রাজনীতির প্রতি ঘৃণা ও ঘৃণার রাজনীতি: প্রসঙ্গ বুয়েট

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বলে দিয়েছেন, যতক্ষণ না কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির বদল ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আজকের দিনের ছাত্র রাজনীতির সংকট কাটবে না। কিন্তু, তাদেরও পক্ষ-বিপক্ষ ঠিক করতে পারা লাগবে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দায় সমগ্র ছাত্র রাজনীতির ওপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়।

সৌমিত জয়দ্বীপসৌমিত জয়দ্বীপ
Published : 1 April 2024, 11:00 AM
Updated : 1 April 2024, 11:00 AM

‘আই হেইট পলিটিক্স’ একটা আপাত নিরীহ, কিন্তু প্রবল প্রতাপশালী প্রপঞ্চ বা টার্ম। চলমান একুশ শতকের গত দশকের গোড়া থেকে তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উন্মেষ ও উত্থানের সময় থেকে প্রপঞ্চটি নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে হাজির হয়েছে সারা দুনিয়াতে। বাংলাদেশেও। এই প্রপঞ্চের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ছাত্র রাজনীতিতে। ফলে, বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতি তার স্বতঃস্ফূর্ত আবেদন হারিয়েছে তরুণদের মাঝে৷

আশ্চর্যই বটে, 'আই হেইট পলিটিক্স' নামক একটা তথাকথিত লিবারেল 'বিকল্প রাজনীতি' ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতিকে নাকচ করে দেয়ার শক্তি পেয়ে গেল সুধীজন সমাজ থেকে এবং বাঘা বাঘা কর্পোরেটরা হয়ে উঠল এই বিরাজনীতিকরণের আবছায়া পৃষ্ঠপোষক। সমাজ-রাষ্ট্র, দিন-দুনিয়া বদলাতে হবে, সত্য। কিন্তু, সেজন্য রাজনীতির আর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগের— ইয়েস গ্রুপ, নো গ্রুপ, ক্যারিয়ার ক্লাব ইত্যাদির। পুঁজিবাদের আগ্রাসনকে প্রশ্নহীন মেনে নিয়ে জাতীয়তাবাদী হতে হবে, দেশপ্রেমিক হতে হবে, কিন্তু রাজনীতিমুক্ত থাকতে হবে! এর আরও আগে, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নতুন সংকট হয়ে দাঁড়াল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, যে রাজনীতিকে বাংলাদেশে ঠাঁই দেয়া হবে না বলেই সর্বজনীন ধারণা তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই। কিন্তু, ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসনকেও প্রশ্নহীন রেখে দেয়া হলো এবং দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদী চেতনাকে রাজনীতিমুক্ত রোমান্টিকতা হিসেবে দেখতে চাওয়ার অভিপ্রায়টিই জয়যুক্ত হতে থাকল।

বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি এই 'রাজনীতিমুক্ত' হওয়ার সামাজিক যে চাপ ও চ্যালেঞ্জ, তার মুখোমুখি হয়ে পড়ল। কিন্তু, তাতে ক্ষতি হলো বিশেষত ছাত্র আন্দোলনের। আর এই কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটা লাগাতার দিতে থাকল রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর লাঠিয়াল ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশে সরকারি ছাত্র সংগঠনগুলোর বেনজির সন্ত্রাস, নিপীড়ন-নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, বিরোধীদের দমন, ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, হলগুলোকে টর্চারসেলে পরিণত করাসহ অমানবিক-অগণতান্ত্রিক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম তথা কর্তৃত্ববাদী আস্ফালন শিক্ষাঙ্গনকে এতটাই অচলায়তনে পরিণত করতে থাকল যে, সম্ভবত একপ্রকার বাধ্য হয়ে তরুণরা 'আই হেইট পলিটিক্সে'র ছায়াতলে আপাত 'নিরাপদ' আশ্রয় খুঁজতে থাকল।

২.
এই 'আই হেইট পলিটিক্স' স্বভাবতই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারেনি। কারণ, স্টেইট পাওয়ার ডাইনামিকসের কল্যাণে এরা লাঠিয়াল হিসেবে বেহাল তবিয়তে নিজেদের দাপুটে অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী বদভ্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে গেছে। ফলে, তাদের মিছিলে-শোডাউনে জোরপূর্বক ধরে আনা গড্ডলদের সংখ্যা 'আই হেইট পলিটিক্সে'র জয়জয়কারের যুগেও আশ্চর্যজনকভাবে অনেক বেশি। এরা যদি হলগুলোকে টর্চারসেল বানানো বন্ধ করে, হলের সিটবাণিজ্য বন্ধ করে, কিংবা যা যা করলে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ থাকবে, তা তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের স্বার্থে করে, দেখা যাবে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার জন্য শিক্ষার্থীর অভাব হবে না। রাজনীতির সৌন্দর্য গণতান্ত্রিক চর্চা। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলোতে গেলে মনে হবে একেকটা যেন 'হিটলারি কনসেনট্রেশান ক্যাম্প'!

সমীকরণ মেলালে দেখা যাবে, 'আই হেইট পলিটিক্স' ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন মিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে ছাত্র আন্দোলনের আর বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর। বাম-ডান সবার৷ ডানপন্থিদের সংকট কম— নানা ফ্রন্টে লড়াই করার এজেন্ডা তাদের নেই। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা এসবের ধারও তাদের ধারতে হয় না। জাগতিকতায় তারা আছে নানা বৈষয়িকতার মধ্য দিয়ে, শিক্ষা-ব্যবসা তো আছেই। এরা শেষতক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থারই এজেন্সি। রেজিম ব্যাটে-বলে মিলে গেলে এদের সুখসমৃদ্ধিও ঘটতে বাধ্য!

বামপন্থীরাই সবচেয়ে সংকটে আছে। তাদের এজেন্ডা ও ইস্যুর শেষ নেই। শত ফ্রন্টে শত লড়াই। কত কত ইস্যু৷ মুক্তিযুদ্ধের চেতনারক্ষা থেকে সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-পুঁজিবাদবিরোধী লড়াই, অন্ত নেই৷ জাগতিকতা ও অবৈষয়িকতা তাদের জীবনাদর্শ। কিন্তু, পুঁজি ও পরজাগতিকতার দাপটের যুগে সে জীবনাদর্শকে আপন ভাবার মতো তারুণ্য হাতে গোনা যায়। লড়াইটা আছে, কিন্তু ষাট-আশির দশকের বাস্তবতায় নেই। সংখ্যাধিক্য কখনও কখনও গুণগত উন্নতি ঘটায় হয়তো। কিন্তু সংখ্যাধিক্য তো ক্রমশ নিম্নগামীই, উপরন্তু বামপন্থায় গুণগত রাজনৈতিক চিন্তাশক্তিরও দৈন্য শুরু হয়েছে। ফলে, 'আই হেইট পলিটিক্স' ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দাপটের যুগে বামপন্থার কাউন্টার স্মার্টনেস কম, নতুন ন্যারেটিভ তৈরির সামর্থ্যও কমে যাচ্ছে। অবস্থা 'ওয়েটিং ফর গডো'র মতো!

৩.
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী বিক্ষোভ কি শুধুই ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে? না, তারা সম্পূর্ণভাবেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে, ছাত্রলীগকে তারা উসিলা হিসাবে দেখাচ্ছেন। বুয়েটের বিক্ষোভকারীরা কি শুধুই ডানপন্থায় বিশ্বাসী? সম্ভবত, না। ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে, তাদের অধিকাংশই রাজনীতি ঘৃণা করেন। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি ঘৃণিত হয়েছে বিভিন্ন রেজিমের ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্তৃত্ববাদী অপরাজনীতির কারণে, যে অপরাজনীতিটিও মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করার মধ্য দিয়েই সূচিত হয়েছে। অথচ, পুরো কোপটা গিয়ে পড়ছে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের ওপর। ক্ষমতাসীনরা কি এই দায় এড়াতে পারে?

সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এমনটা ঘটল। রাজনীতি ঘৃণাকারীরা রাস্তায় নেমে সম্মিলিত স্বরে জানান দিলেন তারা কতটা রাজনীতিবিরোধী! সন্দেহাতীতভাবেই এটাও একটা রাজনীতিই এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা-অভিজ্ঞতা না থাকলে কেউ এতো বড় বিক্ষোভ তৈরি করতে পারেন না। ফলে, রাজনীতিবিরোধিতার রাজনীতিটিও একটু বোঝা দরকার। পক্ষ-বিপক্ষ, স্বার্থ-পরার্থ সবই বোঝা দরকার। রাজনীতিবিরোধিতা একটা অ্যাবসার্ড বিষয়। মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক প্রাণী, কথাটা বলেছিলেন অ্যারিস্টটল। কিন্তু, আজকের দিনের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সেসব জানার বালাই নেই। 'জেনারেল এডুকেশন' থেকে বহুদূরে তাদের অবস্থান। ফলে, যতই দেশসেরা মেধাবী হোক, সমাজ-রাজনীতির পাঠ তাদের একাডেমিক কারণেই কম থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এই সুযোগটা কাউন্টার রাজনীতি নিতে চাইবে, এ আর আশ্চর্য কী! বিশেষত বিজ্ঞান ও ধর্মের ব্যাখ্যাতীত মণিকাঞ্চনযোগ গড়ে তোলার রসদ যখন সমাজ থেকেই তারা পেয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার একটা প্রকল্প ছিল ইউজিসির উচ্চশিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্রে, যেটার মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। এই প্রেসক্রিপশনের কারণে ছাত্র সংসদের অকার্যকর থাকা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণবিরোধী প্রশাসনগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন না দিতে পারলে তো সুখবোধ করেই। আজকের ছাত্র রাজনীতি আগামীর জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি, সত্য। ছাত্র সংসদ থাকলে যাওবা সম্ভাবনা ছিল, সেটাও নষ্ট করা হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকলে, ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকাও যা, কার্যসিদ্ধ থাকাও তা!

বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি শুধু বুয়েটে না, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই নিষিদ্ধ। কেন নিষিদ্ধ, তার স্পষ্ট উত্তর— ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ও তার কর্তৃত্ববাদী কার্যকলাপ। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি থাকা উচিত ক্যাম্পাসগুলোতে? নিশ্চয়ই থাকা উচিত, এটা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। অবশ্য এরই মধ্যে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ২০১৯ সালে জারি করা বিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছে হাই কোর্ট। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা জনগণের টাকায় পড়ে। জনগণ রাজনৈতিক চরিত্র। জনগণ টাকা দেয় রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের সেই টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ও খরচ করে সরকার৷ সরকার একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বুয়েটের ভিসি ও উচ্চ পদধারীদের নিয়োগ দেয় সরকার। তাহলে বুয়েট কি রাজনৈতিক নীতিচিন্তার বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান? না। রাজনীতির সঙ্গে টক্কর দিয়ে বিরাজনৈতিক হওয়া যায়, সত্য। কিন্তু, সমস্ত সুযোগ-সুবিধা যখন রাজনৈতিক, তখন রাজনীতি নিষিদ্ধের স্লোগানটাকেও অরাজনৈতিক কিংবা বিরাজনৈতিক বলা যায় না। আবার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বুয়েট ক্যাম্পাসে কেন উচ্চারণ করা যাচ্ছে না, কারা করতে দিচ্ছে না এবং তার সঙ্গে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না-করার কী সম্পর্ক, সবগুলোকেই মিলিয়ে পাঠ করতে হবে, কেননা এ বিষয়গুলোও ভীষণরকম রাজনৈতিক। যথেষ্ট মাঠপর্যায়ের বাস্তব-অভিজ্ঞ তথ্য না থাকায়, আমরা সেদিকে আপাতত যাচ্ছি না। তবে, এটুকু সত্য স্বীকার করে নেয়া ভালো যে, বুয়েটের নাম জড়িয়ে এসব গুঞ্জন শুনতে পাওয়া খুব ভালো লক্ষণ নয়।

ভালো লক্ষণ কি এটাও যে, সরকারি ছাত্র সংগঠনের ‘কর্মসূচি’র বিরোধিতা করতে গিয়ে সমস্ত নিয়মনিষ্ঠ রাজনীতির বিরোধিতা করছেন দেশের সেরা মেধাবীরা? এ বড় আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক। কিন্তু, ঠিক কেন তারা এ পথে নামলেন, সেই পটভূমি বিবেচনা না করলেও বিপদ আসন্ন। আবরার হত্যাই কি সেই পটভূমি? না।

এই পটভূমি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই রচিত হয়েছে, যার সর্বশেষ সংস্করণ আবরার হত্যাকাণ্ড। অথচ, তার আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই খুন হয়েছেন। শুধু গত দশকেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর (২০১০) খুন হয়েছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে খুন হয়েছেন নিরাপরাধ বিশ্বজিৎ ঘোষ (২০১১), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়েছেন জুবায়ের আহমেদ (২০১২) এবং আরও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অন্তর্কোন্দলে কখনও নিজেদের কর্মীরা, কখনও সাধারণ কেউ খুন হয়েছেন। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা তখনও তোলা হয়েছে সুধীজন সমাজ থেকে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার পথ বেছে নেয়নি। ব্যতিক্রম-পথে হেঁটেছে শুধু বুয়েট প্রশাসন। এর পেছনে বড় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরাই, কেননা তারা তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছিলেন, এর আগের হত্যাকাণ্ডগুলোতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যা কখনই চাননি। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সেদিনের চাওয়ার পেছনে 'আই হেইট পলিটিক্সে'র প্রবল প্রভাব তো অবশ্যই আছে, এখনকার শিক্ষার্থীরা সেই ধারাবাহিকতাটাই রক্ষা করে চলেছেন।

একই সঙ্গে, বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও কিছু পরিবর্তন বিগত দশকে সূচিত হয়েছে। বুয়েট বাংলাদেশের ‘ব্রেইন ড্রেইনে’র সবচেয়ে বড় উদাহরণ, তাদের তৈরি করা অধিকাংশ মেধাই দেশের বাইরে চলে যায় (বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার নিশ্চয়ই কারণও আছে), দেশের নানা প্রয়োজনীয় জায়গায় এই মেধা কাজে লাগানো যায় না (যেমন: বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের জন্য আজও কোনো বিশেষায়িত বিভাগ বুয়েট খুলতে পারেনি এতদিনেও)। কিন্তু, বিগত কয়েক বছর ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিসিএস জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা শুরু হয়ে গেছে এবং বিসিএসেও তারা মেধাতালিকায় স্থান করে নিচ্ছেন। ব্রেইন ড্রেইন ও বিসিএস— এ দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী জ্ঞানের অভিযোজন নিয়ে টিকে আছে। একাডেমিক প্রয়োজনে বিদেশে যেতে হলে, নিশ্চয়ই বিষয়ভিত্তিক লব্ধজ্ঞান উচ্চমানের হতে হয়, বুয়েটের শিক্ষার্থীদের তা বিলক্ষণ আছে। অথচ, বিসিএসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের তেমন একটা কার্যকরণ নেই। তবুও, বিপরীতমুখী এ দুটি স্রোত শ্রেণিস্বার্থে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, কেননা এসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ ঝামেলাবিহীন শেষ করতে পারলে, ক্যারিয়ার যেখানে ‘চমৎকার আভিজাত্যপূর্ণ’ এক ভবিষ্যতের হাতছানি দিচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক বোধ ও কর্মসূচিকে থোড়াই কেয়ার করা আজকের দুনিয়ায় পদ্ধতিগতভাবেই জায়েজ হয়ে গেছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এই আত্মবিশ্বাস থেকেই সম্ভবত ‘আই হেইট পলিটিক্স’কে রাস্তার আন্দোলনে রূপান্তরিত করার সিংহ-সাহস দেখিয়েছেন।

৪.
বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন— ৫০ বছরে যত বাঁক বদল, তার সবই হয়েছে ছাত্র আন্দোলনের কল্যাণে। এ সত্য এড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসই লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা এই গৌরবের কথা উল্লেখ করে বুয়েটের বিক্ষোভকারীদের বিপক্ষে দাঁড়ানোকে শ্রেয় মনে করছেন, তারা বোধহয় কয়েকটা সত্যকে অস্বীকার করতে চাইছেন, এগুলো হলো: কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির যুগে বিরাজনীতিকরণের প্রভাব, নব্বই-পরবর্তী তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্র রাজনীতির মানের স্খলন এবং রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে চাওয়ার সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার অভাব।

