Published : 07 May 2026, 12:11 PM
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে রাজনৈতিক উদারতাবাদ শক্ত অবস্থান তৈরি করে, যার ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে একটি উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই উদার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এক ধরনের ‘ফ্রি চয়েস’ ধারণার প্রবর্তন ঘটে। অর্থাৎ মানুষ কী খাবে, কী পরবে বা কোন ধর্ম ও বিশ্বাস লালন করবে—সেটি একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার হয়ে ওঠে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে একদল তাত্ত্বিক প্রশ্ন তোলেন যে, এই মুক্তচিন্তা কি ধর্মীয় মূল্যবোধকে বাড়িয়ে তুলবে, নাকি সেটিকে জনসাধারণের কাছে অজনপ্রিয় করে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একদল গবেষক ‘ধর্মীয় বাজার তত্ত্ব’ (রিলিজিয়াস মার্কেট থিওরি) উদ্ভাবন করেন। স্টার্ক ও বেইনব্রিজকে এই তত্ত্বের মূল চিন্তক ধরা হয়।
প্রথমে ধর্মীয় বাজার তত্ত্ব সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের উৎপত্তি হয় সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা তত্ত্বের সমালোচনা করে। ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের ভিত্তি মূলত মানুষের মনে ধর্মের যে চাহিদা তৈরি হয়, সেটির ওপর। কার্ল মার্ক্স মনে করেন, “ধর্ম হলো মানুষের মনের সেই অক্ষমতা, যার ফলে সে এমন সব ঘটনাকে মোকাবিলা করতে অপারগ, যা তার বোধগম্য নয়।” মার্ক্সের ভাষায়, ধর্ম মানুষকে কিছু ভবিতব্য ধারণার মুখোমুখি করে যা মানুষের ভাবনায় আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। মানুষের এই মনোজাগতিক সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে ধর্ম মানুষের ওপর এক ধরনের বাজার দর তৈরি করে। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে স্টার্ক ও বেইনব্রিজ ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের ধারণা নিয়ে আসেন। এই তাত্ত্বিকদ্বয় ধর্মনিরপেক্ষতা তত্ত্বের কঠোর সমালোচক এবং তারা মনে করেন এটি একটি ‘ইউরোপকেন্দ্রিক’ ধারণা যা ইউরোপে ধর্মের অবক্ষয়ের ওপর আলোকপাত করে।
স্টার্ক ও বেইনব্রিজ ধর্মীয় বাজার তত্ত্বে প্রস্তাব করেন যে, মানুষ ‘প্রাকৃতিকভাবে ধার্মিক’ এবং ধর্ম মানুষের কিছু প্রাকৃতিক চাহিদা পূরণ করে। তাই দেখা যায়, ধর্মের চাহিদা সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। মানুষ যেহেতু পুরস্কারের পেছনে ছোটে, তাই মানুষ বিকল্প সুবিধা ও অসুবিধা যাচাই করতে আগ্রহী হয়। তাত্ত্বিকদ্বয় মনে করেন, এই ধরনের প্রণোদনামূলক প্রস্তাব ও ‘ক্ষতিপূরণকারী উপাদান সরবরাহ’ করার কারণে ধর্ম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ধারণা করা হয়, মানুষ যখন বাস্তব জীবনে পুরস্কার পেতে ব্যর্থ হয়, তখন সে ধর্মের অতিপ্রাকৃত পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিতে নিজের ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করে। ধর্মের যে রাজনীতিকীকরণ, সেটি হলো সেই নবায়ন তত্ত্বের অংশ। লাইবনিজ বিশ্ববিদ্যালয় হ্যানোভার-ভিত্তিক গবেষক মাথিয়াস অপফিংগার ২০১১ সালে প্রকাশিত তার ‘ধর্মীয় বাজার তত্ত্ব বনাম ধর্মনিরপেক্ষায়ন: ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা’ নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, ধর্মীয় বাজার তত্ত্ব তিনটি মূল ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, এই তত্ত্বে ধারণা করা হয় তুলনামূলকভাবে ‘প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ধর্মালয়গুলো’ একচেটিয়া বাজারের ধর্মালয়ের চেয়ে ভালো মানের ‘ধর্মীয় পণ্য’ উৎপাদন করতে সচেষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, একচেটিয়া বাজারের ধর্মালয়গুলোর পরিসর ক্ষুদ্র হয়। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ফলে ধার্মিকতার মাত্রাও উচ্চতর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তৃতীয়ত, এই তত্ত্বে ধারণা করা হয় কল্যাণ রাষ্ট্রের বিকাশ ধর্মালয়ের গুরুত্ব হ্রাস করে।
এবার আমরা যদি নবায়ন তত্ত্বের আলোকে দুই বাংলার ধর্মীয় প্রভাবকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যায় যে বাংলার দুই পাশেই ধীরে ধীরে ধর্মের এই রাজনৈতিক নবায়ন ঘটেছে। ফলে বাঙালির মানসপটে শাশ্বত যে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল, সেটি ধীরে ধীরে ধর্মের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এই লেখায় এই তত্ত্বের ভিত্তিতে এর কারণ কী হতে পারে, সেটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ বিশ্লেষণ করা যাক। চলতি সপ্তাহে (মে ২০২৬) আমরা দেখতে পেলাম যে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি বিজেপির অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিজয় হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন পূর্ব বাংলায় ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বিজয়ের অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ধর্মীয় রাজনীতির এই বিজয় মূলত সেখানে ধর্মের রাজনৈতিক চাহিদা তৈরি হওয়ার কারণে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই রাজনৈতিক চাহিদা কী—যা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা জোগান দিতে ব্যর্থ হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, সেখানে তিন দশকেরও বেশি সময় বামপন্থী সিপিআইএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় ছিল। আদর্শগতভাবে এই ধরনের রাজনৈতিক দল মূলত ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার ঔরসজাত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সেখানে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের একটি আকাঙ্ক্ষা বিরাজমান ছিল; কিন্তু এই বাম রাজনৈতিক শক্তি সেটি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। এরপর বামপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসে কথিত মধ্যমপন্থার দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৬ সালের মে মাসে ধর্মভিত্তিক দল বিজেপির কাছে পরাজিত হয় মধ্যমপন্থার তৃণমূল কংগ্রেস। বিগত দুই দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বামপন্থীদের হাতে বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদার যে অপূর্ণতা থেকে যায়, সেই অপূর্ণতা এই সময়ে আরও অনেকাংশে বেড়ে যায়। ফলে ২০২৬ সালে এসে মানুষ তার ‘স্বভাবগত প্রবৃত্তি’র কাছে ধরা দেয় এবং ধর্মীয় রাজনীতিকে বিজয়ী করে। আপাতদৃষ্টিতে সেটি ধর্মীয় বিজয় মনে হলেও, বাজার তত্ত্বের ভিত্তিতে মানুষ আসলে তাদের এই অপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণের আশায় নতুন ধর্মীয় রাজনীতির ওপর আস্থা রাখে। বাজারে টিকে থাকার জন্য ধর্ম যেহেতু নতুন নতুন উপাদান যুক্ত করে পণ্যের উন্নয়ন ঘটায়, ধর্মের রাজনৈতিক সংস্করণ হলো সেই পণ্য উন্নয়নের নতুন উপাদান। কারণ ধর্মতাড়িত রাজনীতি মানুষকে বস্তুগত লাভের পাশাপাশি কিছু অবস্তুগত লাভের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, যা ধর্মকে আপাতদৃষ্টিতে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই বলা যায়, প্রগতিশীল রাজনীতির ব্যর্থতা মানুষকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় উদ্বুদ্ধ করে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে বলে অনুমান করা যায়। কারণ বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষতা-তাড়িত উন্নয়ননীতি ও প্রগতিশীলতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিজয়ের অন্যতম কারণ ব্যর্থতা বলে অনুমান করা যায়। এই অনুমানের বাস্তবতা কতটুকু সেটি যাচাই করতে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা আধা ডজন গবেষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের প্রত্যেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বিজয়ের পেছনে বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন।
এবার বঙ্গের পূর্বপ্রান্তের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যাক। বঙ্গের পশ্চিমপ্রান্ত পশ্চিমবঙ্গ মূলত হিন্দু অধ্যুষিত, আবার পূর্বপ্রান্ত বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত—এটি একটি সর্বজনবিদিত সত্য। বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতি এ বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মে মাসের মতোই ছিল। অনেক কসরতের পরও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ক্ষমতার মসনদ দখল করতে পারেনি। যদিও বিরোধী দল হিসেবে সংসদে আসীন হয়ে একচ্ছত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি আসলেও, বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় পায়নি। যা এক অর্থে বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিসরকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে এই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রাজনৈতিকভাবে সফল না হলেও সামাজিকভাবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই সামাজিক জনপ্রিয়তা খুব ভয়ংকররূপে ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ধর্মের চাহিদা তৈরি হয়েছে সেই একই কারণে। বাংলাদেশের বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, এখানে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চার চেষ্টা থাকলেও মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যে উৎকর্ষ আশা করেছিল, সেটি ধর্মনিরপেক্ষতা-ভিত্তিক রাজনীতি পূরণ করতে পারেনি। ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সেই সুযোগ নিয়েছে। স্বভাবজাতভাবে অদেখা ও উপভোগ্য নয় এমন বিষয়ের প্রতি যেহেতু মানুষের একধরনের আকাঙ্ক্ষা কাজ করে, সেহেতু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকরা সেই সুযোগ নিয়েছেন। যেহেতু তাদের রাজনৈতিক বয়ান একধরনের অদেখা, অজানা ও অনুভোগ্য বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, ফলে তারা এই ধরনের মুখরোচক রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে পারদর্শী। এছাড়াও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যেহেতু উপরি হিসেবে ধর্মীয় পুণ্যের বয়ান যুক্ত করে থাকে, ফলে যাদের কিছুই হারানোর নেই তাদেরকে দলে ভেড়ানো সহজ হয়। এছাড়াও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে থাকে। এই পরিস্থিতিকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তত্ত্ব খুব দারুণভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। এই তত্ত্বে ধারণা করা হয় যে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী জনগণকে বোঝাতে চায় যে, ধর্মীয় পরিচয় সুরক্ষিত থাকলে তাদের জাতীয় পরিচয় সুরক্ষিত থাকবে। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বাংলাদেশের বর্তমান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো একই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জনগণকে বোঝাতে চাচ্ছে আমাদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার জন্য তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বসানো জরুরি। কিন্তু তাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই ধরনের প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সফল হলে সেটি শুধুমাত্র ওই একক ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়; আর সেখানে থাকা অন্যান্য গোষ্ঠী অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা দেশের জন্য এক মহা বিপর্যয় ডেকে আনে। আমরা যদি বর্তমান বাংলাদেশকে এই তত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করি, তাহলে সেই প্রচেষ্টার স্পষ্ট উদাহরণ দেখতে পাব।