Published : 04 Feb 2026, 03:56 PM
দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তি‑সমীকরণকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, কৌশলগত দ্বিধা এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে অবস্থান নেওয়া দুই দেশ—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত হঠাৎ করেই পারস্পরিক বিরোধ কমিয়ে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে এসেছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আকস্মিক ঘনিষ্ঠতা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সমঝোতার ফল নয়; বরং এটি বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ, যার কেন্দ্রে রয়েছে গণচীনের উত্থানকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। মার্কিন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ ট্যারিফ কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনবে। এই সমঝোতা কেবল বাণিজ্যিক নয়; বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ, যার কেন্দ্রে রয়েছে গণচীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আর প্রান্তিক নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের সময় ভারত ছিল জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা, যদিও বাস্তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল সুস্পষ্ট। সোভিয়েত সমর্থন ভারতের প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখত। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে, বিশেষত ২০০৫ সালের অসামরিক পারমাণবিক চুক্তির পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। তবে রাশিয়া ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে রয়ে যায় এবং ভারত তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের উত্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে তার প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে আর ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে উদ্বিগ্ন। ফলে দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য—চীনের প্রভাব সীমিত করা—যা তাদের সম্পর্ককে দ্রুত ঘনিষ্ঠ করেছে। রাশিয়া–ইউক্রেইন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া ভারতের জন্য নতুন কৌশলগত সংকট তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ভারতের জন্য আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক অংশীদার। নিরাপত্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর নির্মাণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোতে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা ইস্যুতে নানা সময়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এসেছে। ফলে বাংলাদেশকে এ তিনটি শক্তির মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জে মোকাবেলা করে চলতে হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সামনে যে পরিস্থিতি দাঁড়াবে, তা এই তিন শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার ওপরই নির্ভর করবে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চাপ থাকবে—বাংলাদেশ যেন চীনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের বন্দর ও অবকাঠামো বিনিয়োগকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখে, বিশেষত বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে। ভারতও চায় বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরেই থাকুক এবং চীনের প্রভাব সীমিত থাকুক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো—চীনকে দূরে ঠেলে দিলে উন্নয়ন প্রকল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বড় ধাক্কা লাগবে। আবার চীনকে কাছে রাখলে যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের চাপ বাড়বে। এই দ্বৈত চাপই বাংলাদেশের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
পরিস্থিতি আরও জটিল হবে কারণ আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হবে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করে, বিদেশি বিনিয়োগ কমায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে, যা উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে নতুন সরকারকে একসঙ্গে তিনটি ফ্রন্টে লড়তে হবে—অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং চীন–ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী চাপ সামলানো।
নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের বৈধতা, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর। যদি সরকার রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে সে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তবে সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের কাছে আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে চাপ বাড়াতে পারে, ভারত নিরাপত্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আর চীন অর্থনৈতিক সহায়তা ও অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নির্বাচনোত্তর সময়ে পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। বৈদেশিক ঋণ, ডলার সংকট, রপ্তানি নির্ভরতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতি চাপের মধ্যে থাকবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের শর্ত পূরণ করাও সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—চাপ সামলে কীভাবে চীনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা যায়, আবার যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। এই ভারসাম্য রক্ষাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে সরকারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তার কৌশলগত দূরদর্শিতা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার দক্ষতার ওপর।