Published : 07 Feb 2026, 07:31 PM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শাসনতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এ দেশের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এবং এদের নানা রূপ ও সংমিশ্রণ ঘুরে ফিরে এসেছে। কেউ মনে করেন গণতন্ত্রই একমাত্র মুক্তির পথ, কেউ বিশ্বাস করেন ইসলামিক শাসনতন্ত্রই ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, আবার কেউ সমাজতন্ত্রকে দেখেন বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার একমাত্র বিকল্প হিসেবে।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের মতো করে ইশতেহার ঘোষণা করছে, যেখানে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একেকটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। এমনকি একই দলের প্রার্থীরাও নিজ নিজ এলাকার বাস্তবতা ও ভোটের অঙ্ক বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষের সামনে প্রশ্ন জাগছে, এত ভিন্ন ভিন্ন কথা ও প্রতিশ্রুতির ভিড়ে আসল সত্যটা কোথায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ইশতেহার আর বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক দীর্ঘদিন ধরেই রয়ে গেছে। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই জনগণ শুনেছে উন্নয়নের আশ্বাস, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই এসব আশ্বাসের সঙ্গে মেলে না। শাসনতন্ত্রের নাম যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ন্যায়বিচার পাওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এবং রাষ্ট্রের সেবা সমানভাবে পাওয়া এই মৌলিক বিষয়গুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলে, শুধু আদর্শের ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না, যদি সেই আদর্শ বাস্তবায়নের মতো কার্যকর ব্যবস্থা ও সদিচ্ছা না থাকে।
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন শাসনতন্ত্র অনুসরণ করেও উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে। ইউরোপের অনেক দেশ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই সামাজিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে ইসলামিক মূল্যবোধকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেও আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। আবার চীন, ভিয়েতনাম বা কিউবার মতো দেশে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের উদাহরণ তৈরি হয়েছে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, শাসনতন্ত্রের নাম বা আদর্শ একা উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। মূল শক্তি আসে আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল জায়গাটিও এখানেই। এখানে শাসনতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক যতটা তীব্র, আইনের শাসন বাস্তবায়নের প্রশ্নে ততটাই দুর্বলতা রয়ে গেছে। আইনের শাসন বলতে শুধু আইন থাকা বোঝায় না, বরং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়াই এর মূল কথা। একজন সাধারণ নাগরিক, একজন রাজনৈতিক কর্মী বা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, সবার ক্ষেত্রেই আইন একইভাবে কার্যকর হবে এই নিশ্চয়তাই আইনের শাসনের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ক্ষমতা ও পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্নতা তৈরি হয়। এই বৈষম্যই ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
ইশতেহারগুলোতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা প্রায় সব দলই বলে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এসব শব্দ ও বাক্য বহুবার শোনা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব প্রতিশ্রুতি কতটা আন্তরিক এবং কতটা বাস্তবায়নযোগ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে না পারলে কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি মাঠে কোনো ফল দেয় না। এখানে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়, বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগও সমানভাবে জরুরি।
একজন নাগরিক যখন অন্যায়ের শিকার হন, তখন তার প্রথম প্রত্যাশা থাকে ন্যায়বিচার পাওয়ার। সেই অন্যায় যদি রাজনৈতিক সহিংসতা, ভূমি দখল, প্রশাসনিক হয়রানি বা আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে ঘটে, যে কোনো ক্ষেত্রেই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার কারণে বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা ভেঙে পড়ে। এই আস্থাহীনতাই সমাজে অসন্তোষ তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো এই আস্থার সংকট। অর্থনৈতিক সূচকে কিছু অগ্রগতি হলেও ন্যায়বিচার ও সুশাসনের প্রশ্নে ঘাটতি রয়ে গেছে বলে বহু মানুষের অভিযোগ। বিনিয়োগকারীরা আইনি নিরাপত্তা চান, সাধারণ মানুষ চান দৈনন্দিন জীবনে শান্তি ও সুবিচার। এই দুইয়ের কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব নয় যদি আইনের শাসন দুর্বল থাকে। ফলে উন্নয়নের গল্প যতই জোরালো হোক, তার ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয় তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।
রাজনৈতিক আনুগত্য যখন আইনের শাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলীয় পরিচয়ের কারণে অপরাধী পার পেয়ে যাওয়া বা নির্দোষ মানুষ হয়রানির শিকার হওয়া একটি ভয়ংকর সংস্কৃতি তৈরি করে। এতে করে রাজনীতির প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা বাড়ে এবং তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। অথচ একটি সুস্থ গণতন্ত্র বা যে কোনো কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটাররা শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন দেখতে চান। তারা জানতে চান, ক্ষমতায় গেলে কে কীভাবে আইনের শাসন নিশ্চিত করবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে রক্ষা করা হবে, প্রশাসনে দলীয়করণ কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত উত্তর ছাড়া ইশতেহার কেবল কথার ফুলঝুরি হয়েই থেকে যায়।
বাংলাদেশ যদি প্রকৃত অর্থে উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তাহলে শাসনতন্ত্রের নাম নিয়ে বিতর্কের বাইরে এসে মূল সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে। গণতন্ত্র, ইসলামিক শাসনব্যবস্থা বা সমাজতন্ত্র যেটাই গ্রহণ করা হোক না কেন, তার ভেতরে আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষমতাসীনদের জন্য আইন একরকম আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেকরকম এই ধারণা ভেঙে দিতে না পারলে কোনো আদর্শই সফল হবে না।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র মানে কিছু প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের সমষ্টি নয়, রাষ্ট্র মানে মানুষের আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন একজন নাগরিক বিশ্বাস করতে পারেন যে তিনি অন্যায়ের শিকার হলে ন্যায়বিচার পাবেন, তার অধিকার রক্ষা পাবে এবং তার কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাবে। ইশতেহারে আইনের শাসনের কথা লেখা থাকলেই তা বাস্তবায়িত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। যদি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো আনুগত্য আইনের শাসনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, যদি আইন সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমান হয়, তবেই বাংলাদেশ পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। এই সত্যটি যত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজ উপলব্ধি করবে, তত দ্রুতই দেশ একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হবে।