Published : 30 Aug 2025, 05:49 PM
' গিরহস্থেরা ভাইবতো ফুলের ক্ষেতে বেটিসাওয়াল ঢুইকলে সেই ক্ষেতে ফুল ফুটবে না’–এমন কথা ছোট থেকেই শুনে বড় হয়েছেন নওগাঁর সাপাহারের বাসিন্দা পবিত্র কুমার মালি। ফুলের বাগান বলতে তিনি আক্ষরিক অর্থে ফুলের বাগান বোঝাননি। সেই সব সবজি বা ফলকে বুঝিয়েছেন, যা ফুল থেকে জন্মায়।
তাই বানিজ্যিকীকরণের জন্য করা যে কোনো বাগানে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলা যায়। তবে এই কথার প্রচলন থাকলেও কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ ওই এলাকায় একটা সময় ছিল চোখে পড়ার মতো। এখনও আছে। শুধু আমবাগানের বেলায় নারীদের কাজে নেওয়া হয় না। অথচ এলাকাটা এখন আমের জন্য বিখ্যাত।
কিছুটা উঁচু জায়গা হওয়ায় তীব্র পানির সংকটে অন্যান্য সবজির ফলন তেমন একটা হয় না ফলে কৃষিকাজেও নির্ভর করতে হতো বৃষ্টির ওপর। অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়া আর বৃষ্টির স্বল্পতায় ফলন কমে যাওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা।
একটা সময় ধানের চাষের জমিগুলোও দখল করে নেয় আম বাগান। শক্ত মাটি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমের স্বাদ ভালো হয়, চাষেও খুব বেশি পানির প্রয়োজন হয় না। এভাবেই সাপাহার হয়ে উঠেছে আমের রাজ্য।
এই সব আম বাগানে আর নারীদের মুখ দেখা যায় না। তবে নারীদের এই কর্মহীনতার পেছনের কারণ কি কেবলই কুসংস্কার? কেউ বলেন আমের বাগানের ভারি কাজ নারীরা করতে পারে না, কারো কাছে যায় আম বাগানের নারীদের প্রবেশ অশুভ, অনেকের দাবি, নারীরা কাজ করতে চায় না।
সাপাহারে যখন গিয়েছিলাম, তখন ছিল আমের ভরা মৌসুম। জায়গাটার সঙ্গে এর আগে পরিচয় ছিল না। অফিসের কাজে সাপাহার যেতে হবে জানার পর জায়গাটা ঠিক কোথায় জানতে গুগল সার্চ করে দেখি এটি নওগাঁ জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। সাপাহারে যখন পৌঁছাই ৮ জুলাই বিকেলে, তখন হাটে-মাঠে সর্বত্র ছিল আমের ছড়াছড়ি। সাধারণত মে মাস থেকে আমের মৌসুম শুরু হয়ে জুন মাস পর্যন্ত থাকে। তবে জুলাইয়েও আমের পরিমাণ নেহায়েত কম ছিল না।
সাপাহারে যাওয়ার আগে মানচিত্র দেখে জানলাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল এটি। এখানে সীমান্ত পরিস্থিতি ও চোরাচালান ইস্যুতে মাঝে মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়–গুগল সার্চে সেই তথ্যও পাওয়া যায়।
সরকারি কোনো গেজেট, ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা কিংবা বাংলাপিডিয়ার মতো উৎসে সাপাহার নামকরণের স্পষ্ট কোনো উৎস খুঁজে পাইনি সেখানে যাওয়ার আগে। তবে সাপাহারের ধুলোবালিতে তিন দিন হেঁটে হেঁটে স্থানীয়দের কাছে নানান কাহিনি শুনেছি, যার ভেতর দিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাস, সমাজ ও লোকবিশ্বাসের কিছু আভাস পাওয়া গেছে।
একটি জনপ্রিয় লোককথা বলে, একসময় এখানে প্রচুর সাপ ছিল। স্থানীয় আদিবাসী ও বনজীবীরা সাপ শিকার করত এবং কেউ কেউ তা আহার করত বলেও কথিত আছে। সেই থেকেই নাম ‘সাপ আহার’—পরবর্তীকালে হয়ে গেছে ‘সাপাহার’। আরেকটি ব্যাখ্যা অনুসারে, সাপাহারের মাটিতে একসময় ব্যবসায়ী সাহা সম্প্রদায়ের প্রভাব ছিল, যারা পাহারাদার দিয়ে তাদের সম্পদ রক্ষা করত। ‘সাহার পাহারা’থেকেই নাকি জন্ম হয় ‘সাপাহার’ নামটির। তৃতীয় আরেকটি গল্প আরও ভিন্নধর্মী। কেউ কেউ বলেন, এই অঞ্চল উঁচু ও ঢেউখেলানো হওয়ায় স্থানীয় উপভাষায় ‘সা; (অর্থ: উঁচু জমি) ও ‘পাহার’ (অর্থ: পাহাড়) থেকে তৈরি হয় ‘সাপাহার’ নামটি। তিনটি উপকথার তৃতীয়টি আমার কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কেননা, ওই এলাকাটি পাহাড়ি অঞ্চল নয়। সাপাহারে আদিবাসীরা আছে। আদিবাসীদের কেউ কেউ সাপ খেলেও নামকরণের পেছনে এমন কারণ থাকবার কথা নয়। বরং ‘সাহার পাহারা’ থেকেই নামটি হয়ে থাকতে পারে।
এই তিনটি উপকথার কোনোটিই নাও সত্য না হতে পারে। তবে সাপাহার যে এক সময় হিন্দু প্রধান এলাকা ছিল, সেটি নিশ্চিত, এখন এখানে মাত্র ৬ শতাংশ হিন্দুদের বাস। বৌদ্ধ আছে কিনা নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত কিছু খ্রিস্টান আছে। তবে তাদের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় কম হবে।

সাপাহারে প্রবেশ করতেই রাস্তায় যানজট দেখা পাই। আমকে কেন্দ্র করে রীতিমতন অতিষ্ঠ ছিল তখন ওখানকার জনজীবন। সড়কপথে ঢোকার আগেই আমার চোখ আটকে গেল এক অদ্ভুত দৃশ্যে। পিকআপের পর পিকআপ, গাদাগাদি করে ভর্তি আম। কোনো হিসেব নেই, কিছু রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে অবহেলায়—যা নিচে পড়ছে, তা কুড়িয়ে নিতে দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় অনেকে। এখানে আম যেন অতি তুচ্ছ বস্তু। এমনকি আবাসিক হোটেলগুলোতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আম ব্যবসায়ীদের ভিড় এতটাই যে, জায়গা পাওয়া দায়। বাজার, রাস্তা, হোটেল—সব আমের দখলে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে যায় একটি অনুপস্থিতিতে। এত আম, এত শ্রম, এত বাগান—কিন্তু একজন নারীও কোথাও নেই। স্থানীয়রা জানায় নারীদের আমবাগানে কাজ করতে দেওয়া হয় না। কারণ? ‘ওটা মেয়েদের কাজ না’—একবাক্যে সাফ উত্তর। অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার আম পাড়তে, বহনে, বাছাইয়ে শ্রমিকের দরকার পড়ে। সেই দরজাগুলো নারীদের জন্য বন্ধ।
নারীদের কর্মহীন হয়ে পড়ার গল্পটা এখানকার সবারই মুখে মুখে শুনা যায়। সাপাহারের বাসিন্দা মঙ্গল কিস্কোর সঙ্গে দেখা হয় পথে। নারীরা কাজ পাচ্ছে না এই কথা উল্লেখ করে তিনিও বলেন, আগে ধানের আবাদ হতো, মেয়েরাও কাজ করত। এখন আমবাগানে নারীদের কাজের তেমন কোনো জায়গা নেই আসলে।
কৃষিকাজ ছিল যেখানে প্রধান পেশা সেখান থেকে এই এলাকার আমের রাজ্য হয়ে ওঠার গল্পটা খুব বেশিদিন আগের না। তবে তার আগের সাপাহার কেমন ছিল? নারী পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই মাঠেঘাটে কাজ করতেন বলছিলেন ৯৮ বছর বয়সী বার্কি টুডো।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে যেতে হলেও বেশি দিন শরণার্থী জীবন কাটাননি। তিনি মনে করেছিলেন নিজের দেশেই ভালো থাকবেন। কিন্তু দেশে ফিরে এসে জমিজমা আর ফিরে পাননি। থাকার মতো জায়গাটাই ছিল শুধু। আগেকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলেন, ‘ধানের আবাদ করতুম, গোয়ালার কামও কইরেছি, গরুর গাড়ি চালাইয়াছি, ধানের বোঝা উঠাইছি। এই এলাকার মানুষ জানে হামাগের কথা। কেউ পারেনি হামাগের সাথে।
বার্কি পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছেন উল্লেখ করে যা বললেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়–তখন পারলে এখন কেন নারীরা পারবে না?
কৃষিকাজে, বিশেষ করে ধানচাষে নারীদের উপস্থিতি এখনও চোখে পড়ার মতো, কিন্তু আমবাগানে নারীদের অনুপস্থিতি একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারা যায়। আমচাষি আব্দুল মতিনের মতে, কুসংস্কার নেই হয়তো নারীরা কাজ করতে চায় না। অথবা ভারী কাজ বলে নারীদের অংশগ্রহণ কম।
কিন্তু সাপাহারের পথে পথে নারীদের সাথে কথা বলে কাজ না পাওয়ার আর্তনাদ শুনা যায়। প্রায় সবাই বলেন আগের ধানের আবাদে পাঁচ শ’ টাকা মিলত প্রতিদিন। এখন সাপাহারে এত আম বাগান, আমের এত সুনাম, তবু মেয়েদের কাজ নেই। আম বাগানে কাজ না পেয়ে যে চাপা কষ্ট নারীরা বয়ে বেড়ায় তা বার্কি টুডোর বড় ছেলের বৌ কৌশলী হেমব্রমের কথায় বুঝতে পারি।
হয়তো সেজন্য পানির সংকটে ধানের আবাদ ভালো হতো না, তা স্বীকার করতে চান না সহজে। কৌশলীর কাছে আমের চেয়ে ধান চাষ ভালো। ২০০৮ সালে বিয়ে করে সাপাহারে আসেন তবে কৃষিকাজের সাথে তার সম্পর্কটা শৈশব থেকেই। তার ভাষ্য, ধানের আবাদেতো নারীরা কাজ করতে পারতো, এখন কেন না? ভারী কাজ ছাড়াও অনেক কাজ আছে যেমন আম ভাঙা (গাছ থেকে আম সংগ্রহ করা বলতে বুঝিয়েছেন), ধোয়া, ক্যারেটে নেওয়া এসব কাজ কি পারবে না। কাজ করতে চাইলে আমাদের সরাসরি বলে দেয় আমরা করতে পারব না। কেন পারবো না?
হাসিমুখে কৌশলী বলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ ডাইরেক্ট বুলে দিবে, ওটার জন্য মেয়েদের বাগানে ঢুকতে বারণ।’ ওটা বলতে কৌশলী নারীর ঋতুস্রাবকে বুঝিয়েছেন, তার পরের কথায় তা স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘ওদের কথার মানে আমরাও বুঝে নিলাম। ধানের ওখানে আগে কোনো বাধা ছিল না। এখন সুধু সাপাহার লয়, এবার থেকে উচাডাঙার মেয়েদেরও কামে নিচ্ছে না বুলে শুইনেছি।’ তার কথায় বুঝা যায় নারীর কর্মহীনতার এ সংকট শুধুমাত্র সাপাহারে নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়ও। এভাবেই নারীদের এই কর্মহীন হয়ে পড়ার গল্পটা বড় হচ্ছে।
কুসংস্কারের আড়ালে অর্থনৈতিক বিষয়ও লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন পবিত্র মালি। দীর্ঘদীন এই এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। বললেন, ভারী কাজগুলোর সঙ্গে পুরুষদের দিয়েই হালকা কাজ করিয়ে ফেলা হয়। আলাদা করে হালকা কাজের জন্য লোক কেন রাখবে? এমন চিন্তাও থাকতে পারে।
এখানে সাঁওতাল ও ওঁরাও আদিবাসীদের চোখে পড়ে বেশি। কৃষিকাজ তাদের পুরনো পেশা হলেও, এখন অনেকেই জমি হারিয়ে শহরমুখী। আমবাগানের নামে আদিবাসীদের ভূমি দখল হয়েছে বলেই জানালেন কেউ কেউ।
কাজেরসূত্রে দীর্ঘসময় বরেন্দ্র ডেভলপমেন্ট অরগানাইজেশনের (বিডিও) জেলা সমন্বয়ক শামসুল আলম এই সাপাহারে আছেন। এখানকার পানির সংকটের কথা শুনা যায় তার মুখে। বলছিলেন, পানির সংকট এখন কিছুটা কমলেও, ২০০৯ সাল পর্যন্ত অবস্থা ভয়াবহ ছিল। তাই ধানের আবাদ বাদ দিয়ে মানুষ আম বাগান করতে শুরু করে। এরপরই এখানে আসে ডিপ টিউবওয়েল ও মোটর। আগে তাও পানি পাওয়া যেত না। কুয়ার অনেক গভীর থেকে টেনে টেনে পানি তুলেতে হতো। নারীদের হাতে ব্যথা হয়ে যেত। এখন মোটরের ওপরই নির্ভরশীল সবাই।
গল্প করতে করতেই পৌঁছে যাই সাপাহারের পাশের আরেক গ্রাম পত্নীতলায়। সেখানেই দেখা যায় এক কিশোরকে হাতে তার পোষা টিয়া পাখিটি নিশ্চিন্তে বসে আছে। মাথায় বসে আছে কমলা রঙের বারজিগার। হাতে থাকা পাখিটাকে আলতো করে আদর করতে করতে পানির সংকটের গল্প শুনে নিজেও বলে উঠল, ‘পত্নীতলাতও পানির আকাল ছিল, তাই আম বাগান করা শুরু হয়েছে। পানি কম হলেও বাগানে ফলন আসে। কৃষিকাজ ছেড়ে সবাই ঝুঁকেছে আমের ব্যবসার দিকে। সাপাহার আরও উঁচা হওয়াত, সেটি পানির আকাল আরও বেশি। এখন মোটর আসছে। কিন্তু, মোটরের অনেক দাম।’
যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এক পুরনো স্থাপনার নিচে—দিবরদিঘির ঐতিহাসিক স্তম্ভ সেটি। লোকমুখে শুনা যায় কৈবর্ত বিদ্রোহের সময় পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত ও হত্যার সাফল্যকে স্মরণীয় করে রাখতে কৈবর্ত সামন্ত রাজা দিব্যক এই জয়স্তম্ভসহ দিঘিটি নির্মাণ করেছিলেন। এখানে কথিত আছে পানির সংকটের কারণেই এই জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন রাজা দিব্যক। কিন্তু মনে হয়—যদি একদিন কেউ এই সাপাহার ঘুরে ফিরে দেখে, তারা কী দেখে যাবে? শুধু আম, কাহিনি আর চোরাবালির মতো নিঃশব্দ নারী?
ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ‘জেন্ডারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই নারী, যা মোট চাকরি হারানো মানুষের ৮৫ শতাংশ। বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে সক্রিয়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত। সাপাহারের মতো জায়গাগুলোতে সেই সংকোচন যেন আরও অনেক বেশি। কাজ নেই, প্রশিক্ষণ নেই, দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বদলও নেই। অথচ নারীরাই হোটেলে রুটি বানান, ঘরে ঘরে সাহস বুনে যান। তবে সাপাহারেই যে নারীদের অনুপস্থিতি তাই নয় কৌশলী হেমব্রম বলছিলেন এ বছর থেকে উচাডাঙায়ও নারীরা আর কাজ পাচ্ছে না। অর্থাৎ নারীকে কর্মহীন করে দেওয়ার এ প্রক্রিয়া নীরবে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আবার কোথাও কাজ পেলেও নারী পুরুষের মজুরি বৈষম্যও রয়েছে প্রকট আকারে। শুধু কুসংস্কারই নয়, রয়েছে অবহেলাও। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর এই পিছিয়ে পড়ার হিসাবটা পুরো বাংলাদেশেরই চিত্রকে তুলে ধরে।
শুধু কৃষিখাতই নয়, নারীর অংশগ্রহণ কমেছে বিদেশি শ্রমবাজার ও তৈরি পোশাক শিল্পেও। জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, একসময় গার্মেন্টস খাতে মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী, বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজারে। একই সময়ে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা নারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজারে। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৬ লাখ ৩০ হাজার।
নারীদের কাজের ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি রয়েছে মজুরি বৈষম্যও, যা শহর ও গ্রামাঞ্চল সব জায়গাতেই দৃশ্যমান। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় উঠে আসে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীর মাত্র ১৫ শতাংশ মজুরি পান। ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে শুরু হওয়া এই গবেষণাতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশে কৃষিকাজের কতটা নারীর দ্বারা সম্পাদিত হয়। পরিবারের কতটা খাবারের যোগান দেন নারী। গ্রামীণ শ্রমবাজারে নারী কতটা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গবেষণাপত্রে বলা হয়, ‘সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, কৃষিতে মজুরিযুক্ত কাজে নারীর সংখ্যা মাত্র ১৫ ভাগের কাছাকাছি। গবাদিপশুর লালন পালন ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে নারীর অনেক বেশি অংশগ্রহণ থাকার পরও এত অল্প সংখ্যা দেখে এটাই প্রমাণিত হয় যে, গ্রামীণ জীবনে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে নারীর কাজের পরিধি এখনও খুবই সামান্য।
গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ (২০২২) অনুসারে, প্রধান অর্থনৈতিক খাত হিসেবে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ৪৫ শতাংশ জনবল (১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা) নিয়োজিত। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ নারী, ১৯ শতাংশ পুরুষ। সংখ্যার হিসাবে কৃষি খাতে অর্থাৎ কৃষি, বনায়ন ও মৎস্যকর্মী হিসেবে নিয়োজিত ৩ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার জন। নারী শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজ, বনজ ও মৎস্যকর্মী হিসেবে নিয়োজিত।
প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিকাজে নারী যুক্ত হয়ে অবদান রেখে আসছে যার অধিকাংশেরও বেশি অস্বীকৃত। এক প্রতিবেদনে দেখা যায় দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির মধ্যে ৫০ লাখই নারী শ্রমিক। তাদের মধ্যে অনেকেই রোজগার করে পরিবারের ভরণপোষণ করেন। সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীরা একটা বিশাল অবদান রাখছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর শ্রম আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি করলেও তাদের শ্রমের বিনিময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিক তো নেইই বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তারা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতিও পায় না। কৃষি থেকে প্রাপ্ত পারিবারিক আয়েও নারীদের ভাগ থাকে না। এটিকে তাদের প্রাত্যহিক ও পারিবারিক শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়, যার কারণে শ্রমের মজুরি দেওয়ার কথা চিন্তাই করা যায় না।
সাপাহার ছাড়াও আশপাশের অঞ্চলগুলোতেও নারীকে দেখা যায় হোটেলের রান্নার কাজে, কোথাও হোটেলের খাবার ঘরের পেছনে বসে সবজি কুটছেন, কোথাও কালাই রুটি বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন অথবা কোনো হোটেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন, এর বাইরে যেন নারীর জন্য কোনো কাজই নেই। সাপাহারের আলোহা আবাসিক হোটেলের রান্নার কাজ করেন মাকসুদা বেগম। বলছিলেন, তার স্বামী ভ্যান চালিয়ে দৈনিক ৫০০ টাকার মতো পেতেন, এখন আম বহন করে হাজার টাকা পাচ্ছেন। মাকসুদার আক্ষেপ, তার মতো নারীদের কাজ নেই। সন্তানদের মানুষ করতে হোটেলে কাজ শুরু করছেন। আমের মৌসুমে দু-পয়সা জমিয়ে রাখতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু কাজ নেই।