২০২০ সালে মেডিসিন ও শারীরবৃত্তিতে নোবেল পুরস্কার

Published : 31 Jan 2012, 06:54 AM
Updated : 7 Oct 2020, 05:12 PM

মেডিসিন এবং ফিজিওলজি বা শারীরবৃত্তিতে ২০২০ সালে  নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী যাদের কোন না কোনভাবে আমেরিকার সঙ্গে সংযুক্তি আছে। কিন্তু তিনজন কাজ করেছেন একটি সংক্রামক রোগের তিনটি দিক নিয়ে। বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ মহামারীতে পর্যুদস্ত, সেখানে আরেকটি ইনফেকশাস ডিজিজ বা সংক্রামক রোগের আবিষ্কারের জন্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিস্ময়ের কিছু না। বিশ্বকে এখন এই বিষয়ে আরও সচেতন করাও জরুরী। তাছাড়া যে রোগটির নানান দিক এই তিন বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছেন তা এখনো বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগে, একটু জেনে নিই এই বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানী হারভি অলটার ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার থেকে মেডিক্যাল ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) এ কর্মরত অবস্থায় মানব শরীরে রক্ত স্থানান্তর-সঞ্চালনের পরে এক ধরনের সংক্রমণ দেখতে পান, যা সেই সময়ে আবিস্কৃত হেপাটাইটিস এ এবং বি নয়। তখন এটাকে বলা হয় হেপাটাইটিস নন-এ এবং নন-বি। হেপাটাইটিস অর্থ হলো লিভার বা যকৃতের সংক্রমণ, যা থেকে যকৃতের প্রদাহ, এমনকি বি এবং সি ভাইরাস দিয়ে লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সার হয়ে থাকে। চল্লিশের দশকে যকৃতের প্রদাহে যে ভাইরাস কে চিহ্নিত করা হয় তার নাম দেওয়া হলো হেপাটাইসিস এ। এই ভাইরাসটি খাদ্য বা পানিবাহিত এবং খুব স্বল্পস্থায়ী সংক্রমণ করেই নিরাময় হয়। বাংলাদেশে খুব সাধারণভাবে এই হেপাটাইটিস 'এ' দেখা যায়। ষাটের দশকে  অন্য আরেকটি রক্তবাহিত ভাইরাস আবিষ্কার করেন বারুচ ব্লুমব্লার্গ যাকে নাম দেওয়া হয় হেপাটাইসিস 'বি'।এই আবিষ্কারের জন্যে ব্লুমব্লার্গ মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৭৬ সালে। চিকিৎসা বিজ্ঞানী হারভি অলটার যখন অজানা আরেকটি ভাইরাস, যা হেপাটাইটিস 'এ' এবং 'বি' থেকে আলাদা, আবিষ্কার করলেন তখন বিজ্ঞানী মহলে নানান কৌতূহলের সৃষ্টি করে। 

ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া মাইকেল হুটন, যিনি বর্তমানে কানাডার আলবার্টা  ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার কাইরোন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করার সময় তার নোবেল বিজয়ী আবিষ্কারটি করেন। মাইকেল হুটন এবং তার সহকর্মীরা একটি শিম্পাঞ্জির রক্তে থেকে এক ধরনের ডিএনএ-র অংশবিশেষ আলাদা করেন যা মূলত শিম্পাঞ্জির শরীর থেকে এলেও বিজ্ঞানীদল ধারণা করেন যে ডিএনএ-র সবটুকু শিম্পাঞ্জির নয়, বরং একটি অজানা ভাইরাস থেকে আসছে। তারা ক্লোন করে সেই অংশটুকু আলাদা করার পর বুঝতে পারলেন তাদের ক্লোন করা একটি অংশ আসলে নতুন ধরনের আরএনএ ভাইরাস, আজকের বিশ্বমহামারী কোভিড-১৯ যেমন তেমন একটি আরএনএ ভাইরাস। এই ভাইরাসটি ফ্লাভিভাইরাস ফ্যামিলির বা গোত্রের এবং এর নাম দেওয়া হলো হেপাটাইটিস 'সি'। 

রক্তবাহিত হেপাটাইটিস বি ও সি লিভারের সিরোসিস ও ক্যান্সারের কারণ। 

তিনজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের সংক্ষিপ্ত রূপ 

কিন্তু এই দুটো আবিষ্কারের পরও একটি অমীমাংসিত বিষয় থেকে গেল; তাহলো এই ভাইরাসটি কি একাই হেপাটিটিস বা যকৃতের প্রদাহ করতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমেরিকার মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেইন্ট লুইস শহরের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষক চার্লস রাইস করলেন আরেক আবিষ্কার। তিনি ভাইরাসটির জেনোম স্টাডি করে এটিকে আলাদাভাবে প্রাণীর শরীরের প্রতিলিপি তৈরি করতে (অনেকটা বংশবৃদ্ধির মতো)সক্ষম প্রমাণ করেন এবং একাই রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা আছে তা আবিষ্কার করে এই রোগ ও রোগের কারণের জ্ঞানের পূর্ণতা দেন। একারণেই তিন বিজ্ঞানীকে এ বছরের নোবেল পুরস্কার ভাগ করে দেওয়া হলো।  

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কী? 

বিশ্ব জনস্বাস্থ্যে এই আবিষ্কার কতোটা  গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে বর্তমান কোভিড-১৯ রোগের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। যদিও হেপাটাইটিস 'সি' কোভিডের মতো এতো বেশি সংক্রামক নয় এবং রক্তবাহিত (নিডল, যৌন সঙ্গমের মাধ্যমে ছড়ায়), তবু পৃথিবীতে প্রতি বছর ৭১ মিলিয়ন (৭১,০০০,০০০) মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়। প্রতি বছর চার লাখের মতো মানুষ মারা যায় হেপাটাইটিস 'সি' সংক্রমণ থেকে ক্যান্সার ও সিরোসিস হয়ে। এই আবিষ্কার হেপাটাইটিস 'সি' ডিটেকশনের টেস্ট, টিকা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনে ভূমিকা রেখে বিশ্বের বড় একটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা সমাধান করেছে যা নোবেল পুরস্কারের যথার্থ দাবিদার।

অন্যদিকে বর্তমান কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারী যা আরেকটি একই ধরনের ভাইরাস দিয়ে হচ্ছে তার চিকিৎসা বা টিকার ক্ষেত্রে একই রকমের পদ্ধতিতে যে কাজে লাগবে না, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। কিংবা বলা যায় এই তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের পথ ধরেই অন্যান্য ভাইরাসের টেস্ট, টিকা বা চিকিৎসা আবিষ্কৃত হবে যা মানবগোষ্ঠির কল্যাণে কাজ দেবে। তাই নির্দ্বিধায় এই তিন বিজ্ঞানীকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানানোর  মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞানের এবং মানবতার জয় কে উদযাপন করা যেতে পারে। অভিনন্দন আবারো এই বিজ্ঞানীত্রয়ী-কে বিশ্বের সেরা স্বীকৃতির জন্যে! 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক