নির্বাচনের আমেজ, কেউ কি শুনতে পাচ্ছেন জনগণের কথা?

নির্বাচন তো ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’— সেই সুঁই পরিমাণ মাটি নিয়ে লড়াই তো দূরের কথা, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয় সুনিশ্চিত।

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 29 Nov 2023, 12:06 PM
Updated : 29 Nov 2023, 12:06 PM

দূরদেশে বসেও দেশে নির্বাচনি আমেজ তৈরি হয়ে গেছে বলে টের পাচ্ছি। বিএনপি ও তার সমমনা নামে পরিচিত দলগুলোর হরতাল অবরোধ কী কাজে আসছে জানি না । তবে এটা মানতেই হবে অদম্য শেখ হাসিনা আবারও এগিয়ে আছেন। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাঠে নেমে পড়ার মধ্য দিয়ে মোটামুটি একটা ভোটের আবহ তৈরি হয়ে গিয়েছে। অবশ্য এই আবহ যতটা জনমনে তার চেয়ে বেশি গণমাধ্যমে। এত এত পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন আর অনলাইনের তো চলতে হবে । কাটতি লাগবে। কাজেই এই সব গণমাধ্যমের অধিকাংশই যা পাচ্ছে, তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, নৌকার মনোনয়ন মানে কি জিতে যাওয়া? সাধারণত নির্বাচন মানে যুদ্ধ। নির্বাচন তো ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’— সেই সুঁই পরিমাণ মাটি নিয়ে লড়াই তো দূরের কথা, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয় সুনিশ্চিত। অবশ্য আমরা সবাই বুঝি কী এর কারণ। একদিকে ভোট নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা, ভোট দিতে না দেয়া, রাতে ভোট করে ফেলা ইত্যাদি গুরুতর সব অভিযোগ তো রয়েছেই। তাই ভোট নিয়ে সন্দেহ-সংশয় কাজ করে মানুষের মনে।

অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বহীন। দলটির মূল নেতাই বহুদিন ধরে দেশের বাইরে পলাতক। বিএনপি ও তাদের সমমনাদের নিয়ে গঠিত জোট দিক-নির্দেশনাহীন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এমনই এক প্ল্যাটফর্ম যেখান থেকে এক নেতা ও এক কর্মীর দল কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমও সটকে পড়তে পারেন। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা রীতিমতন একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন। সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে নতুন রাজনৈতিক জোট আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কল্যাণ পার্টির সঙ্গে নতুন এই জোটে শরিক হয়েছে জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হাতপাঞ্জা)। আজ আছি তো কাল নাই নেতাদের দলটির জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপিতে দেখছি আমরা। সেই বিখ্যাত মওদুদ সাহেব আজ প্রয়াত। এমন অনেক নেতা মন্ত্রিত্ব আর আসনের স্বার্থে এই দলে ছিলেন।

বিএনপির হরতাল -বরোধ আসলে এক ধরণের হুমকি। বোধ হয় নিজেদের অস্তিত্ব জানাতে এই হুমকি জারি রাখতে হবে বলে মনে করছে দলটি। তবে হুমকিতে কাজ হবে বলে মনে হয় না। সরকার এসব মোকাবেলা করতে করতে মোকাবেলার সব মন্ত্র জানে ও বোঝে। কাজেই বিশেষ কিছু না ঘটলে কিভাবে কি হতে পারে তা এখন স্পষ্ট। আমাদের জিজ্ঞাসা অন্যত্র। জ্বালাও-পোড়াও করে, মানুষ মেরে আন্দোলন হয় না। এখন যুগ পাল্টেছে। যে সব লোকজন টক শো করে উসকানি দেন, তাদের আমরা সুশীল বললেও রাজনীতিবিদ বা গবেষক বলতে পারি না। এদের কথার জোর কতটা তা এখন ভালোই বোঝা যাচ্ছে । আসলে এভাবে কিছুই হয় না। সত্যিকার অর্থে মানুষ যে উন্নয়ন আর  অগ্রযাত্রার সঙ্গী সেটাই তার মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছে । সে কারণেই নৌকার মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা মোটামুটি নিশ্চিত যে তারা জিতবেন । এই জয় প্রত্যাশিত হলেও গণতন্ত্রের জন্য কি সহায়ক?

আজকে দেশে বহুবিধ সমস্যা। সঙ্গত কারণেই আমরা দ্রব্যমূল্য, যানজট বা সন্ত্রাসের মতো বিষয় কিংবা আর্থিক দুর্নীতি ও লুটপাট নিয়ে বেশি বলি—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর ফাঁকে আরো অনেক সমস্যা আমাদের নৈতিকতা, জীবন শিক্ষার মতো বিষয়গুলোকে আক্রমণ করেছে। আমাদের দেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ আসলে কেমন? তাদের লেখাপড়ার অবস্থা কি আসলেই মানসম্মত? এসব প্রশ্ন এখন জ্বলন্ত । বাড়ছে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও  সাম্প্রদায়িকতা ।

