০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ভাইয়ের ‘উন্নাসিকতা’ ও আমাদের রুচির দারিদ্র্য

যোগ্য মানুষের সামনে বিনয়ী, কিন্তু পেশাগত দীনতা আর মূর্খতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন তীব্র সোচ্চার। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি সমালোচকদের দেওয়া ‘উন্নাসিক’ তকমার আড়ালের সত্য নিয়ে লিখেছেন তারই সহকর্মী রাজু আলাউদ্দিন।

তৌফিক ভাইয়ের ‘উন্নাসিকতা’ ও আমাদের রুচির দারিদ্র্য

আর্হেন্তিনা থেকে রাজু আলাউদ্দিনের (বামে) আনা মাতে ও মাতে পানের পাত্র কৌতূহল নিয়ে দেখছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। চা বা কফির মতোই মাতে হচ্ছে আর্হেন্তিনোদের এক ধরনের পানীয়।

রাজু আলাউদ্দিন রাজু আলাউদ্দিন

Published : 08 Oct 2026, 12:38 PM

Updated : 08 Oct 2026, 01:32 PM

জীবনে এমন কিছু আঘাত আসে, এতটা প্রবল…

আমি জানি না!

এমন আঘাত যেন তা ঈশ্বরের ঘৃণা; যেন বা

ওই আঘাতের মুখোমুখি

এতদিন যা কিছু সয়ে গেছি তা সব উল্টোস্রোতে

আত্মায় এসে জমে পুকুরের মতো,

আমি জানি না!

ওরা সংখ্যায় কম; কিন্তু ওরা আছে…

সবচেয়ে কঠোর মুখে, সবচেয়ে শক্তিশালী পিঠে

ওরা কালো পরিখা কাটে।

মনে হয় ওরা বর্বর আত্তিলাদের তরুণ ঘোড়াগুলি;

কিম্বা আমাদের উদ্দেশে মৃত্যুর পাঠানো কালো যমদূত।

( কালো বার্তাবাহকেরা, সেসার বাইয়্যেহো, অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন)

২ অক্টোবর বিকেলে নবী(চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী) ভাইয়ের কাছ থেকেই প্রথম শুনি হৃদয়বিদারক সেই দুঃসংবাদটি। খবরটা শোনার পর বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সহকর্মী জাহিদের (জাহিদুল কবির) কাছে জানতে চেয়েছিলাম, খবরটা ঠিক কিনা। জাহিদের কাছে আমি আসলে ‘না’শুনতে চাইছিলাম। কিন্তু জাহিদ আমাকে হতাশ করে মৃত্যুর খবরটাই নিশ্চিত করলেন।

খবরটা শুনে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। তৌফিক ভাইয়ের (ইমরোজ খালিদী) এই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত প্রয়াণ আমি কীভাবে মেনে নেব? লন্ডন যাওয়ার দুদিন আগেই তার সঙ্গে আমাদের শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল তারই বাসায়। সঙ্গে ছিলেন সুব্রত শংকর ধর, গোলাম ফারুক খান, সস্ত্রীক আজহার ফরহাদ আর আমার স্ত্রী।

সেদিন তৌফিক ভাই এত উৎফুল্ল ও আনন্দপূর্ণ মেজাজে ছিলেন যে আমাদের কারোরই মনে হয়নি মৃত্যুর গুপ্তচর ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছে লন্ডনের মাটিতে মাত্র কয়েকদিনের দূরত্বে। যিনি অন্যের অসুস্থতায় বিচলিত বোধ করতেন, দিতেন নিজের হোমিও-এলেম থেকে নিরাময়ী নির্দেশনা ও পথ্য, নিজের সুস্থতা নিয়েও তার যত্নের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু মৃত্যু সমস্ত সতর্কতা আর নিরাময়ী ব্যূহ ভেদ করে তাকে ছিনিয়ে নিল, নিল এমনই এক সময় যখন কিনা এই মৃত্যুকে আমরা অকাল প্রয়াণ ছাড়া আর কিছুই বলতে পারি না। সারাজীবন যিনি খাদ্যসচেতন ও স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন, মৃত্যু এসে তাকেই লক্ষ্যবস্তু করে তুলল আমাদের সব হিসেব-নিকেশকে ভণ্ডুল করে দিয়ে।

মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। কিছু কিছু মানুষের প্রয়াণ আমাদেরকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়ে যায়। তার মৃত্যুতে এত শূন্যতা অনুভব করছি যে এমনটা আমার আত্মীয়বিয়োগেও কখনো অনুভব করিনি। তার আগে এই একই রকম অনুভূতি হয়েছিল যখন আবদুল মান্নান সৈয়দ মৃত্যুবরণ করেন। অথচ এই দুজনের সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই দুজনই আমার পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন; মান্নান ভাই তার সাহিত্যিক ডানার নিচে মাতৃসুলভ মমতায় আগলে রেখেছিলেন আমাকে, আর তৌফিক ভাই ভ্রাতৃসুলভ ভালোবাসায় আমাকে তার হৃদয়ে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। শেষ বছরগুলোয় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বন্ধুপ্রতিম। শেষের দিকে আমি দু-তিনবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যখন মৃত্যুর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছি, তিনি তখন সংগোপনে আর্থিক সহযোগিতা করেছেনই, আমার স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে এও জানিয়েছেন, যখন যা লাগবে তাকে যেন নির্দ্বিধায় জানানো হয়। অথচ তার কোনো প্রয়োজনে আসার সুযোগ আমি পাইনি—এই দুঃখ কীভাবে ভুলব?

কর্মসূত্রে আমি তার অধীনস্থ ছিলাম বটে, কিন্তু পেশাগত এই সম্পর্কটিকে তিনি প্রভু-ভৃত্যের আচরণ দিয়ে কখনো খাটো করে দেখেননি। বরং প্রত্যেক সহকর্মীর প্রতি তার দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ছিল সত্যিকারের অভিভাবকের মতো। আমাদের আর্থিক সংকটের সময় তাকে কতবার যে বিচলিত হতে দেখেছি। সহকর্মীদের সঠিক সময়ে বেতন দিতে না পারলে তিনি মনে মনে খুব কষ্ট পেতেন, অস্বস্তি বোধ করতেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওপর ক্ষমতাসীন আর দুর্বৃত্তদের পীড়নের কথা সবারই জানা; মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা থেকে শুরু করে প্রাপ্য বহু বৈধ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা তো ছিলই। এসবই হয়েছিল তার আপসহীন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে। কিন্তু প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার কাছে তিনি নিজের সততা ও আদর্শকে বিকিয়ে দেননি কখনো। এত ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও তিনি প্রতিষ্ঠান ও সহকর্মীদের বুকে আগলে রেখেছেন। যখনই কোনো সহকর্মীর লেখা বা প্রতিবেদন সরকার কিংবা বিরোধীদলীয় রোষের শিকার হয়েছে, তখন তিনি সহকর্মীকে প্রতিপক্ষের হাতে বলিদান হিসেবে তুলে না দিয়ে বরং নিজে বুক পেতে গ্রহণ করেছেন সেই আঘাত। এমন সম্পাদক আজ আছে কোথাও?

জুলাই অভ্যুত্থানের পরপর জাতীয় সংগীত নিয়ে একটি লেখা লিখে তোপের মুখে কেবল আমিই না, গোটা প্রতিষ্ঠানই হুমকির মুখে পড়েছিল। তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সর্বোচ্চ উত্থান ও তাণ্ডবের সময়। আমাকে আর সম্পাদককে অকথ্য ভাষায় গালাগাল তো ছিলই, ছিল আমাদের হত্যার হুমকিও। এমনকি প্রতিষ্ঠানটিকে পুড়িয়ে দেওয়ার ফতোয়া। আমি বিচলিত ও ভীত হয়ে পড়লেও, তৌফিক ভাই অবিচল ও অকুতোভয়। তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে, উল্টো আমাকে পরামর্শ দিলেন, “আপনি কিছুদিন আত্মগোপনে চলে যান। সম্ভব হলে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়ে আসুন।” অর্থাৎ, শুধু আমার নিরাপত্তাই নয়, আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন, বিচলিত। গ্রামের বাড়িতে অবশ্য শেষ পর্যন্ত যাইনি, তবে আমি নিজে তার পরামর্শে কিছুদিন ঢাকার বাইরে এক আত্মীয়ের বাসায় কাটিয়েছিলাম। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিটি যখন ওই লেখাটি তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল, তৌফিক ভাই তখনও অটল। লেখা যদি যুক্তিনিষ্ঠ হয়, যদি সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে লেখা হয়ে থাকে, সেই লেখা তিনি কোনো হুমকিতেই প্রত্যাহার করবেন না—এমনই একরোখা ছিলেন তিনি। এবং সত্যিই তিনি করেননি।

শুধু এই লেখাই নয়, আরও বহু লেখার ক্ষেত্রেই এমন ঘটেছে, কিন্তু তৌফিক ভাই কখনো প্রত্যাহার করেননি। তৌফিক ভাইয়ের দৃঢ়চেতা মনোভাব, আপসহীন অবস্থান প্রতিপক্ষের ক্রোধকে বরং উসকে দিত বেশি। সেই ক্রোধের বহ্নি আমাদের পুড়িয়েছে, একবার-দুবার নয়, বহুবার। কিন্তু পরাজিত করতে পারেনি। না পারার কারণ তৌফিক ভাইয়ের সম্পাদকীয় আপসহীন অবস্থান।

তার মৃত্যুর পর কেউ কেউ তাকে উন্নাসিক, চিরনিন্দুক বলেও অভিহিত করেছেন। এই দুটো অভিধাই তার ক্ষেত্রে সত্যি, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে কাদের সঙ্গে এবং কাদের ক্ষেত্রে তিনি এমনটা ছিলেন।

সাংবাদিকতার জগতে তাকে যদি উন্নাসিক মনে হয়ে থাকে সেটা এই জন্য যে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠতা, সততা আর পেশাগত দক্ষতা ও অঙ্গীকারের নিদারুণ অভাব দেখতে পেয়েছিলেন তিনি, সেটা দেখতে পেয়েছিলেন বলেই নিজে নতুন ধারার একটি সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। একটা সময় তার এও মনে হয়েছিল, শুধু নেতৃত্ব নয়, সংবাদকর্মী হিসেবে মালিকানা নিজের হাতে না থাকলে অনেক বিষয়েই স্বাধীন মতামত ও অনুসন্ধান সম্ভব নয়। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা যতদিন কর্পোরেট শক্তির হাতে থাকে, ততদিন প্রতিবেদন ও প্রতিবেদকের স্বাধীনতা হয়ে পড়ে সীমিত।

Image

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে রাজু আলাউদ্দিন (বামে)।

তৌফিক ভাই সংবাদজগতের সীমাবদ্ধতা যেমন জানতেন, তেমনি জানতেন এর সম্ভাবনার দিকগুলো সম্পর্কেও। বিডিনিউজে তিনি নতুন নতুন বিভাগ সৃষ্টির মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলেন। ‘হ্যালো’ নামক বিভাগ সৃষ্টি করে তিনি শিশু-কিশোরদেরও সাংবাদিকতার জগতে অন্তর্ভুক্ত করেন, যা এই দেশে অকল্পনীয় ছিল। ‘ইনসাইড আউট’ নামে অভিমতভিত্তিক ভিডিও সাক্ষাৎকার কিংবা ‘Chinwag with the Chiefs’ নামে আরেকটি ভিস্যুয়াল মাধ্যমের কথা বলা যেতে পারে, যা ডিজিটাল যুগের জন্য সঙ্গত এক আয়োজন।

সংবাদ নির্ভুল, নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ আর নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে তার পদ্ধতি ও নির্দেশনাগুলো যে কতটা আদর্শস্থানীয়, তা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। এসব করতে গিয়ে তিনি অন্য সম্পাদকদের থেকে আলাদা হয়ে উঠেছেন। তিনি অন্যদের চেয়ে উন্নত, ফলে তার পক্ষে উন্নাসিক হওয়াই তো স্বাভাবিক। মূর্খতার নৈরাজ্যে একাকী যুদ্ধ করে গিয়েছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। কিন্তু গুণীজনকে কদর করার ক্ষেত্রে কেউ তাকে উন্নাসিক বলে ভেবেছেন—এমন দৃষ্টান্ত নেই।

আমাদের সাংবাদিকতার জগতে দক্ষতা ও সততার যে দারিদ্র্য তিনি দেখেছেন, তা তৌফিক ভাইয়ের কাছে ছিল অসহনীয়। তিনি পৃথিবীর সেরা সংবাদমাধ্যমে কাজ করার দক্ষতা সঙ্গে নিয়ে যখন দেশে ফিরলেন, তখন এই দেশের সংবাদমাধ্যম জগতের অসংখ্য অসংগতি তাকে পীড়িত করেছিল; সেই কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিন্দুক। কিন্তু যোগ্য মানুষকে কখনোই তিনি নিন্দা করেননি। এমনকি যথার্থ যোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি কখনোই উন্নাসিক আচরণ করেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেছেন, সেই বিভাগের খুব কম শিক্ষক সম্পর্কে তিনি সপ্রশংস ছিলেন। কিন্তু অনুবাদক কায়সার হক সম্পর্কে ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। তার সম্পর্কে কোনো নিন্দা বা অযোগ্যতার সামান্যতম উক্তিও করতে তাকে শুনিনি। তারই শিক্ষক খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পর্কেও তাকে কখনো কটূক্তি করতে শুনিনি। ওই বিভাগের আরেকজন শিক্ষক ইমতিয়াজ হাসান হাবিব সম্পর্কেও ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। ইমতিয়াজ হাবিব ছিলেন শেক্সপিয়র-বিশেষজ্ঞ। তৌফিক ভাই তার পাণ্ডিত্যের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। যখনই তার প্রসঙ্গ উঠত, তিনি আবেগের সঙ্গেই এই শিক্ষকের কথা স্মরণ করতেন। শেক্সপিয়রের চতুর্থ শতবার্ষিকীতে বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে ইমতিয়াজ হাবিবের অ্যাংকরিংয়ের কথা বলেছিলেন তৌফিক ভাই। সেখানে বাঘা বাঘা শেক্সপিয়র-বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তিনি কী সমান স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলে যাচ্ছিলেন—ইমতিয়াজ হাবিবকে নিয়ে সেই স্মৃতির কথা তৌফিক ভাই যখন উত্তেজিত ও মিষ্টি মুখরতায় জানাচ্ছিলেন, তখন আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। আক্ষেপ করে তিনি বলতেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেশির ভাগের ইমতিয়াজ হাবিবের নখের যোগ্যতাও নেই। তার এই কথা শুনলে মনে হতে পারে আতিশয্য, কিন্তু আমাদের একাডেমিয়ার সত্যিকারের খোঁজ যারা রাখেন, তারা জানেন তৌফিক ভাই একটুও বাড়িয়ে বলেননি। এমন সব বামনদের ক্ষেত্রে তিনি যদি নিন্দুক হয়ে থাকেন, তবে তো যথার্থ কারণেই তিনি নিন্দুক।

