Published : 28 Apr 2026, 04:19 PM
জাতীয় সংসদে গত ৭ এপ্রিল পাস হওয়া ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ নিঃসন্দেহে সময়ের এক অনিবার্য দাবি পূরণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া অধ্যাদেশটি যখন সংসদীয় আইনে রূপ নেয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছারই প্রতিফলন ঘটায়। তবে এই আইনি অর্জনকে কেন্দ্র করে জনমনে প্রচ্ছন্ন একটি পুরোনো প্রশ্ন রয়েই গেছে। আদতে এই আইন আমাদের বিপন্ন জলাভূমির জন্য প্রকৃত রক্ষাকবচ হবে, নাকি বিগত দিনের অন্যান্য ভালো আইনের মতো এটিও ইতিহাসের ধুলোজমা নথির স্তূপে আরেকটা ‘কাজীর গরু’তে পরিণত হবে–কেতাবে থাকলেও যে গরুর অস্তিত্ব গোয়ালে খুঁজে পাওয়া যায় না।
আইনটির কঠোরতা অনস্বীকার্য। অবৈধ দখল, জলাশয় ভরাট, বিষ প্রয়োগে মৎস্য নিধন কিংবা পরিযায়ী পাখি ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলার মতো পরিবেশগত অপরাধের বিপরীতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আপাতত দৃষ্টিতে এই শাস্তির মাত্রা বেশ জোরালো মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আমরা অতীতে দেখেছি, আইনের ধারাগুলো যত বেশি কঠোর হয়, তার প্রয়োগের ফাঁকফোকরগুলো তত বেশি সংকুচিত হওয়ার বদলে চওড়া হয়। হাওর ও জলাভূমি রক্ষার লড়াইয়ে ‘শাস্তির পরিমাণ’ কখনোই প্রধান সংকট ছিল না; বরং আসল সংকট হলো আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভূমিদস্যুদের থাবা থেকে এই আইন কতটুকু মুক্ত থাকতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এর চূড়ান্ত সার্থকতা।
এখানেই মূল উদ্বেগ। ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’-এর কেন্দ্রীয় বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি অধিদপ্তরকে যে বিস্তৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বিশাল। অধিদপ্তরকে ব্যাপক ক্ষমতা দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের পরও সংস্থাটি ২৫ বছরে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত তিনটি প্রকল্পই সমীক্ষাভিত্তিক, উন্নয়নমূলক কাজ নয়। একাধিক বাস্তবায়ন প্রকল্প প্রস্তাব আকারে আটকে আছে। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা জনবল সংকট, যা মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনাকে প্রায় অকার্যকর করে রেখেছে। ফলে আইনটির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনে অধিদপ্তরের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে যৌক্তিকভাবেই গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় আইনের ঘাটতি নেই; ঘাটতি রয়েছে প্রয়োগে, জবাবদিহিতে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। অতীতে হাওর ও জলাভূমি রক্ষার নামে প্রণীত বহু আইন ও নীতিমালা বাস্তবে পরিবেশ সংরক্ষণের চেয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন আইন প্রণয়ন যতই আশাব্যঞ্জক হোক, বাস্তবায়নের কাঠামো স্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক না হলে এর কার্যকারিতা প্রশ্নের জন্ম দিতেই থাকবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ১৮ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের ওপর আরোপিত পরিবেশ সংরক্ষণের দায় কোনো প্রতীকী ঘোষণা নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সনদ (CBD), রামসার কনভেনশন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)—সবকটি বৈশ্বিক কাঠামো জলাভূমি ও সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে মানবসভ্যতার সম্মিলিত উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের হাওর অঞ্চল ক্রমেই এই আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার লঙ্ঘনের উদাহরণে পরিণত হচ্ছে।
নতুন এই আইনে পর্যটনের বিরূপ প্রভাব স্বীকার করা হয়েছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন ইতোমধ্যেই পরিবেশগত ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে। প্লাস্টিক ও বর্জ্য দূষণ, নৌযানের শব্দ, পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়া এবং স্থানীয় জীবনের ওপর বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সংকটজনক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে অবকাঠামো নির্মাণ, যা হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলা, অন্যদিকে পর্যটন সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করা—এটি কেবল নীতিগত অসামঞ্জস্য নয়, বরং সুস্পষ্ট দ্বৈততা। হাওর কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি একটি ভঙ্গুর ও উচ্চসংবেদনশীল ইকোসিস্টেম, যেখানে সামান্য ভুল হস্তক্ষেপও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। আইনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে হাওরের কৃষি আজ সম্পূর্ণরূপে রাসায়নিক নির্ভর। স্থানীয় ধানের জাত বিলুপ্তির পথে, করপোরেট কৃষি ও হাইব্রিড বীজের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা দিয়ে দূষণ কমানো বাস্তবসম্মত নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আন্তঃসীমান্ত দূষণ, যা আইনে কার্যত অনালোচিত থেকে গেছে। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের কয়লা ও পাথর খনি থেকে নির্গত ইউরেনিয়াম, সালফার, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত বর্জ্য পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভাটিতে নেমে সরাসরি হাওরের পানি, মাটি ও জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই বহিরাগত চাপকে উপেক্ষা করে কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ আইন বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না।
হাওরের সংকট তাই কেবল পরিবেশগত নয়; এটি নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আন্তঃরাষ্ট্রিক ব্যর্থতার সমষ্টি। প্রতিবছর ফসলরক্ষা বাঁধের নামে অপরিকল্পিত প্রকল্প, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, জলাধার ভরাট এবং ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে জলজ সম্পদের বাণিজ্যিক শোষণ—সব মিলিয়ে একটি জটিল সংকট কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, আইন প্রণয়ন করলেই জনস্বার্থ সুরক্ষিত হয় না। আইনের পরিপূর্ণতা, বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ এবং প্রয়োগের সক্ষমতা—এই তিনের সমন্বয় না হলে আইন শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়া মূল সংকট আড়াল করে প্রণীত আইন, যত সদিচ্ছাই থাকুক, কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন-২০২৬’-এর সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপের ওপর:
সর্বোপরি, হাওর কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আইনটি সেই গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে—এখন প্রয়োজন সেই স্বীকৃতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা। আইন প্রণয়ন সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন। ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ সেই কঠিন পথের একটি সূচনা হতে পারে—যদি আইনটি কাগজের সীমা পেরিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়, তবেই কাজীর গরু না হওয়ার নিশ্চয়তা মিলবে।