Published : 25 Mar 2026, 12:18 PM
১. এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন চালকরা, চাহিদার এক-চতুর্থাংশও তেল পাচ্ছেন না, জরুরি সেবা ব্যাহত
২. তেল না পাওয়ায় পাম্পে জনরোষ; নীলফামারীতে গ্রাহকদের রোষানলের মুখে তেলের ট্যাংকি খুলে দেখালো পাম্প কর্তৃপক্ষ
৩. জ্বালানির কৃত্রিম সংকট; নারায়ণগঞ্জ-দিনাজপুরে পাম্পে হাহাকার; পিরোজপুরে বন্ধ ফিলিং স্টেশন
৪. বোতলে তেল নেয়াকে কেন্দ্র করে নীলফামারীর টেংগনমারীতে দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত ১০
৫. তেলের অভাবে কি গাড়ি বন্ধ, প্রশ্ন বিদ্যুৎমন্ত্রীর। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না নিলে সরবরাহ ঠিক থাকবে বলে দাবি
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) এরকম আরও অনেক খবর হয়েছে—যেগুলো সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। এদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আবারও বললেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি এবং সরবরাহও কমায়নি। তাই পেট্রল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন ধরে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেউ প্রয়োজনের বেশি তেল না কিনলে অর্থাৎ স্টক না করলে সংকট থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রীর এই কথায় মনে হচ্ছে, প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনার কারণেই দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। সত্যিই কি তা-ই নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
সরকারের দাবি, গত বছরের তুলনায় এই বছর ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি তাই হয় তাহলে পেট্রল পাম্পের সামনে কেন যানবাহনের দীর্ঘ সারি? কেন অনেক পাম্প বন্ধ? কেন গ্রাহকদের রোষানলের মুখে তেলের ট্যাংকি খুলে পাম্প কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হচ্ছে যে, সত্যিই সেখানে তেল নেই? তাহলে তেল কোথায় গেল? নাকি সত্যিই মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নিয়ে বাড়িতে মজুত করছে, যাতে আরও বড় সংকট হলে তখন সামাল দেওয়া যায়।
প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, জাপানের মতো উন্নত ও সভ্য দেশেও আছে। মঙ্গলবারই একটি টেলিভিশনে খবরের শিরোনাম ছিল: জাপানে টয়লেট পেপার কেনার হিড়িক। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে দেশটির নাগরিকরা নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য, এমনকি টয়লেট পেপারও মজুত শুরু করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জনগণকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে এরই মধ্যে বেশ কিছু ছবি ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দেখা গেছে টয়লেট পেপার, বিড়ালের খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ ও পানীয়সহ নানা পণ্য কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা।
অবশ্য জাপানের জন্য এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় দেশজুড়ে টয়লেট পেপার মজুতের হিড়িক পড়েছিল, যা বাস্তবেই সংকট তৈরি করে। এরপর ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি এবং ২০১৯ সালের করোনা মহামারীর শুরুর দিকেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় জাপানজুড়ে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি চলমান জ্বালানি তেল সংকটের পেছনে নাগরিকদের এই প্যানিক বায়িংই দায়ী? যেরকম প্যানিক বায়িং দেখা গিয়েছিল করোনার সময়ে? অর্থনীতিতে বলাই হয় এরকম যে, স্বাভাবিক সময়ে যদি আপনার মাসে ১০ কেজি চাল লাগে, সেখানে আপনার মনে যদি এই ভয় ঢুকে যায় বা এই ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে সামনে চালের সংকট তৈরি হবে, তখন আপনি দোকানে গিয়ে ৫০ কেজির দুই বস্তা চাল কিনবেন। এভাবে সব লোক গিয়ে যদি বাজারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা স্বাভাবিক সময়ে যা লাগে তার পাঁচ ছয় গুণ বেশি কিনতে চায়, তাহলে একদিনেই বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেকোনো পণ্যের সংকট দেখা দেবে। প্রথম ধাপে কিছু লোক অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করবে। কিন্তু তারপরে অসংখ্য লোক বাজারে গিয়ে দেখবে চাল নেই। কারণ তখন ব্যবসায়ীরাও সুযোগ বুঝে চাল মজুত করবে এবং বলবে চাল নেই। কারণ ওই সুযোগে তারা ৫০ টাকার চাল বিক্রি করবে ৭০ টাকায়। এভাবে ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট রাতারাতি শত শত কোটি টাকা বাজার থেকে হাতিয়ে নেবে। জ্বালানির তেলের ক্ষেত্রেও কি তাহলে এই ঘটনা ঘটছে?
অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সবশেষ গত বছরের ডিসেম্বরেও এই ঘটনা ঘটে। বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি হলো এবং উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ৭ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের বৈঠকের পর লিটারে ৬ টাকা বাড়ানো হয় সয়াবিন তেলের দাম। নতুন দাম অনুযায়ী এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৯৫ টাকা। এর আগে ওই বছরের ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি ২৪ নভেম্বর তারা আবারও দাম সমন্বয়ের সুপারিশ করে।
তার মানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট যে কত শক্তিশালী, সেটি নতুন করে বলার কিছু নেই। সুতরাং, এবারের তেল সংকটের পেছনে পাম্প মালিকদের এরকম দাম বাড়ানোর কোনো দূরভিসন্ধি আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পাম্প মালিকরা দাম বাড়াতে চায় কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
তবে এবারের জ্বালানি তেলের সংকটের একটি বড় কারণ সম্ভবত সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা। কারণ সরকারের তরফে বারবার বলা হচ্ছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বা সংকট হবে না, তারপরও কেন গ্রাহকরা পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছে না এবং পাম্পের সামনে কেন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, সেটি স্পষ্ট নয়। একদিনে পাম্প মালিকরা বলছেন তেল নেই। অন্যদিকে সরকার বলছে সংকট নেই। কার কথা সঠিক?
জ্বালানিমন্ত্রী বলছেন, মানুষ অতিরিক্ত কিনতে চায় অর্থাৎ চাহিদা বেড়েছে বলে সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মানুষ ন্যূনতম জ্বালানিও পাচ্ছে না। তার ওপর অনেক পাম্প বন্ধ বা পাম্পের সামনে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তেল নেই। তার মানে কোথাও একটা গণ্ডগোল তো হয়েছে বা একটা মিসম্যাচ তো আছেই। সেটি কী? সরকার কি সেই গোমরটা জানে না নাকি ধরতে পারছে না? ধরতে না পারলে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। সরকার যদি জানে বা বোঝে যে, পাম্প মালিকরা দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন অথবা তারা বেশি দামে খোলা বাজারে তেল বিক্রি করে দিচ্ছেন এবং সেখান থেকে আরও বেশি দামে গ্রাহকরা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাহলে সেখানে সরকারের পর্যাপ্ত নজরদারি কি আছে?
ঈদের দুদিন পরে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হলো, ঈদের ছুটির কারণে ব্যাংক ও ডিপো বন্ধ থাকায় পাম্প মালিকরা নতুন করে তেল তুলতে পারেননি। ফলে মজুত দিয়েই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বললেন, মূল সমস্যা হচ্ছে পে-অর্ডার সংকট। ব্যাংক বন্ধ থাকায় আমরা পে-অর্ডার করতে পারছি না। পে-অর্ডার ছাড়া ডিপো থেকে তেল তোলা সম্ভব না। তাই চাইলেও পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। ঈদের ছুটির পর সোমবার ডিপো খোলার কথা রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, ঈদের আগে তো ব্যাংক খোলা ছিল। তখনও সংকট হলো কেন? সুতরাং এটিও কোনো শক্ত যুক্তি নয়। বরং সত্যিই কী কারণে জ্বালানি তেলের এই সংকট দেখা দিলো তার সঠিক কারণ বের করা দরকার। অসুখ চিহ্নিত করা না গেলে ওষুধ দেয়া যাবে না। উপরন্তু সরকারও কোনো তথ্য গোপন করছে কি না, সে প্রশ্নও জনমনে আছে। সরকারের দায়িত্ব জনগণকে আশ্বস্ত করা, অভয় দেয়া এটা যেমন ঠিক। তেমনি ভেতরে ভেতরে সত্যি্ই কোনো সংকট থাকলে সেটিও জনগণকে জানানো দরকার। না হয় সরকার এক কথা বলবে, আর ব্যবসায়ীরা বলবেন ঠিক তার বিপরীত—মাঝখান দিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হবে, সেটি কাম্য নয়।