Published : 06 May 2026, 02:03 PM
ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গত এক দশকে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, তা নিছক দলীয় নির্বাচনি সাফল্যের আখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গভীরতর মতাদর্শিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতবাহী, যা রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান সমগ্র ভারতে এবং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে ঘটেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে নির্ণায়ক অধ্যায়গুলোর একটি। এই উত্থানের ভূ-রাজনৈতিক অভিঘাত প্রতিবেশী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ভারতের ক্ষমতায় আসে। সেই বিজয় নিছক কংগ্রেসের পরাজয় ছিল না, ছিল এক নতুন রাজনৈতিক ভাষার আবির্ভাব—যে ভাষায় হিন্দু জাতীয়তাবাদ, উন্নয়নের বয়ান এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি একটি সুসংহত মতাদর্শিক কাঠামোয় একীভূত হয়েছিল। ২০১৯ সালে এই বিজয় আরও বিশাল আকার ধারণ করে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, কর্ণাটক—একের পর এক রাজ্যে বিজেপি তার সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক আধিপত্য সুদৃঢ় করে। আসামে বিজেপি অসমিয়া আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে কৌশলগতভাবে সমন্বিত করে একটি টেকসই রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বিজেপির এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণ নিছক নির্বাচনি কৌশলের পরিণাম নয়; এর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) পরিচালিত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, সামাজিক পরিষেবামূলক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক হেজেমনি নির্মাণের একটি সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা চৌত্রিশ বছর বামপন্থী জোট—মূলত সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে বাম ফ্রন্ট—পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। এই দীর্ঘ শাসনকালকে কেবল একটি দলের ক্ষমতা-কেন্দ্রিক আখ্যান হিসেবে পাঠ করা অপর্যাপ্ত; বরং এটি একটি সুগভীর রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণ-প্রক্রিয়ার ইতিহাস।পার্টির পঞ্চায়েত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক সংঘ থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন—সমাজের প্রতিটি স্তরে বামপন্থা একটি হেজেমনিক শক্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে রক্তাক্ত দমন-পীড়ন এবং তৃণমূল স্তরে দলীয় ক্যাডারদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস—এই সব মিলিয়ে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে বামেদের ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে।
তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ছিল একটি জনবাদী রাজনীতির বিজয়—যা বামদের শ্রেণিভিত্তিক বয়ানকে প্রত্যাখ্যান করে একটি 'মা-মাটি-মানুষ' আবেগকেন্দ্রিক পরিচয়ের রাজনীতি হাজির করেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে ক্যারিসমাটিক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেন। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস একটি ব্যক্তি-আনুগত্যনির্ভর রাজনৈতিক সংগঠন, যেখানে নেতৃত্বের কেন্দ্রীভবন এতটাই প্রবল যে দলের অভ্যন্তরে কোনো সুসংহত মতাদর্শিক ভিত্তি বা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে বামফ্রন্টের পতনে যে বিপুল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তৃণমূল তা পূরণ করতে পারেনি। বরং দলের ভেতরে দুর্নীতি, ভাইপো-বিতর্ক, সংসদীয় দলের একাধিক সদস্যের ক্ষমতার অপব্যবহার—এই সব মিলিয়ে একটি বিকল্পের জন্য জনতার তৃষ্ণা তৈরি হয়।
এই শূন্যতায় প্রবেশ করে বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি জিতে নেয়—যা ছিল এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বামপন্থার সমর্থকদের একটি বড় অংশ, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ, তৃণমূলের বিরোধিতায় বিজেপির দিকে সরে যায়। মতুয়া, রাজবংশী এবং অন্যান্য অনগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়গুলোকে বিজেপি নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) এবং পরিচয়ের রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের দিকে টেনে আনে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি একটি বিশাল ভোটব্যাংক তৈরি করে। একই সঙ্গে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ঘিরে ভয় ও সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি করে হিন্দু ভোটারদের একটি অংশকে মেরুকৃত করার কৌশলও সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে কেন্দ্রে রেখে এবং ‘বাংলার মেয়ে বাংলা শাসন করবে’—এই আঞ্চলিক-জাতীয়তাবাদী আখ্যানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করে। বিজেপি ৭৭টি আসন পায়। তবে এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের দাবি রাখে: যে রাজ্যে এক দশক আগেও বিজেপির কোনো কার্যকর সাংগঠনিক উপস্থিতি ছিল না, সেখানে দলটি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনি অস্তিত্ব কার্যত বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায়। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণ বাম-ডানের দ্বন্দ্ব থেকে সরে গিয়ে তৃণমূল বনাম বিজেপি—অর্থাৎ মধ্য-ডান বনাম কট্টর-ডানের দ্বিমেরু কাঠামোয় পুনর্বিন্যস্ত হয়। এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুচিন্তিত ও ধারাবাহিক মতাদর্শিক স্থানচ্যুতির প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি।
হিন্দুত্ববাদের এই উত্থানকে কেবল নির্বাচনি সাফল্যের পরিসংখ্যানে বিচার করা তার প্রকৃত গভীরতা ও ব্যাপ্তিকে আড়াল করে। এর মর্মমূলে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ও সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। আন্তোনিও গ্রামশির হেজেমনি তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বিজেপি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা অধিগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—সমান্তরালভাবে তারা নাগরিক সমাজেও হেজেমনি প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল অনুসরণ করেছে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন, ইতিহাসের বিকল্প পাঠ নির্মাণ, সংবাদমাধ্যমের ওপর কাঠামোগত প্রভাব বিস্তার এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংগঠনিক অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক আখ্যান নির্মাণের প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামশি যাকে ‘কমন সেন্স’ বা সমাজের প্রচলিত সাধারণ বোধ বলেছেন, সেই বোধের কাঠামো একবার রূপান্তরিত হলে রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল সময়ের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে এই সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর হয়েছে—যা রাজ্যটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি নির্ণায়ক চলক হিসেবে কাজ করছে।
ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এই কাঠামোগত রূপান্তরের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর বহুমাত্রিক ও গভীর। প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে—বিশেষত পানি বণ্টন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘকালীন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোতে—হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় সরকারের ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। তিস্তার পানি বণ্টনের দীর্ঘস্থায়ী অনিষ্পত্তি, সীমান্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি—এই বিষয়গুলো সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানকে একটি কাঠামোগত অসাম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ভারতে বাংলাদেশি হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রশ্নকে ঘিরে যে বয়ান তৈরি হয়েছে, তা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়বস্তু করে তুলেছে।
তৃতীয়ত, এবং তাত্ত্বিক বিচারে সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাবটি হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত। ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে দুটি পরস্পরবিরোধী কিন্তু সমান্তরাল প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন করছে। একদিকে, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার অনুসারীরা ভারতের অভিজ্ঞতাকে একটি ঐতিহাসিক সতর্ক সংকেত হিসেবে পাঠ করছেন এবং দেশীয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ভিত্তিকে সুসংহত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। অন্যদিকে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে মুসলিম-বিরোধিতার কাঠামোগত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের মতাদর্শিক আখ্যানকে জনমানসে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করছে। এই দ্বিমুখী গতিপ্রবাহের পরিণতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিসকোর্স ক্রমশ ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির সামাজিক সংহতি, রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তারাও এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি গভীর কৌশলগত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার বাধ্যবাধকতা অনেক ক্ষেত্রে সেই সরকারের সংখ্যালঘু-বিরোধী নীতিগুলোর প্রতি মৌন সম্মতির সমতুল্য হয়ে পড়ে—যা বাংলাদেশের ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল জনমানসে এই শক্তিগুলোর রাজনৈতিক বৈধতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পক্ষান্তরে, যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভারত-বিরোধী অবস্থান থেকে হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা করে, তারা সেই সমালোচনাকে প্রায়শই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের আখ্যানে আবৃত করে উপস্থাপন করে—যা একদিকে হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি ও মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে এক অপরিহার্য আদর্শিক সংঘাত তৈরি করে।
এখন প্রশ্ন হলো, পশ্চিমবঙ্গে কি আবার ধর্মনিরপেক্ষ বা বামপন্থী রাজনীতির পুনরুজ্জীবন সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে বুঝতে হবে কেন বামপন্থার পতন হলো। বামেদের পতন কেবল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ফল ছিল না। মূল কারণ ছিল আরও গভীরে—দীর্ঘ ক্ষমতার কারণে দলীয় কাঠামোর আমলাতান্ত্রিক জড়তা, তৃণমূল স্তরের ক্যাডারদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ব্যর্থতা। বামপন্থা যদি কেবল একটি নির্বাচনি কৌশল হিসেবে ফিরে আসার চেষ্টা করে, তাহলে তা টেকসই হবে না। তাকে ফিরে আসতে হবে একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক পুনর্নিমাণের মধ্য দিয়ে।
তবে সম্ভাবনাটি একদম নেই, তা-ও বলা যাবে না। বিজেপির আগ্রাসী কেন্দ্রীভূত শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার আঞ্চলিক গর্ব একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হতে পারে। তৃণমূলের দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পের শূন্যতা রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিচয়ের রাজনীতির বাইরে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলো নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ রয়েছে। যদি বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো এই অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারে এবং নতুন সাংগঠনিক রূপে মানুষের কাছে যেতে পারে, তাহলে একটি ধীর কিন্তু বাস্তব পুনরুজ্জীবন সম্ভব।
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্নটিতে: দক্ষিণপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে কি কেবল ধর্মনিরপেক্ষ বা বামপন্থী রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু 'হ্যাঁ' নয়, বরং এটাই একমাত্র কার্যকর পথ—এবং এই প্রতিপাদ্যের পেছনে একটি গভীর তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। কার্ল পোলানির 'The Great Transformation' থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থনীতি, এরনেস্তো লাকলাউর জনবাদের তত্ত্ব থেকে বেনেডিক্ট অ্যান্ডার্সনের 'কল্পিত সম্প্রদায়'—সবাই একটি মৌলিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: উগ্র ডানপন্থা বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তখনই শিকড় গাড়ে, যখন বস্তুগত বৈষম্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নগুলো অনুত্তরিত থাকে এবং সেই শূন্যতা পূরণে পরিচয়ের রাজনীতি সুযোগ পায়।
হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি মূলত একটি ভয়ের রাজনীতি—'অপর'কে শত্রু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে নিজের সম্প্রদায়কে একত্র করার কৌশল। এই ভয়কে শুধু পাল্টা ভয় দিয়ে মোকাবেলা করা যাবে না। একটি ধর্মনিরপেক্ষ বয়ান যদি মানুষের বাস্তব জীবনের প্রশ্নগুলো—রুটি-রুজি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা—থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে সেটি কেবল একটি অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প হয়ে থাকে, জনগণের আন্দোলনে পরিণত হয় না। বামপন্থা বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির শক্তি ঐতিহাসিকভাবে এখানেই ছিল যে এটি পরিচয়ের প্রশ্নকে শ্রেণির প্রশ্নের সঙ্গে, সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রশ্নকে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে দিত।
বিপরীতে, ডানপন্থী রাজনীতি দিয়ে ডানপন্থাকে মোকাবেলার যে কৌশল—অর্থাৎ 'নরম হিন্দুত্ব' বা ধর্মীয় প্রতীকের আশ্রয় নিয়ে ভোট ধরার চেষ্টা—ইতিহাস প্রমাণ করেছে এটি আত্মঘাতী। কংগ্রেসের 'নরম হিন্দুত্ব' বিজেপির 'কঠোর হিন্দুত্বের' বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষ আসলের বদলে নকলকে কখনো পছন্দ করে না। ফলে যখনই মূলধারার দলগুলো বিজেপির ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেছে, তারা বিজেপিকে বৈধতা দিয়েছে—প্রতিরোধ করেনি। একটি সত্যিকারের বিকল্পকে তাই ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে হবে, ভিন্ন প্রশ্ন তুলতে হবে।
গ্রামশির হেজেমনির তত্ত্ব এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গ্রামশি বলেছিলেন, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগে টেকে না—এর জন্য সম্মতি উৎপাদন করতে হয়। হিন্দুত্ববাদ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই, তারা সম্মতি উৎপাদনের লড়াইটাও চালাচ্ছে—মিডিয়া, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মাধ্যম দিয়ে। এই লড়াইটি কেবল সংসদীয় বা নির্বাচনি ময়দানে লড়া সম্ভব নয়। এই লড়াইটিকে নামাতে হবে নাগরিক সমাজে, সাংস্কৃতিক পরিসরে, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানে। ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী রাজনীতিকে তাই কেবল সরকার গঠনের লক্ষ্যে নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদী পাল্টা-হেজেমনি নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ—সর্বত্র একটি মৌলিক সত্য কাজ করছে: ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ একটি রাজনৈতিক উপকরণ, যা সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও রাজনৈতিক হতাশার জ্বালানি ব্যবহার করে জ্বলে ওঠে। তাই তাকে নেভাতে হলে কেবল পাল্টা-প্রচারণা নয়, কাঠামোগত অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি সত্যিকারের বিকল্প প্রকল্প হাজির করতে হবে। এই প্রকল্পটি কেবল বামপন্থা বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিই দিতে পারে—কারণ এটি মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে শ্রেণি, মর্যাদা ও অধিকারের ভাষায় কথা বলতে শেখায়। তাই গেরুয়া ঢেউ যতই শক্তিশালী হোক, ইতিহাস বলে মানুষের ন্যায়বিচারের তৃষ্ণা শেষপর্যন্ত কোনো বিভাজনকামী রাজনীতি দিয়ে পূরণ হয় না।