Published : 16 Apr 2026, 11:11 AM
গত মাসে কিউবার কোটিখানেক মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থার মধ্যে অন্ধকারে ডুবে ছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে মার্কিন সংবাদমাধ্যম যেন মান্ধাতার আমলের সেই পুরোনো বয়ানই আবার সামনে নিয়ে আসে, ব্যর্থ কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, মৃত শাসনব্যবস্থা, এটাই কিউবাকে শেষ করে দেওয়ার উপযুক্ত সুযোগ। অথচ সেই একই সংবাদমাধ্যম মার্কিন দখলদারিত্বের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে কিউবার মানুষের সংহতির শক্তি চোখে দেখতে পায় না। দেখতে পায় না সেই বোধকেও, যা সাধারণ মানুষের সংগ্রামী ইতিহাসের শিকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।
রাশিয়ার তেলবাহী নিষিদ্ধ জাহাজ আনাতোলি কোলোদকিন কয়েকদিন আগে কিউবার মাতানসাস বন্দরে নোঙর করে। গত তিন মাসের মধ্যে এটিই দেশটিতে নোঙর করা প্রথম জাহাজ, যা ৭ লাখ ৩০ হাজার ক্রুড তেল সরবরাহ করেছিল। এই পরিমাণ তেল দিয়ে কিউবার মাত্র ১০দিনের জ্বালানি চাহিদা পূরণ হয়। আরেকটি জাহাজ আসার কথা থাকলেও তা ভেনেজুয়েলার দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেননা কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধ চলছে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে।
যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি কিউবা দখলের সম্মান পেতে চান। তিনি বলেন, “আমি চাইলে কিউবাকে মুক্ত রাখতে পারি, নিজের দখলে নিতে পারি। আমি যা খুশি তা করতে পারি।” ভাষাটি যেমন অমার্জিত, তেমনি রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যহীন। তবে মূল বিষয় হলো, ট্রাম্প এখানে কেবল নিজের মনের কথাটাই প্রকাশ করেছেন।
কাকতালীয় হলেও এ ভাষাই দাসপ্রথার ভাষা, ধর্ষকেরা ঠিক এই সুরেই কথা বলে থাকে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ঐতিহাসিকভাবে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্র শত বছরের বেশি সময় ধরে এই একই যুক্তি প্রয়োগ করে আসছে। তবে ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে দাঁড়িয়ে দ্বীপটি সেই যুক্তিকেই ক্রমাগত খণ্ডন করে যাচ্ছে। মনে হয়, ট্রাম্প এখন কিউবার কাছ থেকে বশ্যতা স্বীকারের সেই তথাকথিত সম্মান পেতে উঠেপড়ে লেগেছেন। আর এ কাজে তার পাশে আছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, তিনি কিউবাকে পুনরায় মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির করেছেন।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় মার্কিন সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যাটি তথ্যের নয়। সমস্যাটি নিহিত আছে সেই সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা কিউবাকে তার নিজের ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখতে অস্বীকার করে। বরং তাকে দেখা হয় এক ঠুঁটো জগন্নাথ হিসেবে, যে রাষ্ট্রকে সহজেই প্রভাবিত, নিয়ন্ত্রিত এবং কাবু করা সম্ভব।
প্রশিক্ষণরত এক আনকোরা নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমি প্রথম কিউবায় যাই নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। তখন আমি লাতিন আমেরিকা অধ্যয়নে মগ্ন। সেই অধ্যয়নের প্রাথমিক অনুমান ছিল, এই অঞ্চলে গায়ের রং নয়, শ্রেণিই আসল জিনিস। তবে কিউবাতে পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই আমার সেই ভুল বিশ্বাসে চির ধরে।