আর উন্নাসিকতা? সীমাহীন মূর্খতার এই নিখিল নৈরাজ্যে তৌফিক ভাইয়ের রুচি, দীক্ষা ও দক্ষতা, সাহস ও সততা তাকে উন্নাসিক করবেই বা না কেন? তার মতো কে আর একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি সাংবাদিকতার জগতে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে ও দক্ষতায় বিচরণ করেছেন? তার প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় মতামত ও সম্পাদনা সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক মানের অনুসারী ছিল। তিনি নিজে যখনই ইংরেজিতে দেশি বা আন্তর্জাতিক বিষয়ে লিখেছেন, সেগুলো ভাষিক সৌকর্যে ও তথ্যের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে এতটাই গ্রহণযোগ্য হতো যে, আমাদের রুচি ও দক্ষতার দরিদ্র জগতে তা বেমানান মনে হতো।

তৌফিক ভাই এক অর্থে ছিলেন নিঃসঙ্গ নাবিক। সংবাদমাধ্যমের জগতে নিয়মনীতির সংকটগুলো তাকে পীড়িত করত। তিনি ছিলেন একাকী যোদ্ধা। তার যুদ্ধ ছিল বহুমুখী; একদিকে সংবাদমাধ্যমের অসুস্থ ধারার মধ্যে আদর্শ ধরে টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে রাজনীতি ও করপোরেট মাফিয়াদের সঙ্গে লড়াই।

Image

(ছবিতে ডান থেকে) রাজু আলাউদ্দিন,মনিরুল ইসলাম ও তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

তার ছিল আশ্চর্য জীবনীশক্তি। পরপর একাধিক আক্রমণে তিনি মোটেই ভেঙে পড়েননি। আক্রমণের ফলে আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তায় তাকে পড়তে হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্য মনোবল নিয়ে তিনি চলাফেরা করতেন। শেষের দিকে তিনি নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য তার পছন্দের শিল্পী ও লেখকদের সঙ্গে আড্ডার সুযোগটি বেছে নিয়েছিলেন। আমার মধ্যস্থতায় মাঝে মাঝে তার বাসায় লেখক ও শিল্পীদের কেউ কেউ জড়ো হতেন। বেশ কয়েকবার শিল্পী মনিরুল ইসলাম, শিল্পী রফিকুন নবী ও শিল্পী শেখ আফজাল হোসেনকে আড্ডার অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়েছেন। বিশেষ করে মনির ভাই আর নবী ভাইয়ের সঙ্গ ও আড্ডা খুবই পছন্দ করতেন তিনি। তাদের পছন্দসই খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করার জন্য আগেই জেনে নিতে চাইতেন তারা কে কী খেতে চান। কখনো কখনো নিজের প্রিয় কোনো মাছ একেবারে নদীর ঘাট থেকে কেনা হলে, প্রিয় মানুষদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো ছিল তার প্রিয় বিষয়। কী যে খুশি হতেন আপ্যায়ন করতে পেরে!

তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে আভিজাত্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল শিক্ষা, রুচি আর শিল্পিত স্বভাব। তার আচরণে, ব্যবহারের পরিশীলতায়, পোশাকে, আলাপে ও সৌজন্য বিনিময়ে রুচির সেই আভিজাত্য ও শিল্পিত স্বভাব মানুষকে মুগ্ধ করত।

অসততা ও মিথ্যাচার তিনি একদম সহ্য করতে পারতেন না। অন্য যে জিনিসটি তিনি কখনো পছন্দ করতেন না, সেটা হলো স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-রাজাকারদের। আওয়ামী রাজনীতির একটা নির্দিষ্ট পর্ব পর্যন্ত তিনি প্রশংসা করেছেন; তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নীতি ও পদক্ষেপকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। কেউ কেউ বেবী মওদুদকে অন্তর্ভুক্ত দেখে বিডিনিউজকে আওয়ামীপন্থী বলে আখ্যায়িত করেন, কিন্তু বেবী মওদুদের পাশেই যে বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত আমানুল্লাহ কবীরও কাজ করতেন, সেজন্য তাকে কেন বিএনপিপন্থী বলা হলো না একবারও? ২০১০-১১ সালে বিডিনিউজের মতামত বিভাগে একদিকে বেবী মওদুদের কলাম, অন্যদিকে শফিক রেহমানের কলাম প্রকাশিত হয়েছে; একদিকে প্রকাশিত হয়েছে ফরহাদ মজহারের লেখা, অন্যদিকে প্রকাশিত হয়েছে মোজাম্মেল বাবুর কলাম, কিংবা আনু মুহাম্মদ বা মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর লেখা। একদিকে প্রকাশিত হয়েছে ফাহাম আবদুস সালাম ও ফিরোজ আহমেদের লেখা, আবার তাদেরই ঘোরতর বিপরীত মেরুর কুলদা রায়ের লেখাও। আজকে আওয়ামীপন্থী থেকে পল্টি দিয়ে মাদ্রাসাপন্থী হয়ে যাওয়া সলিমুল্লাহ খানের লেখা যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত ফয়েজ আহমেদের আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই ধারাবাহিক আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে সন‌জীদা খাতুনের। এসবই ঘটছে আওয়ামী আমলে। তাহলে বিডিনিউজ কি একই সঙ্গে আওয়ামী-বিএনপি-চীন ও হেফাজত ইত্যাদি মিলিয়ে সর্ববাদী নয়?

না, বিডিনিউজ নির্দিষ্টভাবে এর কোনোটিই নয়। বিডিনিউজ, মানে তৌফিক ভাই বিশ্বাস করতেন সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। কোনো মত গণতান্ত্রিক, কোনটি নয়—তাও মতপ্রকাশের মাধ্যমেই খণ্ডন বা গ্রহণ করতে হবে। বিডিনিউজকে তিনি কোনো দলের হতে দেননি কখনো, কোনো গোষ্ঠীরও হতে দেননি কোনোভাবে।

তিনি আমাদের সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র চর্চা ও এর আবহ তৈরিতে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় বিশ্বাস করতেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি নানা মতের সমাবেশ ঘটানোর পক্ষে ছিলেন। আমাদের বেশিরভাগ সংবাদপত্রে তাদের নির্দিষ্ট কিছু লেখক ও বুদ্ধিজীবীই ঘুরেফিরে রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অভিমতগুলো তুলে ধরেন। সম্পাদক এদের বাইরে অন্য অভিমতগুলোকে চাপা দিয়ে রাখেন। আমাদের বেশিরভাগ গণমাধ্যম যে প্রচ্ছন্নভাবে ফ্যাসিবাদী, তা ওই গোষ্ঠীতান্ত্রিক তোষণ থেকেই প্রমাণিত হয়। কিন্তু অন্যরা যখন চাতুর্যের সঙ্গে এই ফ্যাসিবাদকে লালন করে, বিডিনিউজ সেই চাতুর্যকে নীতিগতভাবে কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি বলে বিভিন্ন মহলের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়েছে। চাতুর্য তখনই দরকার হয়, যখন সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার প্রাসাদ তৈরির দরকার হয়। তৌফিক ভাই মিথ্যার প্রাসাদ তৈরি করতে চাননি কখনো।

তৌফিক ভাই সংবাদমাধ্যমের জগতে ভিন্ন ধাতুতে গড়া এক মানুষ ছিলেন। তার শিক্ষাদীক্ষা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছিল। নিজে ছিলেন জবরদস্ত পড়ুয়া এবং শিল্পানুরাগী। নানামুখী পড়াশোনা ছিল তৌফিক ভাইয়ের। ইতিহাস, সাহিত্য ও চিত্রকলার ইতিহাস ছিল তার প্রধান আগ্রহের বিষয়। রাজনীতি ও সংস্কৃতির স্পন্দনগুলো ছিল তার নখদর্পণে। এই দেশে সত্যনিষ্ঠ ও প্রতিভাবান হওয়া মানে নিঃসঙ্গ ও নিপীড়িত হওয়া। তিনি তা-ই হয়েছিলেন। অসংখ্য কর্মী ও মানুষের সঙ্গে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গেই মিশতেন, কিন্তু দিন শেষে তার ছিল একাকীত্বের এক অসহনীয় ভার। এই ভার অন্যের ওপর ন্যস্ত করে নির্ভার হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। অনুভূতি আর উপলব্ধির ওই পর্যায়ে যার অবস্থান, তার পক্ষে নির্ভার হওয়ার কোনো উপায় নেই। তিনি সেই উপায় কখনো খোঁজেনওনি।

মাঝে মাঝে নিজের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমানোর প্রয়োজন বোধ করতেন অবশ্যই। সেরকম মুহূর্তে মাঝরাতে তার ডাক পেতাম কখনো কখনো। ডাকে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম এদিক-সেদিক। কিংবা কখনো তিনি এত্তেলা পাঠাতেন তার বাসায় যাওয়ার, নিছক কথা বলার জন্য। কখনো কখনো আমার বাসায় মেক্সিকান খাবার তৈরি হলে আমিও তাকে আমন্ত্রণ জানাতাম। মেক্সিকান খাদ্যের তিনি ছিলেন খুবই অনুরাগী। কিন্তু তৌফিক ভাইয়ের মধ্যে ছিল আশ্চর্য মধুর কিছু স্ববিরোধ, আর তার প্রকাশ ঘটত এই খাবার টেবিলে। যেদিন গরুর জিহ্বার তাকোস বানানো হতো, তিনি খাওয়ার আগে একপ্রস্থ গবেষণা ও অনুসন্ধান হাজির করতেন জিহ্বার বিরুদ্ধে: এর ভেতরে কত বেশি কোলেস্টেরল, কীভাবে তা আমাদের রক্তনালিকে রুদ্ধ করে দেয়, আর তার ফলে কী কী ব্যাধির শিকার হতে পারি, তার নিখুঁত বর্ণনা তিনি হাজির করতেন।

