১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নিষেধাজ্ঞা দিলেই চলবে না, বাস্তবায়নের পথটাও বলতে হবে

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যত সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত কেন এ সংক্রান্ত আইনে বাধা দিল? প্রযুক্তি ও গোপনীয়তার দ্বন্দ্বে বাংলাদেশে এর বাস্তবায়ন কতটা চ্যালেঞ্জিং?

নিষেধাজ্ঞা দিলেই চলবে না, বাস্তবায়নের পথটাও বলতে হবে
শিশুদের সুরক্ষায় কোনো বয়সসীমা ঠিক করার আগে ওই সীমা বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, তার নিখুঁত পথ বের করা সবচেয়ে জরুরি। ছবি: এআই

জান্নাতুল রুহী জান্নাতুল রুহী

Published : 28 Aug 2026, 08:34 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগে বাধা দিয়েছে। আদালত বলেছে, প্রস্তাবিত আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে। রায়ে আরও বলা হয়, এটি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তার অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ১৫ বছরের কম বয়সীদের নির্দিষ্ট অনলাইন সেবা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে সব ব্যবহারকারীকে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদেরও বয়স প্রমাণ করতে হবে।

কিন্তু কীভাবে, কোন সীমার মধ্যে এবং কী ধরনের প্রক্রিয়ায় ওই বয়স যাচাই করা হবে, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, আদালত কিন্তু শিশুদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেনি। আপত্তি করেছে নিষেধাজ্ঞাটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, বিশেষ করে বয়স যাচাই ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করতে না পারার সংশয় থেকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটাই সহজ, তা বাস্তবে প্রয়োগ করা ঠিক ততটাই কঠিন। ধরা যাক, নিয়ম করা হলো ১৫ বছরের নিচে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর বয়স সত্যি ১৫ বছরের নিচে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে? আবার এই বয়স যাচাই করতে গিয়ে ব্যবহারকারীর কতটুকু ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হবে এবং ওই তথ্যের গোপনীয়তাই বা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, মূল জটিলতাটা আসলে তৈরি হয় ঠিক এই জায়গাটিতে।

বয়স যাচাই বনাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ থেকে দেখা যায়, বয়সসীমা কার্যকর করতে শুধু ব্যবহারকারীর দেওয়া জন্মতারিখের ওপর ভরসা করলে চলে না। একই সঙ্গে প্রয়োজন অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা। তবে অস্ট্রেলিয়া এই কাজে নির্দিষ্ট কোনো একটি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেনি। তাদের বিধানে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই কিংবা প্রযুক্তির সাহায্যে মুখাবয়ব বিশ্লেষণ করে বয়স অনুমান করার মতো একাধিক পদ্ধতির সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, কেবল নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না; কীভাবে সঠিক বয়স নিশ্চিত করা সম্ভব, ওই বাস্তব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করতে হবে।

এসব পদ্ধতির প্রত্যেকটিরই নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বয়স নিশ্চিত করতে গেলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার ছবি বিশ্লেষণ করে বয়স অনুমান করার প্রযুক্তি সব সময় শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে। সহজ কথায়, বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটি। যাচাইয়ের নিয়ম যত বেশি কড়া করা হবে, তথ্যের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটিও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ব্যবহারকারী শনাক্তের ধোঁয়াশা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্য এই ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী পথ দেখাচ্ছে। তাদের 'জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন' (জিডিপিআর)-এর আওতায় দেশভেদে ডিজিটাল সম্মতির বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারী তার পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নিজের বয়সের একটি ডিজিটাল প্রমাণ তৈরি করতে পারেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো পরিচয় প্রকাশ না করেই কেবল তিনি নির্ধারিত বয়সের যোগ্য কি না, ওই প্রমাণটুকু জমা দেওয়া যায়। এতে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহারকারীর পুরো নাম-ঠিকানা বা সুনির্দিষ্ট জন্ম তারিখ জানার প্রয়োজন পড়ে না; শুধু নির্ধারিত বয়সসীমা পার করেছেন কি না, ওটুকুই তারা নিশ্চিত হতে পারে। স্পেন, ডেনমার্ক, গ্রিস ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশ বর্তমানে এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

তবে এই ব্যবস্থার ভেতরেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ব্যবহারকারীর দেওয়া নথিটি সঠিক হলেও, যিনি ব্যবহার করছেন তিনি সত্যিই ওই ব্যক্তি কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? যেমন, একটি ১৪ বছরের শিশু যদি তার ১৭ বছরের ভাই বা মা-বাবার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বয়স প্রমাণ করে, তবে তো সমস্যা থেকেই গেল। ফলে গোপনীয়তা রক্ষার সমাধান মিললেও নথির অপব্যবহার আটকানো এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: একই ডিভাইসে একাধিক ব্যবহারকারী

