Published : 07 Jul 2025, 12:19 AM
হুমায়ুন আজাদ উপাচার্যকে ‘উপাশ্চার্য’ বলতেন। হুমায়ুন আজাদকে নিশ্চয়ই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। উপাচার্যকে নিয়ে তার এই অভিধা নিছকই একটি শব্দচয়ন ছিল না, বরং উচ্চশিক্ষিত মানুষের চরম নৈতিক স্খলন ও সামান্য পদের জন্য তাদের আশ্চর্যরকম দালালিকে তুলে ধরতে এক তীক্ষ্ণ শ্লেষ ছিল।
এই ‘উপাশ্চার্য’ শব্দটি এমন এক করুণ বাস্তবতাকে নির্দেশ করে, যেখানে জ্ঞান ও মেধার সাধকেরা আদর্শচ্যুত হয়ে ক্ষমতার পদলেহনে ব্যস্ত হন। যে পদ একসময় বিদ্যাচর্চা ও গবেষণার সর্বোচ্চ প্রতীক ছিল, সেই পদেই যখন শিক্ষাবিদরা নিজেদের রাজনৈতিক ক্রীড়নকে পরিণত করেন, তখন তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত অধঃপতনই নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তোলে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের কার্যালয়ে কিছু শিক্ষার্থীর প্রবেশ, তাকে ঘিরে ধমকাধমকি, এবং মুখের ওপর বলা—“আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি”—এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার প্রতীক। প্রশ্ন জাগে, উপাচার্যের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে আজ আদৌ কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষাবিদ বসে আছেন, নাকি কোনো রাজনীতির অনুগত পুতুল, যাকে ছাত্রসংগঠনের ইচ্ছা ও ‘উপরমহলের’ দয়ার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়?
শিক্ষার্থীদের ওই মন্তব্যকে অনেকে ঔদ্ধত্য বললেও, এটি আসলে এক নিষ্ঠুর সত্যের স্বীকৃতি। কারণ, দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে অনেক দিন ধরে শিক্ষাগত উৎকর্ষ বা গবেষণার অবদান মুখ্য নয়—বরং রাজনৈতিক আনুগত্য, ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সখ্য, আর দলীয় মহলের মন রক্ষা করাই হয়ে উঠেছে মূল শর্ত। ফলে যোগ্য অথচ ‘অপছন্দের’ শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠছে ক্ষমতার দালান।
চট্টগ্রামে যা ঘটেছে, তা আগে ঘটেছে রাজশাহীতেও। উপাচার্যকে স্থানীয় রাজনীতিকের হাতে হেনস্তা হতে দেখা গেছে। আজ সেই চিত্রই নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, যারা একসময় এসব অনিয়ম আর হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করতেন, আজ তারাই নতুন সরকারে পদের অলঙ্কার হয়ে বসে আছেন—আর সিনেট, সিন্ডিকেটে চুপচাপ। মুখে কিছু বলেন না, কলম তোলেন না, কিন্তু পদ ও সুবিধার শপথ ঠিকই নেন।
আসলে, এই ব্যবস্থা এমনভাবে পচে গেছে যে এখন কে অপরাধী, আর কে নিরুপায়—তাও আলাদা করা যাচ্ছে না। যে উপাচার্য মবের সামনে নিজের সম্মান রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, যিনি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের ‘সরকারি প্রতিনিধি’ হিসেবে গণ্য করে তাদের নির্দেশ পালন করেন, তিনিই নিজেই তার পদকে অপমানিত করেন এবং এই চূড়ান্ত অপমান শুরু হয় ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন রাষ্ট্রক্ষমতার হাত থেকে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা জনগণের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, এবং এটিকে একচেটিয়া রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়।
এই কারণে, আজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের বড় অংশই হয়ে উঠেছেন শিক্ষাবিদ নয়, বরং দলের বশ্যতার প্রতীক। তারা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা করেন না, বরং দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীরব সহায়ক হয়ে উঠেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় তাই আর মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র নয়—এটি হয়ে উঠেছে ‘প্রশাসনিক দখলদারিত্বের একটি কেন্দ্র’।
আহমদ ছফা তার ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসে এক শিক্ষক চরিত্রের মুখে লেখেন— ‘তুই শিক্ষক না, তুই মোষ। তোরে কেউ জাবালে দিলে তুই চিবাস, কেউ ল্যাঙ মেরে উঠাইয়া দিলে তুই দুধ দিস। তুই নিজের ইচ্ছায় কিছু করিস না।’ ছফার উপন্যাসটি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে রচিত, যদিও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম নেই। শিক্ষক রাজনীতিতে বিভাজন, দলাদলি এবং ছাত্র রাজনীতিতে সহিংসতা ও নোংরামি তখন থেকেই প্রকট হতে শুরু করে। এই ব্যঙ্গোক্তি শুধু কোনো কল্পিত চরিত্রের নয় এবং উপন্যাসটির রচনাকালে যেমন ছিল, এখনও তেমনই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকের আত্মবিক্রয়ের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।
এই পথ থেকে ফেরার উপায় একটাই—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যারা উপাচার্য ছিলেন, তারাও রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণেই ওই পদটি পেয়েছিলেন। অভ্যুত্থানের পর যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারাও যে আনুগত্যের গাঁটছড়া বেঁধে এসেছেন, তা প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিতে হবে। সিনেট ও রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে এমন দিন আসবে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে বড় করে লেখা থাকবে—“এখানে সম্মানিত শিক্ষক পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় শুধু দাসত্বের ভূমিকায় অভিনয়কারী কলাকুশলী।”
যেদিন থেকে দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য ও প্রশাসনের সম্পূর্ণ কাঠামো পাল্টে ফেলার সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা আর স্বায়ত্তশাসনের কবরটিও রচিত হয়েছে। উপাচার্য পদটি, যা এক সময় ছিল বিদ্বৎসমাজে নেতৃত্বের প্রতীক, আজ সে পদই পরিণত হয়েছে হাস্যরসের বস্তুতে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তুতে। সেই কারণেই আজ এই মর্যাদাপূর্ণ পদটিকে অনেকে ‘উপাশ্চার্য’ এমনকি ‘পাপাচার্য’ বলে অভিহিত করেন কেউ কেউ—এটি শুধু রসিকতা নয়, বরং বাস্তবতার এক নির্মম ট্র্যাজেডি।
একজন শিক্ষককে তার ভাইভা বোর্ডে ঢুকে ছাত্রদের দ্বারা অপমানিত হতে হচ্ছে, এমন দৃশ্য কল্পনাও একসময় অসম্ভব ছিল। অথচ আজ তা ঘটছে দিবালোকে, ভিডিও করে ভাইরাল করে দেওয়া হচ্ছে। এই দুঃসাহস শিক্ষার্থীদের হঠাৎ করে হয়নি; বরং এই সাহস তারা পেয়েছে সেইদিন থেকেই, যেদিন উপাচার্য পদটিকে রাজনৈতিক দখলদারিত্বের প্রতীক বানানো হয়েছে—যে পদে বসতে হলে আর গবেষণার মান, একাডেমিক কৃতিত্ব কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতা লাগে না; লাগে শুধু ‘সঠিক পক্ষের’ আনুগত্য।
আমরা দেখি একজন উপাচার্যের জীবনবৃত্তান্ত ৬৯ পৃষ্ঠা কিংবা ৯৬ পৃষ্ঠার হলেও, একজন ‘বিশ্বখ্যাত স্কলার’ হিসেবেও তিনি ছাত্রদের সামনে অসহায়, নিরুপায় এবং ভীত হয়ে থাকেন। কেননা তিনি জানেন—তিনি ওই চেয়ারটি দখল করেছেন মেধা দিয়ে নয়, ‘মবের প্রভু’-র অনুমোদন নিয়ে। তার ক্ষমতা নেই ছাত্রদের রুখে দাঁড়ানোর, নেই নীতিগত বলিষ্ঠতা।
এই দাসত্ব শুধু ব্যক্তি উপাচার্যের নয়, বরং তা পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় তখন আর শিক্ষার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতার খেলাঘর, আদেশ পালন ও উপদেশ শোনার করপোরেট অফিস। যে শিক্ষকরা চুলে শ্যাম্পু মেখে ক্যাম্পাসে ঘোরেন, তারাও জানেন—আজ নয় তো কাল তিনিও হতে পারেন পরবর্তীসময়ের ‘মনোনীত জন’। আর সেই আশায় কেউ প্রতিবাদ করেন না, কেউ চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় মৌনতা পালন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশন কিংবা শিক্ষক সমিতি—এই নামগুলো শুনলে একসময় মনে হতো, তারা শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো, এসব সংগঠন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট মুখপাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকার বদল হলে তারা চুপচাপ সরে যায়, মুখে কুলুপ আঁটে। আবার সরকার সদয় হলে কিছু নমনীয়, আপসমূলক বিবৃতি দেয়। অথচ তারা ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদ করে না, মেধাবী শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি ঠেকাতে এগিয়ে আসে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না। তারা যেন শুধু পদ-পদবি আর সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখতেই ব্যস্ত, ন্যায়বোধ ও শিক্ষকসম্মান তাদের কাজের তালিকায় নেই।
আমরা স্পষ্টভাবে দাবি করি—চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত হোক, প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিচার করবে কারা? সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যারা নিজেরাই এই দখলদার রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দয়ায় পদে বসেছেন? যারা সত্য বললে নিজের চেয়ার হারাবেন, তারা আর কতটা নিরপেক্ষভাবে বিচার করবেন?
এই পচা ও অনৈতিক অবস্থার অবসান চাইলে, একমাত্র পথ হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনা। উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একেবারে বন্ধ করতে হবে। সিনেট এবং রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের সরাসরি ভোটে উপাচার্য নির্বাচনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুসারে যে নির্বাচনপদ্ধতি ছিল, সেটিই ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের জরুরি দাবি।
কারণ, এই নষ্ট ও দখলদার সংস্কৃতি দিয়ে কখনোই মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। যারা ভাবেন, এই পচে যাওয়া কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠবে গবেষণার কেন্দ্র, বিশ্বমানের উদ্ভাবনের স্থান—তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এই অবক্ষয়কে এখনই থামানো না গেলে, সামনে শিক্ষকতা হবে দেশের সবচেয়ে অপমানজনক, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপন্ন পেশাগুলোর একটি।
শিক্ষকদের সম্মান, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং সর্বোপরি মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে হলে এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটাতে হবে। আমরা যারা ন্যায়, বিবেক আর সত্যে বিশ্বাস করি, আমাদের এখনই একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতে হবে। নইলে ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে কেবলমাত্র ক্ষমতার দালান আর ভীতু নিযুক্তদের নির্বাক আসন।
সম্মান যদি সত্যিই রক্ষা করতে চাই—লড়াইটা এখান থেকেই শুরু করতে হবে। এখন নয়, তো কখন? এরই মধ্যে যথেষ্ট বিলম্ব ঘটে গেছে।