Image

রাজু আলাউদ্দিনের বাসায়  (বাম দিক থেকে) শিমুল সালাহউদ্দিন, রাজু আলাউদ্দিন, মারিসোল রোহাস গনসালেস, তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও সোহেল হাসান গালিব। 

আমরা স্বামী-স্ত্রী অস্বস্তির সঙ্গে পরের পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করতাম: এখন তাহলে কী করা? রাজকীয় মেহমানকে তো এই লেকচার শোনার পরও না খাইয়ে বিদায় দেওয়া যায় না। আমার গিন্নিই তখন বলে বসল, “ঠিক আছে, তৌফিক ভাই, আপনি বেশি নয়, একটুখানি খান।” আমিও অতিথিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বললাম, “তৌফিক ভাই, স্প্যানিশ প্রবাদ বলে: una vez al año no hace daño— বছরে একবার, কী এমন ক্ষতি আর! একটা চেখে দেখুন।”

সৌজন্য রক্ষা করার জন্যই কিনা কে জানে—একটা খাওয়ার পর তার কাছে সুস্বাদু মনে হওয়ায় তিনি আরও একটা খাওয়া শুরু করলেন। এরপর আরও একটা, এভাবে শেষ পর্যন্ত ছয়টা তাকোস খেয়ে তিনি যখন মোটামুটি পূর্ণতা অর্জন করেছেন, তখন বললেন, “এত খাওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু খাবারটা এতই সুস্বাদু হয়েছে যে খাওয়ার প্রলোভন এড়াতে পারলাম না।”

এই হচ্ছেন তৌফিক ভাই। এরকম যে তিনি কতবার করেছেন! গরুর মাংসের কী কী ক্ষতিকর দিক আছে, তার প্রায় বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সমস্ত নথি তিনি হাজির করে ‘তাকোস দে বিররিয়া’ খাওয়া শুরু করলেন। আমি হয়তো দুইটা কি তিনটা খেয়েছি, তিনি খেলেন ছয় থেকে সাতটা। নিজেরই ফতোয়ার বিরুদ্ধে নিজেই সব নিয়মকানুন ভেঙে সুখী এক মানুষ তিনি!

বোর্হেসের গল্পের চরিত্র সেই প্যাট্রিক কিলপ্যাট্রিকের মতো—যিনি দণ্ডিত, তিনিই দণ্ডদাতা। একই দেহে মিস্টার জেকিল এবং মিস্টার হাইড। তবে এটা ঠিক যে এমন ঘটতে দেখেছি কেবল মেক্সিকান খাবারের বেলায়। অন্য কোথাও অন্যসব খাবারের বেলায় তিনি এমনটা করতেন কিনা জানি না। অনুমান করি, আমার স্ত্রীর বানানো খাবার তার এতই প্রিয় ছিল যে তিনি বলতেন, যদি কখনো আমরা মেক্সিকান রেস্তোরাঁ খুলি, তবে যেন তার জন্য, শুধু তার জন্য সবসময় একটা টেবিল বরাদ্দ রাখি। আমার স্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেছে, “নিশ্চয়ই তৌফিক ভাই, ওই টেবিলে আপনি ছাড়া আর কেউ বসতে পারবে না।”

২.

তৌফিক ভাইকে অনেকেই খুব ইংরেজ মনোভাবাপন্ন বলে অভিহিত করেন তার আদবকায়দা, পোশাক-আশাক আর সৌজন্যের পরিমিতিবোধের কারণে। বহিরঙ্গে তিনি আসলে তাই। কিন্তু অন্তর্লীন সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে তিনি ছিলেন পুরোপুরি বাঙালি চেতনায় স্নাত এক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস বলুন আর দেশাত্মবোধের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটই বলুন, তিনি ছিলেন বাঙালির প্রগতিশীল সেই বর্গের অন্তর্গত, যারা বিশ্ববোধের সঙ্গে বাঙালি হওয়াকে একাকার করে নিয়েছিলেন।

তার বাসায় প্রত্যেক পহেলা বৈশাখে ভর্তা থেকে শুরু করে বুনো শাকসবজি, নানা রকম ছোট ও বড় জাতের যত মাছ, আবহমান কাল ধরে বাঙালির যত রান্নার প্রণালি—সবই প্রাধান্য বিস্তার করে থাকত। সেই উৎসবে বাঙালি অতিথিরা যেমন আমন্ত্রিত হতেন, অবাঙালি কূটনীতিক শ্রেণির বহুজনই ছিলেন তার আমন্ত্রিত অতিথি। অর্থাৎ বিদেশিদের কাছে তিনি একেবারে বাঙালি খাবারের আসল স্বাদটুকু তাদের রসনায় তুলে দিতে আয়োজন করতেন নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী। এমনকি সিঙ্গারা, পুরি, চটপটি, ফুসকা থেকে শুরু করে তেঁতুল ও ডাবের পানিসহ আরও কত কী যে রাখতেন সেই খাদ্যতালিকায়, তার হিসাব দেওয়া রীতিমতো কঠিন।

খাবার টেবিলে শত পদে খাদ্যের এক বিস্ময় হয়ে উঠত। নানা রকম মিষ্টান্ন তো আছেই। বাঙালির খাদ্যতালিকা যে মোটেই সীমিত নয়, যেন এই বিষয়টা বোঝাতেই তিনি এমন আয়োজন করতেন। বিদেশিদের কাছে নিজের সংস্কৃতির স্বরূপ তুলে ধরার ব্যাপারে তার উৎসাহ ও আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না।

সেই উৎসবে নানা ক্ষেত্রের রথী-মহীরথী, সাধারণ ও অসাধারণ যিনিই এসে থাকুন না কেন, সবাইকে সমান আন্তরিকতায় ও গুরুত্বে বরণ করে নিতেন। সবার দিকেই কী অসম্ভব খেয়াল রাখতেন তিনি! সবার খোঁজখবর রাখতেন। তৌফিক ভাইয়ের কাছে ছোট-বড় এবং ধনী-দরিদ্রের বিভেদটা ঘুচে গিয়েছিল।

যখনই তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন কোনো উচ্চপদের কিংবা উচ্চবর্গের কারোর সঙ্গে, আমাকে কতটা উঁচু করে তুলে ধরা যায়, সেই ব্যাপারে তাকে কখনো কার্পণ্য করতে দেখিনি। আমার সম্পর্কে যখন বড় বড় বিশেষণ দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতেন কোনো দেশি বা বিদেশি কারোর সঙ্গে, তখন আমিই বরং একটু সংকুচিত ও অস্বস্তিবোধ করতাম। স্প্যানিশ জানি আর লাতিন আমেরিকান সাহিত্য সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল—এরকম পরিচয়ে তিনি ছোট মানুষটিকে বড় করে তুলতেন।

অন্যকে বড় করে তোলার যে ঔদার্য—এই বিরল গুণ বাঙালির মধ্যে আজ প্রায় বিলুপ্ত। তিনি এমনই এক বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন। আমি এমন এক পদে কর্মরত, যার রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু তবুও তিনি আমাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। সেটা করার কারণ বোধহয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার ইংরেজি সাহিত্য পাঠের প্রভাব।

অনেকেই তাকে জবরদস্ত এক প্রতিবেদক ও সম্পাদক হিসেবে চেনেন। কিন্তু তার সাহিত্যপাঠের হদিস জানেন কম লোকই। আমার সঙ্গে তার প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক ঘুচে যাওয়ার ও ঘনিষ্ঠতার একটা বড় কারণ হয়তো এই সাহিত্য। আমি সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু তার যারা প্রিয় লেখক, ঘটনাক্রমে তারা আমারও প্রিয় লেখক। এবং মনে করার কোনো কারণ নেই যে তৌফিক ভাই কেবল ইংরেজি সাহিত্যই পড়েছেন, তিনি বাংলা সাহিত্যেরও একজন নিবিড় পাঠক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, শঙ্খ ঘোষ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, এমনকি প্রায় তার সমসাময়িক রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কোনো কোনো কবিতা আমি তাকে মুখস্থ বলতে শুনেছি।

একবার আমার প্রিয় কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘পরাবাস্তব কবিতা’ ও ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে বই দুটি তার সংগ্রহে দেখে আমি বললাম, “আপনি মান্নান সৈয়দ পড়তেন?” উত্তরে বললেন, “কেন পড়ব না? উনি তো আমার প্রিয় কবি। অত্যন্ত বড় লেখক তিনি।” কিন্তু আমি আসলে অন্য কিছু ভাবছি। এই বই দুটি আমার সংগ্রহ থেকে হারিয়ে গেছে। আমি তার কাছ থেকে বই দুটো হাতিয়ে নেওয়ার আশায় বললাম, “তৌফিক ভাই, এই বই দুটো আপনি তো আর পড়ছেন না। আপনি আমাকে উপহার দিয়ে দিন।”

তৌফিক ভাই সত্যি সত্যি বই দুটি আমাকে উপহার দিয়ে দিলেন। কতবার যে আমি আড্ডায় প্রসঙ্গক্রমে শেক্সপিয়র, এলিয়ট, ইয়েটস থেকে তাকে কোনো কোনো কবিতার অংশবিশেষ মুখস্থ বলতে শুনেছি। পেশাগত পদমর্যাদার যে বিভেদরেখা, তা অনেকটাই ঘুচে গিয়েছিল সম্ভবত আমাদের অভিন্ন সাহিত্যপ্রীতির প্রভাবে।

আমার লেখা তিনি কতটা পড়েছেন তা জানি না, কারণ আমি তা কখনো জানতে চাইনি, চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না; তিনিও কখনো বলেননি। কিন্তু যখনই কারোর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হাজির হতো, তখন তিনি আমার বিশেষত্বকে নির্ভুলভাবেই তুলে ধরতেন। তাতে করে অনুমান করি, তিনি সরাসরি না বললেও আমার লেখার সঙ্গে কমবেশি পরিচিত ছিলেন। তা যে ছিলেন, তার একটা উদাহরণ একবার ঘটতে দেখেছি যখন আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, স্প্যানিশ ভাষায় নজরুল-অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক-গবেষক মারিয়া এলেনা বাররেরা বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন। তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গিয়েছিলাম তার বাসায়। আমার সেই বান্ধবীর সঙ্গে নানা কথা প্রসঙ্গে যখন আমার প্রসঙ্গ এল, তখন রসিকতা করে বললেন, “And he is a secret agent of Latin American literature in Bangladesh.” আমরা দুজনই তার রসবোধ আর পরিশীলিত কথনশৈলীর শিল্পিত স্বভাবে হেসে উঠেছিলাম। তৌফিক ভাই আড্ডার মেজাজে যখন থাকতেন, তখন কথাবার্তায় এরকম রস ও দীপ্তির রেখা আমি বহুবার বাক্য থেকে ঠিকরে বেরোতে দেখেছি।

তার জীবনের শেষ কয়েক বছরে তৌফিক ভাই আমার প্রতি কেন যেন সদয় ও বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন। ২৪-এর অগাস্ট-পরবর্তী সময়টি বিডিনিউজ যেসব আশঙ্কার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে, তা নিশ্চয়ই তাকে বিচলিত করেছিল; কিন্তু এই আকস্মিক পটপরিবর্তনে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে যেন তৌফিক ভাইকে আরও বেশি দৃঢ় ও প্রতিরোধী হতে শক্তি জুগিয়েছিল। তা না হলে কেন সেই দুঃসময়েই তিনি ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তিন খণ্ডে অসামান্য এক প্রামাণিক দলিল সংকলিত করার দিকে মন দিলেন? কেন চিত্রশিল্পী শেখ আফজাল হোসেনকে দিয়ে কমিশন করে আঁকালেন বিশাল আকৃতির এক চিত্রকর্ম, যার বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ?

তার অঙ্গীকার কেবল সংবাদমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এই দেশ ও জাতির প্রতিও তার অঙ্গীকার ছিল স্পষ্ট। এমন সোনার মানুষ কেন অকালে চলে যায়! আরও কত সব পরিকল্পনা যে ছিল তার, তা কেবল ঘনিষ্ঠজনরাই জানেন। মাত্র ৫৯ বছরে কেন চলে গেলেন তৌফিক ভাই?

এত ভালোবাসা ও মমতা যদি দিলেন, তবে কেন না জানিয়ে দূর দেশে অগস্ত্যযাত্রা বেছে নিলেন? দুবার দূর দেশে আপনার সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। একবার নিউ ইয়র্কে, আরেকবার ব্যাংককে; দুবারই দেখেছি আপনি সফরসঙ্গীর প্রতি কতটা মমতাপূর্ণ ও যত্নশীল। আমি সঙ্গে টাকাকড়ি নিয়ে এসেছি কিনা, আপনি সেই প্রশ্ন না করে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের দিকটি লক্ষ্য রেখে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুদ্রা হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, “যদি কিছু কেনার ইচ্ছে হয়, এগুলো হাতে রাখুন।” দুবারই আপনি এমনটা করেছেন; প্রথমবার আকিবের মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার আকিব ছিল না, তাই সরাসরি আমাকে দিয়েছিলেন আপনি। আমরা সহকর্মীরা বেতন পেতে বিলম্ব হলে আপনি অস্থির হয়ে যেতেন বেতনের টাকা জোগাড় করার জন্য। সময়মতো দিতে পারতেন না বলে আপনার কষ্ট কিছুটা আঁচ করতে পারতাম। আপনি দু-একবার আমাকে বলেছিলেনও, “আপনারা আরেকটু কষ্ট করেন, এই সংকট কেটে যাবে। আমাদের সুদিন আসবে।” কিন্তু আজ সুদিন এলেও আপনি কি আর ফিরে আসবেন? আসবেন না তো, তৌফিক ভাই! যেখানে গেলেন, সেখান থেকে আপনি আর ফিরে আসবেন না। আমাদের অশ্রুসিক্ত অপেক্ষার কথা আপনি জানতেও পারবেন না। আমরা হয়তো সুদিন পাব, কিন্তু আপনাকে আর পাব না—এই হৃদয়বিদারক সত্য কীভাবে মেনে নেব, তৌফিক ভাই?

ফরাসি কবি জাঁ ককতো রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে যা বলেছিলেন, সেই বাক্য দিয়েই এই সত্যকে আজ গ্রহণ করবে, কেবলমাত্র সম্বোধিত জনের নামটি বদলে দিয়ে: “আমি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সমাধিতে একটি অদৃশ্য পুষ্পস্তবক রাখলাম, যেখানে তিনি মৃত্যুর ব্যর্থ অনুকরণ করে শুয়ে আছেন।”

রাজু আলাউদ্দিন: কবি ও অনুবাদক; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কর্মী। ইমেইল: razu.alauddin@bdnews24.com