Published : 31 Mar 2026, 11:40 PM
ঢাকা তখন এক আগ্নেয়গিরি; অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত শিখায় জ্বলছে পূর্ব বাংলা। আলোচনার টেবিলে বসে আছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আর জুলফিকার আলী ভুট্টো। হঠাৎ ইয়াহিয়া দূরবীন চোখে লাগিয়ে ঢাকার আকাশ দেখার চেষ্টা করলেন। অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন—হাইকোর্ট, সচিবালয় থেকে শুরু করে প্রতিটি বাড়ির ছাদে উড়ছে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা! দূরবীন দিয়েও কোথাও মিলছে না পাকিস্তানের চাঁদ-তারা। এই দৃশ্যটি যখন ২৪ মার্চ ১৯৭১-এ ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার পাতায় কার্টুন হয়ে ভেসে উঠল, তখন সেটি ছিল পাকিস্তানের অস্তিত্বের ওপর এক চূড়ান্ত আঘাত। সংবাদের ভিড়ে কালির এই আঁচড় কীভাবে স্বাধীনতার অদম্য ঘোষণা হয়ে উঠেছিল, চলুন ফিরে দেখা যাক সেই উত্তাল মার্চে।
গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্র ও সাময়িকীর জন্য কার্টুন খুবই শক্তিশালী উপাদান। সংবাদ কার্টুনের ভাষা অত্যন্ত জোরালো ও লক্ষ্যভেদী হয়ে থাকে। একটি কার্টুনের মাধ্যমে অনেক কিছুই আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব। কার্টুনের ধরন সাধারণত হাস্যরসাত্মক হলেও অনেক ক্ষেত্রে এতে থাকে তীব্র শ্লেষ ও কটাক্ষ, যার কারণে পাঠক পত্রিকার পাতায় কার্টুন খুব পছন্দ করেন। যেমন—বর্তমান ইরান যুদ্ধে দেশটির মিনাব প্রদেশের শাজারেহ তাইয়্যেবা স্কুলে বোমা হামলায় ১৭০ জন নিরপরাধ শিশু বর্বর যুদ্ধাপরাধের শিকার হওয়ার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান' ১৪ মার্চ একটি কার্টুন প্রকাশ করেছে। যার শিরোনাম ছিল ‘আফটার নাপাম গার্ল’ (After Napalm Girl)। এলা ব্যারনের করা এই কার্টুনটি এরই মধ্যে যুদ্ধবাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এখানে একটু মনে করিয়ে দিই, ১৯৭২ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন মদদপুষ্ট বিমানবাহিনী একটি গ্রামে প্রাণঘাতী রাসায়নিক নাপাম বোমা নিক্ষেপ করেছিল। সেই আগুন থেকে বাঁচতে নগ্ন এক শিশুর দৌড়ানোর ছবি বিশ্ববিবেবককে নাড়া দিয়েছিল। সেই পটভূমিতেই দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশ করেছে ‘আফটার নাপাম গার্ল’। যাই হোক, এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দুর্বার অসহযোগ আন্দোলনে ‘দ্য পিপল’-এ প্রকাশিত সংবাদ কার্টুনের দিকে।
১৯৭১ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। অবিস্মরণীয় সেই গণজোয়ারে শামিল হয়েছিলেন পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণ। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংঘ, সংস্থা, সমাজ ও সমিতি—যে যেভাবে পেরেছেন অবদান রেখেছেন সেই সময়টাতে; নিশ্চিত করেছেন একটি স্বাধীন সূর্য। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা ছিল কিছু সংবাদকর্মীর। যে কারণে ২৫ মার্চের মধ্যরাতে পাকিস্তানি হায়েনাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল কিছু পত্রিকা অফিস। ১৯৭১ সালে এই অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় ইংরেজি সংবাদপত্র ছিল ‘দ্য পিপল’। ইংরেজি এই দৈনিকটি বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিক ও ভিনদেশি সাংবাদিকদের কাছে খুবই কাঙ্ক্ষিত ছিল, কারণ এর বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। এই পত্রিকাটি সর্বাত্মকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ অবলম্বন করে সংবাদ প্রকাশ করত।
১৯৭১ সালে ‘দ্য পিপল’ সম্পাদক ছিলেন আবিদুর রহমান। সংবাদপত্রটি অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতেও অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিল। এ সময় পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে অনেক সাহসী কার্টুন প্রকাশ করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে এই সংবাদপত্রটি আখ্যায়িত করেছিল ‘দখলদার সেনা’ (Occupation Army) হিসেবে। আসুন দৃষ্টি দেওয়া যাক ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল দিনে প্রকাশিত ‘দ্য পিপল’-এর প্রথম সংবাদ কার্টুনের দিকে।

