‘উন্নয়ন’ এর মূল্য: ঢাকা শহর ‘আইসিইউ’তে

আবু নাসের অনীকআবু নাসের অনীক
Published : 28 April 2022, 02:40 PM
Updated : 28 April 2022, 02:40 PM

'উন্নয়ন' এর মূল্য: ঢাকা শহর 'আইসিইউ'তে

ঢাকা শহর এক 'অসুস্থ নগরী'তে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সময়ে তার সবচেয়ে বড় রোগ যানজট। এই একটি রোগকে কেন্দ্র করে আরো অনেকগুলি রোগে আক্রান্ত এই শহর। অসুস্থতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে আইসিইউতে রেখে তাকে কোনরকমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। 

যানজট এই শহরকে স্থবিরগতিহীন শহরে পরিণত করেছে। বুয়েট এর এআরআই এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি বেগ ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। এই মুহূর্তে তা কমে হয়েছে দশমিক কিলোমিটার। যা একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের হাটার গতিবেগের চাইতেও কম। গত দেড় দশকে গতি কমে গেছে ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটার। 

গতি হ্রাস পাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নাগরিক জীবনে। এখন যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার আর্থিক মূল্য হয় প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা। এই হিসাব অনুসারে বছর শেষে যানজটের কারণে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি (এআরআই, বুয়েট) চোখ বন্ধ করে ভাবুন, আমরা কতোটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি। 

আমাদের মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী ঢাকার যানজটকে 'উন্নয়নের মূল্য' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার সাথে গলা মিলিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেছেন, "মানুষের জীবনমানের উন্নতি হওয়ার কারণেই সড়কে যানজট বাড়ছে। আওয়ামী লীগ আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলে উপজেলা পর্যায়েও যানজট হবে" বিআইডিএস এর সর্বশেষ গবেষণা অনুসারে, শুধু রাজধানীর যানজটের কারণে প্রতিবছর প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপি' প্রায় দশমিক শতাংশ পরোক্ষ ক্ষতি যুক্ত হলে যার পরিমাণ হয় শতাংশ এই ক্ষতি বহন করে এধরনের 'উন্নয়ন' কতোটুকু যুক্তিযুক্ত! উন্নয়ন অর্থ গতিশীলতা আর যানজট মানে গতিহীনতাএকে অপরের বিপরীতার্থক শব্দ

একটি নগরীতে রাস্তা থাকা প্রয়োজন শহরের মোট আয়াতনের ২৫ শতাংশ ঢাকায় আছে শতাংশ রাজধানীর রাস্তায় যে পরিমাণ গাড়ি চলাচলের ক্ষমতা, বাস্তবে চলাচল করছে তারচেয়েও ৩০৪০ শতাংশ বেশি। ওয়ার্ল্ড ট্র্যাফিক ইনডেক্স ২০১৯ এর প্রতিবেদন অনুসারে যানজটে ঢাকার অবস্থান ১ম। এর প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের (দূষিত হওয়ার অন্যতম তিনটি কারণের মধ্যে একটি যানবাহনের ধোঁয়া) মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১ম, একইসাথে শব্দদূষণেও (অন্যতম একটি কারণ যানবাহন থেকে নির্গত শব্দ) এই শহরের অবস্থান ১ম। 

'উন্নয়ন' এর মূল্য দিতে গিয়ে যে দুর্বিষহ জীবন আমরা যাপন করছি শহরের একজন নাগরিক হিসেবে আমি বলবো, এই 'উন্নয়ন' আমি চাইনা। যানজটের কারণে শুধু শ্রমঘণ্টা নষ্ট আর তার আর্থিক ক্ষতিই নয়, এর সাথে যুক্ত হচ্ছে স্বাস্থ্য পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়। শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানী খরচ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ যা সরাসরি পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

যানজটের প্রভাব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নর্দান ইউনিভার্সিটির 'Possible Causes & Solutions of Traffic Jam and Their Impact on the Economy of the Dhaka City' গবেষণা পত্রে দেখা গেছে যানজটের কারণে ৫০ শতাংশ শিশু মাথাব্যথায় আক্রান্ত, ৩৩ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ঘামের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মধ্যে স্নায়ু চাপের ঘটনা ঘটছে। স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অল্পতে রেগে যাওয়া, উগ্র সহিংস আচরণ করছে তারা। কাণ্ডজ্ঞানহীন কার্যকলাপ বেড়ে যাচ্ছে। স্কুলে যাওয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সর্বোপরি তাদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব প্রভাব বিস্তার করছে। 

ঢাকা শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা। শহরের মোট যাত্রীর মাত্র শতাংশ যাতায়াত করেন ব্যক্তিগত গাড়িতে, যা একাই সড়কের ৭০ শতাংশ দখল করে রাখে। অধিকাংশ ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রী সংখ্যা ড্রাইভার বাদ দিলে একজন। অন্যদিকে যানজটের জন্য ৩০ শতাংশ দায় বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পার্কিং ব্যবস্থার। 

