Published : 02 Jun 2024, 03:03 PM
আমার ডান অংশের হিপে বেশ আগে থেকেই লাইপোমা (চর্বিযুক্ত নির্দোষ টিউমার) ছিল। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন সমস্যা মনে হলে অপারেশন করতে। লাইপোমাটা ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকলে আমার স্ত্রীর পরামর্শে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিই এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডা. আহমেদ মিজানুর রহমানের কাছে অপারেশন করার জন্য ২০২১ সালের ৯ মে উপস্থিত হই। যথারীতি অপারেশন শেষে আমার বাঁ অংশের হিপে কালো দাগ, যেটিকে আমি জানতাম জন্মদাগ বলে, সেটি ডাক্তার সাহেব লক্ষ্য করেন। তিনি তখন জানান এটিকে তাঁর কাছে ক্ষতিকর মনে হচ্ছে। তিনি তখন বলছিলেন আমি যে লাইপোমা অপারেশন করতে এসেছি, সেটি না করলেও আমার কোনো সমস্যা ছিল না; কিন্তু আমি এই কালো দাগের মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু হয়তো বহন করছি বা ভবিষ্যতে করতে পারি। তখনো বুঝিনি কী অপেক্ষা করছে আমার জন্য। লাইপোমা অপারেশন করার পর অপারেশন টেবিলেই আমার অনুমতি নিয়ে ডাক্তার আবারও কালো জন্মদাগটিকে কেটে অপসারণ করলেন। সেই কালো দাগটিই বায়োপসি রিপোর্টে এল মেলিগ্যান্ট ম্যালানোমা (ত্বকের ক্যানসার)।
ক্যানসারে আক্রান্ত সকলের মতো আমাকেও ‘ক্যানসার’— এই ভয়ঙ্কর শব্দের মোকাবিলা করতে হলো। সকলের সহযোগী মনোভাবের জন্য ক্যানসার-জার্নি শুরু ও চিকিৎসাপর্বটা আমার জন্য সহজ ছিল বলে মনে হয়। সত্যি বলতে কি, মানসিক পুরো স্ট্রেসটাই নিয়েছিল আমার কমরেড, আমার স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার রিতা। আমাদের বিয়ের বয়স তখন মাত্র তিন মাস।

ক্যানসার-জার্নিতে অনেককেই ভুল চিকিৎসা ও ডাক্তারদের অসহযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। আমার অভিজ্ঞতা অবশ্য ভিন্ন ছিল। ডা. আহমেদ মিজানুর রহমান সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছেন। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে ডাক্তার জানালেন লিম্ফনোডের অপারেশন করাতে হবে। আমার আক্রান্ত স্থানের কাছাকাছি লিম্ফনোড কুঁচকিতে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ২০২১ সালেরই ১১ জুলাই লিম্ফনোডের অপারেশন করা হয়। লিম্ফনোডের বায়োপসি রিপোর্টের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। ভাবছিলাম কিছু হয়নি আমার, কিছুই হবে না। লিম্ফনোডে ক্যানসারের জীবাণু পাওয়া যায়। তবে সফলভাবে আক্রান্ত সকল লিম্ফনোড অপসারণ করা হয়েছে।
পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে তখন অন্যান্য দেশের ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। সব ডাক্তার একই পরামর্শ দেন, ইমিউনোথেরাপি দেওয়া জন্য। ইমিউনোথেরাপি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, এটি খুবই ব্যয়বহুল। মনের নানা দোদুল্যমানতার মধ্যে আমি ও আমার সঙ্গী বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মুম্বাইয়ে টাটার উদ্দেশে রওনা হই। মনের মধ্যে সব সময়ই ছিল, এই ক্যানসার শব্দটি আমার জীবন থেকে ঘুচে যাক। হাসপাতালে সকল টেস্ট করার পর কোনো ক্যানসার জীবাণু পাওয়া যায়নি। প্রথম অপারেশন দুটি সফল হয়েছে। মুম্বাই টাটা হাসপাতাল থেকেও পরামর্শ দেওয়া হয় ইমিউনোথেরাপি দেওয়ার জন্য। ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতা ছিল, উৎকণ্ঠা ছিল। ভিন্ন দেশে অচেনা পরিবেশে আমরা তখন দুজনেই মানসিকভাবে সংকটে ছিলাম।
এত ব্যয়বহুল চিকিৎসা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে মানসিক প্রশান্তি ভালো থাকার প্রচেষ্টা। অবশেষে ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং ছয় সাইকেল বাংলাদেশের সিএমএইচে সম্পন্ন হয়। একজন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর মানসিক ও অর্থনৈতিক লড়াই অন্য কারও পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
আগে যে বিষয়টি বলছিলাম, সকলের সহযোগিতার কথা; আমার অফিস, আমার পুরো পরিবার, শুভানুধ্যায়ী— সকলে সর্বাত্মকভাবে পরামর্শ দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন। এর মধ্যে একজনের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, তিনি আমাদের অভিভাবক কমরেড শাহীন রহমান। প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত তিনি তত্ত্বাবধান করেছেন। এই পর্যায়ে একটি কথার উল্লেখ করতে হয়, আমি ক্যানসারের অপারেশন করাতে না গিয়েও ডাক্তারের অনুসন্ধানী চোখে আমার শরীরে ক্যানসারের উপসর্গ ধরা পড়ে এবং ডাক্তারের দুটি অপারেশনের সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক। এখন আমার কোনো প্রকার শারীরিক সমস্যা নেই। স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি, তবে ফলোআপে থাকতে হবে সব সময়।
তো এই সকল সহযোগিতায় আত্মোপলব্ধির জায়গা থেকে অনুধাবন করতে পেরেছি, সহযোগিতার মাধ্যমে ক্যানসার-জার্নির পথটি সহজ হয়। আমিও চেষ্টা করছি আমার সক্ষমতা অনুযায়ী ক্যানসারে আক্রান্তের পাশে দাঁড়ানোর।
সেই ধারাবাহিকতায় কিছু করার পথ খুঁজতে খুঁজতে আমরা সমমনা কয়েকজন এক হয়েছি ‘সেন্টার ফর ক্যানসার কেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামের প্ল্যাটফর্মে।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পদশালী লোকদের জন্য। সকলের উপযোগী স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্মাণের পথে আমাদের হাঁটতে হবে।
লেখক: ট্রেজারার, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)