বস্তুত, যখন গণতন্ত্র সংকটে থাকবে, তখন অগণতান্ত্রিক চর্চার প্রাদুর্ভাব বাড়বে এবং একটা পক্ষ খুবই কর্তৃত্ববাদী ও দাপুটে হয়ে যাবে। এই কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে কিংবা না নিয়ে আরেকটা পক্ষ চুপ করে থাকবে। চুপ থাকাটা যখন সংস্কৃতিতে পরিণত হবে, তখন বিরাজনীতিকরণ চমৎকার ঠাঁই পেয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। সেটা ব্যক্তিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক সব পরিসরেই। যখন আপনি কথা তুলতে পারবেন না, কিংবা কথা তুলতে পারলেও সে কথাকে গুরুত্ব দেয়া হবে না, কিংবা দমিত হবেন, তখন না-কথা বলাটাই শ্রেয় জ্ঞান করে অন্যদিকে মনোযোগী হওয়ার প্রক্রিয়া থেকেই বিরাজনীতিকরণের শুরু। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এ দশায় বিরাজমান, বলা ভালো নব্বইয়ের পর থেকেই। দ্বিতীয়ত, ছাত্র রাজনীতি যে কালে স্ট্রাইক ফোর্স হিসেবে সজাগ ছিল, সে কালটা ছিল ছাত্র আন্দোলনের রাষ্ট্র মেরামতের কাল। ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা-এগার দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং এরপরে আশির দশকজুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের মূল ছাত্র রাজনৈতিক ধারা বরাবরই রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। নব্বইয়ের পর এসে দেখা গেল, সেই ধারাগুলো আর একে অপরকে সহ্য করতে পারছে না; কেউ সরকারি ছাত্র সংগঠন হয়ে গেছে, কেউ প্রধান বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠন হয়ে গেছে, কেউ আগের মতোই বিরোধী ছাত্র সংগঠনই রয়ে গেছে বরাবর (যেমন: বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো)। বদলে গেছে এজেন্সি এবং এজেন্ডাও। নব্বই-পরবর্তী সময়ে নানা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির একটি ধারা, মুখ্যত বামধারাটি যুক্ত হলো বটে, কিন্তু আরেকটি ধারা নিজেকে মনে করা শুরু করল 'আমিই রাষ্ট্র, আমিই সরকার'। ফলে, নতুন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি তার চিরাচরিত রোমান্টিক ও রোমাঞ্চকর গৌরবোজ্জ্বলতার উত্তরাধিকার হারাতে শুরু করে দিল। মাত্র ২০ বছরের মাথায় তার পচন ও পতন, ক্ষমতাসীনদের বদান্যতায় এতটাই অধঃমুখী হলো যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে তরুণরা 'আই হেইট পলিটিক্স'কে নিজের আইডেন্টিটির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু করল। বুয়েটে, ধারণা করি, এই আইডেন্টিটিওয়ালারাই নতুন ন্যারেটিভ হাজির করে ফেলল— 'নো টু পলিটিক্স'।

এমতাবস্থায়, আপনি জোর করে তাদের সম্মতি আদায় করে নিতে পারেন। কিন্তু জবরদস্তি ও জোরারোপের ফল দীর্ঘজীবন পায় না। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ও তারুণ্যের মনোজগৎ এখন সে অবস্থায় নেই যে, আপনি ডাক দেয়া মাত্রই তারা মুক্তিযুদ্ধের মতো জনলড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বুয়েটের এই সংকট তাই সমগ্র দেশেরই সংকট। এই সংকটকে আপনি এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনৈতিক ইতিহাস দিয়ে জয় করতে পারবেন না। বস্তুত, ওই গৌরবকে ফেরি করা ও তাকে নিয়ে চর্বিতচর্বণ করা ছাড়া আর কোনো কিছু নেওয়ার নেই। কেননা, ওই অনন্য সাধারণ সময়ের আলোকবর্তিকার ধারাটি এরশাদের পতনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে। ওই ধারায় বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি আর ফিরতে পারবে না। কর্পোরেট পুঁজির দাপটই সেটা হতে দিতে দিবে না। ফলে, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে নাকি থাকবে না, তার সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির 'গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে'র প্রশ্নটা আজকের তারিখে বেমানান। ছাত্র রাজনীতি তথা ছাত্র আন্দোলন অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং থাকতে হবে, শুধু এটুকু যুক্তিসহ উপস্থাপন করলেই যথেষ্ট, ইতিহাস টানার প্রয়োজন দেখি না।

যারা ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে এবং মনে করেন, এর কারণে শিক্ষা-কার্যক্রম ঠিকঠাক করা যায় না, তাদের হাতে নিশ্চয়ই ডাটা আছে যথেষ্ট, রাজনীতি-নিষিদ্ধ থাকা সব ক্যাম্পাসেরই। এসব ক্যাম্পাসে পড়ালেখা খুব ভালো হচ্ছে, গবেষণা খুব ভালো হচ্ছে এটা বোঝার জন্য দুটি ইন্ডিকেটর/সূচক প্রস্তাব করি। একটি হলো, ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পরীক্ষার ফল— ছেলেদের হলগুলো টর্চারসেল হওয়ায় প্রথমবর্ষ থেকেই ছাত্রদের ফলাফল খারাপ হতে থাকে, কেননা তাদের অধিকাংশকেই অনিচ্ছায় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের মর্জি অনুযায়ী চলতে হয়। আরেকটি হলো, গবেষণা— বাংলাদেশে গবেষণার মান ও তাতে সরকারি অর্থবরাদ্দ তথৈবচ ও বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। তবুও, ছাত্র রাজনীতি যেসব ক্যাম্পাসে সচল আছে, আর যেসব ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ আছে, তাদের মধ্যে তুলনা হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ প্রস্তাবিত সূচক দুটিসহ আরও কিছু সূচক নির্ধারণ করে গবেষণা ফলাফল ও একটি  প্রতিবেদন জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারে।

৫.

রাজনীতি করার অধিকার নিশ্চিত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখ্যত বিদ্যাশিক্ষার জায়গা। তবে, বিদ্যাশিক্ষা মানে শুধু ক্লাস-পরীক্ষা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আরও না। বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত মহাজগৎ ব্যাপ্ত জ্ঞানের সৃজন ও বিতরণে ব্রতী হবে, জ্ঞানের স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে উর্ধ্বে তুলে ধরবে— এটাই তার প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে শুধু শ্রেণিকক্ষ আর পরীক্ষাগারই শিক্ষার্থীর শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে, তা মোটেও বিশ্ববিদ্যাকে লালন-পালনের জন্য যথোপযুক্ত না। প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক-শারীরিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বার্থে ক্লাস-পরীক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষাক্রমকে উৎসাহিত করা। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের (পড়ুন শিক্ষার্থী) জন্য রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার সমুন্নত রাখার প্রশ্নটি সেই সহশিক্ষাক্রমেরই অংশ হিসেবে এখানে পাঠ করতে হবে। সহশিক্ষাক্রম বাধ্যতামূলক কিছু না। ঐচ্ছিক। যা ঐচ্ছিক, তা করতে কাউকে জোরাজুরির প্রশ্ন আসে না। গোলটা এখানেই বেঁধেছে। কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন রাজনীতিকে সহশিক্ষাক্রমের পদ্ধতির বাইরে গিয়ে জবরদস্তির হাতিয়ার বানিয়েছে। ফলে, সহ্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে যখন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘আই হেইট পলিটিক্সে’র শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এই রাজনীতিকে প্রত্যাঘাত করে বসেছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরাই সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম এমন ঘটনা ঘটিয়ে দেখাল, আগেই বলেছি।

বাংলাদেশের সমস্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আদতে একটা সংকট সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংস্কৃতি কর্তৃত্ববাদী। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বলে দিয়েছেন, যতক্ষণ না কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির বদল ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আজকের দিনের ছাত্র রাজনীতির সংকট কাটবে না। কিন্তু, তাদেরও পক্ষ-বিপক্ষ ঠিক করতে পারা লাগবে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দায় সমগ্র ছাত্র রাজনীতির ওপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে, সেই রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনাকে সমুন্নত রেখে যারা রাজনীতি করতে চায়, শুধু বুয়েট নয়, বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডেই তাদের ঠাঁই পাওয়া এই রাষ্ট্রের বিকাশের স্বার্থেই যারপরনাই প্রয়োজন। রাজনীতিকে ঘৃণা করে সমাধানে পৌঁছানো যায় না। সমাধানে পৌঁছানো যায় যদি কর্তৃত্ববাদী ঘৃণার রাজনীতিকে পরিহার করে প্রকৃত রাজনীতিকে লালন করা যায়। বেদনার কথা হলো, সমগ্র রাষ্ট্রব্যাপী সেই রাজনীতিকে আমরা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছি, আর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছি শুধু বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ওপর! এ বড় আশ্চর্য দেশ!