Published : 10 Apr 2026, 01:50 PM
১২ মাস বয়সী ছোট্ট শিশু আব্দুল্লাহর মরদেহ রাখা হয়েছে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের স্ট্রেচারে। পাশেই মা ইতি মনির কান্নায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে! মাত্র এক বছর বয়সী পুত্রকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা রাসেল। হাসপাতালে সৃষ্টি হয়েছে এক করুণ পরিবেশ। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৩ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আব্দুল্লাহকে। যত দিন গড়িয়েছে, তার অবস্থার অবনতি হয়েছে। এক বছর বয়সী শিশু জ্বরের উচ্চ তাপমাত্রা আর তীব্র ব্যথার সঙ্গে কতক্ষণ লড়াই করতে পারে? শেষমেশ অসীমের কাছে তার যাত্রার মধ্য দিয়ে জীবনরেখা থেমে গেছে।
২.
ছোট্ট ইনায়ার প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে র্যাশ; কচি হাতে পরানো ক্যানুলা দিয়ে চলছে স্যালাইন, নাকে লাগানো হয়েছে নল। নয় মাসের এ শিশুর অনবরত কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে আসছে। ইনায়ার সঙ্গে হাসপাতালে আছে তার মা ও দাদি। চোখের সামনে কাঁদতে থাকা ইনায়ার ব্যথা আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়? মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা। কখনো ছুটছেন নার্সের কাছে, কখনো চিকিৎসকের কাছে, আবার কখনো ছুটছেন ওষুধের দোকানে। ইনায়ার মা ও দাদির মতো বাকি অভিভাবকদেরও একই রকম দিশেহারা অবস্থা।
শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড ঘুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদকও আক্রান্ত হয়েছেন ইনায়ার কষ্টে। তিনি বলছেন, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডের ৬০টি শয্যার সবকটি রোগীতে পূর্ণ। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিল ৭৮ জন শিশু। কিছু শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। সবারই হাতে ক্যানুলা, নাকে নল। শিশুদের চিৎকার-কান্না থামাতে পারছেন না মা-বাবা ও স্বজনরা। অভিভাবকদের কেউ শিশুকে সামলাচ্ছেন, কেউ নার্স-চিকিৎসকদের পেছনে ছুটছেন, কেউবা ওষুধ কিনতে হাসপাতালের বাইরে ছোটাছুটি করছেন।
৩.
আজ ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার ঘটনা। শিশু রোগীতে ঠাসা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড। অসুস্থ সন্তানদের দেখভাল করতে অভিভাবকেরা ব্যস্ত। কোনো মা তার আদরের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার চেষ্টা করছেন শিশুকে খাওয়ানোর। এর মধ্যে হঠাৎ এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ। অন্যরা তখন বলতে শুরু করেন, এই যে আরেক মায়ের বুক খালি হলো। আব্দুল্লাহ নামের শিশুটি মারা গেছে—চিকিৎসক এমনটি জানানোর পর আহাজারি করা মা আরিফা আক্তার বলতে থাকেন, ‘আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দে আল্লাহ। আমার ছেলে কী আর হাসত না? জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হইছিলাম, মেডামরা কইছে ওষুধ খাইলেই ভালো হইয়া যাইব। আল্লাহগো তুমি কী করলা।’
সন্তান হারানো আরিফা আক্তারের কান্না ছুঁয়ে যায় আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা অন্য শিশুর স্বজনদের। আতঙ্কিত হয়ে কোনো কোনো মা-বাবা তাদের শিশুকে কোলে তুলে পায়চারি করতে থাকেন। কেউ আবার এগিয়ে আসেন আরিফাকে সান্ত্বনা দিতে।
৪.
আমি মাত্র তিনটি শিশুর মৃত্যুর দৃশ্য বললাম, সংবাদমাধ্যমে যাদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু খবর পাচ্ছি দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এমন হৃদয়বিদারক গল্প। ছোট্ট ইনায়া কিংবা আব্দুল্লাহরা বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে, দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়া হাম কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের প্রাণ। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় আহাজারি করছে হাজার হাজার শিশু। হাসপাতালে বিছানা নেই, ওষুধ সরবরাহ অপ্রতুল, প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই—কিন্তু তাতে কোথাও কিছু থেমে নেই। শুধু যার গেছে, সেই জানে।
৫.
শিশুরা যখন এই দুঃসহ সময় পার করছে, উৎকণ্ঠায় উদগ্রীব যখন তাদের পিতা-মাতা ও অন্য অভিভাবকেরা, তখন জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলছে। এবারের সংসদে বেশ বড়সড় একটি বিরোধী দল আছে, কিন্তু সরকার কিংবা বিরোধী দল—কারও মুখে বেঘারে প্রাণ হারানো কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা শিশুদের নিয়ে টু-শব্দটি নেই। সরকারি দল প্রতিদিন ডজনখানেক বিল পাসে ব্যস্ত, বিরোধী দল ব্যস্ত সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে জুলাই সনদকে তার স্থলে বসানো যায় কিনা—তার ধান্ধায়। ইনায়া ও আব্দুল্লাহদেরকে নিয়ে কথা বলার সময় কোথায় তাদের?
৬.