আমার কালো শরীর নিঃসন্দেহে আমাকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ কিউবান পুরুষের শ্রেণিতে ফেলেছিল। তাই হাভানার রাস্তায় হাঁটার সময় কিউবার পুলিশ আমাকে বারবার থামিয়ে পরিচয়পত্র দেখতে চাইত। নজরদারির উৎস হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে গভীরভাবে পরিচিত ছিল।
আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতার কারণে এই বাস্তবতা আমার কাছে অচেনা ছিল না। নিজের দেশে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে যেকোনো জায়গায় চলাফেরার সময় যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমি বারবার হয়েছি, কিউবার পরিস্থিতির সঙ্গে তার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলাম।
যদিও কিউবায় ঝুঁকিটা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, আমেরিকার মতো পুলিশের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা কিংবা খুব কাছ থেকে গুলি করে মেরে ফেলার আশঙ্কা সেখানে ছিল না। তবে অভিজ্ঞতার অন্তর্গত সত্যটি ছিল একই। পুলিশ একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে প্রশ্ন করছে অথচ তার উত্তর শোনার আগেই পুলিশ নিজে পরিচয় নির্ধারণ করে ফেলছে।
কী নির্মম পরিহাস! আমি কিউবাকে দেখতে এসেছিলাম অথচ কিউবাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
একদিকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের পুলিশগিরি, যারা আমাকে থামিয়ে পরিচয় জানতে চাইত। অন্যদিকে হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের সতর্ক নজরদারি এবং সবচেয়ে তাৎপর্যবাহী ছিল কৃষ্ণাঙ্গ কিউবান ও কৃষ্ণাঙ্গ নির্বাসিতদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আলাপন। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে কিউবাকে দেখার এক ভিন্ন পথের খোঁজ পাই।
মার্কিন নীতিনির্ধারক ও সাধারণ পর্যবেক্ষকেরা যখন কিউবার দিকে তাকায়, তারা সেখানে একটি সরল জগতের বাইরে আর কিছুই দেখতে পায় না। কিন্তু সেই সরল কিউবা আর আমার দেখা কিউবা এক নয়।
আমি যে কিউবাকে চিনেছি, সেখানে ছিল ‘দমিঙ্গো’ নামের মানুষ, যে হাভানার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজত। কখনো নকল সিগারেট বিক্রি করত। কখনো আবার এমন কাজ করত, যাতে ইউরো বা ডলার আয় করা তুলনামূলক সহজ হয়। আর দমিঙ্গোর স্ত্রী তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এমনভাবে পরিবারটিকে আগলে রেখেছিল, যেন দারিদ্র্যপীড়িত ও প্রায় অচল সেই সংসারটি কোনোভাবে স্বস্তিতে টিকে থাকে।
তারা দুই ধরনের অবরোধের কথাই জানত। একটি ১৯৬২ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আরোপ করেছে; অন্যটি, তাদের মতো অনেকের বিশ্বাস, কিউবার সরকার নিজ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সাম্যের ভাষ্য সামনে এনে কিউবা যে বর্ণগত ও অর্থনৈতিক নীরবতাকে ঢেকে রাখতে চেয়েছে, তার প্রতি তারা কখনোই পুরোপুরি সম্মান দেখাতে পারেনি।
বার বার আমি কিউবান শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষকে একটি প্রশ্নই করেছি: বিপ্লব যদি সত্যিই সবাইকে মুক্ত করে থাকে, তাহলে এখনও কেন দারিদ্র্যপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যা এত বেশি এবং সরকারি চাকরি ও রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে কেন তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে?
উত্তরগুলো এসেছিল ঘোর বস্তুবাদীদের কাছ থেকে। তাদের ভাষা ছিল মার্ক্সবাদী, এই পরিস্থিতি পুঁজিবাদের ফল। তাদের মতে, কৃষ্ণাঙ্গ নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতার কারণ। যেন দায় এড়ানোর ভঙ্গি, অসংখ্য অভিযোগ। একজন মহিলা বললেন, “কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত নয়। আগে থেকেই তাদের অবস্থা খারাপ।” মাঠপর্যায়ের গবেষণার সময় আমি বুঝেছিলাম, এটি কেবল ব্যক্তিগত মত ছিল না, ছিল একটি গভীর মানসিক কাঠামোর অংশ।
যদিও কিউবার পরিসংখ্যান দপ্তর কোনো আনুষ্ঠানিক বর্ণভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে না, তবু সমাজবিজ্ঞানী ক্যাটরিন হ্যানসিং এবং বার্ট হফম্যানের ২০২০ সালের দেশব্যাপী একটি সমীক্ষা করেছিল। এক হাজারেরও বেশি কিউবানকে অন্তর্ভুক্ত করা তাদের প্রতিবেদনটি, আমার নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের অনেক দিককে সমর্থন করে। কিন্তু সাধারণ মানুষ আগেই বাস্তবতা থেকে ধারণা করছিল, বৈষম্যের কাঠামো বহু ক্ষেত্রে বিপ্লব-পূর্ব যুগের সীমাকে পুরোপুরি অতিক্রম করতে পারেনি।
অন্যদিকে, অভিবাসনের সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন তৈরি করেছিল। ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর শ্বেতাঙ্গ কিউবানরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে দেশত্যাগ করতে পেরেছিল। তাদের পাঠানো অর্থ দেশে থাকা পরিবারের কাছে পৌঁছাত। বাইরে থেকে পাওয়া এই সম্পদ অনেক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ব্যবসা শুরুর মূলধন হয়ে ওঠে। ফলে অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে বর্ণগত অবস্থান জড়িয়ে যায়।
আমি সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছিলাম ২০২১ সালের জুলাইয়ে, যখন কিউবার মানুষ সান্তিয়াগো দে কিউবা ও হাভানার রাস্তায় নেমে আসে। ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর এটি সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের অংশ ছিল। এই আন্দোলনে দ্বীপের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরাও অংশ নেয়।
জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী বিপ্লবী স্লোগান ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’-কে তারা নতুনভাবে উচ্চারণ করে ‘মাতৃভূমি ও জীবন।’ পাশাপাশি শোনা যায় ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ ধ্বনি। এর প্রতিক্রিয়ায় কিউবান সরকার গণগ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে এবং কিছু প্রতিবাদকারীকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেয়। মানবাধিকার সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণগুলো দেখায়, এই দমননীতি অসমভাবে কৃষ্ণাঙ্গ কিউবানদের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।
অব্যবস্থাপনা, দমননীতি, নজরদারি এবং ভিন্নমত দমনের জন্য কিউবা বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এক নিদারুণ ক্লান্তি তৈরি করে, আমার পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় বহু কিউবান এখন রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর তেমন প্রত্যাশা রাখেন না।
তবে কিউবার এই বাস্তবতা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, কিউবার হাসপাতালের জন্য আসা জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া সমর্থন করতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজের পথে কিউবা বিপ্লব যে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তার সম্ভাবনার ক্ষয় নিয়ে শোক করা এক বিষয়, আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে স্বাগত জানানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তাৎক্ষণিক মানবিক সংকটের বাইরে গিয়ে বোঝা জরুরি, এই পরিস্থিতিতে আসলে কী হারিয়ে যাচ্ছে, কী ধ্বংস হচ্ছে। একই সঙ্গে দেখতে হবে কিউবা তার সীমানার বাইরে বিশ্বের জন্য কী করেছে। জ্যামাইকার দিকেই তাকানো যায়, যেখানে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চার হাজার সাতশোরও বেশি কিউবান স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করেছে। কিউবান চিকিৎসকরা সেখানে লাখ লাখ রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং বহু হাজার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন। এখন মার্কিন চাপের ফলে সেই ব্যবস্থার বড় অংশ ভেঙে পড়েছে, শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেসব মানুষ সেই ক্লিনিকগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা নীরবে এর ফল ভোগ করছে।
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, কিউবা ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনশোরও বেশি চিকিৎসক ও নার্স পাঠিয়েছিল। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক দ্বীপদেশীয় চিকিৎসা সহায়তা, এমন এক সময় যখন দ্বীপটি নিজেই দীর্ঘদিনের অবরোধের মধ্যে ডুবে ছিল। কিউবা এমন বহু দেশে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে, বিনিময়ে তাদের পাবার মতো কিছুই ছিল না শুধু সংহতি ছাড়া।
১৯৭০-এর দশকের অ্যাঙ্গোলার দিকে তাকাতে হবে, আন্তর্জাতিকতাবাদের সেই পর্বে কিউবা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। এই ভূমিকা দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের গতিপথকে অনেকাংশে বদলে দিয়েছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা তা জানতেন, ১৯৯১ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সফরগুলোর একটি ছিল হাভানায়, যেখানে তিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ম্যান্ডেলা ক্যাস্ট্রোকে আফ্রিকার জনগণের বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ওই সময় এভাবে বলাটা না নিরাপদ ছিল, না কোনো লাভের বিষয় ছিল।
এই অবরোধের ফলে শুধু আজকের এক কোটি মানুষের মানবিক কষ্টই নয়, বরং গত ষাট বছরের সেই আন্তর্জাতিক সংহতির ইতিহাসও বিপন্ন হয়ে পড়ে, যা সাম্রাজ্য ও আধিপত্যের রাজনীতির বিপরীতে এক বিকল্প নৈতিক অবস্থান নির্মাণ করেছিল।
কিউবার সরকার দমনমূলক ছিল সেটি সত্য এবং এখনও সেভাবে চলছে। বর্ণগত অসামঞ্জস্য, অর্থনৈতিক স্থবিরতা সবই কিউবার বাস্তবতার অংশ।
তবু একই সঙ্গে কিউবা সেই দেশ, যে দেশ দশকের পর দশক ধরে মার্কিন বিপ্লবী আসাতা শাকুরকে মার্কিন বদনজর থেকে জীবিত থাকতে ও রেহাই পেতে আশ্রয় দিয়েছে। আর সেটা মার্কিন বিপুল অর্থমূল্যের পুরস্কারের লোভ উপেক্ষা করে। হারিকেন ক্যাটরিনার পর যখন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে বিপর্যয় নেমে আসে, কিউবা তখন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক দল পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে একই চিকিৎসক দল পাঠানো হয় পাকিস্তানে, ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায়। দলটি প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকায় ত্রিশটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করেছিল। আবার কোভিড-১৯ মহামারীর সময়, যখন পশ্চিমা ওষুধ কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছিল, কিউবা তখন নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরি করে এবং ন্যায্য প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে তা ভাগ করে নেয়।
ফলে কিউবাতে রাষ্ট্রীয় দমনমূলক কাঠামো ও বৈশ্বিক সংহতি, এই দুই বাস্তবতাই একসঙ্গে সত্য। বামপন্থীরা প্রায়ই প্রথম বাস্তবতাটিকে অতিরঞ্জিতভাবে রোমান্টিক করে তোলে, আর মধ্য ও ডানপন্থীরা দ্বিতীয় বাস্তবতার গুরুত্ব অস্বীকার করে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির, যা এই দুইয়ের কোনো একটিকেও আলাদা করে বেছে না নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ কিউবানদের অভিজ্ঞতা এই দুই সত্যের মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে নয়, এই দোটানার ভেতর দিয়েই তাদের জীবন গঠিত। তাদের জন্য সিদ্ধান্তহীনতা কেবল একটি দার্শনিক অবস্থান নয়, বরং তাদের জীবনেরই একটি শর্ত।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসন কিউবাকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই বয়ান যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, তা হলো কার জন্য মুক্তি এবং কোন মুক্তির কথা বলা হচ্ছে? রিগ্যান থেকে বাইডেন পর্যন্ত সব মার্কিন প্রশাসনের সময় কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কখনও স্বাভাবিক হয়েছে, আবার কখনও উত্তেজনায় ফিরে গেছে। ওবামার আমলে সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণতার দিকে অগ্রসর হলেও ট্রাম্পের সময়ে তা আবার স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পুরো সময়জুড়ে কিউবা আসাতা শাকুর ও নেহান্দা আবিওদুনের মতো কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান বিপ্লবীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। কিউবা এই অবস্থানকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধরে রেখেছে। এই অবস্থান বিশ্বের সেসব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের প্রতি সংহতির প্রকাশ, যারা নিজেদের দেশে সংগ্রামের বাস্তবতা বোঝেন এবং প্রতিরোধে দাঁড়ানো মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখেন।
কিউবা স্বীকৃতি দিয়েছিল তাদের, যাদের জন্য মার্কিন ফৌজদারি ব্যবস্থা কখনোই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। সেই অবস্থানের জন্য কিউবাকে মূল্য দিতে হয়েছে, অবরোধ তারই দীর্ঘ প্রতিফলন, যা আজও নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে।
যে প্রশাসন একসময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল এবং যার প্রভাবে কিউবার প্রধান তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, সেই একই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর ইরানে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বদলে দিয়েছে। সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই রাশিয়ার জাহাজগুলো এখন কিউবার দিকে তেল নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছে, বিপরীতে তাদের অনুসরণ করছে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার।
কিউবা বর্তমানে এবং সবসময়ই একটি সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি। ষাট বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার যুক্তিকে কেন্দ্র করে কিউবা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বড় একটি অংশ বিকৃত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের নীতি দ্বীপরাষ্ট্রটির সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যা কিউবার অভ্যন্তরীণ সংহতিকে এক ধরনের অভিযোগের বিষয় বা বিতর্কের লক্ষ্যে পরিণত করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নতুন চুক্তির প্রয়োজন নেই এবং নিশ্চিতভাবেই নতুন কোনো সাম্রাজ্যবাদী মুক্তির বয়ান দরকার পড়ে না। বরং প্রয়োজন হলো ক্যারিবীয় প্রতিবেশী, আফ্রিকা এবং বিশেষভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য কিউবা কী করেছে, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন কিউবার ক্লান্ত, আপসকামী এবং পরস্পরবিরোধী বিপ্লবটি কী করতে পারেনি, তার নির্ভেজাল বিশ্লেষণ।
রুশ জাহাজ আনাতোলি কলোদকিন মাতানসাস বন্দরে নোঙর করেছে। আরেকটি রুশ তেলবাহী জাহাজ ইতিমধ্যেই মাল বোঝাই করছে। কয়েকদিন আগে নুয়েস্ত্রা আমেরিকা কনভয়ের অংশ হিসেবে ৬৫০ জন মানুষ কিউবায় পৌঁছায়, যে কনভয়ের নাম রাখা হয়েছে ১৮৯১ সালে রচিত হোসে মার্তির একটি প্রবন্ধের নামে। ওই প্রবন্ধে হোসে মার্তি এক সাম্রাজ্যবাদমুক্ত মহান লাতিন আমেরিকা কল্পনা করেছিলেন।
এখন তিন মহাদেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্যান-আফ্রিকান আন্দোলনগুলোর কণ্ঠে এক স্বীকৃতি প্রতিধ্বনিত, তোমরা আমাদের উপদেশ দাওনি, তোমরা করে দেখিয়েছ। দীর্ঘদিনের মুষ্টিবদ্ধ হাতও কোনো একসময় নিজের শর্তে, নিজের ছন্দে ধীরে ধীরে শিথিল হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংহতির মাধ্যমে কিউবা যে পৃথিবী নির্মাণ করেছিল, তার প্রতিধ্বনি আজও ফিরে আসে, বারবার এবং অবিরাম। হয়তো তা যুদ্ধজাহাজের মতো অত দ্রুত আসে না বা অস্ত্রের ঝনঝনানির মতো উচ্চকিত কণ্ঠে নয়। তবুও এক নীরব, অনমনীয় অগ্রযাত্রায় সেই সংহতি এখনও কিউবা দ্বীপটির দিকে এগিয়ে আসছে।
লেখাটি আল-জাজিরা থেকে অনূদিত; এর লেখক জাফরি এস. অ্যালান মার্কিন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আফ্রিকান আমেরিকান ও আফ্রিকান ডায়াসপোরা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কিউবা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গদের যৌনতা, লিঙ্গ ও সামাজিক আন্দোলনের ওপর নৃ-বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। তার কিউবা সম্পর্কিত বই ‘¡Venceremos?: The Erotics of Black Self-making in Cuba’।