবলী অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষা না দিয়ে শুধু উচ্চ নম্বরযুক্ত সনদপত্র দেওয়ার লক্ষ্যে অসুস্থ চাপের সাগরে ভাসিয়ে দেই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ না হোক কাল নিশ্চয়ই আমাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে কোনো দ্বিধাবোধ করবে না।

শুধু পোশাক শিল্পে নয়, যে মৌলিক অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলী সবক্ষেত্রে প্রয়োজন তা হলো নিজের চিন্তাধারা অন্যের সামনে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা। ভাব বিনিময়য়ে যে যতটা প্রাঞ্জল ও দক্ষ তার জন্য যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করা ততটাই সহজ। একজন চিকিৎসক যদি রুগীকে সুন্দর ও সহজ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে রোগের কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যা করেন, রুগীর জন্য তা একটি বিরাট মানসিক শক্তি হয়ে দাঁড়ায় যা তাকে রোগের সাথে সংগ্রাম করতে অতুলনীয় সাহস যোগায়। রোগের প্রতিরোধক ও প্রতিশোধকের তুলনায় এটাও কম কিছু নয়। চিকিৎসক যখন জটিল রোগে আক্রান্ত হবেন, তখনই তিনি উপলব্ধি করবেন যে চিকিৎসকের অতি নীরবতা বা রুক্ষ আচরণ রোগীর মনে কতটা ঋণাত্মক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। শিক্ষাক্ষেত্রে বেত-লাঠি হাতে শিক্ষকের অগ্নিমূর্তি ধারণের দিন শেষ। এখন শিক্ষকেরাও অনেক যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক, কারণ যুক্তিতর্ক ও উপস্থাপনায় তাদেরকে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী হতে হবে, তবেই না এই গুণাবলীগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিফলিত হবে। ভাল শিক্ষক বলতে আমরা দুটো জিনিসকেই বুঝি, শিক্ষকের অপ্রতুল জ্ঞান অর্জন এবং তার অর্জিত জ্ঞান সুচারুরূপে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন যা একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে বহুদিন ধরে লালিত হতে থাকে। একটু ভেবে দেখুন, ছোটবেলায় ওইসব শিক্ষকদেরকে প্রিয় ভাবতাম যারা সুন্দর করে পড়াতেন, অর্থাৎ যারা সুন্দর করে কথা বলতেন। অনেকসময় তাদের ছোট্ট একটি মিষ্টি কথায় সব দুঃখ ভুলে যেতাম।

এতক্ষণ ধরে যা বললাম তার সরল সারমর্ম হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে যুক্তিতর্ক ও উপস্থাপনায় পারদর্শী হওয়ার ব্যাপারে অবশই যথাযথ দিকনির্দেশনা ও বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। তাদেরকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শিখে আসতে হবে– সঠিক উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ও সাবলীল উপস্থাপনা শৈলী। কেননা এখানেই অন্যান্য দেশের ছেলেমেয়েদের সাথে আমাদের মূল পার্থক্য, তারা যে গুণাবলীগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই অর্জন করে আসে আমরা কর্মপ্রতিষ্ঠানে এসে তা রপ্ত করার দুরূহ চেষ্টা করি।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতর্ক চর্চার মৌসুমী ব্যবস্থা থাকলেও তা গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দু-চারজন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় আর বাকিরা শুধু দর্শক হয়ে থাকে। কতটুকু লাভ হয় তাতে? আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি ছেলেমেয়েকে যুক্তিতর্কে পারদর্শী করা, নচেৎ এরা সবাই কর্মজীবনে আফসোস আর হতাশায় ভুগবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, বিতর্ক চর্চা শুধু গুটিকয়েক মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য নয়, এটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধিকার যে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে এমন একটি নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করবে যেন কর্মজীবনের অতীব জরুরী গুণাবলীসমূহ অনায়াসে রপ্ত হয়ে যায়। একটু ভেবে দেখুন তাদের কথা যারা সারাজীবন ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন ঠিকই কিন্তু কোনোদিনই কারও সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সুযোগ পাননি, আর এই সুযোগের অভাবে উপেক্ষিত একটি অতীব প্রয়োজনীয় গুণের অভাব তাকে গোপন হতাশায় ভোগায় যখন তিনি কর্মজীবনে সবার সামনে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেন না। শুধুই একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয় এই ভেবে যে, কেন যে তিনি শিক্ষাজীবনে এসব সুবোধ চর্চা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন!

ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছর শেষে টুকটাক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে দেখা যায় যেখানে তারা একটু-আধটু কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা যৎসামান্য। যেহেতু বিষয়টির গভীরতা আরও ব্যাপক তাই আরও আগে থেকেই এর পরিচর্যা করতে হবে, তাদেরকে স্কুল/কলেজ থেকেই সুন্দর করে কথা বলার সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তবেই বিশ্বের অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রমাণ করতে তাদের কোনো বেগ পেতে হবে না। সুতরাং, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি অতীব জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া খুব প্রয়োজন, তা হলো ‘বিতর্ক’ চর্চাকে জাতীয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কেবল এই বাধ্যবাধকতাই আমাদের শিক্ষার্থীদের মনের ভীতি দূর করে তাদেরকে করে তুলবে আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাশীল। মনে রাখতে হবে, এখন আমাদের প্রতিযোগিতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, এখন আমাদের প্রতিযোগিতা গোটা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের সাথে।

অতএব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈশ্বিক অস্তিত্বের কথা অনুধাবন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে আকূল আবেদন জানাচ্ছি, যেন বিতর্ক চর্চাকে জাতীয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের সন্তানদেরকে যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর লক্ষে অনবদ্য ও অবিস্মরণীয় এক পদক্ষেপ নিবেন।

সেইসাথে বাংলাদেশের সকল বর্তমান ও সাবেক বিতার্কিকদের আকুল আহ্বান জানাই, আসুন, বিতর্ক চর্চাকে সীমিত পরিসর থেকে বের করে জাতীয় পরিসরে একটি প্রায়োগিক রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই যেখানে শুধু গুটিকয়েক শিক্ষার্থী নয় বরং বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থী সমানভাবে উপকৃত হবেন। এতদিন বিতর্ক চর্চাকে আমরা জেনে এসেছি ‘Extra Curricular Activities’ হিসেবে, আসুন, এখন থেকে এটিকে আমরা ‘Regular Activities’ হিসেবে চালু করি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক