Published : 20 Dec 2025, 10:39 PM
ঢাকা থেকে বেরিয়ে টঙ্গীতে ঢোকার মুখেই বাস থেমে যায়। পাকি সেনাদের ইশারায় লোহার তৈরি লাল রঙের ব্রিজের গোড়ায় দাঁড়িয়ে পড়তে হয় সবাইকে। কলেজপড়ুয়া ছেলেদের বাস থেকে নামিয়ে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো হচ্ছিল। ভাইজান—কামাল ভাই—তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। বয়স কম, কিন্তু লম্বা-চওড়া গড়নের কারণে তাকেও লাইনে দাঁড়াতে হলো।
বাসের ভেতরে আম্মার সঙ্গে আমরা ভাই-বোনেরা অপেক্ষা করছি। আব্বা নেমে গিয়ে কথা বললেন। তিনি ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। সেই পরিচয়েই হয়তো ভাইজান সেদিন রেহাই পেল।
আজও যতবার আবদুল্লাহপুর হয়ে টঙ্গীর দিকে যাই, সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে—একটি লাল ব্রিজ, কয়েকটা বন্দুক, আর শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা।
আমাদের বাবা ছিলেন রেলওয়ের চাকরিজীবী, যুক্ত ছিলেন শ্রমিক লীগের সঙ্গে। এক বিকেল কিংবা সন্ধ্যায়—ঠিক মনে নেই—আব্বা-আম্মা বাইরে থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ নিয়ে কথা বলছিলেন। শেখ মুজিব তখন ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেছেন। অনুমান করি, দিনটি ছিল ৭ই মার্চ ১৯৭১।
আমার তখন এসব বোঝার বয়স নয়। আমি আনন্দে মেতে আছি চিনির তৈরি আম আর পিঙ্ক রঙের গ্লাস পেয়ে। চিনির সেই আমটি যেন সত্যিই আমগাছের ছোট ডালে ঝুলছে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কয়েকদিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হলো। আমার কাছে যুদ্ধ মানে দূর থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দ। আমরা থাকতাম কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারে—সবাই সরকারি কর্মচারী। আশপাশে পাকিস্তানি সেনাদের তেমন আনাগোনা ছিল না।
এপ্রিলের শুরুতে আব্বা আমাদের টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে রেখে আসতে রওনা হন। সেবার টাঙ্গাইল যাত্রা পথেই টঙ্গী ব্রিজে ভাইজানকে বাস থেকে নামানো হয়েছিল।
গ্রামের বাড়ি সোনালিয়ায় তখন দাদা-দাদি, চাচা—সবাই সপরিবারে এসে জড়ো হয়েছেন। সেই সময় বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় দাদাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। ১২ এপ্রিল তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। কয়েকদিন পর আমরাও আবার ফিরে আসি কলাবাগানে।
রোজার ঈদের চাঁদ উঠেছে। নিউ মার্কেটে আব্বার একটি শাড়ির দোকান ছিল। কর্মচারীরা দোকান চালাত, তবে অফিস ছুটির পর আব্বা নিজেও বসতেন।
চাঁদ রাতে কলোনিতে ফিরেই সবাইকে বিল্ডিংয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করানো হলো। বাইরে থেকে যারা ফিরছিল, সবাইকেই। চারপাশে নীরবতা। সব বাসার আলো নিভে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ভয়ার্ত চোখে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা।
শেষ পর্যন্ত সেদিন কোনো অঘটন ঘটেনি। হয়তো সবাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাদের পরিবার বলেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন ঈদ কেমন কেটেছিল—আজ আর মনে নেই।
‘ব্ল্যাকআউট’ শব্দটা তখনই প্রথম শুনি। আমাদের বাসার জানালার কাচে গমের আটা দিয়ে তৈরি আঠা লাগিয়ে কাগজ সাঁটা হয়—ভেতরে আলো জ্বালালেও যেন বাইরে থেকে দেখা না যায়। শুধু আমাদের বাসায় নয়, চারপাশের সবাই এমনটাই করেছিল।
ঈদের কথা মনে হলেই সাইরেনের শব্দ মনে পড়ে। চাঁদ উঠলেই সাইরেন বাজত। আমাদের কাছে তখন সাইরেন মানেই ঈদ, আনন্দ। আবার ইফতার আর সেহেরির সময়ও সাইরেন বাজত।
এক ভোরে প্রথমবার দেখি—সাইরেনের শব্দে সবাই আতঙ্কিত। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘুম থেকে তুলে নিচতলার বাবু-খোকনদের বাসায় পাঠানো হলো। সবাই মেঝেতে শুয়ে থাকি—এতে নাকি বোমা বা গুলি থেকে বাঁচা যায়।
একদিন কলোনির বাসাগুলোতে পাকিস্তানি সেনাদের তল্লাশি। আমাদের বাসায় কী খুঁজেছিল, মনে নেই। শুধু মনে আছে—ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার টানতেই পুরোটা বের হয়ে আসে। সেটি আবার বসাতে গিয়ে এক খানসেনার হাতে সামান্য চাপ লাগে। কিন্তু কোনো অঘটন ছাড়াই তারা চলে যায়।
আমাদের বাসায় রেডিও ছিল। সন্ধ্যার পর খুব কম শব্দে আমরা সবাই মিলে রেডিও শুনতাম—বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। পরে জেনেছি, এম আর আখতার মুকুলের কণ্ঠ—‘ছেল কুত কুত’—সেই ডায়লগ এখনো কানে বাজে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ তো এতবার শুনেছি যে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের তিনতলার বাসা থেকে সরাসরি তেজগাঁও এয়ারপোর্ট দেখা যেত। লাইটহাউসের সার্চলাইট ঘুরে ঘুরে সংকেত দিত, আর সেই আলো এসে পড়ত আমাদের বারান্দায়।
কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর প্রান্তের ৬ নাম্বার বিল্ডিং-এ ছিল আমাদের বাসা। সেই বাসা থেকে এয়ারপোর্টের মাঝে আর কোন বিল্ডিং ছিল না, সব টিনের ঘর।

এক সকালে দূরের আকাশে একটি বিমানকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পশ্চিম দিকে পড়ে যেতে দেখেছিলাম—এয়ারপোর্টে বোমা ফেলতে এসে বিমানটি গুলিবিদ্ধ হয়।
এক সময় কলাবাগানের বাসা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আমরা বঙ্গবাজারের পাশে নিমতলীতে একটি পুরোনো বাসায় উঠেছিলাম। সম্ভবত রাতে থাকা হয়নি বা আমার মনে নেই। সেটা ছিল একটা দোতলা টিনের বাড়ি।
নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে যাত্রায় আমিনবাজার লোহার ব্রিজ পার হতেই একটি বিমান আসতে দেখে সবাই দৌড়ে রাস্তা থেকে নেমে মাঠে চলে যায়। তবে কোন অঘটন ছাড়াই ২দিন ২ রাত পরে আমরা টাঙ্গাইল পৌঁছাই। সে যাত্রায় ঢাকা থেকে হেঁটেই যেতে হয়েছিল। প্রথম রাত কোন এক গ্রামে কাটাতে হয়েছিল। বাড়িটা খুব সুন্দর, গোছালো ছিল। আর দ্বিতীয় রাত ছিল গোড়াই। বড় রাস্তার সঙ্গেই একটি বেড়ার ঘরে খড় বিছিয়ে আমাদের থাকবার আয়োজন ছিল। যতবারই ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল গেছি, সে বাড়িটা বোনরা দেখিয়ে গল্প করত। তাই আমারে মনে থেকে গিয়েছিল।
গোড়াইয়ের সেই বাড়িটি এখন ওভারব্রিজের দখলে চলে গেছে।
টাঙ্গাইলে পৌঁছে দেখি—বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে কবরের মতো গর্ত খোঁড়া। বোমা পড়লে সেখানেই আশ্রয় নিতে হবে।
করটিয়া বাজারে আগুন লাগার পর গ্রাম ছেড়ে পালানোর কথা ওঠে। করটিয়ার ওদিকে পাকিদের ঘাঁটি। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তরিতরকারি-মুরগী, চাল–এসব সংগ্রহ করত।
আমাদের গ্রাম থেকে করটিয়া যেতে ছোট একটি খাল পার হওয়া লাগত। খালের উপর ছোট বাঁশের সাঁকো ছিল। সেই সাঁকোতে পাকিরা চেকপয়েন্ট বানিয়েছিল। যাতায়াতকারী সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ করে, তবেই পারাপার করতে দিত। এমনই এক বিকেলে গ্রামের এক লোক সাঁকো পার হতে যেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি। সেদিনই পাকিরা গ্রাম থেকে খাবার সংগ্রহ করে ফিরেছে।
যে-লোকটা সাঁকো পার হতে যেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি, সে সেদিন পাকিদের মুরগি ধরে দিয়েছিল।
পাকিদের জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে সে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছ না? হাম না একটু আগে মুরগি ধরে দিয়েঙ্গা?’
