পরিষেবার মূল্য বৃদ্ধি: কেবল জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যেই সঙ্কট মোকাবেলা সম্ভব

পরিষেবা সঙ্কটের কারণে মূল্যস্ফীতিকে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে আমলাদের গতানুগতিক প্রক্রিয়া কাজে দেবে না। বরং রাজনীতিবিদদেরই সৃজনশীল আইডিয়া নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে ।

জায়েদ বিন নাসেরজায়েদ বিন নাসের
Published : 18 August 2022, 03:50 PM
Updated : 18 August 2022, 03:50 PM

লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে রুটিন করে দেওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেই রুটিনের নির্দেশনা ডেসকো, ডিপিডিসি মানছে না। ঢাকা শহরে এই লোডশেডিং কোথাও কোনওদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা। আর ঢাকার বাইরে রুটিনের তোয়াক্কা না করেই পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। সরবরাহ ও বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের উচ্চ মহলের কথার সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করছে। কিন্তু এই ব্যাপারে কোনো জবাবদিহিতা নেই। বিতরণ প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করলে উপরের নির্দেশনার কথা বলে। বলা হচ্ছে সেপ্টেম্বর থেকে লোডশেডিং হবে না। কিন্তু নিয়মমাফিক ঘোষিত সূচি কেন মানা হচ্ছে না? সরকারের তো এই ব্যাপারে না জানার কথা না। তবে কি সরকার মুখে বলছে এক থেকে দুই ঘণ্টার কথা আর সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন কোনও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে? জনমনে এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সঙ্কটের ব্যাপারে লুকোচুরি না করে পুরো পরিস্থিতি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই শ্রেয়।

মাত্র কয়দিন আগেই জিনিসপত্রের দাম বাড়লো এক দফা। হুট করে গত কয়েকদিন আগে রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘোষণা দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর ফলে জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর থেকে বাড়তি দামের কথা শুনে সেদিন রাতেই ফুয়েল স্টেশনগুলোতে মানুষ লম্বা লাইন ধরেছে। কেউ তেল বিক্রি করেনি, কেউ আবার সীমিত পরিমাণে দিয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তেলের দাম বাড়ানোর কথা। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাহী আদেশে তেলের দাম বাড়ানো হলো। এরকম হঠকারিতা কতোটা যুক্তিযুক্ত ছিল সেটা সময়ই বলবে। তবে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জিনিসপত্রের দাম আবারও যে বাড়বে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ২২ এবং ৩৪ ধারা অনুযায়ী জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করার দায়িত্ব বিইআরসির। একই আইনের ২৭ ধারা মোতাবেক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিইআরসির লাইসেন্সি। হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায় বিপিসির লভ্যাংশ থেকে ৭ বছরে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এছাড়া সরকার লিটার প্রতি ডিজেল থেকে ১৯ থেকে ২০ টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে আদায় করে। বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে বিপিসি গত ৭ বছরে সরকারকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না বলে সম্প্রতি মত দিয়েছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম। 'আইন তোয়াক্কা' না করে বিপিসি কর্তৃক এক লাফে ব্যাপকভাবে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পরবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে একবারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সর্বোচ্চ রেকর্ড হলো এবার। খবর বেরিয়েছে ওয়াসাও পানির দাম বাড়াবে। পানির দাম বাড়লেও মান রয়ে যাচ্ছে আগের মতোই, অর্থাৎ অত্যন্ত নিম্নগামী।

বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, তেল- এগুলো হচ্ছে পরিষেবা। অর্থাৎ এসব কিছুর দামের উপর অন্য সবকিছুর মূল্য নির্ভর করে। সরল ভাষায় পরিষেবার মূল্য বৃদ্ধি মানে অন্য সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়া। বাজারে সরবরাহ কমেছে জিনিসপত্রের। উৎপাদনে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি যেমন উৎপাদকদের বিপাকে ফেলেছে ঠিক একইভাবে লোডশেডিং উৎপাদনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারের কাছ থেকে টাকা উসুল করেছে। এদের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই সরকার ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী মহলের আত্মীয়স্বজনের মালিকানাধীন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংসদেও তোলা হয়নি মূল্য বৃদ্ধির ইস্যু। কারণ সংসদ অধিবেশনরত অবস্থায় নেই, কেননা এটি সাংঘাতিক ভারসাম্যহীন। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা কতোটা এই সংসদ প্রতিনিধিত্ব করে তা নিয়ে বিরোধীদের একটি বড় অংশের মানুষের প্রশ্ন আছে।

আইন অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিইআরসির কার্যকর ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু বিইআরসি সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে শুনানী করে মূল্য না বাড়িয়ে বিপিসি দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েই চলেছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার এই একই তরিকায় কাজ সেরেছে বিপিসি। বিপিসির এমন কার্যকলাপ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অবৈধ। এখানে একটা স্বার্থের দ্বন্দ্বও আছে। বিপিসি যেখানে নিজে বিক্রেতা সেখানে সেই প্রতিষ্ঠান যদি নিজেই আবার নিজের বিক্রি করা জিনিসের দাম বাড়ায় তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা কখনই সম্ভব হবার কথা না। বিইআরসির উচিৎ শুনানি করে জ্বালানির মূল্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর গণমাধ্যমগুলোকে অনুরোধ করে শুনানিগুলো জনগণকে সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থাও করা উচিৎ৷ এতে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরবে, জনমনের শঙ্কা দূর হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। গণমাধ্যম রাজি না হলে অন্যভাবেও তারা জনগণকে শুনানি দেখানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন।

তেলের দাম যখন বিশ্ববাজারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল তখনও বিপিসি অনেক দামে বিক্রি করায় বড় অঙ্কের লাভ করেছিল। কিন্তু সেই লাভের হিসাব এখনও দায়িত্বশীল কারও পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। জনগণকে এরকম অন্ধকারে রাখার ফলে মানুষের ভেতরে নানাধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। এদিকে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করার পক্ষে সাফাই গাইলেও প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর মতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীরা খুশি; যদিও ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন এফবিসিসিআই ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এ ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান এ সময়ে মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করে দিতে পারে।

এক লাফে নজিরবিহীনভাবে মূল্য এতোটা না বাড়িয়ে প্রয়োজনবোধে ধাপে ধাপে বাড়ালে আঁচটা মানুষের গায়ে সেভাবে লাগতো না। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং কর্মপন্থার যে ঘাটতি ছিল সেটা যে কেউই উপলব্ধি করতে পারবেন। পরিষেবা সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে সরকারের একের পর এক দায়মুক্তির বিধানের ফলে এইসমস্ত সেক্টরে দুর্নীতি ও লোপাটকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত শুধু হয়নি, বরং আইনি কাঠামোর মধ্যে দুর্নীতিবাজ এবং লুটেরাদের বিচার করার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে ন্যায়বিচারকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। যা সংবিধানের মূল্যবোধ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। লোপাটকারিদের লাগাম টেনে অব্যবস্থাপনায় জড়িত আমলা ও সরকারি কর্মচারীদের স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিৎ। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ইস্যুতে সহনশীলতা দেখাতে হবে। আন্দোলনে কথায় কথায় পুলিশি হামলা বন্ধ করতে হবে। এটা জাতীয় সঙ্কট। যেভাবে ডিজেলের দাম এক লাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ করা হলো, অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হলো এবং অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য ৫১ শতাংশের উপরে বাড়ানো হলো, এতে সুস্থ স্বাভাবিক যেকোনো মানুষই প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। আন্দোলন থেকে জানমালের উপর সরাসরি হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর রোধে ব্যবস্থা অবশ্যই দরকার। কিন্তু মিছিল, মিটিং, বক্তৃতার মতো কর্মসূচিতে চড়াও হয়ে বিনা উস্কানিতে হামলা, মামলা ভালো ফল বয়ে আনবে না। বরং আন্দোলন না দমিয়ে সরকারের উচিৎ জায়গামতো নজরদারি করা এবং লুটেরাদের লুটের লাগাম টেনে তাদের দমন করা।

পদ্মাসেতু নির্মাণ নিয়ে স্বস্তিতে ছিলাম যে, বাংলাদেশ বিশ্বমোড়ল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্ত মেনে না নিয়ে নিজ সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। কিন্তু আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়া সেই স্বস্তিকে চরম অস্বস্তি এবং শঙ্কায় পরিণত করেছে। ভয়াবহ রকমের উদ্বেগ কাজ করছে। কারণ পরিকল্পনামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী আইএমএফের শর্তানুযায়ী তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আইএমএফের শর্ত হচ্ছে জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো। এই প্রতিষ্ঠানের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এখন তাদের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের পথে হাঁটছে সরকার।

সরকারি কর্মচারিরা এখনও সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ অপব্যবহার করছে, জ্বালানি খরচ হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত কাজকর্মে। এসবের ব্যাপারে সরকারের আরও সচেতন দৃষ্টি দিতে হবে। সরকারি কর্মচারিদের অবাধ সুযোগ-সুবিধা, ভারসাম্যহীন ভোগ-বিলাস নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকরী ভূমিকা না নিতে পারলে ভয়াবহ সঙ্কট থেকে সহজে পার পাওয়া সম্ভব নয়। অনতিবিলম্বে রপ্তানির নতুন নতুন বাজারের দিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিৎ। সবচেয়ে আগে যেটার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি তা হলে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ এবং জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য। রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য ব্যতীত সঙ্কটকে সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করা যাবে না। সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা না করলে এই সঙ্কট মোকাবেলা করাই অসম্ভব। আর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল সকল শক্তিকে ছাড় দেওয়ার, দেশের স্বার্থে আপসের মানসিকতা নিয়ে আলাপে বসতে হবে, কাজ করতে হবে। বৈশ্বিক মহামারী, ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ, ডলার সঙ্কট, স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি, দেশে দেশে অস্থিতিশীলতা ও অস্থির অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটাই বেসামাল, লাগামহীন এবং অনিশ্চিত। অর্থনীতির এই ক্রান্তিকালে সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া আলোর দিশা কল্পনা করা যায় না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট যেমন আছে, ঠিক তেমনই জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক সঙ্কটও আছে। দেশে বিরাজনীতিকীকরণ করা ও আমলা-প্রশাসনের অবারিত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে এনে বৈরী রাজনৈতিক আবহাওয়াকে কাটিয়ে বাস্তবিক অর্থে সুষ্ঠু ও সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশের স্বার্থে নতুন এক সূচনা করা চাই। একঘেঁয়ে, গতানুগতিক আমলাতন্ত্র থেকে এই সঙ্কটের সমাধান আসবে না। এর সমাধান কেবল দেশপ্রেমিক সৃজনীশক্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিই করতে পারে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক