Published : 19 May 2026, 07:37 PM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দুটি প্রত্যয় বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো ফ্যাসিবাদ এবং ফ্যাসিস্ট। রাজপথের মিছিল, সংসদের বক্তৃতা, পত্রিকার কলাম থেকে সমাজ মাধ্যমের তর্ক—সব জায়গায় এই দুটি প্রত্যয় এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে বহু ক্ষেত্রে সেগুলো তাদের মূল অর্থ ও রাজনৈতিক ওজন হারিয়ে গালিগালাজের পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে অনেকের কাছে মনে হয়। অথচ ফ্যাসিবাদ একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ধারণা—যার উৎপত্তি, বিকাশ এবং চরিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে এই প্রত্যয়টির প্রকৃত বিপদকে বোঝা সম্ভব নয়। তাই ‘ফ্যাসিবাদ’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ বলতে আসলে কী বোঝায়, কীভাবে এই ধারণার জন্ম হলো এবং কোন পরিস্থিতিতে এটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাস করে—এই প্রশ্নগুলো অনুধাবন করা এই মুহূর্তে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য জরুরি।
রাজনৈতিক বিতর্কে ফ্যাসিবাদকে প্রায়ই কেবল ক্ষমতাসীন দলের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইতিহাস ও রাজনৈতিক তত্ত্ব বলে ভিন্ন কথা—ফ্যাসিবাদ কোনো একটি দলের একচেটিয়া সম্পদ নয়। এটি একটি চিন্তাপদ্ধতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা ক্ষমতায় থাকা দলে যেমন বাসা বাঁধতে পারে, তেমনি বিরোধী দল, ধর্মভিত্তিক সংগঠন, এমনকি ক্ষুদ্রতম রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যেও শিকড় ছড়াতে পারে। ফ্যাসিবাদের এই বহুমাত্রিক ও ব্যাপক চরিত্রকে বোঝার জন্যই এর ঐতিহাসিক উৎস, দার্শনিক ভিত্তি এবং সমসাময়িক প্রকাশভঙ্গি নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।
ফ্যাসিবাদের জন্ম ও ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা
ফ্যাসিবাদ কোনো একক দার্শনিকের রচিত মতবাদ নয়; বরং উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের শুরু পর্যন্ত ইউরোপে যে প্রতিক্রিয়াশীল বৌদ্ধিক স্রোত তৈরি হয়েছিল, তার সমন্বয়ে ফ্যাসিবাদের জন্ম। এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন ও ফরাসি বিপ্লবের সমতা, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল এর প্রথম উৎস। জোসেফ দ্য মেস্ত্র বা হিপোলিত তেনের মতো চিন্তকেরা যুক্তিবাদী আধুনিকতার পরিবর্তে ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব, শ্রেণী–বিভক্ত সমাজ ও ঐতিহ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি দেন। এই প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীলতা পরবর্তীকালে ফ্যাসিবাদের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় চিন্তাজগতে ফিরে যেতে হবে। জর্জ উইলহেলম ফ্রিডরিখ হেগেলের রাষ্ট্র-দর্শন, যেখানে রাষ্ট্রকে নৈতিক সত্তার সর্বোচ্চ প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট চিন্তার একটি পরোক্ষ উৎস হিসেবে কাজ করেছে। ফ্রিডরিখ নিৎশের ‘অতিমানব’ ধারণা এবং ক্ষমতার ইচ্ছার দর্শন ফ্যাসিস্ট মতাদর্শীরা সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করেছে—যদিও নিৎশে নিজে জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। জর্জ সোরেলের ‘সহিংসতার দর্শন’ এবং সিন্ডিক্যালিস্ট রাজনীতি ফ্যাসিবাদের কর্মপন্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল। ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি জেন্টিলে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণ করেন এবং তাকেই ফ্যাসিবাদের মূল দার্শনিক মস্তিষ্ক বলা যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও তার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয় ইউরোপজুড়ে গভীর সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি এই শূন্যতাকে কাজে লাগান। ১৯১৯ সালে তিনি ‘ফাসি দি কমব্যাটিমেন্তো’ নামে একটি আধাসামরিক সংগঠন গড়ে তোলেন—‘ফাসি’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘ফাসেস’ থেকে, যার অর্থ একগুচ্ছ লাঠির বান্ডিল—শক্তির প্রতীক। ১৯২২ সালে ‘রোম অভিমুখে মার্চ’-এর মাধ্যমে মুসোলিনি ইতালির ক্ষমতা দখল করেন এবং ‘ইল দুচে’ বা মহান নেতা উপাধি গ্রহণ করেন। তার শাসনব্যবস্থায় একদলীয় রাষ্ট্র, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের কারারুদ্ধ করা ও হত্যা এবং সর্বোপরি ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি কায়েম হয়।
জার্মানিতে হিটলারের নাৎসিবাদ ফ্যাসিবাদকে আরও চরম ও ভয়ঙ্কর রূপ দেয়। বর্ণবাদী মতাদর্শ, ইহুদিবিদ্বেষ এবং আর্য শ্রেষ্ঠত্বের মিথ মিলিয়ে নাৎসিবাদ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার কারণ হয়ে ওঠে। ইতালিতে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ও মিত্রশক্তির আক্রমণের ফলে। ১৯৪৩ সালে মুসোলিনিকে তার নিজের দলের গ্র্যান্ড কাউন্সিল ক্ষমতাচ্যুত এবং গ্রেপ্তার করে। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইতালির কমিউনিস্টদের নেতৃত্বাধীন পার্টিজানদের হাতে তিনি নিহত হন। তার মৃতদেহ মিলানের একটি চত্বরে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়—যা ছিল ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রতি জনরোষের চরম প্রকাশ।
