Published : 28 Jul 2025, 09:27 AM
দুর্ঘটনা মানেই একেবারে অপ্রত্যাশিত, অকল্পনীয় ও আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা। এটি পূর্বাভাস দিয়ে আসে না, তাই তার আকস্মিকতা মানুষকে চরম সংকট ও গভীর শোকে নিমজ্জিত করে। এমন মুহূর্তে মানুষ প্রায়শই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা যত বেশি হয়, মানুষের ভেতরের ভাঙন তত গভীর হয়—তারা হতচকিত হয়, দিশেহারা হয়ে পড়ে, শোকগ্রস্ত হয়, এমনকি অনেক সময় ক্ষোভে ফেটে পড়ে বা মানসিক ভারসাম্য হারায়। এটাই হলো সাধারণ মানুষের গড়পড়তা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই—তারা প্রস্তুত থাকেন বিচক্ষণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের মনকে নাড়া দিয়েছে। বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। দুর্ঘটনার সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণের ফলে এর বিভিন্ন ধাতব অংশ জ্বলন্ত অবস্থায় ছিটকে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। জেট ফুয়েলের তীব্র দাহ্যতা মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে দেয় দুটি শ্রেণিকক্ষে, যেখানে কোচিং করবে বলে অপেক্ষা করছিল একদল শিশু ও কিশোর। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের অনেকে হতাহত হন।
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমান বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নিকটস্থ বিমানবন্দর অল্প সময়ের জন্যই হলেও আঁচ করতে পেরেছিলেন। তবে ঠিক কোথায় বিধ্বস্ত হতে চলেছে, তা সময়মতো নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে কর্তৃপক্ষের হাতে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না। তবুও খুব অল্প ক্ষণে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফায়ার ব্রিগেড অকুস্থলে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে—তাদের আন্তরিক ও প্রাণপণ চেষ্টায় কোনো ত্রুটি ছিল না।
তবুও দুর্ঘটনার পর ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবাদ-প্রদর্শন, অস্থিরতা ও সহিংসতায় উদ্ধারকাজ কয়েকবার বিঘ্নিত হয়। দুর্ঘটনাস্থল ছাড়িয়ে গোটা শহরে তীব্র উত্তেজনা ও অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার ব্রিগেড, দুর্ঘটনাকবলিত মাইলস্টোন স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী, ঘটনাস্থলে থাকা অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এতসব চেষ্টা সত্ত্বেও জনসাধারণের মধ্যে যে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে—এবং এখনও দেখা দিচ্ছে—তার পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে।
উদ্ধার প্রচেষ্টার সমান্তরালে খুব প্রয়োজন ছিল সমন্বিত একটা ব্যবস্থাপনার। যা পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। জরুরি ভিত্তিতে অকুস্থলে একটি তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল, যেখানে ঘটনার সর্বশেষ আপডেট, আহতদের তালিকা ও চিকিৎসার তথ্য পাওয়া যেত। একইসঙ্গে জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য সকল হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার সঙ্গে একটি কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা দরকার ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দ্রুত শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া উচিত ছিল। এই ব্যবস্থাগুলো না থাকায় উদ্ধার তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের বিস্তার।
দুর্ঘটনা, তা যাই হোক না কেন, একে দুর্ঘটনাই বলা হয়—এটা যে কোনো সময়, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঘটতে পারে। বিমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও সেই অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। বিধ্বস্ত হওয়া প্রশিক্ষণ বিমানটির একমাত্র বৈমানিক ছিলেন এক মেধাবী কর্মকর্তা, যিনি পেশাগত জীবনে সুনাম অর্জন করেছিলেন এবং আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করছিলেন।
২০১২–১৩ সালে কেনা এই প্রশিক্ষণ বিমানের কার্যকর ব্যবহারের মেয়াদ ছিল প্রায় ৩০ বছর। দুর্ঘটনার সময় তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন বিমানটিকে রক্ষা করার এবং জনবহুল এলাকা এড়িয়ে নিরাপদ কোথাও নামিয়ে আনার। কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় অনেক দেরিতে তিনি বাধ্য হয়ে ইজেক্ট করেন, অর্থাৎ বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে বিমান থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ততক্ষণে সময় পেরিয়ে গেছে—দেশের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনও রক্ষা করতে পারেননি।
বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ ধরনের প্রশিক্ষণ বিমানে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে পাইলট অনেক সময় বিশেষ আসন প্রযুক্তির (ইজেকশন সিট) মাধ্যমে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচতে পারেন না। বিশেষ করে এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট সামরিক প্রশিক্ষণ বিমানে এমন ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, এতে ইঞ্জিনে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকে না। একবার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে পাইলটের হাতে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে এমন বিমানে নিরাপদ অবতরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাই দ্রুত বিমানকে সামনের দিকে এগিয়ে লোকালয় ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি খোলা জায়গাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা একটুর জন্য তাকে সফল হতে দেয়নি। অনেক উচ্চতায় না থাকলে নোওজ ডাইভ দিয়ে ভূমিতে পতিত হবার আগে খুব একটা সময়ও পায় না পাইলট। উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই ইঞ্জিন বিকল হয়েছে যেহেতু, এক্ষেত্রে সময় ছিল খুবই কম, আনুমানিক ১৫-২০ সেকেণ্ড মাত্র। বিমান যদি ৩০০ ফুট উচ্চতার মধ্যে নেমে আসে তাহলে সিট ইজেক্ট করে প্যারাসুট খোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না, থাকলেও ইজেকশনের ফলে ২ সেকেণ্ডের মধ্যে ১০০ মিটার দূরে ছিটকে দেওয়ার যে গতি থাকে তাতে কোনোভাবে প্যারাসুট খোলার সৌভাগ্য জুটলেও মেরুদণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পাইলটের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বলতে গেলে শূন্যের কোটায় থাকে। ঠিক এমনটাই ঘটার পরে মাইলস্টোনেরই পাশের আরেক অংশে টিনের ছাউনি ভেঙে দুর্ঘটনা কবলিত পাইলট পড়ে ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তাই উদ্ধারও হয়েছেন এক ঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় পরে।
ঘটনার ভয়াবহতা বা গতি-প্রকৃতি আমরা এখন আর আলাপ-ব্যবচ্ছেদে পাল্টে দিতে পারব না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর যা কিছু করণীয়, তা যথাসাধ্য ঠিক করার চেষ্টা আমাদের অবশ্যই থাকা উচিত—যদি সত্যিই আমাদের মধ্যে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকে। দুর্ঘটনার শিকারদের জন্য জরুরি চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরাসরি সরকারের। এসব ক্ষেত্রে ধীর গতি কিংবা দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনার পর উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে—১. নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে; এক মিনিট নিরবতা পালন ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। ২. নিহতদের পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩. নিহত দুই শিক্ষককে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ৪. সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষ শীর্ষজনদের মাধ্যমে জনসাধারণকে এর জন্য তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছিল। পরে অবশ্য সেটি প্রত্যাহারও করে।
ক্ষতিপূরণ আর পরলৌকিকতাতেই কি এদেশে জীবনের সবটুকু সীমাবদ্ধ? শোক প্রকাশই শুধু আমাদের জীবনের নিয়ামক?
দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, কেন ঘটল, কতজন প্রাণ হারাল, কতজন আহত হয়েছে, কতজন এখনও নিখোঁজ—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর জানানো রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক দায়িত্ব। নিখোঁজদের সন্ধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারীদের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ থেকে কীভাবে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট এবং জনসমক্ষে ঘোষিত একটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
নিখোঁজদের তালিকা করে, ডিএনএ মিলিয়ে শনাক্ত করার জন্য স্বচ্ছ ও দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শোকস্তব্ধ পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদের এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করে তা অভিভাবক ও স্কুল প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এসব গৎবাঁধা হলেও একান্ত আবশ্যক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনে দেরি, অগোছালো আচরণ বা স্বচ্ছতার ঘাটতি নতুন করে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
জীবনের ক্ষতি কখনোই কোনো সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না—তার জন্য ক্ষতিপূরণও কখনো যথেষ্ট হয় না। তবুও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির একটি আনুষ্ঠানিক হিসাব, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী দ্রুত বরাদ্দ দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি মাইলস্টোন স্কুলের চলমান বোর্ড পরীক্ষা নিয়েও দ্রুত, যুক্তিসঙ্গত ও মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি ছিল।
ভয়াবহ বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির এই অভিজ্ঞতা শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের মনে যে ভয়, আঘাত এবং মানসিক ধাক্কা তৈরি করেছে—তা সহজে কাটিয়ে ওঠার নয়। শুধু তারাই নয়, তাদের পরিবার এবং স্কুল কর্তৃপক্ষও এই মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তাদের জন্য দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত ছিল—যা এখনও দেখা যায়নি।
আমরা বুঝি—অভিজ্ঞতার অভাব থাকতেই পারে, তার ফলে কিছু ভুলভ্রান্তিও ঘটতে পারে। কিন্তু কোনো উদ্যোগ না থাকাটা কোনোভাবেই মানা যায় না। প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য বিশেষজ্ঞ হতে না পারলেও অন্তত একটি উদ্যোগ, একটি পরিকল্পনার চেষ্টার মধ্য দিয়েই শুরু হওয়া উচিত। বাস্তবায়নের পথে হাঁটলে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের অনেকেই হয়তো স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।
গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেওয়া এই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত ক্ষতি অপরিমেয়, আরো সময় লাগবে আমাদের কাছে তা স্পষ্ট হতে—এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করা যাবে। তবে এখনই একটি বিষয় নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে: এমন ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শূন্য—না সরকারের পর্যায়ে, না জনগণের মধ্যে।
হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবে সত্যি—অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন, সাহায্যের অবারিত হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি নানা পক্ষকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। পাশাপাশি যত রকম অভিযোগ বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে অতি-উৎসাহী জনতার নানাবিধ উদ্ভট আচরণ নিয়ে–তার সবই ভিত্তিহীন নয়। বরং এসবের পেছনে কারণ রয়েছে—কারণ হচ্ছে, আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো, পূর্বপরিকল্পনা বা বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তুতি নেই।
এই প্রসঙ্গে পৃথিবীর দুটি দেশের উদাহরণ দিলে স্পষ্ট বোঝা যাবে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকলে এমন সংকটও অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হতে পারে।
উদাহরণ ১: সুইডেনে একবার বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় বিকট শব্দে এক মুরগির খামারের মুরগিগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। খামার মালিক মুরগিগুলোকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক বলেন, বিকট শব্দের কারণেই ওরা এমন করছে। খামারের মালিক বিমানবাহিনীর নামে মামলা করে দিলে সুইডেনের বিমাননবাহিনী তাকে ক্ষতিপূরণ দেয় ও ক্ষমা চায়।
এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়—যে রাষ্ট্র শুধু মানুষের ক্ষতির প্রতিকারে নয়, প্রাণীসম্পদের ক্ষতির দায়ও স্বীকার করে নেয় এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়, সে রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীল ও নাগরিকমুখী। আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করার জায়গা এখানেই।
উদাহরণ ২: জাপানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আন্ডারগ্র্যাড পর্যায়ের, রাতে তার ৫০ সিসি বাইক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এক সময় রাস্তায় একটি মোড় ঘোরার সময় বিপরীত দিক থেকে আরেকটি ট্রাকও মোড় ঘুরছিল। হঠাৎ করেই সেই ছাত্রটি ট্রাকের পেছনের চাকার নিচে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।
তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ বললেন, এই জন্য ওনারাই দায়ী, কেননা ওনারা যথেষ্ট সতর্কবাণী দেননি। মা-বাবা বলছেন ওনারা দায়ী, রাতের বেলা ছেলেকে বাইরে পাঠানো তাদের ঠিক হয়নি। পুলিশ কর্তৃপক্ষ বললেন, নিশ্চয়ই লাইসেন্স দেওয়ার সময় যথেষ্ট প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করেই লাইসেন্স দিয়েছিলেন, তাই ওনারা দায়ী। পৌর কর্তৃপক্ষ বললেন, রাস্তার বাতি যথেষ্ট আলোকিত ছিল না, তাই ওনারাই দায়ী।
পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে কলেজে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হলো। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পুলিশ, পৌরসভার প্রতিনিধি এবং নিহত ছাত্রের মা-বাবা সবাই সেই আলোচনায় যোগ দিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত রিপোর্ট তুলে ধরা হলো, ছবির মাধ্যমে পুরো ঘটনা বোঝানো হলো। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেখা গেল ছাত্রটি যদি থেমে যেতেন, তাহলে হয়তো বাঁচতে পারতেন। কিন্তু তিনি গতি কমাননি, ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকের পেছনের চাকার নিচে চলে যান।
তবে এত কিছুর পরেও দায়-দায়িত্ব নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক হয়নি। বরং কলেজের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হলো—সবাই মিলে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো হলো, দুর্ঘটনাবিষয়ক সচেতনতামূলক পোস্টার তৈরি করে জমা দিতে। সেরা পোস্টারটি কলেজের মূল ফটকে টানা চার মাস ঝুলিয়ে রাখা হলো।
এছাড়া, পুলিশের পক্ষ থেকে কলেজের বাইকচালক শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তারা কীভাবে নিরাপদে মোড় ঘুরতে হয়—তা হাতে-কলমে বারবার করে দেখিয়ে দিলেন।
জাপানেরই আরেক ঘটনায় ভালো রাস্তায় স্বাভাবিক গতিতে বাইক চালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বাইক বা মানুষ কারোই কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, রুটিনমাফিক পুলিশকে জানাতেই হলো। পুলিশ ও বীমা কোম্পানি যৌথভাবে দুর্ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে দেখল যে ওই জায়গায় রাস্তা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে একটু বেশি উঁচুনিচু। কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও রাস্তা এমনটা খানিক বেশি উঁচুনিচু হয়ে থাকার দায় সরকারের, তাই সরকার তাকে এক লাখ ইয়েন ক্ষতিপূরণ দিল।
মাইলস্টনের দুর্ঘটনা থেকে আমাদের চোখ খুলে যাওয়ার কথা। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন—দেশজুড়ে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিংমলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল বাধ্যতামূলক করা উচিত। এর পাশাপাশি, দুর্ঘটনার সময় কে কী করবে, কোথায় যাবে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে—এসব বিষয়েও আগেভাগেই সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।
পরিস্থিতি এবং অবস্থানগত দোষ-ত্রুটি বিবেচনায় স্কুল সরবে নাকি বিমানবন্দর সরবে, সামরিক বিমানের প্রশিক্ষণ তাহলে কোথায় হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত আলোচনা করতে হবে।
হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় আরও দ্রুত ও সহজ করার উপায় কী হতে পারে, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।
আরও কিছু বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া যায়—যেমন, সব ছাত্রছাত্রীর পরিচয়পত্রে রক্তের গ্রুপ ও মা-বাবার যোগাযোগ নম্বর থাকা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে বা ক্লাউডে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে বিপদের সময় দ্রুত কাজে লাগে।
এসব নিয়ে এখনই আলোচনা হওয়া দরকার—গোলটেবিল বৈঠক, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তব পদক্ষেপ—সবই জরুরি। নিহতদের তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবে যারা বেঁচে আছে, তাদের সেবা নিশ্চিত করা চিকিৎসকদের দায়িত্ব, আর তাদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের। এখনো সময় আছে—সাহসিকতা, সমন্বয় আর সদিচ্ছা থাকলেই এই ঘটনার পর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব। সেটাই হওয়া উচিত আমাদের পরবর্তী কাজ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো দুর্যোগের সঙ্গে পরিচিত। তবে গত বছরের নজিরবিহীন বন্যা আমাদের সামনে দুর্যোগের এক নতুন চেহারা তুলে ধরেছে। এদেশে বড় রকমের ভূমিকম্প ঘটার আশঙ্কাও দিনে দিনে প্রবলতর হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক কিংবা দুর্ঘটনাজনিত যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় চাই সুপরিকল্পিত, শক্তিশালী ও সমন্বিত প্রস্তুতি।
এইসব বিবেচনায় প্রাকৃতিক এবং দুর্ঘটনাজনিত সকল প্রকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বিশাল রকম প্রস্তুতি প্রয়োজন। এর জন্য জরুরি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে—পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, জনসচেতনতা, উদ্ধার ও পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দক্ষ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এজন্য সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় বিবেচনায় সব ধরনের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটা দুর্যোগ মোকাবেলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ভীষণ জরুরি। সরকারের উচিত অবিলম্বে প্রাজ্ঞজনদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা, যারা মাইলস্টোন দুর্ঘটনার তদন্ত করবে এবং ভবিষ্যতের যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা দেবে। এ কমিটিকে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, মানুষ ও মনোবল—সব দিকেই প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হোক।
যথাযথ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন অত্যাবশ্যক। তথ্যকেন্দ্র থেকে আহত ও নিহতদের সঠিক তথ্য একত্র করে দ্রুততার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। জনগণকে তা অবহিত করে স্বস্তি দেওয়াও জরুরি।
হতাহতদের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক পুনর্বাসনের জন্য অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপই পারে উদ্ভূত যাবতীয় অভিযোগ এবং ক্ষোভ ও বিক্ষোভ প্রশমিত করতে।
দেশ এমনিতেই একটি অস্থির ও রাজনৈতিকভাবে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এরকম হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা যদি যথাযথভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তবে তা জন-অসন্তোষকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল, প্রশ্নবিদ্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।