এছাড়া একই রাস্তায় দ্রুতগতির ধীরগতির পরিবহন চলাচল, ভিআইপি মুভমেন্ট, শহরের মধ্যে রেল ক্রসিং রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ। এরসাথে যুক্ত হয়েছে মান্ধাতা আমলের ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা, সারা বছর জুড়ে রাস্তা খোড়াখুড়ির কাজ আর নতুন নতুন মেগা প্রজেক্ট। যার একটিরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্ত হয়না। 

একটি শহরে একরপ্রতি জনঘনত্ব থাকা উচিত সর্বোচ্চ ১২০ জন পর্যন্ত। সেখানে ঢাকার জনঘনত্ব ৪০০৫০০ জন। ঢাকামুখী জনস্রোত অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই এই শহরে মানুষ বাড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ সরকারের ঢাকা কেন্দ্রীক উন্নয়ন পরিকল্পনা। ঢাকাকে আইসিইউ থেকে বের করতে হলে মানুষ ঢোকা বন্ধ করতে হবে; তারজন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পিত টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই।

নগর ব্যবস্থাপনায় বলা হয়, কোন শহরের জনসংখ্যা ৭০ লাখের বেশি হলে সেখানে বিনিয়োগ করলে 'Diseconomies of Scale' কার্যকর হতে থাকে। ফলে সড়ক, অবকাঠামো অন্যান্য বিনিয়োগ ব্যয় এর তুলনায় নগর উন্নয়নের সুফল অনেক কমে যায়। ঢাকার এখন জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। এমন অবস্থার মধ্যে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা ধার করে বিনিয়োগ করা হচ্ছে 'উন্নয়ন' এর নামে

যানজট নিরসনের জন্য একর পর এক ফ্লাইওভার আর ওভারব্রিজ বানানো হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে হাজার কোটি টাকা খরচ করে। অথচ তার ফলাফল শূন্য। এমনকি ওভারব্রিজগুলোতেও জ্যাম হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে (সুষ্ঠ পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা ব্যতীত) ঢাকার যানজট কমিয়ে আনা একটি অসম্ভব বিষয় সেটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত    

প্রকৃত অর্থে ঢাকায় একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যদি আমরা এই শহরকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। গণপরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণেই এখানে ব্যক্তিগত যানবাহনের আধিক্য তৈরি হয়েছে। শহরে পৃথক লেনের মাধ্যমে ভালো এসি বাস নামালে, সাইকেল চালানোর জন্য পৃথক লেন তৈরি করতে পারলে ব্যক্তিগত গাড়ীর ব্যবহার ক্রমেই কমে আসবে। রাইড শেয়ারিং এর চাহিদাও কমে যাবে। 

বড় বড় স্কুলকলেজের (যেসমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী বেশি) তাদের ছাত্রছাত্রীদের আনানেওয়ার জন্য পরিবহনের (বাস) ব্যবস্থা করতে হবে। এটা কার্যকর করা গেলেও রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল কমে আসবে। ফুটপাতগুলি দখলমুক্ত করে নাগরিকদের হাটার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পার্কিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনাকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। সর্বোপরি ট্র্যাফিক ব্যবস্থপনাকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজ করতে হবে চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে।

জনগণের চলাচলকে দুর্বিষহ করে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে যে মেট্রো রেল নির্মাণ করা হচ্ছে সেটাও যানজট নিরসনে কার্যত খুব বেশি কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। কারণ মোট যাত্রীর মাত্র ১৫ শতাংশ সে বহন করতে পারবে। রিভাইসড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান অনুযায়ী মেট্রো রেলের (প্রকৃত অর্থে স্কাইট্রেন) এই প্রকল্প শুরু করার আগে গণপরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও পরেরটা সরকার আগে বাস্তবায়ন করছে।

অর্থাৎ সরকারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যাপক গলদ রয়ে গেছে। 'উন্নয়ন' বলতে অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া অন্যকিছু বোঝে বলে মনে হয়না তাদের কার্যকলাপে। অন্যদিকে এই সমস্ত প্রকল্প থেকে লুটপাটের অবারিত সুযোগ থাকে। অবকাঠামো তৈরি করেছে কিন্তু সেটি কার্যকর করার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাপনা দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে। 

এই শহরকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প কিছু নেই। একইসাথে নাগরিককেও দায়িত্বশীল আচারণ করতে হবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য। মাননীয়গণ, আপনারা গাড়িতে পতাকার জোরে হুইসেল বাজিয়ে আমাদের চলাচলকে আটকে রাখছেন বছরের পর বছর, এভাবে আর কতোদিন? মনে রাখবেন সবকিছুরই কিন্তু শেষ বলে একটা কথা আছে, তখন আর নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবেন না যতোই 'উন্নয়ন'এর গল্প করেন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক