Published : 26 Apr 2026, 07:01 PM
এই লেখাটি লেখার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত পাতার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যখন আমার বার্তা আদান-প্রদান চলছিল, তার খানিক আগের ঘটনা। ছুটির দিনের সকাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের যে স্টুডেন্ট হাউজিংয়ে আমি আরেকজন ভিনদেশি ফ্ল্যাটমেটের সঙ্গে থাকি, সেই অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় হঠাৎ টোকা পড়ল।
এমন টোকা নতুন কিছু নয়। ফুড ডেলিভারির লোক, হাউজিংয়ের লোক, নানা প্রয়োজনে মানুষ আসে। অথচ আজ সকালের এই টোকা কেন যেন মনে ভয় জাগাল।
দরজার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখি, এক অপরিচিতা। কোনোদিন দেখিনি। অচেনা মুখ, অচেনা উপস্থিতি। কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা শঙ্কা নিয়ে দরজা খুললাম। পরে জানা গেল, কোনো এক সময় একটি জরিপে অংশ নিয়েছিলাম, তিনি সেই সংস্থার পরবর্তী এক জরিপের কাজে এসেছেন। ভয় কাটল কিন্তু রেশ রয়ে গেল।
তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য বসবাস করছি। চারপাশে শিক্ষার্থীঘেরা পরিবেশেই বেশিরভাগ সময় কেটেছে। অথচ এমন অযৌক্তিক ভয় আগে কখনো অনুভব করিনি। এই ভয়টা যেন গত কয়েকদিনেই তৈরি হয়েছে।
লিমন আর বৃষ্টি। দুটি নাম, দুটি জীবন, দুটি আফসোসের গল্প। তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনা আমার মতো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যেই এক অদৃশ্য অস্বস্তি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
লিমন আর বৃষ্টির হারিয়ে যাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ, তারপর তাদের মৃত্যুর খবরে যে শোকে আমরা ভাসছি তার ভেতরেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমাদের সামনে উঠে আসছে, এ কেমন জীবনের পেছনে বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী ছুটে চলেছে যেখানে তাদের মেধা, পরিশ্রম, চেষ্টা একটি নিরাপদ একক বাসস্থানের সামর্থ্যও দিতে পারে না। তারাই কি ছুটে চলেছে, নাকি বাস্তবতা তাদের বাধ্যও করছে?
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষার পরিধি দ্রুত বেড়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন নতুন বিভাগ, প্রতিবছর হাজারো গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু সেই সঙ্গে সমানতালে বাড়েনি গবেষণার সুযোগ, অবকাঠামো কিংবা মানসম্মত একাডেমিক পরিবেশ। বাড়েনি কাজের সুযোগও।
ফলে তৈরি হয়েছে এমন এক অসামঞ্জস্য, যেখানে বলা হচ্ছে এরা শিক্ষিত জনশক্তি, কিন্তু তাদের দক্ষতা বিকাশ ও জ্ঞানের প্রয়োগ ও বিস্তারের সুযোগ সীমিত। এই বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বিদেশে যাওয়া একটা আকর্ষণীয় পছন্দ তো বটেই একটি প্রয়োজন হয়েও ধরা দিচ্ছে। কাঠামোগত বাস্তবতাই তাদের এই প্রয়োজনের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
গবেষণা আর একাডেমিয়ায় আগ্রহী যে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে আসেন তাদের অনেকেই এই উচ্চ ব্যয়বহুল শিক্ষার দেশে তাদের মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিচয় দিয়ে টিচিং বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ/আরএ) হয়ে আসেন। কিন্তু এটি আক্ষরিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কোনো চাকুরি নয়।
এটি অনেক ক্ষেত্রেই কম পারিশ্রমিকে এক ধরনের শ্রমের বিনিময়ে এই ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকার উপায়। যেখানে মেধার বিনিময়ে শিক্ষার্থীরা মূলত টিউশন ফি মওকুফ ও সীমিত আর্থিক সহায়তার মত কিছু সুযোগ পান।
এই ফান্ডিংয়ের বিনিময়ে তাদেরকে একইসঙ্গে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা ক্লাস নেওয়া ও গ্রেডিং করার কাজ করতে হয়, সেই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও গবেষণা এগিয়ে নেওয়া, সব সামলাতে হয়। কিন্তু এই বৃত্তি যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শহরে কেবল ন্যূনতম টিকে থাকার হিসেবে দেওয়া হয়, কখনো কখনো সেটিও এই বৃত্তিতে কঠিন হয়ে পড়ে।
নিজের কথাই বলা যাক। আমি যে স্টাইপেন্ড পাই, তাতে ওয়াশিংটন ডিসি সংলগ্ন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরটিতে একা বাস করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আমার মতো এমন অনেকেই আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বাধ্য হন শেয়ারড ফ্ল্যাটে থাকতে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তখন আয়ের সঙ্গে আপসের জায়গায় চলে যায়। এই বাস্তবতায় একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জীবন হয়ে ওঠে এক স্থায়ী অনিশ্চয়তা, সীমিত আয়ে, প্রচণ্ড মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে টিকে থাকার এক প্রচেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে একটি জটিল বাস্তবতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের সংখ্যা প্রায়ই আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক নানা গবেষণায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। এসব কারণে বাড়ছে সহিংস অপরাধের ঝুঁকি। আর এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মতো অপেক্ষাকৃত ভঙ্গুর অবস্থানে থাকা মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি আর ভয়ের মাত্রা হচ্ছে আরও জটিল।
কিন্তু দেশের যে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে আসছে, এই জটিল বাস্তবতায় টিকে থাকছে তাদের নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কী? কিছু সংবাদমাধ্যমে এসেছে জামিল আহমেদ লিমনের শিগগিরই থিসিস জমা দেওয়া কথা, তিনি দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। লিমনের মতো অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরতে চান, নিজেদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের কাজে লাগাতে চান। কিন্তু সেই সুযোগ কি দেশে রয়েছে?
মাঠের বাস্তবতা বলছে, একজন পিইচডি গবেষকের ফিরে যাবার পর দেশে গবেষণার জন্য টেকসই ফান্ডিং-এর অভাব রয়েছে, মানসম্মত ল্যাব ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, বার একাডেমিয়া ও শিল্পক্ষেত্রে দক্ষ এই মানবসম্পদের জন্য সমন্বিত কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত।
রাষ্ট্রের কার্যক্রমে এটি স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র এখনো বিদেশে নীরবে দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করতে থাকা এই শিক্ষার্থীদেরকে কৌশলগত, দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার জায়গাতে আসেনি। ফলে আর্থিক চাপ আর জীবনের নানা প্রয়োজনের সঙ্গে আপসের সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কাও সঙ্গী হয় এই শিক্ষার্থীদের।
এই শিক্ষার্থীদের জীবন যেন অনেকটা সমুদ্রের ভাসমান বরফের ওপর বসে থাকা পাখিদের মতো। যে বরফ ভেসে চলেছে, কিন্তু কোনো সমুদ্রই তাকে নিজের বলে দাবি করে না, আর এই পাখিদেরও কোনো স্থায়ী ঠিকানা থাকে না।
জামিল আহমেদ লিমন আর নাহিদা এস বৃষ্টির হারিয়ে যাওয়া নিয়ে লিখতে বসে তাই মনে হল, আহা, এই পাখিদের নিয়ে কি লিখিব আর!