কর্তৃত্ববাদ, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও বাম সমালোচনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে ক্লাসিক ফ্যাসিবাদের পতন হলেও বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন নতুন রূপে বিস্তার লাভ করতে থাকে। বামপন্থি ও প্রগতিশীল রাজনীতিবিদরা ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটিকে এমন যেকোনো শাসনব্যবস্থার সমালোচনায় ব্যবহার করতে শুরু করেন যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা, দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় ঘটে। এই সমালোচনার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন হান্নাহ আরেন্ট। তার ‘দ্য অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম’ (The Origins of Totalitarianism) গ্রন্থে তিনি ফ্যাসিবাদ ও স্তালিনবাদী সর্বাত্মক রাষ্ট্রের (Totalitarian state) মধ্যে মৌলিক মিল খুঁজে পান এবং দেখান কীভাবে রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত পরিসর গ্রাস করে নেয়।
ইতালীয় ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক উমবের্তো ইকো তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘উর-ফ্যাসিজম’ (Ur-Fascism) বা আদি ফ্যাসিবাদে ফ্যাসিবাদের ১৪টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ পূজা, আধুনিকতার প্রত্যাখ্যান, কর্মের জন্য কর্ম, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, বর্ণবাদ ও বৈষম্য, ব্যক্তিপূজা এবং শত্রুর চিরন্তন উপস্থিতির মিথ। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কয়েকটি মিললেই একটি আন্দোলন বা রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদী বলার যুক্তি তৈরি হয়। এই সংজ্ঞামূলক কাঠামোই বামপন্থিদের হাতে একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তবে ফ্যাসিবাদ ও সাধারণ কর্তৃত্ববাদের মধ্যে পার্থক্যও জরুরি। কর্তৃত্ববাদী শাসন সাধারণত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে কিন্তু সমাজকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে না। ফ্যাসিবাদ কিন্তু আরও গভীরে যায়—এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত জীবনকেও রাষ্ট্রের মতাদর্শের অধীনে আনতে চায়। এটি একটি গণআন্দোলনের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসে এবং জনগণের মধ্যে একটি সক্রিয় সহযোগী শক্তি তৈরি করে। এই কারণেই ফ্যাসিবাদ কেবল ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বিরোধী দল, ছোট দল, এমনকি সিভিল সমাজের মধ্যেও ফ্যাসিবাদী চিন্তার বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে। ইউরোপের অনেক ছোট জাতীয়তাবাদী দল, যারা নির্বাচনে নগণ্য ভোট পায়, তারাও সংগঠন পরিচালনায়, বক্তব্যে ও সহিংসতায় সুস্পষ্ট ফ্যাসিবাদী চরিত্র বহন করে।
ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ এই বিশ্লেষণের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলামবাদী আন্দোলনগুলো ইসলামকে কেবল একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি নয়—তারা ইসলামকে একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোও একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আধিপত্যের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এই দুটি ধারাই—যদিও তাদের মতাদর্শগত বিষয়বস্তু আলাদা—কাঠামোগতভাবে ফ্যাসিবাদের বেশ কিছু মূল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। একটি কাল্পনিক গৌরবময় অতীতের দিকে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, বহিরাগত শত্রুর চিরন্তন উপস্থিতির ধারণা, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনের রাজনীতি এবং ভিন্নমতকে ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা—এগুলো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের মূল উপাদান। ধর্ম এখানে মতাদর্শ হিসেবে কাজ করে এবং ক্ষমতার বৈধতার উৎস হয়ে ওঠে।
নব্য ফ্যাসিবাদের বৈশ্বিক পুনরুত্থান
একবিংশ শতাব্দীতে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি। নব্য-উদারবাদী অর্থনীতির ব্যর্থতা, বৈশ্বিকায়নের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতাশা এবং অভিবাসন সংকটকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী দলগুলো নতুন শক্তি সঞ্চয় করেছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, ইতালির ব্রাদার্স অব ইতালি, হাঙ্গেরিতে ভিক্তর অরবানের ফিডেজ পার্টি—এগুলো গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে।
লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলে জাইর বোলসোনারোর শাসনকাল ছিল এই প্রবণতার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ—সামরিক শাসনের প্রতি নস্টালজিয়া, সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ, পরিবেশ ধ্বংসের নির্লজ্জ সমর্থন এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পাঠ্যপুস্তক থেকে নেওয়া। এশিয়াতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট—ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান, মিয়ানমারে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের নামে রোহিঙ্গা গণহত্যা, ফিলিপাইনে ডুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে বিচারবহির্ভূত হত্যা—এসবই ফ্যাসিবাদী প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
নব্য ফ্যাসিবাদ পুরনো ফ্যাসিবাদ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে আলাদা—এটি সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং গণতান্ত্রিক ভাষায় কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এটি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম—এই তিনটি স্তম্ভকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে শুরু করে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও লুকান ওয়ে এই প্রক্রিয়াকে বলেছেন ‘ইলেক্টোরাল অথরিটেরিয়ানিজম’—যেখানে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকে, কিন্তু সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায্য পরিবেশ থাকে না। এখানে মিডিয়া ও প্রচারণার ভূমিকা অপরিসীম—সোশ্যাল মিডিয়া, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম একটি মিথ্যা বাস্তবতা নির্মাণ করে যেখানে নেতা সর্বদা সঠিক এবং শত্রু সর্বদা বিদ্যমান।
প্রতিরোধ ও ভবিষ্যতের রাজনীতি
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কীভাবে গড়ে উঠতে পারে—এই প্রশ্নটি নিছক একাডেমিক জিজ্ঞাসা নয়, এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক প্রশ্ন। ইতিহাস বলে, ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করতে হয় তার উত্থান পর্বেই—যখন এটিকে একটি প্রান্তিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ক্ষণস্থায়ী তৎপরতা বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তের নিষ্ক্রিয়তাই পরবর্তীকালে অপূরণীয় বিপদ ডেকে আনে। ওয়াইমার জার্মানিতে উদারনীতিবাদীরা এবং বামপন্থিরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে হিটলারকে ক্ষমতার পথ খুলে দিয়েছিলেন—এটি ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ভ্রান্তিগুলোর একটি।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা—এই চারটি স্তম্ভ শক্ত থাকলে ফ্যাসিবাদ সাধারণত শিকড় গাড়তে পারে না। কিন্তু শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেওয়াই যথেষ্ট নয়—ফ্যাসিবাদ যে বৈষম্য ও হতাশাকে কাজে লাগায়, সেই মূল সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের পুনরুত্থান আটকানো কঠিন। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রসার—এগুলোই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধের একটি গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিজেই ছিল একটি ফ্যাসিবাদী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মহাকাব্যিক আখ্যান। সেই যুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য ছিল না—এটি ছিল বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী পরিচয়কে টিকিয়ে রাখার লড়াই, যা মূলত ফ্যাসিবাদের একমাত্রিক, একভাষিক ও একধর্মী রাষ্ট্রের ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বারবার নির্বাচনি ব্যবস্থার অবক্ষয়, বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং ভিন্নমতকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করার যে প্রবণতা দেখা গেছে—তা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সুপরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এই প্রবণতা কোনো একটি বিশেষ দলের একচেটিয়া পাপ নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা দলমত নির্বিশেষে ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একইসঙ্গে ইসলামবাদী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামোর জন্য একটি বিশেষ হুমকি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দিয়েছে—কেবল ক্ষমতাসীন দলকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করলেই ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যে দল ক্ষমতার বাইরে থেকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বিরোধিতার ভাষা ব্যবহার করে, সে দলও অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমত দমন ও একনায়কতান্ত্রিক সংস্কৃতি লালন করতে পারে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো, যারা ইসলামবাদ বা হিন্দুত্ববাদের আলখেল্লায় রাজনীতি করে, তারাও ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করতে পারে—কারণ ধর্মকে রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার বানানোর প্রক্রিয়াটি মূলত ফ্যাসিবাদেরই একটি রূপ। এমনকি বামপন্থি বা প্রগতিশীল মতাদর্শের দাবিদার দলগুলোর মধ্যেও দলীয় শৃঙ্খলার নামে ভিন্নমত স্তব্ধ করার সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী প্রবণতারই প্রকাশ। তাই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইকে কেবল নির্দিষ্ট একটি দলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে না দেখে একটি ব্যাপক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এই আন্দোলনের লক্ষ্য হতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মুক্তচিন্তার সংরক্ষণ এবং সকল মতের মানুষের জন্য সমান রাজনৈতিক পরিসর নিশ্চিত করা। কারণ ফ্যাসিবাদ এক অনিবার্য ও পুনরাবর্তিত মানবিক সংকট—তার বিরুদ্ধে সতর্ক, সংগঠিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক প্রতিরোধই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের একমাত্র কার্যকর পথ।