Published : 21 Feb 2026, 09:41 AM
১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনা। তখন এরশাদ ক্ষমতায়। আমরা স্কুলের ছাত্র। উত্তরের ছোট্ট জনপদ পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় তখন সিপিবির রমরমা। ওটা ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের এলাকা। তিনি নিয়মিত এলকায় গণসংযোগ করতেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকত। স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অনুমতি ছিল না। তবে এলাকার অগ্রজদের কল্যাণে পরোক্ষভাবে আমাদের মধ্যেও এক ধরনের রাজনৈতিক চেতনা ভর করতে শুরু করে। আমরা একেুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করি।
এলাকার বড় ভাইদের কাছে আমরা তখনই জেনেছিলাম, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শাসকরা জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা ঘোষণা করে, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাংলার ছাত্রসমাজ। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলা করার দাবিতে তারা ঢাকায় মিছিল করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, সালাম, বরকতসহ অনেকে নিহত হন। এরপর সারাদেশে প্রতিবাদের ঢেউ বয়ে যায়। তীব্র প্রতিবাদের মুখে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর একুশের প্রতিবাদী চেতনা থেকেই ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে স্বাধিকার আন্দোলন, অবশেষে মুক্তির লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
একুশের এই চেতনা আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে যায়। কৈশোরের দিনগুলোতে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল আমাদের বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটি যতই এগিয়ে আসত, আমাদের ভেতরে ততই জমতে থাকত এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক গভীর আবেগ। দিনটি কেবল একটি শহীদবেদীতে মালা দেওয়া আর প্রভাতফেরির আয়োজন ছিল না; ছিল আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার, ইতিহাসের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নতুন করে আবিষ্কার করার এক মহড়া।
বিশেষ করে প্রভাতফেরির স্মৃতি আজও মনে জ্বলজ্বল করে। আমরা কয়েকজন বন্ধু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই পরিকল্পনা শুরু করতাম। কার দায়িত্ব কী—ফুল সংগ্রহ, ডালা বানানো, পোস্টার লেখা, মাইক জোগাড়, রিকশা ঠিক করা—সব ভাগাভাগি করে নেওয়া হতো। ফুল সংগ্রহের ঘটনাগুলো ছিল আলাদা রোমাঞ্চে ভরা।
এলাকায় তখন ফুলের খুব অভাব ছিল। আজকের মতো সর্বত্র ফুলের দোকান, পাইকারি বাজার, কিংবা আগাম বুকিংয়ের সুযোগ ছিল না। কেবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে এবং কয়েকটি সৌখিন, সচ্ছল পরিবারের বাড়িতে শখ করে ফুলগাছ লাগানো হতো—গাঁদা, গোলাপ কিংবা শিউলি। ফলে প্রভাতফেরির জন্য ফুল জোগাড় করা ছিল এক কঠিন কাজ। যাদের বাড়িতে ফুলগাছ ছিল, তারাও সতর্ক থাকতেন। বাগানে লাইট জ্বালিয়ে রাখতেন। কেউ কেউ পাহারাও বসাতেন। কারণ তারা জানতেন—রাত গভীর হলে কিছু কিশোর নিশ্চয়ই ফুলের খোঁজে আসবে।
অনেক সময় আমাদের ঢিল ছুঁড়ে বাগানের লাইট ভেঙে দিতে হতো, যাতে অন্ধকারে আমাদের চিনতে না পারে। এখন ভাবলে বুঝি, কাজটি ঠিক ছিল না। কিন্তু তখন আমাদের কিশোর মন এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখেনি; দেখেছিল একুশের জন্য জরুরি ‘সংগ্রাম’ হিসেবে। ধরা পড়লে বকুনি, এমনকি মারও খেতে হতে পারত। তবু আমরা থামিনি। কারণ, আমাদের বিশ্বাস ছিল—ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এইটুকু ‘ঝুঁকি’ নেওয়া যায়।
ফুল সংগ্রহ শেষে স্কুলের বারান্দায় অন্ধকারের মধ্যেই আমরা বসে মালা বানাতাম। সুতোয় গাঁথা সেই মালা হয়তো নিখুঁত হতো না, কিন্তু তাতে ছিল আমাদের হাতের পরিশ্রম, কিশোর হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। ভোরের আগে মালাগুলো প্রস্তুত করে আমরা যেন এক অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করতাম।
মাইকে কেউ একজন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গান ধরত, বাকিরা কণ্ঠ মেলাত। ভোরের নিস্তব্ধতায় সেই সুর কেমন যেন ভারী হয়ে উঠত। মাঝে মাঝে আমরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলতাম, কবিতা আবৃত্তি করতাম। অল্প কয়েকজন মিলে শুরু করলেও একটা চক্কর দেওয়ার পর জমায়েত বেড়ে যেত। আমাদের ছোট্ট আয়োজন তখন পুরো এলাকার আয়োজন হয়ে উঠত।
তখন আমাদের এলাকায় রিকশা চালু হয়েছে মাত্র। তার আগে গরুর গাড়িই ছিল ভরসা। প্রভাতফেরির জন্য আগেভাগেই গাড়ি ঠিক করে রাখতে হতো। মাইক সেট করা ছিল বড় কাজ। মাইক ভাড়া করা, সংযোগ, ব্যাটারির ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। আমরা নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম। মনে হতো, আমাদের হাতেই যেন পুরো এলাকার একুশের আয়োজন।
সকাল সাতটা-আটটার দিকে প্রভাতফেরি শেষ করে বাড়ি ফিরতাম। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন ভরপুর। মনে হতো, একুশ পালন করে আমরা যেন নিজেরাই একটু বড় হয়ে গেলাম।
আমরা তখন যেহেতু স্কুলের ছাত্র, তাই বাড়ির অভিভাবকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাত বারোটার পর ঘর থেকে বের হতে হতো। ঘুঁটঘুটে অন্ধকারে তখন বের হওয়াটা সাহসেরও ব্যাপার ছিল! সেটা ছিল এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। নিঃশব্দে দরজা খোলা, পা টিপে টিপে উঠোন পার হওয়া, তারপর অন্ধকার পেরিয়ে সঙ্গীদের ডেকে আনা, স্কুলের মাঠে মিলিত হওয়া—সবকিছুই যেন এক গোপন অভিযানের অংশ। ধরা পড়ার ভয় ছিল প্রবল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল একুশের প্রভাতফেরিতে ফুল না থাকলে কেমন দেখাবে—এই দুশ্চিন্তা। তখন ফেব্রুয়ারির শীত তখন ছিল কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। পায়ে জুতা থাকত না—এটা ছিল আমাদের নীরব অঙ্গীকার। ঠান্ডায় পা জমে যেত, কাঁকর-পাথরে কেটে যেত চামড়া। তবু আমরা খালি পায়ে হাঁটতাম। মনে হতো, ভাষাশহীদরা প্রাণ দিয়েছেন; তাদের স্মরণে আমরা এতটুকু কষ্টও সহ্য করব না?
আগেরদিনই আমরা এলাকার শহীদমিনারটি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে রাখতাম। সেই সময় এসব কাজ করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকের কোনো অভাব হতো না। সবাই নিজ দায়িত্বে কাজ করত। কাজ শেষে কেউ কখনও একটা চা-সিঙারা খাওয়ার জন্যও বায়না ধরত না!
স্কুলজীবন পেরিয়ে কলেজে ওঠার পর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, মঞ্চ তৈরি, পোস্টার লেখা, চাঁদা তোলা—সবই ছিল আমাদের হাতে। এলাকার বড়রা সহযোগিতা করতেন। বয়সে ছোট হলেও আমাদের নেতৃত্ব মেনে নিতেন। সেই সামাজিক আস্থা আমাদের সাহস জোগাত।
কবিতা বাছাই, গান অনুশীলন, বক্তৃতা প্রস্তুত—এসব নিয়ে দিনের পর দিন ব্যস্ততা চলত। এলাকার এক তরুণ কবি আমাদের উচ্চারণ শোধরাতেন, আবৃত্তির ভঙ্গি ঠিক করে দিতেন। কয়েকজন বড় ভাই মঞ্চসজ্জা ও পোস্টার তৈরিতে অকাতরে সাহায্য করতেন। চাঁদা তোলার অভিজ্ঞতাও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। দোকানদারদের কাছে যাওয়া, এলাকার বড়দের সঙ্গে কথা বলা—সব জায়গায় আমরা পেয়েছি উৎসাহ। বয়সে ছোট হলেও কেউ আমাদের অবহেলা করতেন না। বরং বলতেন, ‘ভালো কাজ করছ, এগিয়ে যাও।’ সেই সামাজিক স্বীকৃতি আমাদের আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিত।
আমাদের সমাজটা তখন যেন অন্য রকম ছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়বদ্ধতা আর দেশপ্রেমের এক অদৃশ্য সুতায় সবাই বাঁধা ছিল। ছোটদের উদ্যোগকে বড়রা সম্মান দিতেন। আমরা শিখেছিলাম—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মমর্যাদার প্রতীক। একুশ মানে কেবল শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নয়; মানে নিজের ভেতরে শুদ্ধতা আর সাহস লালন করা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতিগুলো মনে করলে এক ধরনের হাহাকার জাগে। দিন-দুনিয়া বদলে গেছে। কর্পোরেট পুঁজি জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রের মতো একুশের ফেব্রুয়ারিকেও গ্রাস করেছে। এখন একুশ মানে বর্ণমালাখচিত পোশাক, বিশেষ ফ্যাশন কালেকশন, নানা ব্র্যান্ডের ছাড়। টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ঢল নামে। বাণিজ্যিক আয়োজনের ঝলকানিতে দিবসটি যেন এক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। আয়োজন আছে, আলোকসজ্জা আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট আছে—কিন্তু সেই নিভৃত আবেগ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। খালি পায়ে প্রভাতফেরির দৃশ্য এখন বিরল। অনেক সময় দেখি, জুতা পরেই কেউ কেউ শহীদ মিনারের মূল বেদীতেও উঠে যাচ্ছেন। হয়তো সময় বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে—তবু ভেতরের সেই শ্রদ্ধাবোধ কি একটু ক্ষীণ হয়ে যায়নি?
আমরা যারা একসময় নিজেদের ‘চেতনার মশালবাহী’ ভাবতাম, তারা এখন পরিণত বয়সে পৌঁছেছি। পেছনে তাকালে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে সেই আবেগ, সেই দায়বদ্ধতা পৌঁছে দিতে পেরেছি? নাকি বাস্তবতার অজুহাতে নিজেরাই দূরে সরে গেছি? একুশের চেতনার জায়গাটি কোথায় হারাল? একুশ কি কেবল একটি থিম-ডে? একটি ফটোসেশন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করে দায় সারা?
কৈশোরের একুশ আমাদের শিখিয়েছিল—ভাষা মানে আত্মপরিচয়, ভাষা মানে স্বাধীনতার স্বর। সেই শিক্ষা পরিবার যেমন দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে আমাদের ছোট্ট শহরের উদার সমাজ। ভালো মানুষ হওয়ার, দেশের জন্য কিছু করার যে মন্ত্র আমরা পেয়েছিলাম, তার বড় অংশই এসেছে সেই প্রভাতফেরির কুয়াশাভেজা সকাল থেকে।
আজও একুশে ফেব্রুয়ারি এলে, অজান্তেই মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলো। মনে হয়, আবার যদি খালি পায়ে হাঁটা যেত, আবার যদি মাইকে গান ধরতে পারতাম—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’। সময় ফিরে আসে না, কিন্তু স্মৃতি আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই পবিত্র ভোরে, যেখানে একদল কিশোর বিশ্বাস করত—ছোট্ট ত্যাগ দিয়েই বড় ইতিহাসকে সম্মান জানানো যায়।