Published : 04 May 2026, 12:59 PM
এটা এখন পরিষ্কার যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটে জিতে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। ১৫ বছরের মমতা যুগের তথা তৃণমূল শাসনের অবসান হতে চলেছে। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ জুটির বিজয়রথ এবার পশ্চিমবঙ্গে এসে থামছে। পরিবর্তনের ফেরে প্রত্যাবর্তন রহিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে বসতে হচ্ছে বিরোধী দলের আসনেই। কেন বিজেপি জিতল, কেন পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা আস্থা রাখল হিন্দুত্ববাদের প্রচারণা চালানো বিজেপির ওপরেই, তারই বিশ্লেষণ এই লেখায়।
নতুন ভোট: বিজেপির কৌশল
ভারতের কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ধারাবাহিকভাবে আছে মহাশক্তিধর বিজেপি সরকার। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির এই বিজয়রথ বহমান। বাকি ছিল পশ্চিমবঙ্গ। একসময় মাত্র দুটি আসন পাওয়া বিজেপি গত বিধানসভা নির্বাচনে আওয়াজ তুলেছিল সরকার গঠনের। যদিও সেই ফাঁকা আওয়াজ বাস্তব কাজে পরিণত হয়নি, কিন্তু তারা ৭৭টি আসন পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলের আসন গেড়ে প্রমাণ করেছিল সামনের দিন তাদের। সেই লক্ষ্যে এবারের নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস; তারা পেয়েছিল ২১৫টি আসন। ৭৭টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো বিজেপি বসেছিল বিরোধী দলের আসনে। কংগ্রেস ও বামদের নির্বাচনি ফলাফল ছিল শোচনীয়।
এবার বিজেপির টার্গেট ছিল নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধন করে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে তৃণমূলের প্রভাব থেকে বের করে এনে এক নতুন ব্যবস্থার মধ্যে তৃণমূলকে চাপে ফেলে নির্বাচনি জয়রথ তাদের অনুকূলে আনা। বিশেষ করে তাদের টার্গেট ছিল মুসলিম ভোটারদের সংখ্যা কমিয়ে আনা। মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলোতে ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) অস্ত্র প্রয়োগ করে ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিতে সমর্থ হয় বিজেপি। তবে আনুপাতিক হারে হিন্দু ভোটও বাদ পড়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় প্রভাব বিস্তার করে। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরে তৃণমূলের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের সকল ক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। ফলে সম্পূর্ণ হাঙ্গামাবিহীন শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটাররা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিতে সমর্থ হয়। দুই দফার ভোটে ৯২ শতাংশের ওপরে ভোটার ভোট দেয়। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই রকম ভোটার উপস্থিতির ঘটনা বিরল।
এসআইআরে বাজিমাৎ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এবারের সবচাইতে বড় ইস্যু ছিল স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)। বিজেপির তুরুপের তাসও ছিল এই এসআইআর। এটা আসলে ভোটার তালিকা সংশোধনের পোশাকি নাম। বিজেপির চ্যালেঞ্জ ছিল পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমান ভোটারকে কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা, যাতে তৃণমূল ভোটের মাঠে লাভবান না হয়।
এসআইআর-এর আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭.৬–৭.৭ কোটি। এই প্রক্রিয়ার পরে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়ে। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ১০–১২ শতাংশ কমে যায়। অভিযোগ আছে, এই প্রক্রিয়ায় অনেক বৈধ ভোটারের নামও বাদ গেছে। মোদ্দা কথায়, এসআইআর-এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা বিপুল সংখ্যায় কমে গেছে, যা নির্বাচনের গণিত ও রাজনীতিতে বিজেপির অনুকূলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা শুদ্ধিকরণ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সরকার চলছে নিরঙ্কুশভাবে গত ১৫ বছর ধরে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে চলেছে পার্টিরাজ। রাজ্যের প্রশাসনের সকল স্তরে, বিশেষ করে পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনে তৃণমূলের প্রভাব দারুণভাবে সক্রিয় ছিল। নরেন্দ্র মোদি সরকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এবার সেই জায়গায় আঘাত হানে। নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরিয়ে নতুনদের নিয়োগ করে ভারতের নির্বাচন কমিশন। সরানোদের আর কোনো নির্বাচনি কাজে রাখা হয়নি। এই পদক্ষেপকে ঘিরে কমিশনের ‘অতিরিক্ত সক্রিয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, কার্যত নির্বাচনি ব্যবস্থায় তৃণমূলের পক্ষে কাজ করার সকল সুযোগকে রহিত করে দেয় এই পদক্ষেপ। ফলে ছাপ্পা ভোট বা জোরপূর্বক ভোট নেওয়ার পুরনো সংস্কৃতি এবার সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেটা তৃণমূলকে দারুণভাবে বিপাকে ফেলে। একারণেই তৃণমূলের দিক থেকে বলা হয়েছে, এবার নির্বাচনে তৃণমূলকে লড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রের সরকার ও রাজ্যের বিজেপির বিরুদ্ধে।
দলবাজির শাসন ও অন্যান্য
দীর্ঘদিনের তৃণমূলের শাসনকাল নিয়ে ওঠা অভিযোগ—যেমন প্রশাসনিক ব্যর্থতা, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি কিংবা আরজি কর কাণ্ড সংক্রান্ত বিতর্ক—এসব ভোটের আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাবে, তৃণমূলের এই রাজনৈতিক বিবেচনা সম্পূর্ণ ফেল করেছে। তাদের ধারণা ছিল জনমনে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হবে এসআইআর, অন্য কোনো পুরনো ইস্যু নয়। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। মানুষ বিজেপির তোলা ইস্যুকেই ভোটের বাক্সে সমর্থন দিয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক হিসাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের চিন্তা, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া ও মৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত তাদেরই নির্বাচনি সুবিধা দেবে। তাদের চিন্তায়, এই ধরনের ভোটারদের একটি বড় অংশ অতীতে তৃণমূলের পক্ষে ভোট দিয়েছে; ফলে তালিকা শুদ্ধ হলে সমীকরণ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হবে। এ ছাড়া বিজেপি আরও একটি রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে—‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ ভোটারদের ইস্যু তুলে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের দাবি জোরদার করা এবং এর মাধ্যমে হিন্দু ভোট একত্র করার চেষ্টা। তাদের প্রচার কৌশলে এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজেপির এই কৌশল সফলভাবেই কাজে লেগেছে।
বিজেপি জয়ের ১০ কারণ
প্রথমত, অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি বা দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি, বা সরকারবিরোধী ভোট। তৃণমূল কংগ্রেস বহু বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় দুর্নীতি, দলীয়করণ বা প্রশাসনিক অসন্তোষ সরকারবিরোধী ভোটকে একত্র করেছে। বিজেপি পরিবর্তনের সেই হাওয়াতে পাল তুলে জনমনে আশার সঞ্চার করেছে।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনও জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী জনপ্রিয় মুখ। মোদি-অমিত শাহ জুটির ইমেজ ও অবিরাম শ্রমে লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোট ভিত্তি বেড়েছে—এটি বিধানসভাতেও কাজে লেগেছে। মানুষ মমতার চেয়ে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। ভোটে যার প্রতিফলন পড়েছে।
তৃতীয়ত, হিন্দু ভোটের মেরুকরণের বিজেপির চেষ্টা সফল হয়েছে। হিন্দুত্ববাদের যে কার্ড নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ বহুদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে গেলাবার চেষ্টা করছিলেন, এখানকার ভোটাররা তাতে সায় দিয়েছে। হিন্দু ভোটারদের বৃহৎ অংশ এবার বিজেপির গেরুয়া রঙে মেতেছে। সীমান্ত, বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয় ইত্যাদি ইস্যুতে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মানসে এটি কার্যকর রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে, যার প্রভাব ভোটের বাক্সে পড়েছে।
চতুর্থত, তৃণমূলবিরোধী ভোটের একত্রীকরণ করা সম্ভব হয়েছে। কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর দুর্বলতায় বিরোধী ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে হেলে পড়েছে।
পঞ্চমত, মুসলমান ভোটারদের বিভাজনকে বিজেপি কাজে লাগিয়েছে। মুসলমান ভোটাররা এবার বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ, তৃণমূল—নানা ফ্রন্টে ভাগ হয়ে বিজেপিকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
ষষ্ঠত, বিজেপির দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সংগঠনগত বিস্তার প্রচেষ্টা এবার ভোটের মাঠে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপি গ্রাম পর্যায়ে সংগঠন অনেক শক্তিশালী করেছে। বুথ ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল প্রচারেও তারা আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত হয়েছে, যার প্রভাব ভোটে পড়েছে।
সপ্তমত, দুর্নীতি ইস্যু এবার তৃণমূলকে ভোটের মাঠে পিছিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, কয়লা দুর্নীতি, গরু পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগকে বিজেপি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব নিয়ে তৃণমূলের কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে জনঅসন্তোষ বেড়েছে, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে।
অষ্টমত, মমতার ভোটের তিন কৌশল—মহিলা ভোটার, মুসলিম ভোটার (প্রায় ৩০%) আর ছাপ্পা ভোট এবার ফেল মেরেছে। এর মধ্যে মহিলাদের ভোটের বড় অংশ এবার বিজেপির পক্ষে গেছে। মুসলমান ভোট ভাগ হয়েছে। ছাপ্পা ভোট বা জোরপূর্বক ভোটের ক্ষেত্রে এবার নির্বাচন কমিশন এমন ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে তৃণমূল পিছু হটেছে। ফলে বিজেপির কৌশল তৃণমূলকে বেকায়দায় ফেলেছে।
নবমত, বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান নেই, শিল্পে বিনিয়োগ নেই; ফলে মানুষ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ভাগ্যের পরিবর্তন চেয়েছে। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ সেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কেন্দ্রে ও রাজ্যে সরকার গঠনের যে লাভ, যাকে বিজেপির লোকেরা ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ বলে অভিহিত করে পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের ডাক দিয়েছে, সেই ডাকে জনতা বিপুলভাবে সাড়া দিয়েছে।
দশমত, বিজেপি হিন্দুত্ববাদের যে মন্ত্র দীর্ঘকাল ধরে আওড়েছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের হিন্দুমনও ব্যাপকভাবে সায় দিয়েছে। অন্যদিকে প্রগতি ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতাও বিজেপির বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
পুনশ্চ: পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক সম্প্রসারণের বড় প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কেও।