সাম্প্রদায়িকতা কেবল হিন্দু-মুসলমানে নয়। লড়াইটা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি অবহেলা তাদের অপমান করাও সাম্প্রদায়িকতা । সাম্প্রদায়িকতা কতটা বেড়েছে তার বড় নজির ছিল ক্রিকেট । এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালের পর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের রসায়নই বদলে গেছে। সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে এখন তা বৈরিতার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শুরু থেকে আমি ভারতীয় ক্রিকেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় সে দেশের অনেকেই রাগ করেছিল৷ খেলার শুরু ও মধ্যভাগে কলকাতাসহ ভারতের অন্য শহরে সফরে থাকায় কিছুটা আঁচও টের পেয়েছি। যে তিন কারণে তারা হেরেছে বলে মনে হয় তার একটি ওভার কনফিডেন্স বা গর্ব। বাকি দুটোর একটি গাভাসকারের মতো উগ্র ধারাভাষ্যকার, যিনি খোলামেলা ভাবে অন্যদের স্টুপিড বা গাধা বলতে পারেন। শেষত মিডিয়ার বাড়াবাড়ি। এক একটা খেলোয়াড় যেন একেকটি দেবতা।

ভারত ফাইনালে অজিদের কাছে গো হারা হেরেছে। সিডনিতে উদ্বেলিত আনন্দিত গর্বিত আমরা যে প্রতিক্রিয়া দেখাইনি বা যার কোন দরকার পড়েনি, সে বিকৃতি কেন গ্রাস করলো বাংলাদেশের তারুণ্যকে? এটার পেছনে কেবল তিস্তা বা সীমান্ত সমস্যা কিংবা শোষণের কথা ভাবলে ভুল হবে। এর সঙ্গে অপপ্রচার ও রাজনীতি জড়িয়ে আছে। গত দুই দশকে রাজনীতি এক অচলায়তনে পরিণত হয়েছে।তার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। শুধু লুণ্ঠন, চুরি-ডাকাতি, জ্বালাও-পোড়াও —এই তার কাজ? এর ফাঁকেই সর্বনাশ হয়ে গেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে। দেশে সবকিছুই একমুখী। দূর থেকে বা কাছ থেকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখলে যে কেউ বুঝবেন একা নেতা তরী বাইছেন। তাঁকে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে বলেই মানুষ ধৈর্য ধরে আছে। শিশু কিশোরেরা কিছু জানেই না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জয়গাঁথা জানতে হলে একাত্তরের নয় মাসকে জানতে হবে। সে কথা কোথাও নেই। বইয়ে নেই, তাহলে তারা ভারতবিদ্বেষী হবে না কেন? ভারতের রাজশক্তির অন্যায় বা বড় ভাইসুলভ আচরণ ও খেলা এক বিষয় নয়। সেটা পরিষ্কার করার কোনো নিয়ম, শিক্ষা নেই। এটা সব দেশের বেলায় সত্য।

যারা মুসলিমবিরোধী ও ইহুদিসমর্থক বলে আমেরিকার মুণ্ডুপাত করে, পারলে তাদের মারে, তারাও এখন হাসের জন্য দিওয়ানা। পিটার হাস আওয়ামী লীগ ও সরকার বিরোধী হওয়ায় রাতারাতি বাংলাদেশের কিছু দলের নেতাকর্মীদের পরমাত্মীয় হয়ে গেলেন। এইসব প্রবণতা এবং জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা যত বাড়ছে ততোই সমাজ অসহায় হয়ে পড়ছে।

এবার দেশে গিয়ে দেখলাম একটা পদ্ধতিতে কাজ চলছে। বুঝতে পারলাম এভাবেই চলবে। কিন্তু কোথাও কোনো অভিভাবক নেই।  এমনই একটা পরিস্থিতি কোথাও কোনো কারণে আটকে গেলে কে উদ্ধার করবে কেউ তা বলতে পারে না। কারণ বহুমাত্রিক জটিলতাও সবকিছু এককেন্দ্রিক। এক জায়গায় ঘটনা না পৌঁছানো পর্যন্ত ‘নো সমাধান’।

এটি গণতন্ত্র বা সবার জন্য মঙ্গলের হতে পারে না। যে কারণে নির্বাচন নিয়ে মানুষ মূলত অনাগ্রহী। একদিকে অবরোধ-হরতালসহ নাশকতা অন্যদিকে উৎসব৷ খেয়াল করা দরকার কথা বলা বা কাজ করার মানুষগুলো এখন কথা বলে না কাজও করে না। সেলিব্রিটি নামে পরিচিতজনদের কিছু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায় থাকে। সেটাও উধাও। সবাই এখন মাঝি হতে চান। হতে চাওয়া অপরাধ কিছু নয়, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দেশ তো অপেক্ষায়,  ‘ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল’? সে হালের হকিকত নিয়ে ভাবার মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল এখন।

গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে ধারাবাহিকতা কাম্য। সব দেশ তরতর করে এগুচ্ছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই থাকবেও না৷ কিন্তু টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রয়োজন দোরগোড়ায়। এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। গত দু দফার বিতর্ক ও সন্দেহ ঘুচিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দরকার সহমর্মিতা। এর পাশাপাশি যেসব সমস্যা জমে পাহাড় হয়েছে তার সমাধানও জরুরি।

নির্বাচনের আমেজ তৈরি হওয়া ও তার ফলাফল দেখার জন্য জনগণ অপেক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে আছে দেশের বাইরে বসবাসরত বাংলাদেশের জনগণ। নতুন জন জরিপে তাদের সংখ্যা নিয়ে গোঁজামিলে তারা বিরক্ত। এখন বাকি রয়ে গেল নির্বাচন ও সমস্যার সমাধান।

সরকারি দলের যারা জয়ের ব্যাপারে নিশ্চত হয়ে গেছেন তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন,  এসব দিকে নজর দেয়ার সময় পাবেন তো আপনারা?