০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ক্ষণিক পরিচয়ের তৌফিক ইমরোজ খালিদী

পত্রিকার পাতায় আগেই তার ছবি দেখেছিলাম। হাত মেলাতে মেলাতে নিজের নাম উচ্চারণ করে বললাম, “আপনি তো বিরাট লোক।”

ক্ষণিক পরিচয়ের তৌফিক ইমরোজ খালিদী

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে লেখক (ডানে)।

আশরাফ আহমেদ আশরাফ আহমেদ

Published : 08 Oct 2026, 12:29 PM

Updated : 08 Oct 2026, 02:34 PM

এবছর নিউ ইয়র্ক বইমেলার দ্বিতীয় দিন। বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম। লোকসমাগম বিশেষ নেই। আমরা গুটিকয় ছিলাম ভবনের ভেতর। কী ভেবে বাইরে তাকাতেই দূর থেকে রাজু আলাউদ্দিনকে চাক্ষুষ দেখলাম এই প্রথম। মাঠে টাঙানো তাঁবুর নিচে আরও দুজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘আর্টস’ বিভাগের সাহিত্য সম্পাদক।

সম্ভবত ফেইসবুকেই পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। প্রায় সাত-আট বছর ধরে সেখানে আমার লেখা নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। কাউকে দেখতে না পেয়েই সম্ভবত হাতছানি দিয়ে তিনি সম্ভাষণ জানালেন।

হালকা ঝিরঝির বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমি তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। জানালেন, আগের রাতেই তারা ঢাকা থেকে এসে পৌঁছেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে আমার লেখালেখির কথা জানিয়ে পাশে দাঁড়ানো সুদর্শন তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

পত্রিকার পাতায় আগেই তার ছবি দেখেছিলাম। হাত মেলাতে মেলাতে নিজের নাম উচ্চারণ করে বললাম, “আপনি তো বিরাট লোক। আপনাকে আমি চিনি, আপনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের মালিক।” আমার কথায় লজ্জার সঙ্গে তিনি আপত্তি করলেন। তিনি এবং রাজু আলাউদ্দিন দুজনেই বলে উঠলেন, “মালিক নয়, প্রধান সম্পাদক।”

রাজু আলাউদ্দিন বললেন, “খালিদী সাহেব মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার বই সম্পর্কে কথা বলতে চান।” তাঁবুর নিচে একটি স্টলে তার ঢাউস সাইজের তিন খণ্ডের সচিত্র ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ বইয়ের কপি রাখা। মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ১ হাজার ৪৯৬! বাংলাদেশে এত বড় বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলাদেশে সংগঠিত অসংখ্য ঘটনার সচিত্র দলিল। বইগুলো শুধু বড়ই নয়, এর কাগজ এবং মুদ্রণের মানও নজর কাড়ার মতো। ফলে ওজনেও বেশ! লাইব্রেরি, অফিস এবং শৌখিন লোকের সংগ্রহের মতো কালেক্টরস এডিশন।

মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সব ভাস্কর্য-স্থাপনার ওপর যে আঘাত আসছে, সেই বাস্তবতায় নতুন করে এই বই প্রকাশিত হওয়ায় আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। যুদ্ধের সময় মাত্র চার বছরের শিশুর মনে মুক্তিযুদ্ধ সুদূরপ্রসারী কীরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার এক জীবন্ত প্রমাণ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও যেখানে নিজের পরিচয় গোপন করে চলছেন, সেখানে তৌফিক খালিদী তার সাংবাদিকতার একনিষ্ঠতা পালন করতেই যেন এগিয়ে এসেছেন!

খালিদী সাহেব জানালেন, অতিরিক্ত পয়সা দিয়ে বইগুলো বিমানে নিয়ে এসেছেন। ফলে দাম বেড়ে গেলেও এখানে যে মূল্য নির্ধারণ করেছেন, তা বই মুদ্রণের খরচ থেকেও কম। তিনি বইগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পরিচয় করানো যায়, সে ব্যাপারে আমার পরামর্শ চাইলেন।

সেই মুহূর্তে আমার মাথায় যা এসেছিল, আমি তাকে তাই বললাম। আশ্বাস দিলাম, মেলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেব এবং অনুরোধ করব, অনুষ্ঠানসূচির দর্শকাকীর্ণ সময় বা ‘প্রাইম টাইম’-এ মূল মঞ্চে বইগুলোকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেই কথামতো মেলার অন্যতম কর্ণধার ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদকে আমি সেই অনুরোধ করেছিলাম।

জিয়াউদ্দিন জানালেন, অনুষ্ঠানসূচিতে যদিও কোনো বিশেষ ভেন্ডার বা বইয়ের প্রচারের সুযোগ নেই, তবে এই বইয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে জনাব খালিদীকে সঙ্গে নিয়ে মূল মঞ্চ থেকে তিনি নিজে দর্শকদের কাছে বইটিকে পরিচয় করিয়ে দেবেন। তবে খালিদী সাহেব তখন যেন তার কাছাকাছি থাকেন।

এই ধরনের বইমেলায় সচরাচর যা হয়ে থাকে, অনুষ্ঠান চলাকালে বহুদিন পর দেখা হওয়ায় লেখক ও বন্ধুরা পরস্পরের এবং সেলিব্রিটিদের সঙ্গে গল্প ও ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকে। আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। মূল মঞ্চের বাইরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এবং অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে স্মরণীয় কিছু সময় কাটালাম।

সন্ধ্যায় রাতের খাবারের এক নিমন্ত্রণ রক্ষা করার তাড়ায় আমাকে আগেভাগেই বইমেলা ত্যাগ করতে হলো, যদিও অনুষ্ঠান রাত বারোটা পর্যন্ত চলছিল। তখনকার ‘প্রাইম টাইম’-এ ড. জিয়াউদ্দিন খালিদী সাহেবকে নিয়ে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ বইটিকে দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কি না, আর জানা হয়নি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে সমুন্নত রাখার এই মহাপ্রাণ তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক প্রয়াণসংবাদ মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক পরম দুঃসময় বলে প্রাণে বাজছে।