১৯৭১ সালের ২২ মার্চ ‘দ্য পিপল’ প্রকাশ করে এই কার্টুনটি, যার শিরোনাম ছিল ‘Bomb! Shankar Power!’ এই কার্টুনটি ছিল খুবই সাহসী ও বার্তাবাহক। যেখানে ক্ষমতার নেশায় মত্ত একদল ষড়যন্ত্রকারীকে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। কার্টুনটির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি অনেকটা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আদলে তৈরি। এছাড়া ক্ষমতার নেশায় মত্ত এই মাদকাসক্ত আসরে আছে সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক জুলফিকার আলী ভুট্টো, ধর্মভিত্তিক দলের নেতা ও সামরিক-বেসামরিক আমলা। আর তাদের নিচে চাপা পড়েছে মুক্তিকামী বাঙালিদের কঙ্কাল। যাদের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত এই বাঙালিদের রক্তের সঙ্গে হোলি খেলেই ক্ষমতার নেশায় উন্মত্ত রয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা।

২৩ মার্চ ১৯৭১-এ প্রকাশিত কার্টুনটি ছিল আরও সাহসী। মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালের এই দিনটিতে বাঙালি জাতির অসহযোগ আন্দোলন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। সারাদেশে চলছিল অবরোধ; পাকিস্তানি সেনাদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছিল। সারাদেশে তাদের গুলিতে মানুষ মরছিল এবং ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আয়োজন চলছিল দুর্বার গতিতে। এর আগের দিন দ্বিতীয় দফায় আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো, যাকে স্বাগত জানিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। আর সেনাদের হাতে নরকঙ্কালের মালা এঁকে সত্যিই অসাধারণ একটি কার্টুন প্রকাশ করেছিল ‘দ্য পিপল’, যার শিরোনাম ছিল ‘Reception for the killer’।
২৪ মার্চ ১৯৭১-এ প্রকাশিত কার্টুনটি ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস, যেদিন সাধারণত সড়ক দ্বীপ ও সরকারি-বেসরকারি ভবনে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়ানো হতো। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল এক ভিন্ন দিন। এদিন মুক্তিকামী বাঙালি সারাদেশে উড়িয়েছিল সবুজ জমিনের ভেতর সোনালি রঙের মানচিত্র সম্বলিত বাংলাদেশের পতাকা। সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হাউস, সেনানিবাস ও মিরপুরের বিহারি অধ্যুষিত কিছু এলাকা ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। যা ছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে পাকিস্তানকে চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যানের এক দুর্বার ঘোষণা।
এই বিষয়টি নিয়ে ‘দ্য পিপল’-এর প্রধান সংবাদও ছিল নতুন পতাকা নিয়ে। ২৪ মার্চ সংবাদপত্রটির প্রধান শিরোনাম ছিল—‘A FLAG OF FREEDOM IS BORN WITH STAIN OF MARTYRS’ BLOOD’। এর নিচেই ছাপা হয় সেই ঐতিহাসিক কার্টুন, যার শিরোনাম ছিল—‘SIR, I DON'T SEE ANY SIGN OF PAKISTAN ANYWHERE ELSE’। যাতে দৃশ্যমান ছিল আলোচনার নামে ঢাকায় অবস্থান করা ভুট্টো ও ইয়াহিয়া দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখছেন—কোথাও পাকিস্তানের পতাকা নেই। হাইকোর্ট, সচিবালয় ও ঢাকা শহরের সব বাড়ির ছাদে উড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সত্যিই অনবদ্য ও অসাধারণ এক প্রকাশ! ১৯৭১ সালে ‘দ্য পিপল’-এর জন্য কে বা কারা কার্টুনগুলো এঁকেছেন, তা লেখকের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো অধিকতর অনুসন্ধানে সেই কার্টুনশিল্পীর পরিচয় জানা যেতে পারে।
মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে সাহসী সংবাদ ও কার্টুন প্রকাশের বড় মূল্য দিতে হয়েছিল ‘দ্য পিপল’-কে। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতেই আক্রান্ত হয় পত্রিকাটি। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বর্বর আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এর অফিস। ঘটনাস্থলেই নিহত হন পত্রিকাটির কয়েকজন কর্মচারী। পাকিস্তানি সেনারা ট্যাঙ্কের গোলা ছুড়ে এবং গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়েছিল সংবাদপত্রটিতে। মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল পত্রিকাটির অফিস। নিজ বাড়ির ছাদ থেকে নিজের সংবাদপত্রের অফিস পোড়ার অগ্নিশিখা দেখেছিলেন সম্পাদক আবিদুর রহমান।