Published : 09 Apr 2026, 03:44 PM
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ নেই, বরং পিছিয়ে পড়ার দিকেই ঝোঁক বর্তমান। গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন সাধিত হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে তা কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনল না; উল্টো আরও হতাশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মুখে অনেক গালভরা বুলি শোনা যাচ্ছে, যার মধ্যে সারবত্তা নেই বললেই চলে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যের কোনো সঙ্গতিও নেই। শিক্ষার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় বিষয়ে যে যেমন ভালো মনে করছেন, তেমনই করবেন বলছেন। কোনো দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা, কারো সঙ্গে আলোচনা কিংবা কোনো মতামতের তোয়াক্কা করা—এসবের আর প্রয়োজন নেই মনে হয়। সব ভুলকে বৈধ করার জন্য ক্ষমতাই যথেষ্ট!
অথচ শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হলে ব্যবস্থাটাকে প্রথমে বুঝতে হবে; তাহলেই কেবল এতে কাম্য পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য: প্রথমত, নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তাদের মানবিক বিকাশ সাধন; আর দ্বিতীয়ত, ছাঁকনি হিসেবে অল্প কিছুকে উচ্চতর দায়িত্ব ও সুবিধার জন্য রেখে বাকিদের ফেলে দেওয়া। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার সঙ্গীদের (গীতা গোপীনাথ, রঘুরাম রাজন ও মিহির এস শর্মা) সম্পাদিত ‘হোয়াট দ্য ইকোনোমি নিডস নাউ’ গ্রন্থে এমন একটি চমৎকার আলোচনা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কার্তিক মুরলীধরন। তার আলোচনার বিষয় ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা হলেও অনেক দেশেরই এ থেকে শিক্ষণীয় আছে। সব দেশের শিক্ষাকাঠামোতেই এ দুটি উদ্দেশ্য থাকে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের আনুপাতিক গুরুত্ব সব দেশে সমান নয়।
ফল ও তার বীজে কিংবা কুকুর ও তার লেজের আয়তনে আনুপাতিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে বারো হাত বাঙ্গির তেরো হাত বিচি ও কুকুরের চেয়ে তার লেজ বড় হয়ে দেখা দিত। এমন অবস্থা বৃক্ষকুল ও প্রাণিকুল কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অমঙ্গলের কারণ হয়েছে ওইটাই—নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে ছাঁকনিটাই বড় ও এমনকি একমাত্র হয়ে উঠেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ছাঁকনি যত বড়, সূক্ষ্ম ও উন্নত হবে, শিক্ষা হবে ততই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পাঠ্যপুস্তক তৈরি, পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র তৈরি, নকল ঠেকানো, মূল্যায়ন, পরীক্ষার ফল, পাস-ফেল, শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, নোট-গাইড-টেস্টপেপার, কোচিং—সবই এই ছাঁকনির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মাত্র। এমন একটা ভয়াবহ ছাঁকনির ছিদ্র গলিয়ে শিক্ষাদীক্ষা যদিবা কিছুটা চুঁইয়ে বেরিয়ে আসে, তবে মন্দ কী! ছাঁকনিটা কেমন হলো সেটাই ঘটা করে দেখবার বিষয়, আর এই ছাঁকনির নির্মাতারাই আমাদের সর্বমান্য সব শিক্ষাকর্মকর্তা, উপদেষ্টা ও পরামর্শক। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই ছাঁকনিই নাড়াচ্ছে আমাদের পুরো শিক্ষাকাঠামোকে, যেন ওইটাই আসল!