লোকটার সঙ্গীদের মাধ্যমে এটা প্রচারিত হবার পর, সে গল্পে তখন সবাই হেসেছিল। ভয়ের মাঝেও মানুষ হাসতে জানত। সে সময়ের গ্রামের মানুষরা এখনো হয়তো গল্পটা মনে রেখেছেন।
এই সময় আমার হুপিং কাশি হয়। কিছু খেলেই বমি হতো। স্কুলশিক্ষিকা আম্মা যুদ্ধের মাঝেও প্রতিদিন দুধ-ডিমের ব্যবস্থা করতেন।
একদিন গ্রাম থেকেও পালাতে হয়। আমরা চলে যাচ্ছি দূরের এক গ্রাম মাদারজানিতে। ফুফুর শ্বশুর বাড়ি। বড় চাচাতো ভাই, জগ্নু ভাই আমাকে কাঁধে নিয়ে দৌঁড়াচ্ছেন। পথে একটা খাল পার হতে গিয়ে দেখি, রিজু আপা বসে কাঁদছে—তার মা গুলিবিদ্ধ। খালটি ছিল অনেক বড়। দূর থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উপর মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করছিল। পাকিরাও তার পাল্টা জবাব দিচ্ছিল। আমাদের সেই গোলাগুলির মাঝ দিয়েই যেতে হয়েছে।
এই সময় আমার হুপিং কাশি হয়। খেললেই বমি। স্কুলশিক্ষিকা আম্মা যুদ্ধের মাঝেও প্রতিদিন দুধ-ডিমের ব্যবস্থা করতেন। একদিন গ্রাম থেকেও পালাতে হয়। আমরা চলে যাচ্ছি দূরের এক গ্রাম মাদারজানিতে। ফুফুর শ্বশুর বাড়ি। বড় চাচাতো ভাই, জগ্নু ভাই আমাকে কাঁধে নিয়ে দৌঁড়াচ্ছেন। পথে একটা খাল পার হতে গিয়ে দেখি, রিজু আপা বসে কাঁদছে—তার মা গুলিবিদ্ধ। খালটি ছিল অনেক বড়। দূর থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উপর মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করছিল। পাকিরাও তার পাল্টা জবাব দিচ্ছিল। আমাদের সেই গোলাগুলির মাঝ দিয়েই যেতে হয়েছে।
দিন কয়েক মাদারজানি থাকবার পর চলে যাই কালিয়াকৈরের চাঁনপুর গ্রামে। তৎকালীন মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজের ভেতর দিয়ে গিয়ে বিলের মাঝে সেই গ্রাম। ছোট খালার শ্বশুর বাড়ি।
এই গ্রামে ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। দিন কয়েকের মধ্যেই মুক্তিবাহিনীর সবার পছন্দের পাত্র হয়ে যাই। কারণটা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা প্রায় পুরোটাই মুখস্থ ছিল–যেটা তাদের শুনাতাম।
ক্যাম্পের পাশেই ছোট হাট-বাজার ছিল। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ‘টানা’ কিনে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, গুঁড় আর বাদামের তৈরি সেই ‘টানা’র চাইতে মজাদার খাবার তখনো আমার খাওয়া হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে একটা পশমের টুপি দিয়েছিল। কান পর্যন্ত ঢেকে যেত। টুপিটা অনেক দিন পর্যন্ত ব্যবহার করেছি।
এই ক্যাম্পেই একবার এক রাজাকার কমান্ডারকে তার পরিবারসহ ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল। রাজাকারের স্ত্রী আর দুই কন্যা। তারা আমার আম্মা আর বোনদের সঙ্গেই থাকত। কন্যা দুজন আমার বড় দুই বোনের সমান হওয়াতে তারা বন্ধু হয়ে যায়। তারা সব সময় এক সঙ্গেই থাকত। আমার বোন দু’জন আমার চাইতে ২ আর ৪ বছরের বড়।
এক দুপুরের কথা মনে আছে। বোনরা মিলে মিছিল করছিল। ঘরের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে মিছিলটি চলছিল। আর মিছিলের স্লোগান ছিলো ‘জয় বাংলা‘। আমিও তাদের পেছনে পেছনে ঘুরেছিলাম।
তার দিন কয়েক পরে শোনা গেল, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। ঢাকা ফিরতে হবে। কালিয়াকৈর থেকে ঢাকা ফিরবার জন্য ছিলো মুড়ির টিন খ্যাত ছোট ছোট বাস। তার সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে মহিলাদের বসার জন্য ২টা সিট ছিলো। আর বাসে পেছনের অংশটা যেন পুরোই একটা খোপ।
আম্মা জানালার ধারে বসেছেন। আমি আম্মার কোলে। হঠাৎ দরজা খুলে যায়। ছিটিকিনির পরিবর্তে তার দিয়ে দরজাটা লাগানো ছিল। তারটি ছিঁড়ে যাওয়াতে এটা হয়েছিল। তবে আম্মা আমাকে ধরে রেখেছিলেন বলে বাস থেকে পড়ে যাইনি।
ফিরলাম ঢাকায়। তারপর একদিন আম্মার সঙ্গে ফার্মগেইটে এডভোকেট সাহারা খালার বাসার ছাদে যাই– বঙ্গবন্ধুকে দেখতে। বঙ্গবন্ধু সেদিন ঢাকা ফিরে এসেছিলেন। এখন বলতে পারি, সেদিন ছিল ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২।
পাদটীকা: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় আমার বয়স ছিল সাড়ে পাঁচ বছর। স্মৃতির অনেকটাই ভাই-বোনদের কাছ থেকে শোনা। তবু নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর আমার গভীর আস্থা আছে। কারণ—বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আজও অনেকটাই মনে রাখতে পেরেছি।