এর মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো পই পই করে বারণ করে দিয়েছেন যে, হাম নিয়ে আমরা যেন বেশি কথা না বলি। এতে নাকি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে! রোগীরা ভয় পেয়ে যাবে! তিনি আমাদেরকে ’প্যানিক’ তৈরি না করার পরামর্শও দিয়েছেন। অথচ আমরা জানতাম, বিপদ এলে সেটি নিয়ে কথা বলতে হয়, আলোচনা করে ঠিক করতে হয় যে বিপদ কীভাবে সামলানো যাবে। সবাই মিলে সেই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় না খুঁজে এড়িয়ে যাওয়াই যে কার্যকর সমাধান—স্বাস্থ্যমন্ত্রী না বললে আমরা জানতেই পারতাম না।
ভাগ্যিস, এর মধ্যে একজন ব্যতিক্রম আছেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ) থেকে নির্বাচিত বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী রুমিন ফারহানা। তিনি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৭১ বিধির ওপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে দেশের হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনে ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনকভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বুদ্ধির তারিফ করতেও ছাড়েন নি তিনি, “আমি তো জানতাম আমি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি, ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো কথা বলছি না। সংসদেও তাহলে জনস্বার্থ নিয়ে কথা বলতে পারব না?”
৭.
মার্চের শেষের দিকে হাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো দায়িত্বশীল বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই মাসের গোড়ার দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হাম অন্তত ৫৬ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। গত ২৩ দিনে মারা গেছে ১৪৯ শিশু। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনো এটুকু নিশ্চিত করতে পারেনি যে, কোনটা হামের কারণে মৃত্যু, কোনটা নয়।
কিন্তু কোনো ধরনের তথ্য প্রমাণ ছাড়া হাম সংক্রমণের দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়ে দিতে এক মুহুর্তও দেরি করেননি তিনি। রাজধানীর পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক ওষুধ মেলার উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, দেশে নাকি গত আট বছর ধরে হামের টিকাই দেওয়া হয়নি।
ভাগ্যিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটটি ছিল! ইউনিসেফ ও আরও কিছু দাতা সংস্থা আওয়ামী লীগ সরকারের হাতেপায়ে ধরে এই ডিজিটাল ব্যবস্থাটি চালু করেছিল। সেই ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, গত ১০ বছরে হামের টিকা প্রদানের হার ৮৭ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২৪ সালেও এ হার ছিল ৮৭ শতাংশ।
কিন্তু ২০২৫ সালে এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন টিকা কেনা বন্ধ করে দেয়। ফলে মজুত টিকা থেকে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়। যেসব শিশু টিকার বাইরে ছিল, মূলত তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। বিচিত্র সেলুকাস এই যে, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে গঠিত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই সামান্য সত্যটুকু স্বীকার করতে পারছেন না। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে আট থেকে সাড়ে পাঁচে নামতে তার সদয় আজ্ঞা হয়েছে।
৮.
দেশে হামের সংক্রমণ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, বহু আগেই সেটি মহামারী পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে হাম পরিস্থিতিকে এখনো ‘প্রাদুর্ভাব’ কেন বলা হচ্ছে—সেটি বোধগম্য নয়। ধরুন, কোনো হাসপাতালে সপ্তাহে দুজন হামের রোগী ভর্তি হয়, এটিকে সাধারণ ঘটনা হিসেবেই ডাক্তাররা বিবেচনা করেন। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা যদি ১৫ জনে পৌঁছায়, তখন আর সেটি স্বাভাবিক থাকে না; সেটি ‘প্রাদুর্ভাব’ হয়ে যায়। তখন বলা হয়, ওই অঞ্চলে হামের ’প্রাদুর্ভাব’ দেখা দিয়েছে। প্রাদুর্ভাব সামলাতে কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে সেটি আর মহামারিতে রূপ নেয় না।
কিন্তু পর্যাপ্ত প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব যখন অনেক বড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে ‘মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করতে হয়। হাম এখন আর কোনো এলাকা বা জেলায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কার্যত মহামারী পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হওয়া এই রোগকে আবার ফিরিয়ে আনার পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াও বিস্ময়কর। আধুনিক পৃথিবীতে এমন ঘটনার পেছনে দায়ীরা এতদিনে কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতেন।
৯.
হাম প্রতিরোধে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তা যথেষ্ট নয়। এর মধ্যে স্বল্প পরিসরে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, ডেডিকেটেড ওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়েছে, স্বাস্থ্য কর্মীদের ছুটি বাতিল হয়েছে।
ঈদুল আজহার আগে সব শিশুকে যে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটিকে এগিয়ে আনতে হবে। অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় আনতে হবে। কোনো দেশ থেকে ধার এনে হলেও শিশুদেরকে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। ‘ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদেরকে টিকা দিতে হবে। ভিটামিন–এ ক্যাম্পেইন নিয়মিত করতে হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ধর্মের নামে যারা টিকা কর্মসূচিকে ব্যাহত করছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে তারও আগে সরকারকে আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। তথ্য গোপন নয়, বরং সঠিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব।
১০.
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেলের জন্য রাস্তায় দীর্ঘ লাইন ও উত্তপ্ত সংসদের রিলের নিচে হামে আক্রান্ত শিশুদের কান্না চাপা পড়ে গেছে। অভিভাবকদের আর্তনাদ যখন পত্রিকার পাতা ছেড়ে বেরুতে পারছে না, সে রকম এক সময়ে এক সহকর্মী কবীর সুমনের ’কতটা পথ পেরুলে তবে পথিক বলা যায়’ গানটা পাঠালেন। এই গানের ভেতর নাকি তিনি হামে আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কান্না শুনতে পাচ্ছেন। লুপে ফেলে আমিও বহুদিন পর আবার শুনলাম, সারা দিন ধরে শুনতে শুনতে হাম নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রতিবেদন পড়লাম।
হামে আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কোলাহলে মনটা ভারী হয়ে আছে। গানের শেষ তিনটি লাইন যেনো হৃদয় বিদীর্ণ করে দেয়: “কতটা কান পাতলে পরে কান্না শোনা যাবে/ কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে/ বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে...”
আর কত শিশু মরলে তবে হাম মহামারীর মর্যাদা পাবে কে জানে...