Published : 04 Mar 2026, 10:48 AM
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ পঞ্চম দিনে না গড়াতেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় তিন দেশের এই যুদ্ধের আঘাত বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের অর্থনীতিতে দিতে পারে বড়সড় ধাক্কা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাখো প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স যেমন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ধরে রাখে, তেমনি জ্বালানি আমদানির বড় অংশও আসে ওই অঞ্চল থেকে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও মূল্যস্ফীতির জন্যও বাস্তব হুমকি।
পুড়ছে ইরান
সোশ্যাল মিডিয়ায় যত হাতিঘোড়া মারা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ প্রায় একতরফা। যুদ্ধের বয়স এক দিন না পেরোতেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় শুধু ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিই নিহত হননি, তার সঙ্গে প্রাণ গেছে ইরান সরকারের আরও অন্তত ৪৯ জন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩১টি ইরানি শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। শত শত সরকারি ভবন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। হামলা হয়েছে তেহরানের প্রধান প্রধান কেন্দ্রে। এসব হামলায় হাজারখানেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বালিকা বিদ্যালয়ে নৃশংস হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী, যেখানে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৪৮ জন ছাত্রী।
যুদ্ধ ছড়িয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে
ইরান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, তারা আমেরিকার সঙ্গে আর কোনো আলোচনায় যাচ্ছে না। তারা তাদের সর্বোচ্চ নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু ইরান এটাও জানে যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে লক্ষ্যবস্তু ছুঁতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে ইসরায়েলে হামলার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো সহজ মনে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সৌদি আরবের এক তেল শোধনাগার থেকে বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ওই শোধনাগার বন্ধ ঘোষণা করা হয়। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়েছে ইরান।
আরব আমিরাতে জ্বালানি রাখা ট্যাঙ্কারে আঘাত হেনেছে ইরানের ড্রোন। কাতার জানিয়েছে, তাদের বেশ কয়েকটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা ইরানের হামলার কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ফলে সেগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ অন্যতম। খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। শুধু লেবাননে হামলার জন্য প্রায় এক লাখ সংরক্ষিত সেনা প্রস্তুত করেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে এখন পর্যন্ত ৫২ জন নিহত ও ১৫৪ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বৈরুত।
এসব তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, যুদ্ধ ইতোমধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিরাট শ্রমবাজার, শঙ্কা
যুদ্ধ যত বিস্তৃত হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, মোট সোয়া কোটি অভিবাসীর অন্তত ৬০ লাখের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কোনো কোনো সূত্র বলছে, বাংলাদেশের মোট অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দেড় কোটি। তবে এর মধ্যে প্রায় ৬৭ ভাগের গন্তব্য সৌদি আরবে; এর পরেই রয়েছে কাতারের নাম। কুয়েত ও আরব আমিরাতেও বহু বাংলাদেশি প্রতি বছর কাজের সন্ধানে ছুটে যায়।
আবার বাংলাদেশে ঢোকা বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবেও মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশ থেকে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার। ৩৮৮ মিলিয়ন ডলার এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে; তালিকায় এই দেশটি দ্বিতীয়। বাকি দেশগুলো হলো যথাক্রমে ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্দান ও ইরাক। এর বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ হুন্ডি ও অন্যান্য অপ্রদর্শিত মাধ্যমে দেশের বাজারে ঢোকে।
বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছে এমন প্রায় সব দেশের মার্কিন ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে এসব দেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এর মধ্যে আরব আমিরাত ও বাহরাইনে একজন করে বাংলাদেশি নিহত হয়েছে; আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। দেশে ফেরার টিকিট থাকলেও ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বহু প্রবাসী ফিরতে পারছেন না। ছুটি শেষে যাদের কাজে ফেরার কথা, তারাও ফিরতে না পেরে বিমানবন্দরগুলোতে ধরনা দিচ্ছেন।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার প্রথম তিন দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী ১০২টির বেশি ফ্লাইট শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বাতিল হয়েছে; চট্টগ্রাম থেকে বাতিল হয়েছে অন্তত ২৪টি ফ্লাইট। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক যে দীর্ঘায়িত হবে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে টাকা না এলে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পেটে টান পড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানি-নির্ভর, সংকট বাড়াবে
কৃষি উৎপাদন থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি—বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি-নির্ভর। এসব জ্বালানির বড় একটি অংশ আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১,৭১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমদানিকৃত এলএনজি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮৫০ থেকে ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। একসময় দেশীয় উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছিল, কিন্তু মজুত কমে আসায় ২০১৮ সাল থেকে সরবরাহ ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে এবং আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মূলত কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে; পাশাপাশি ওমান থেকেও কার্গো আসে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়। প্রায় প্রতিটি এলএনজি কার্গোকেই বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সামুদ্রিক পথগুলোর একটি—হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, বার্ষিক বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে যার মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার। ইরান এরই মধ্যে এই প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সার কারখানা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসসংকটে ভোগা শিল্পখাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর বাইরে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত স্থাপিত কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল ব্যবহার হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা তেলের ৬৯ শতাংশ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ঢোকে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের ওপর নির্ভর করে। ফলে তেল ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে ভারতেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেলে সোয়া বাহাত্তর ডলার থেকে ৮০ ডলারে উঠে গেছে। জ্বালানি বিশ্লেষকগণ আশঙ্কা করছেন, অস্থিরতা বাড়লে তা ১৩০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এরই মধ্যে ডলার তার সংকটকালীন মুদ্রার (ক্রাইসিস কারেন্সি) গৌরব ফিরে পেয়েছে। ডলার সূচকের মান (বিশ্বের প্রধান ছয়টি মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের অবস্থান) প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডলারের দাম বাড়তে থাকলে ডলারের চাহিদাও বাড়বে। এতে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। জ্বালানির উচ্চমূল্য শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু এই যুদ্ধের তাপ বাংলাদেশের গায়ে তীব্রভাবে লাগতে পারে। বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে কর্মীদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেওয়া এবং তেল ও গ্যাস আমদানিতে বিকল্প বাজার খোঁজা ছাড়া বাংলাদেশের আপাতত আর কিছু করার নেই।