কার্তিক মুরলীধরনের কথায়, এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় “অর্থ ব্যয় হয় বিদ্যালয় নির্মাণে, শিক্ষক নিয়োগে ও শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার (ঝরে পড়া রোধে) চেষ্টায়, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা অর্জন হয় সামান্যই।” তিনি আরও লিখেছেন, “আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রয়োজন প্রত্যেক নাগরিকের অন্তত সেই পর্যন্ত শিক্ষিত হওয়া যেখান থেকে তারা নিজেরাই তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়াতে পারে।”
অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন যেখানে প্রধান বিবেচ্য: ১. প্রত্যেক শিশুর শিক্ষালাভ (কাউকে বাদ না দিয়ে), ২. শিক্ষার্থীর স্বশিক্ষা গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন ও ৩. আজীবন শিক্ষা। শিক্ষার এই লক্ষ্য পুরনো কাঠামোকে স্বাভাবিকভাবেই অচল ঘোষণা করে। অথচ আমাদের কোথাও এই ছাঁকনি-শিক্ষা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেই। কারণ ক্ষমতাকাঠামোর শীর্ষে যারা আছেন ও যারা সেখানে যাবার স্বপ্নে বিভোর—এই শিক্ষাব্যবস্থা তাদের জন্য যুৎসই। এই শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য নয়, গুটিকয়েক তথাকথিত ‘মেধাবী’র জন্য। তাদের একমাত্র মৌলিক প্রতিভা এই ছাঁকনির অসংখ্য বাধা ফাঁকি দিয়ে তার ছিদ্র গলে বেরিয়ে পড়া। তবে এক্ষেত্রে বেশি কৃতিত্ব তাদের বাবা-মায়ের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, নোট-গাইড বইয়ের, কোচিং সেন্টারের ও শিক্ষক নামধারী ছাঁকনির ‘ছিদ্রবিশেষজ্ঞদের’। ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এখনকার রাষ্ট্রক্ষমতা এই গোষ্ঠীরই হাতে।
শিক্ষার নামে এমন এক ছাঁকনি ব্যবস্থায় প্রকৃত শিক্ষক গড়ে ওঠেন না; ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকে না। এর কুফল ভোগ করেন শিক্ষকেরাই প্রথম। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও কে কার চেয়ে কত বেশি করিৎকর্মা তা প্রমাণ করেন আগের বারের তুলনায় তারা শিক্ষাকে কত বেশি ছাঁকনিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন তাই দিয়ে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে একজন মন্ত্রীর সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে দেখা হয় নকল বন্ধের ক্ষমতায়, যা পুলিশি দক্ষতার সঙ্গে বেশি মানানসই। এটিও তার একটি কাজ বটে, কিন্তু আসল কাজগুলো আরও অনেক বড় ও কঠিন। যদি একজন শিক্ষামন্ত্রীকে এ কারণেই যুগ যুগ ধরে বাহবা দিতে হয়, তবে এ কাজে একজন পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তার ওপরই আমাদের বেশি ভরসা করা ভালো নয় কি?
শিক্ষাব্যবস্থার মূল উপকরণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী; তাদের কার্যক্রমকে সহায়তা করার জন্য দালান, বেঞ্চ, বইপুস্তক, প্রশাসন ইত্যাদি। অথচ চলতি ব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে শিক্ষার কেন্দ্র তৈরি হয় না, উভয় থাকে দূর কক্ষপথে, পরস্পরকে বিকর্ষণ (অসম্মান) যাদের বৈশিষ্ট্য। ছাঁকনি ব্যবস্থায় শিক্ষকের মান বৃদ্ধির চেষ্টা বৃথা হতে বাধ্য। না প্রশিক্ষণ, না বেতন বৃদ্ধি—কোনো কিছুই শিক্ষকের মান বৃদ্ধি করতে পারে না। উক্ত অর্থনীতিবিদের কথায়, “বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে শিক্ষকের বেতনের পরিমাণ ও শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে তাদের কার্যকর ভূমিকা, এ দুয়ের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই।”
ছাঁকনি ব্যবস্থায় শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি ছাঁকনির চাকচিক্যই আরও বাড়াবে মাত্র, শিক্ষার মানের কোনো উন্নতি করবে না। শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, তবে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি ঠিক করা প্রয়োজন তারও আগে। ছাঁকনি ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে দালানকোঠা, চেয়ার-টেবিল, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি শতসহস্র গুণ ঝকঝকে-তকতকে করেও শিক্ষার প্রত্যাশিত লাভ হবে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করেই কেবল এটা সম্ভব। ছাঁকনি ব্যবস্থায় প্রধান হচ্ছেন দালানের প্রকৌশলী, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, কাঠমিস্ত্রি, ছাপাখানার মালিক, নোট বইয়ের লেখক, কোচিং সেন্টারের পরিচালক, প্রশাসনের বস, বেতনদাতা প্রমুখ। প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধান—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।
ছাঁকনি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে কী করে প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা যায় বলো দেখি—এ কথা বলে আমার ওপর অর্থহীন ক্ষোভ প্রকাশ করে লাভ নেই। সেটা অনেক কঠিন কাজ, এটার সমাধান বের করা শিক্ষাকর্মকর্তাদেরই দায়িত্ব, যারা রাষ্ট্রের ও জনগণের বিপুল অর্থ দ্বারা লালিত-পালিত। আমি কেবল এখানে এই শিক্ষাব্যবস্থার মূল রোগটা দেখিয়ে দিচ্ছি। শার্লক হোমস যেমন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাদের বলতেন—এর চেয়ে বেশি বললে এই রহস্য সমাধানে আপনাদের কৃতিত্বটা আর থাকবে না। এবার আপনারা সমাধান করে কৃতিত্বটা জিতে নিন। যদি না পারেন, সাহায্য চাইলে তখন করব।
আমি এখানে যা বলেছি তা খুবই সহজ, পরের কাজটা কঠিন। সহজটাই আমার পক্ষে সম্ভব বলে তা বললাম। এখন এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে দেখান যাকে প্রকৌশলী, ডিজাইনার, ছাপাখানার মালিক, কোচিং সেন্টারের পরিচালকরা ইচ্ছেমতো নাড়াতে না পারে। এরা সবাই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সুবিধামতো কাজ করবেন কেবল সব শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশের জন্য—গুটিকয়েক মেধাবী শিক্ষার্থী খুঁজে বের করার জন্য নয়।