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বয়স যাচাইয়ের পুরো বিষয়টি আরও অনেক বেশি জটিল। আমাদের দেশে এখনও বেশিরভাগ শিশুর নিজস্ব মোবাইল বা ল্যাপটপ নেই; তারা প্রধানত মা-বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে। ফলে কেবল ডিভাইসের মালিকের বয়স জেনেই প্রকৃত ব্যবহারকারীর বয়স অনুমান করে নেওয়া একেবারেই ভুল হবে। অর্থাৎ, এখানে কেবল বয়স যাচাই করাটাই একমাত্র কাজ নয়; ওই মুহূর্তে ডিভাইসের আসল ব্যবহারকারী কে, তা-ও চিহ্নিত করা আবশ্যক। পরিবারের একাধিক সদস্য যখন একটিমাত্র ডিভাইস ব্যবহার করেন, তখন প্রকৃত ব্যবহারকারীকে আলাদা করে চেনা শুধু কঠিনই নয়, একরকম অসম্ভব। আবার একই ডিভাইসে দিনে মা-বাবা এবং রাতে সন্তান আলাদা সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে বিষয়টি আরও প্যাঁচালো হয়ে ওঠে। কারণ ডিভাইস যার নামে নিবন্ধিত, ওই মুহূর্তে সেটি সে ব্যবহার নাও করতে পারে।

আমাদের দেশের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল জন্মসনদ ও অভিভাবকের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে বয়সের সত্যতা যাচাই করে থাকে। অর্থাৎ এখানে কোনো আনুমানিক তথ্যের বদলে সরকারি নথির ডেটা ব্যবহার করা হয়। তবে আর্থিক সেবার এই মডেল সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিকাশে একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট একটি আর্থিক সুবিধা নিতে আসেন; কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারী কেবল একটি সেবা নেন না, বরং তিনি সার্বক্ষণিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকার অনুমতি চান। ফলে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম চাপাতে গেলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের বিশাল ঝুঁকি থেকে যায়। আবার একটি ফোন পরিবারের একাধিক মানুষ ব্যবহার করায় আসল ব্যবহারকারীকে চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিকল্প ভাবনার আগে যা জানা জরুরি

বয়স নির্ধারণের কোনো নতুন ব্যবস্থা তৈরি করার আগে আমাদের মূল তিনটি ধাপ ভালোভাবে বুঝতে হবে: প্রথমত, বয়স জানার উদ্যোগ নেওয়া; দ্বিতীয়ত, ওই বয়স প্রমাণ করা; এবং শেষ ধাপ হলো, প্ল্যাটফর্মকে কেবল ওই বয়সের যোগ্যতা সম্পর্কে জানানো। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই তিনটি ধাপের কোনোটিতেই যেন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ না হয়। তাহলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

উদাহরণ হিসেবে আমাদের দেশের ভোটার নিবন্ধন ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় নতুন করে কারও বয়স যাচাই করা হয় না; বরং ভোটার তালিকায় নাম তোলার সময়েই পরিচয় ও বয়স পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও কি এমন কোনো পূর্ব-যাচাইকৃত বয়সের ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা সম্ভব? এটি প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট পরিচয় না জানিয়েই কেবল তার বয়সসীমা পার করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবে। ফলে একদিকে যেমন বয়স যাচাইয়ের কাজটি হয়ে যাবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।

কিন্তু এই পদ্ধতিও সম্পূর্ণ সংশয়মুক্ত নয়। কারণ বয়সের সনদটি আসল হলেও, তা প্রকৃত ব্যক্তিটিই ব্যবহার করছেন কি না, ওই নিশ্চয়তা কীভাবে মিলবে? বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে একটি ফোন বা কম্পিউটার পুরো পরিবার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে, সেখানে কাগজের বয়সের প্রমাণের পাশাপাশি আসল ব্যবহারকারীকে একসূত্রে মেলানোই হবে সবচেয়ে বড় সংকট।

তাই বলা যায়, ফ্রান্সের আদালত কেবল ১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আটকে দেয়নি; বরং এটি বিশ্বজুড়ে একটি পরিষ্কার বার্তাও দিয়েছে। শিশুদের সুরক্ষায় কোনো বয়সসীমা ঠিক করার আগে ওই সীমা বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, তার নিখুঁত পথ বের করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ মূল প্রশ্নটি কেবল ‘কত বছর বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা যাবে’ তা নয়; বরং ওই বয়স কীভাবে নির্ভুলভাবে যাচাই করা হবে এবং তাতে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা সুরক্ষিত থাকবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।

জান্নাতুল রুহী সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: jannatulruhi@gmail.com