Published : 20 May 2026, 01:25 AM
মূল অর্থবহ কথাটি গত সপ্তাহের ট্রাম্প-শি বৈঠকে চীনের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ থেকে আসেনি। বৈঠক শেষে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে অবস্থানকালে ফক্স নিউজের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখা হয়— বিগত দুদিন ধরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকা তাইওয়ান দ্বীপ নিয়ে এখন তার অবস্থান কী?
ডনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল, “বিষয়টিকে এমন এক ‘জায়গা’ বলব, কেউই আমরা জানি না এর সংজ্ঞা কী হবে।“ তাইওয়ানের নাগরিকরা আগের চেয়ে বেশি না কম নিরাপদ বোধ করবে এমন প্রশ্নে, ট্রাম্প ‘নিরপেক্ষ’ উত্তর দেন।
তাই নিশ্চিতভাবেই ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় তাইওয়ান লবি ক্ষুব্ধ। আগামীতে পত্রিকার পাতায় পাতায় তোষণ, পরিত্যাগ এবং বিশ্বাসহীনতার গালগল্প ভরে উঠবে। তবে ট্রাম্পের অসতর্ক শব্দচয়ন যা করেছে, বিবদমান তিনটি দেশের সতর্ক বিবৃতিও তা পারেনি।
সহজ কথায় বললে এটি কৌশলগত বাস্তবতার এক চিত্র দেখায় যে, প্রজন্ম ধরে ভান করা আমেরিকার তাইওয়ান নীতি আজ অস্তিত্বহীন অথবা অসাড়।
যে ভারসাম্যহীনতা নিয়ে কেউই কথা বলতে চায় না
চীন থেকে তাইওয়ান একশো মাইল দূরে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে তা সাত হাজার মাইল। বেইজিংয়ের জন্য তাইওয়ান বহু বছর ধরে স্বার্থের কেন্দ্র, যাকে ঘিরে রয়েছে চীনের সার্বভৌমত্ব প্রশ্ন। গৃহযুদ্ধের স্মৃতি কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির বৈধতা সে দিকটি তুলে ধরে। তাই শি ব্যতিক্রমী ভাষায় ট্রাম্পকে স্মরণ করান চীন-মার্কিন সম্পর্কে তাইওয়ান খুবই তাৎপর্যবাহী ইস্যু। তিনি সতর্ক করেন, এ বিষয়ে যেকোনো অসদাচরণ বড় বিপদ ডেকে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাইওয়ান সবকিছু নয়। সেটি এক গণতান্ত্রিক সমাজ, যার জন্য আমেরিকানদের গভীর সহানুভূতি আছে। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও এর গুরুত্ব অনেক। পাশাপাশি রয়েছে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতির মাঠে কৌশলগত অবস্থান, যদিও তাইওয়ান আয়তনে ক্ষুদ্র। কিন্তু প্রথাগত অর্থে সেটি কোনো অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ নয়, যার জন্য একটি পরাশক্তি সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে।
এটি আদর্শিক অবস্থান নয়, সামরিক প্রশ্ন—দূরত্ব, রসদ সরবরাহ এবং প্রচলিত সামরিক শক্তির ভারসাম্যের বাস্তবতা। সামরিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়নগুলো দীর্ঘদিন ধরে সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে তাইওয়ান ঘিরে কোনো সংঘাত লাগলে চীনের পিপল’স লিবারেশন আর্মি নিজ ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা বলয়ের ভেতর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রকে লড়তে হবে, জাপান ও গুয়ামের মতো দূরবর্তী সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে। যা চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই পড়ে।
ডনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও, তিনি এই বাস্তবতাটি বুঝেন বলেই মনে হয়। তাইওয়ান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তারা কিছু করবে বলে মনে হয় না। তবে আমি না থাকলে হয়তো করতে পারে।“ ট্রাম্পের তাইওয়ান বিষয়ক অবস্থান অনেকটাই পররাষ্ট্রনীতির বাস্তববাদী ধারার সঙ্গে খাপ খায়। সে দৃষ্টিভঙ্গি হলো, যতদিন সম্ভব চীনকে নিরুৎসাহিত করা বা প্রয়োজনে সমঝোতার পথ খোঁজা। কিন্তু চীন থেকে মাত্র একশ মাইল এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সাত হাজার মাইল দূরের একটি দ্বীপের জন্য সরাসরি যুদ্ধ নয়।
আমেরিকার ভাষ্যই এখন সবচেয়ে জোরালো
কূটনৈতিক বিবৃতিগুলো পড়ার সময় তাতে কী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা বোঝা উচিত। অন্যদিকে, কী বাদ দেওয়া হয়েছে সেটিও উদ্ধার করা দরকার। চীনের ভাষ্য অনুসারে, শীর্ষ বৈঠকে তাইওয়ান আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল। তবে আমেরিকার একাধিক বিবৃতিতে তাইওয়ানের কোনো চিহ্নই ছিল না।

সেটি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, বরং নীরব স্বীকৃতি। পারস্য উপসাগরে মাত্রই যুদ্ধ শেষ করে ও ইউরোপের নিরাপত্তা জটিলতার পর, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তৃতীয় কোনো ফ্রন্টে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় না।
ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যকার গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার যে কাঠামো শি জিনপিং প্রস্তাব করেন, তা ডনাল্ড ট্রাম্প নীতিগতভাবে গ্রহণে ইচ্ছুক। কূটনীতিকরা একে যে নামেই ডাকুক, সেটি আপোসেরই ভাষা। চীনারা ইতোমধ্যে একে এ দশকের বাকি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের কার্যকর নীতি হিসেবে নিয়েছে।
তাকে ট্রাম্পের সমালোচকরা ওয়াশিংটনে দুর্বলতা হিসেবে উপস্থাপন করবেন। বেইজিংয়ে যা ঐতিহাসিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। উভয়পক্ষই আংশিকভাবে সঠিক। তবে আসল ব্যাপারটি আরও বেশি আকর্ষণীয়। এক ধীর ও বিব্রতকর স্বীকারোক্তি যে, একমেরু যুগে বিশ্ব আর নেই। যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন এক বিশ্বে বাস করবে, যেখানে অন্যান্য পরাশক্তিগুলোরও অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাঝামাঝি অবস্থার বিপদ
তাইওয়ানের সর্বনাশ অতি নিকটে কিংবা চীনের হাতে চাবি তুলে দিতে হবে, আমার কথার অর্থ তা নয়। বাস্তবসম্মত পথটির কথা আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলছি। এক চীন নীতি, তাইওয়ানের সঙ্গে বলিষ্ঠ অথচ অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক, আত্মরক্ষায় পর্যাপ্ত অস্ত্র দেয়া এবং মার্কিন হস্তক্ষেপের অস্পষ্ট কাঠামোটি বজায় রাখা। যা অস্বস্তিকর কিন্তু টেকসই, ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেটি প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে তাইওয়ান প্রণালিজুড়ে শান্তি বজায় রাখছে।
যা বিপজ্জনক, তা বাস্তববাদ কিংবা সংযম নয়। ২০১৬ সাল থেকে ওয়াশিংটন যে মধ্যবর্তী অবস্থানে পৌঁছেছে, তা এখন উত্তেজনা উসকে দেয়। পাশাপাশি কথার ফুলঝুরি ও এক অপর্যাপ্ত সামরিক আয়োজন লুকিয়ে ফেলে। এটি হলো সেই দ্বিদলীয় অভ্যাস, যা চীনের সঙ্গে আদর্শিক প্রতিযোগিতায় তাইওয়ানকে ‘জায়গা’ আকারে দেখার চেয়ে, একটি প্রতীক ধরে ভাবতে পছন্দ করে।
তাই এটি সবচেয়ে ভঙ্গুর পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত। বেইজিংকে এমন এক সংকল্প পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়, যেখানে আমেরিকারই স্বয়ং দুর্বল। একইসঙ্গে তাইপেকে এমন নিশ্চিত বিশ্বাসে উৎসাহিত করে, যা ওয়াশিংটন বাস্তবে কখনো দেয়নি কিংবা দিতে পারবে না।
হয়তো অনেকের কাছে ট্রাম্পের উপর্যুক্ত মন্তব্য উপহাসের বস্তু। কিন্তু সেটি ১৯৭২ সালের সাংহাই যৌথ বিবৃতির মূল কথার কাছাকাছি এবং গত তিনটি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় কিছু। তাইওয়ান প্রশ্নে আমেরিকার আসল বুদ্ধিমত্তা ছিল, প্রশ্নটিকে অমীমাংসিত রেখে দেওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং নয়, বরং ওয়াশিংটনই সে চিত্রনাট্য নতুন করে লেখার ইচ্ছা পোষণ করছে।
একটি বিনয়ী সুপারিশ
বেইজিং বৈঠকের শিক্ষা এ নয় যে, ট্রাম্প তাইওয়ানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। তিনি তা করেননি, অন্তত এখনও পর্যন্ত, সবকিছু মিলিয়ে। ট্রাম্পের চীন সফরের মূল শিক্ষা হলো, চীন-বিরোধী পরিবেশ দ্বারা বেষ্টিত থেকেও একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ভূগোল ও সামরিক সীমাবদ্ধতার মহাকর্ষীয় টানে বাস্তববাদী পথ বেছে নেন। অর্ধশতাব্দী আগে হেনরি কিসিঞ্জার যে রূপরেখা দেন, বহু সমালোচক তা হালনাগাদে অস্বীকার করেন। কিন্তু ট্রাম্প তাইওয়ান বাস্তবতা বুঝে বাস্তববাদে ফেরেন।
ওয়াশিংটনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এ প্রশ্ন করবে না। যারা আমেরিকাকে মহান বানাতে দাবি করেন, তাদের এ প্রশ্ন করার দায়বদ্ধতা আছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এক গৌণ স্বার্থে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের বিরুদ্ধে তার সন্তানদের তাইওয়ান প্রণালিতে পাঠাতে প্রস্তুত?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, কিংবা এ বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকে, অথবা যদি ব্যক্তিগত আলোচনায় সত্যিই বলা হয়ে থাকে যে তাইওয়ান প্রণালিতে সন্তানদের পাঠাবে না—তাহলে সেই বাস্তবতা ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে, জনপরিসরে তুলে ধরতে হবে। ট্রাম্প স্বভাবসুলভ অস্পষ্ট ভঙ্গিতে, সবেমাত্র তাল মেলানো শুরু করছেন। ঘরে উপস্থিত প্রাপ্তবয়স্কদের উচিত কথাটি আরও স্পষ্ট করা।
লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত; এর লেখক লিওন হ্যাডার ওয়াশিংটনভিত্তিক একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও লেখক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক ক্যাটো ইনস্টিটিউটের সাবেক গবেষণা ফেলো, ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট পত্রিকার কন্ট্রিবিউটিং এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।