বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হোক বিষমুক্ত এবং সাশ্রয়ী

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
Published : 3 Feb 2011, 12:40 PM
Updated : 3 Feb 2011, 12:40 PM

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে, মুক্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের ডাক দেন, তাতে দেশের লোক অনুপ্রাণিত।

দেশের সাধারণ লোক অ্যানালগ-ডিজিটালের পার্থক্য বিচার করতে পারে না বটে, কিন্তু সোনার বাংলা সম্বন্ধে তাদের একটা মোটামুটি ধারণা আছে। সোনার বাংলা হবে একটা সমৃদ্ধ দেশ। সেই সমৃদ্ধির অন্যতম শর্ত যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির একটা সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে শিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। সেই সমৃদ্ধির রূপায়ণ ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশলী সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকায় পূর্ণ পারঙ্গমতা অর্জনের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির একটা বড় উৎকর্ষ কেন্দ্র হতে হবে, যেন আন্তর্জাতিক মানের কঠিনতম পরীক্ষায় অনায়াসে সেই শিক্ষাঙ্গন উত্তীর্ণ হতে পারে।

আমাদের দেশে প্রতিভার কাঁচা সোনার অভাব নেই। শুধু ঢাকার ধোলাইখালে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্যোগী কারিগররা অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতির মাঝে দেশের নানা ধরণের যন্ত্রপাতি ও কলকবজার চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর দৃষ্টি পড়েছে বিদেশি গবেষকদের। এখন আমাদের তাদের প্রতি অনুকূল দৃষ্টি দিতে হবে।

স্বাস্থ্যতথ্যের উন্নতি, জীবনদায়ী শুদ্ধ চিকিৎসার উন্নতির প্রযুক্তি ও প্রকৌশল, মস্তিষ্কের রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং পারমাণবিক সন্ত্রাস দূরীকরণ। সাইবার স্পেসের নিরাপত্তাদান, ভার্চুয়াল রেয়ালিটি শক্তিশালীকরণ, ব্যক্তিগত জ্ঞানান্বেষণের বিস্তার ও উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাজসরঞ্জামের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। এইসব ব্যাপার আমার অধিগত নয়। আমরা সহসা বা অতি দ্রুত এই সমস্যার মোকাবেলা করার মতো সাহস ও সামর্থ রাখি না। আমি বলতে চাই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথেষ্ট বিষ আছে। আগে যখন তামার পয়সা ছিল তখন একটা কথা ছিল তামার বিষ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানব কল্যাণে কতখানি বিষমুক্ত করা যায় সেই চিন্তা আমাদের অনুক্ষণ স্মরণে রাখতে হবে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি মার্কিন ন্যাশনাল সায়ান্স ফাউন্ডেশনের অনুরোধে পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করে মানবসমাজের ১৪টি চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করে। পৃথিবী ও মানুষের সাহায্যে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অনুশীলনে কী কী অর্জন করা যায় এবং সেই অর্জন কীভাবে টেকসই করা যায় সে সম্পর্কে মতামত গ্রহণ করে ৫০টি বিষয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পুনর্বিবেচনা করা হয়।

সৌর জ্বালানি সাশ্রয়করণ, ফিউশন থেকে জ্বালানি সংগ্রহ। জীবাশ্ম জ্বালানি দহনজনিত কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করে পরিবেশের সংরক্ষণের জন্য জব্দ ও মজুদ করা। নাইট্রোজেন ব্যবস্থাপনা, সুপেয় জলের সন্ধান, নগরস্থাপনার পুনরুদ্ধ ও উন্নয়ন।
সৌর জ্বালানি বা পারমাণবিক জ্বালানির প্রকৌশলগত সমাধান প্রযুক্তিগতভাবে যেন ফসিল জ্বালানির চেয়ে আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হয় সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। সৌরশক্তি ব্যবহারযোগ্য করতে ন্যানোটেকনলজি আমাদের কীভাবে সাহায্য করবে আমরা এখনও জানি না। তাত্ত্বিক মহলে ফিউসান ব্যবহার করার কথা উঠেছে। সূর্যের জ্বালানির উৎস ফিউসান। তবে মানবসমাজে ফিউসান পদ্ধতিতে জ্বালানি সংগ্রহ করা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। আমি সামান্য মানবিক বিদ্যার জ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর এই দুটো কথা বললাম যা বিস্তারিতভাবে আমার পক্ষে আলোচনা করা অসম্ভব। আমাদের দরিদ্র দেশে সব বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলী তত্ত্ব কাজে লাগানো বেশ সমস্যাসঙ্কুল। আমরা যাতে একেবারে পশ্চাৎপর ও আনপড় হয়ে না পড়ি তার জন্য মোটামুটিভাবে তত্ত্বগুলো আমাদের জেনে রাখতে হবে, তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো প্রয়োগ না করতে পারলেও।
প্রকৌশলীরা সভ্যতার আলোকবর্তিকা-বাহক। সমাজে তাঁদের অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা মনে রেখে আমাদেরকে নীতিশাস্ত্রে ও মানবিক বিদ্যায় অবশ্যই কিছু পাঠ নিতে হবে। দেশের বিরাজমান নৈতিক আবহাওয়ায় আমাদের স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কে কিছু পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা থাকতে হবে। শিক্ষকদের স্বাধীনতা নাগরিক স্বাধীনতার চেয়ে বড়। শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভোটাধিকার আছে। সুতরাং তাঁদের রাজনীতি করার স্বাধীনতা থাকবে না তা বলা যায় না। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সুস্থ প্রতিযোগিতার ধারণা হারিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গন ক্লেদাক্ত হয়ে যেতে পারে। ক্যাম্পাসে এমন সব অপরাধকর্ম সংগঠিত হতে দেখছি যে আমরা অসহায় হয়ে কঠোরতম আইনের কথা বলছি। বলা বাহুল্য, ক্যাম্পাসকে জেলখানা বানানো যায় না। যারা অপরাধ করছে তাদের বিচার করে জেলে পোরা উচিত। মুষ্টিমেয় কতকগুলো দুর্বৃত্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা বিনষ্ট করা যায় না। দেশের স্বার্থ শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল এবং তার ভিত্তিমূলকে আমাদের প্রাণবান ও উদ্দীপনায় রাখতে হবে।
তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মধ্যে জগদীশ বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কুদরত-ই-খুদার মতন মেধাবী পুরুষ লুকিয়ে থাকতে পারেন। উচ্চ অট্টালিকা বিশারদ এফ আর খান এ দেশের সন্তান। ড. আবুল হুশাম ও ডা. একেএম মুনির আর্সেনিক রোধে যুগান্তকারী সেনোফিল্টার আবিষ্কার করেছেন। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের যেসব পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ছড়িয়ে আছেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা দিয়ে একটা তালিকা করা প্রয়োজন। আজ দেশের ভেতর এবং দেশের বাইরে যেসব তরুণ উদ্যোগী রয়েছেন, তাঁদের সকলকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের বড় করে ভাবতে হবে এবং আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের সেবা গ্রহণের জন্য তৎপর হতে হবে, যাতে করে প্রয়োজনে আমরা তাঁদের সাহায্য নিতে পারি এবং তাঁদের সহায়তা দান করতে পারি।

উন্নয়ন অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়। বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট উন্নয়ন এক ভয়াবহ অভিশাপ বয়ে আনতে পারে। উন্নয়নের নেশায় যেন আমাদের দিগভ্রম না হয়। আমাদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ের সঙ্গে মানবিক বিদ্যার কিছু সবক নিতে হবে। দেশের আইন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সকলেরই কিছু প্রাথমিক জ্ঞান থাকা দরকার। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদদের লাগাতার শিক্ষায় আজ কবিতারও স্থান রয়েছে। তেল কোম্পানি ঠেকায় পড়ে নৃতত্ত্ববিদের আশ্রয় নেয়। সুস্থ সমাজচেতনায় দেশের বিরাজমান বৈষম্যকে হ্রাস করার একটা প্রণোদনা থাকতে হবে। সাম্প্রতিক কালে আমরা দেখেছি, বৈষম্যপীড়িত ক্ষুব্ধ প্রজা কী ধরণের প্রবল আকার ধারণ করতে পারে। আমাদের সন্ত্রাস পরিহার করতে হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেই দিকে লক্ষ করতে হবে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সৃষ্টিশীল চিন্তা ও পরিকল্পনায় আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথের সন্ধান পাবে। আজ যাঁরা সনদ ও সম্মাননা পেলেন, তাঁদেরকে এবং তাঁদের অভিভাবকদের অভিনন্দন জানাই।

আমাকে দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও তাঁর সহকর্মীদের আমি অশেষ ধন্যবাদ জানাই। আপনারা সবাই ভালো থাকুন। পরম করুণাময় আমাদের সবার সহায় হোন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতার লিখিত রূপ।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক