Published : 01 Dec 2025, 10:05 AM
আজ আর নতুন করে বলার অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া এক অপরিহার্য নাম। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান। তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী, দু-বার বিরোধীদলীয় নেত্রী। স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ছিলেন ফার্স্ট লেডি। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির বর্তমান চেয়ারপারসন তিনি।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজপথের আপসহীন যোদ্ধা হয়ে ওঠা—খালেদা জিয়ার এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। স্বৈরশাসক এরশাদ ও পরবর্তীতে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরোধী আন্দোলনে তিনি কখনো পিছু হটেননি। শেখ হাসিনার শাসনামলে তাকে দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি করা হয়, বিদেশে চিকিৎসায় বাধা দেওয়া হয়, সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা হয়, এমনকি তাকে স্লোপয়জনিং করার অভিযোগও উঠেছে। এক পুত্রের মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে হয়েছে, আরেক পুত্রকে সপরিবারে দেশান্তরি হতে দেখেছেন। তবু রাজনৈতিক আপস করেননি। এ শতাব্দীতে তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে নিপীড়িত রাজনৈতিক নেত্রী।
১৯৮১ সালের মাঝামাঝি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, তখনো খালেদা জিয়া গৃহবধু। ছোট ছোট দুই সন্তান তার। রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু বছর দুয়েকের মাথায় স্বামী হারানোর শোককে বুকে চেপে বিএনপির রাজনীতিতে নাম লেখাতে হয় তার। প্রথমে সদস্যপদ নেন। পরে হন দলের প্রধান। এরপর ১৯৮৪ থেকে টানা ছয় বছর সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করে গেছেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের লোক দেখানো ফাঁদ পাতানো নির্বাচনে পা না দিয়ে, তিনি ওই নির্বাচন বয়কট করে, রাজনৈতিক বেঈমানদের দূরে সরিয়ে জনতার হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ওই সময় তাকে বেশ কয়েকবার জেলে যেতে হয়, রাজনৈতিক নীপিড়নের শিকার হতে হয়, কিন্তু আপসহীন অবস্থান ছাড়েননি। পরেও বহুবার মাইনাস টু, দলে সংস্কারের নামে বহুরকম ষড়যন্ত্র হয়েছে কিন্তু তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দলের হাল ধরে রেখেছেন।
বহুবার বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রুপিং, অভ্যন্তরীণ কোন্দল হয়েছে কিন্তু তাকে তার রাজনৈতিক কর্ম থেকে টলানো যায়নি। শেষাবধি তিনিই দলের ঐক্য ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে থেকেছেন। গত দুই দশকে ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার ক্রোধ, ঘৃণা ,আক্রোশের শিকার হয়ে জেল-কারাগার-বিনা চিকিৎসা-অপচিকিৎসা-সন্তানের মৃত্যু ও পরবাস, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদসহ অকথ্য মানসিক নিপীড়ন সয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে হেঁটেছেন কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আপস করেননি। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দীর্ঘ-পিচ্ছিল-কন্টকাকীর্ণ পথ থেকে সরেননি। মজলুম ও নিপীড়িত জনগণের পাশেই থেকেছেন।
রাজনীতিতে বেগম জিয়ার অভিজ্ঞতা, পরিমিতি বোধ, দূরদৃষ্টি তাকে শুধু দলের নয় দেশের সম্পদে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক লড়াইয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে যে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, সেখানে বেগম জিয়াই একমাত্র শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক মুরুব্বি হয়ে উঠেছেন। বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোর আশা ও আস্থার প্রতীক তিনি। সকল মত ও পথের সমন্বয়ের আস্থাভাজন রাজনৈতিক শীর্ষবিন্দু। তার নিজের দল তো বটেই দলের বাইরে ইসলামপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা ও শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবিরাও তাকে সম্মান ও মান্য করেন। সেনাপরিবারের সাবেক সদস্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসাবে সশস্ত্রবাহিনীর সকলের কাছেও গ্রহণীয় তিনি। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের এই জটিল-কঠিন-বিপদসংকুল দিনে তার সক্রিয় উপস্থিতিই আশা ও ভরসার স্থল।
বিএনপির নির্বাচনি ভবিষ্যতের জন্যও তিনি এক অমূল্য সম্পদ। ওই কারণেই আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে যে ২৩৭ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে বেগম জিয়াই একমাত্র প্রার্থী যিনি তিনটি সংসদীয় আসনে লড়বার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সুস্থ ও সক্রিয় বেগম জিয়া মাঠে নামলে বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে ইতিবাচক ঝড় তোলা সম্ভব ছিল। কিন্তু তার জটিল শারীরিক অবস্থা এখন দলের জন্য সবচেয়ে বড় অশনি সংকেত।
কারণগুলো স্পষ্ট: প্রথমত, বেগম জিয়া পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে নির্বাচনি ময়দানে না নামলে বর্তমান অনুকূল রাজনৈতিক হাওয়াকে কাজে লাগানো বিএনপির পক্ষে কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে বিএনপির যেসব প্রার্থী মাঠে নেমেছেন, বেগম জিয়া সক্রিয় না থাকলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। তৃতীয়ত, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতায় তার অভিজ্ঞতা ও উপস্থিতি বিএনপির জন্য অপরিহার্য। তা না থাকলে রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়বে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অজানা কারণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই মুহূর্তে দেশে না ফেরা। এমনকি মায়ের শয্যাপাশে তার উপস্থিতিও নিশ্চিত নয়। তারেক রহমানের নিজের ভাষায়, “এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে কোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”
প্রশ্ন উঠছে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বাধা কী? কেন তিনি নিজের সিদ্ধান্তে দেশে ফিরতে পারবেন না? কোথায় সমস্যা? মায়ের শারীরিক সংকটকালেও যদি স্বাধীনভাবে দেশে আসতে না পারেন, ওই সিদ্ধান্ত নিতেও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং বাংলাদেশের সংকটকালে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত কি তিনি নিতে পারবেন? এই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে দল ও দেশ পরিচালনার ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকিমুক্ত হবে? এসব প্রশ্ন জনমনে যত উঠবে, দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে এসব নিয়ে যত বিশ্লেষণ-আলোচনা হবে ততোই রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য সংকট বাড়বে। সেটার আছর পড়বে আগামী নির্বাচনে।
বাংলাদেশ এখন যে সংকটে আছে, বেগম জিয়ার সক্রিয় অনুপস্থিতি ক্ষমতার ভারসাম্য হারিয়ে চলমান সংকটকে গভীরে রূপ দিতে পারে। রাজনীতিতে ‘মাইনাস ফর্মুলার’ যে গুঞ্জন শোনা গেছে তা সত্য হয়ে উঠতে পারে। অনেকের ধারণা দেশে সকল ধরনের উগ্রপন্থীদের তৎপরতা বাড়তে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তার বিদেশী মিত্রদের সহায়তায় এই সুযোগকে কাজে লাগালে তা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে জটিল করে তুলতে পারে। তা বিএনপিকেও ভোগাতে পারে।
খালেদা জিয়ার উপস্থিতিই বিএনপি দলের কর্মী-সমর্থকদের জন্য বড় শক্তি। কারণ তিনিই দলটির ঐক্যের প্রতীক। এদেশের ইসলামী আন্দোলন ও আলেম-উলামার সঙ্গে তার ইতিবাচক সম্পর্ক আছে। ইসলামপন্থীদের কাছে তিনি গ্রহণীয়। তার সক্রিয় অনুপস্থিতিতে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়তে পারে। তার প্রভাব রাজনীতি ও নির্বাচনে পড়তে পারে। এমনকি নিজ দলের র্যাডিক্যাল ও ধর্মপন্থী অংশগুলোর বিরাগভাজনের কারণ হতে পারে। সেটাও বিএনপির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বেগম জিয়ার সুস্থতা ও সক্রিয়তা তাই এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য তো বটেই, দেশের জন্যও জরুরি।