Published : 25 Dec 2025, 02:29 PM
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে অন্যরকম এক বাংলাদেশে পা রাখলেন তারেক রহমান। ২০০৮-এর দেশত্যাগের পর ২০২৫-এর এই প্রত্যাবর্তনের মাঝখানে ঘটে গেছে অনেক কিছু। একদিকে দক্ষিণপন্থী শক্তির প্রবল উত্থান, অন্যদিকে নিজ দলের ভাবমূর্তি সংকট—এই দুই আগুনের ওপর দিয়েই এখন পথ চলতে হবে তাকে।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তারের পর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়—বা বলা যায় দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়।
তারেক রহমান ফিরেছেন আরও এক ভিন্ন মাত্রার জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। সচেতন রাজনৈতিক মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই তার দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি তখন দেশে ফেরেননি। কিছুদিন আগে বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে আবারও তার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ সামনে আসে। তবে সে সময় তিনি স্পষ্ট করে জানান, দেশে ফেরা তার একক সিদ্ধান্ত নয়, ফলে তখনও তিনি আসেননি।
একটি বিষয় স্পষ্ট—শেখ হাসিনার সরকার অপসারিত হওয়ার পরও গত প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতা বা শঙ্কার কারণে তিনি দেশে ফেরেননি। তাই প্রশ্ন উঠছে: যে প্রতিবন্ধকতা বা শঙ্কার কারণে তিনি এতদিন দেশে আসেননি, তা কি এখন দূর হয়েছে? নাকি তিনি সেই প্রতিবন্ধকতা বা শঙ্কাকে উপেক্ষা করেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? ইতিহাসে দেখা গেছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত ক্যারিশমেটিক ও সাহসী দেশনায়কোচিত রাজনৈতিক নেতারাই নিয়ে থাকেন।
তারেক সে ধরনের নেতা হয়ে উঠেছেন কিনা—তা বলার সময় এখনো আসেনি। বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুটা সময়। আগামী দিনে তারেক রহমান ও বিএনপির সামনে যে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো আসতে চলেছে, বিশেষত ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক বলয় থেকে, সেই চ্যালেঞ্জ তিনি ও তার দল কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে পারবেন—তার ওপরই নির্ভর করছে তিনি ভবিষ্যতে একজন স্টেটসম্যান হয়ে উঠবেন, নাকি অন্য সাধারণ নেতাদের মতোই গতানুগতিক রাজনীতিবিদ হিসেবে থেকে যাবেন।
১৭ বছর আগে যে বাংলাদেশে তারেক ছিলেন, আজকের বাংলাদেশ সেই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক গঠন ও মূল্যবোধে আমূল পরিবর্তিত। বাইরে থেকে তিনি বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত বা সচেতন থাকলেও, তাত্ত্বিকভাবে বোঝা আর মাঠে থেকে বাস্তবতা উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী কাজ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যে রাজনীতি তিনি সতের বছর আগে দেখেছিলেন, ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব সেই রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে।
৫ অগাস্টের পরিবর্তন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে রাজনীতির চালকের আসনে নিয়ে এসেছে। পাকিস্তান আমলেও বাংলাদেশে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি কখনোই এতটা কেন্দ্রীয় অবস্থানে যেতে পারেনি। এ ধারার বিকাশে অনেকগুলো কারণ থাকলেও আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে এর বিকাশে বিএনপির ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি তখন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি বাফার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে একসময় এই রাজনীতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে আসবে। এমনকি ৫ অগাস্টের পরও বিএনপির অনেক নেতা মনে করতেন, দক্ষিণপন্থী রাজনীতি তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে বা তারা এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন।
কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা রাষ্ট্রক্ষমতার মূল অংশীদারত্ব নিজেদের হাতে নিতে চায়। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি যে এ মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে উঠবে—তা বিএনপি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী কিংবা সুশীল সমাজের (সিভিল সোসাইটি) দূরবর্তী কল্পনারও বাইরে ছিল।
৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল, সে বিষয়ে বিএনপির নেতৃত্ব যথাযথভাবে সচেতন ছিলেন না। এই অজ্ঞতার কারণে ৫ অগাস্ট-পরবর্তী রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ও ঘটনাপ্রবাহের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বিএনপি ব্যর্থ হয়। ফলে আজ পর্যন্ত বিএনপিকে দক্ষিণপন্থীদের নির্ধারিত পদচিহ্ন অনুসরণ করেই পথ চলতে হচ্ছে এবং তাদের নির্মিত বয়ানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
দক্ষিণপন্থার রাজনীতি মোটেই একরৈখিক বা সমসত্ত্ব নয়। তাদের ভেতরে নানা ধারা, ঘরানা ও দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এর মধ্যে যারা অতি-দক্ষিণপন্থী, তারা সাংবিধানিক বা নিয়মতান্ত্রিক পথ এড়িয়ে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পক্ষপাতী। অনেকটা যেমনটি আমরা দেখেছি ১৯৭২-৭৫ সময়কালে অতি-বামপন্থী দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। অন্যদিকে মূলধারার দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মতান্ত্রিক পথে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে আগ্রহী।
তাদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে দক্ষিণপন্থী দল ও গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ—শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে নতুন পরিবেশ তাদের সামনে কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছে, সেটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর দক্ষিণপন্থীদের রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তারেকের আগমনকে তারা সেই সম্ভাবনার পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখবে, এমনটাই স্বাভাবিক। বাস্তবতা হলো, দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তারেকের দেশে ফেরাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে না। এর বাইরেও আরও কিছু মহল রয়েছে, যারা চান না যে তারেক দেশে ফিরুক। এরা সবাই সম্মিলিতভাবে, ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে, আগামী দিনে তারেকের রাজনৈতিক পথচলায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে—এটি সহজেই অনুমেয়।
৫ অগাস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই বিএনপিকে ঘিরে জনগণের মাঝে নতুন করে একটি আশা জন্মেছিল। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণের একটি বড় অংশের সেই প্রাথমিক আশা অনেকটাই ভঙ্গ হয়েছে। তারেকের রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ এখন হলো—জনগণের এই অংশের মাঝে সেই আশাকে পুনরুজ্জীবিত করা। আর এর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর তারেকের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তা করতে পারবেন কিনা—সেটি সময়ই বলে দেবে।
লন্ডনে তারেক দলের নেতাকর্মীদের বিমানবন্দরে উপস্থিত না হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, তার নির্দেশ অমান্য করে অনেক নেতাকর্মী বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছেন। তারেকের দেশে ফেরাকে ঘিরে সর্বস্তরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে উদ্দীপনা থাকলেও যারা দলের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত, তারা দলীয় প্রধানের নির্দেশ মেনে সেসব কাজ থেকে বিরত থাকবেন কিনা—এটি এখনো অনিশ্চিত।
যদি তারেক অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠ পর্যায়ের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দলকে মুক্ত করতে সক্ষম হন, তবে ৫ অগাস্টের পর বিএনপির যে ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার হবে। একইসঙ্গে এটি তারেকের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে দক্ষিণপন্থী ও বিএনপি-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো আসন্ন নির্বাচনে বিশেষভাবে সামনে আনতে চাইবে বিএনপির ২০০১-০৬ শাসনকালকে। তারা জোর দিয়ে তুলে ধরবে যে, ওই সময়ে বাংলাদেশ টানা পাঁচ বছর বিশ্বে দুর্নীতির শীর্ষস্থানে ছিল। পাশাপাশি অপারেশন ক্লিন হার্ট, র্যাবের গঠন এবং বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঘটনাগুলোও তারা প্রবলভাবে আলোচনায় আনবে।
তারেকের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—অতীতের ঘটনাগুলো তিনি কতটা পরিপক্বভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা তিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারছেন। জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে অতীতের মতো কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না।
গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজনীতি বিএনপি নির্মিত বয়ানের ওপর নির্ভর করে এগোয়নি। তাই বিএনপির রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে তারেকের সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো—বর্তমান সময়ের উপযোগী নতুন বয়ান বিনির্মাণ করা। তিনি কতটা সফলতার সঙ্গে সেই বয়ান গড়ে তুলতে পারেন, তার ওপরই আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে।
বিএনপির সামনে আসন্ন নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বহু আসনে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কোন্দল দেখা দিয়েছে, আর মনোনয়ন বঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এসব পরিস্থিতি বিএনপির সামগ্রিক নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সচেতন মহলে শঙ্কা রয়েছে—আসন্ন নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, নাকি আবারও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তারেকের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই নির্বাচনি বৈতরণী সফলভাবে অতিক্রম করার ওপর।
নির্বাচনি রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের সফলতার কোনো উল্লেখযোগ্য অতীত ইতিহাস নেই। বর্তমানে তারা রাজনীতিতে আপাতভাবে প্রভাবশালী হলেও এটি এখনো মূলধারার রাজনীতি হয়ে ওঠেনি। বাম ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতি মূলধারায় পরিণত হতে না পারার অন্যতম কারণ হলো কারিশমেটিক নেতৃত্বের অভাব। সেই প্রেক্ষাপটে তারেকের মতো একজন কারিশমেটিক নেতৃত্ব—যদিও তা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত—বিএনপিকে এই মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
তারেকের প্রত্যাবর্তন বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শুধু উৎসাহই জাগাবে না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাসও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবে—যার অভাব দীর্ঘ সময় ধরে তাদের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল।
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সন্ধিক্ষণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র—তারা কি কেবল রাজনীতিবিদ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি প্রকৃত স্টেটসম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। এ ধরনের সুযোগ সব নেতার জীবনে আসে না।
তারেক রহমান আজ সেই মহাসন্ধিক্ষণে দেশে ফিরেছেন। তার নেতৃত্বে শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় নেওয়াই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপান্তর ঘটলে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সফল মহানায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কিন্তু যদি তার রাজনীতি কেবল বিএনপির সাফল্য-ব্যর্থতার গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকে, তবে তিনি অন্য সাধারণ নেতাদের মতোই ইতিহাসে চিহ্নিত হবেন।