Published : 15 Nov 2025, 10:19 AM
একসময় আমাদের সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ ছিল বই পড়া। ঘরে ঘরে বই পড়ুয়ারা ছিল, অলিতে-গলিতে বই নিয়ে আলোচনা হতো, উপহার হিসেবে বই দেওয়ার চল ছিল খুব স্বাভাবিক। এমনকি পাত্রী দেখতে গেলেও বই উপহার দেওয়াই ছিল রুচির পরিচয়। বইয়ের প্রথম পাতায় প্রিয়জনের উদ্দেশে লেখা দুটি লাইন ছিল ভালোবাসারই ভাষা।
কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে উপহারের ধরন, মানুষের পছন্দ। এখন বই উপহার পেয়ে খুশি হওয়া মানুষ খুব কম। তখনকার দিনে ঘরে ঘরে ছিল না মোবাইল ফোন, কম্পিউটার তো দূরের কথা, টেলিভিশনও ছিল না অনেকের বাসায়। বই-ই ছিল বিনোদনের বড় উৎস। বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকত প্রেমপত্র, ওই স্মৃতিগুলো আজ ইতিহাসের অংশ।
মানুষ তখন বই কিনত, পড়ত। তাই তো সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।” বইপড়ার যে পরিবেশ দরকার, তা আমরা তৈরি করতে পারিনি, এ দায় আমাদেরই। আজ অলিগলিতে মোবাইলের দোকান আছে, কিন্তু লাইব্রেরি কয়টা? বেশিরভাগ উপজেলায় একটিও ভালো লাইব্রেরি চোখে পড়ে না। আবার বাড়িতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্পের বই পড়লেই বকুনি খাওয়ার ভয় থাকে।
বই মানুষের মনের খোরাক যোগায়, এ সত্য এখন যেন বিবর্ণ। পেটের তাগিদে মননের চাহিদা যেন কমে গেছে। অথচ দার্শনিক স্পিনোজা বলেছেন, “ভালো খাবার পেট ভরায়, কিন্তু ভালো বই মানুষের আত্মাকে তৃপ্ত করে।” সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, ১০২টি দেশের মধ্যে বইপড়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে পড়েন মাত্র ৬২ ঘণ্টা, সংখ্যায় তিনটি বইও নয়। বিপরীতে আমেরিকানরা পড়ে ৩৫৭ ঘণ্টা, ভারতীয়রা ৩৫২ ঘণ্টা। শীর্ষ তালিকার অন্য দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।
দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বইপড়া সম্পর্কে বলেছেন, “একাকিত্ব ও বিশ্রামে আনন্দ, আলাপে অলঙ্কার, বিষয়কর্ম অনুধাবন ও সম্পাদনে দক্ষতা— এই হচ্ছে বইপড়ার তিন প্রধান ফায়দা।” বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে মূলত নীতি-নির্ধারকদের অনাগ্রহের কারণে। আমরা প্রযুক্তিকে দোষ দিই ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ তো আরও প্রযুক্তিনির্ভর, তবু তারা বই পড়ে। আমরা পড়ি না কারণ আমাদের দেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই। স্কুল-কলেজে লাইব্রেরি আছে ঠিকই, লাইব্রেরিয়ান আছে কিন্তু পাঠক নেই। এত বিনিয়োগ করে লাভ কী, যদি ছাত্রছাত্রীরা বই-ই না পড়ে?
অধিকাংশ উপজেলায় সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নেই, কিন্তু রয়েছে বড় বড় মোবাইলের দোকান, রাজনৈতিক আড্ডা, তরুণদের জটলা। বইয়ের দোকান নেই, বই পড়ার জায়গা নেই। ইউনিয়ন পর্যায়েও নেই মানসম্মত পড়ার জায়গা। রাজনীতির সাথে তো আজ সবটাই ভজঘট লেগে গেছে। লাইব্রেরিকে হয়তো ‘লস প্রজেক্ট’ মনে করা হয়, কারণ এর রাজনৈতিক ফায়দা নেই। তরুণ সমাজ জ্ঞানী হয়ে উঠলে হয়তো মাঠের লোক পাওয়া কঠিন হয়, এমন ভয়ও থাকতে পারে।
বাস্তবে বই হাতের কাছে না থাকলে পাঠাভ্যাস জন্মায় না। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিশুদের উপযোগী বই পর্যাপ্ত নেই। গল্প, ছড়া, রূপকথা, বিজ্ঞানভিত্তিক বই যা শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ায়, সেসবের অভাব প্রকট। শিশুরা কী পড়তে চায় সে বিষয়ে ভাবার চেয়ে আমরা ভাবি তারা পরীক্ষায় কীভাবে নম্বর পাবে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াকে অনেকে সময়ের অপচয় মনে করেন। রাজনীতি সবকিছুতে ঢুকে গেছে; বই পড়ার তদারকিতে কেউ নেই।
বইপ্রেমী কিছু মানুষ চেষ্টা করছেন বইপড়া-ভিত্তিক সমাজ গড়তে, তাদের উদ্যোগকে সহায়তা করতে হবে। একসময় বাসে-ট্রেনে বই পড়া ছিল সাধারণ দৃশ্য; এখন সবাই তাকিয়ে থাকে মোবাইল স্ক্রিনে। ভ্রমণের ব্যাগে বই থাকা ছিল অপরিহার্য; এখন তার জায়গা নিয়েছে গেমস আর সোশ্যাল মিডিয়া।
বই পড়াকে শখ থেকে অভ্যাসে পরিণত করতে হলে ভেতর থেকে আকাঙ্ক্ষা জাগাতে হবে। যেমন একবেলা না খেলে ক্ষুধা লাগে, তেমনি একদিন বই না পড়লে যদি অভাববোধ হয়, তবেই পাঠাভ্যাস মজ্জাগত হবে। শরৎচন্দ্র বলেছেন, “বই পড়াকে যথার্থ হিসেবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখ কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।” আমাদের জীবনের সাথে, আত্নার সাথে বই ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। বইকে জীবনের সঙ্গী করে সমাজকে আলোকিত করতে হবে।
আজ আমাদের প্রজন্ম গল্প, উপন্যাস, কবিতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জ্ঞান সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, আর সীমাবদ্ধ জ্ঞান মুক্ত আকাশ দেখাতে পারে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে থাকা বিশাল জ্ঞানভান্ডার—উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এসব থেকে তরুণরা দূরে সরে গেছে। তারা সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ভেতর আটকে পড়ছে। মুক্তচিন্তা, মানবিকতা, দর্শন, কল্পনা সবই গড়ে ওঠে অতিরিক্ত পাঠ, সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে। পরিবারে, সমাজে সবারই দায়িত্ব বই পড়ায় উৎসাহ দেওয়া। নিজে বই পড়তে হবে এবং অন্যকে উৎসাহিত করতে হবে। বইকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। যেমন নতুন গেম নিয়ে তরুণরা আলোচনা করে, তেমনি নতুন বই, লেখক নিয়েও আলাপ হোক। জন্মদিনের উপহার হোক বই। প্রতিটি ঘরে একটি করে বুকশেলফ থাকুক।
প্রযুক্তি এগোবে, তবু বই পড়া থামতে হবে কেন? পিডিএফ–এ আজ সব বই পাওয়া যায়; কিন্তু মোবাইল হাতে নিলেই মন চলে যায় ফেইসবুক বা গেমসে, সেখানেই যত বাধা। ফলে বই পড়াটা আর হয়ে উঠছে না। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কোন প্রজন্ম কোনদিকে যাচ্ছে তার উপর। বইপড়া প্রজন্ম তৈরি না হলে জ্ঞান-সংস্কৃতি ধ্বংস হবে। তাই প্রতিটি উপজেলায় একটি বড়, আধুনিক লাইব্রেরি থাকা জরুরি, যেখানে তরুণরা নিশ্চিন্তে পড়তে পারে। বই হাতের কাছে থাকলেই পাঠাভ্যাস গড়ে উঠবে। উপহার হোক বই, উৎসাহ হোক বইকে ঘিরে, এভাবেই আমরা বইমুখী একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।