Published : 30 Nov 2025, 10:40 AM
পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার প্রধানদের ক্ষমতায় থাকাকালীন বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যেভাবে সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া হয়, সেই সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। এই দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে তাদের সমর্থক গোষ্ঠির মনে পছন্দের রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্ব ছাড়া অন্যদের প্রতি কেবলই বিষোদ্গার লক্ষ্য করা যায়। সেটা হোক রাজনৈতিক প্রচার বক্তৃতা, সংসদের আলোচনা, কিংবা চায়ের কাপের আড্ডা—পক্ষ ও বিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ যেন এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন দুর্নীতি, অপশাসন এবং ব্যক্তির আচরণ নিয়েও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন সর্বদা ব্যস্ত থেকেছে।
ফলে, এই দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে—যিনি এই দেশের মানুষদের জন্য জীবনের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি শাসকদের জেলে কাটিয়েছেন—এমন একটি অর্বাচীন গ্রুপ পর্যন্ত 'টেনে হিঁচড়ে' মাটিতে নামাতে ছাড়েনি। সাড়ে তিন বছরের শাসনকালকে তারা তার জীবনের ব্যর্থতার মাপকাঠি হিসেবে দেখে এবং পরিবার-পরিজনসহ তাকে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়াকে বৈধতা দিতে কোনো লজ্জা অনুভব করেনি। রাজনৈতিক বিরোধী শিবিরের অনেক নেতা অতীতে তাকে নিয়ে এমন সব বানোয়াট ও উদ্ভট কথা-বার্তা তৈরি করেছে, যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে 'সুস্থ ধারার' ব্যক্তিত্বের চর্চা আমাদের নজরে আসেনি।
বঙ্গবন্ধুকে যেমন নানা সময়ে উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমাণ্ডার জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে ছোট করে দেখানোর প্রয়াস চালিয়েছে। শাসক হিসেবে নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে অবদানের চেয়ে জিয়াউর রহমানের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে তারা সমালোচনায় ব্যস্ত থেকেছে।
ফলে, আমাদের শাসকদের প্রতি সব শ্রেণির মানুষের শ্রদ্ধাবোধ তৈরির যে পথ রাজনৈতিক দলগুলোর করা উচিত ছিল, তা তারা করতে দেয়নি কিংবা সজ্ঞানে অবহেলা করেছে। ফলে, এই দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে পুত্রের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের মতো বিষয়গুলোও বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুসহ-পরিবারের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত অনুষ্ঠান রাজনৈতিক অঙ্গনকে বিভাজিত করেই চলেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অনেকটাই ঘৃণাবোধের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলেছে। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও এই দেশে ঘটেছে।
অথচ, এসব হওয়ার কথা ছিল না। এমনকি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু এটি ঘটেছে মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ না থাকা, সৌজন্যবোধ হারিয়ে যাওয়া এবং ক্ষমতার বিষবাষ্পে বিবেকের আড়ষ্টতার কারণে। আমরা এক অদ্ভুত প্রতিশোধপরায়ণ জাতিতে পরিণত হয়েছি। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি সৌহার্দ্যবোধ তৈরি হতো, দেশের ভাল-মন্দ নিয়ে যে কোনো আলোচনা দেশকেন্দ্রিকভাবে পরিচালিত হতো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো, তাহলে দেশের গণতন্ত্র থেকে শুরু করে অর্থনীতি এত শক্তিশালী হতো যে এটি এশিয়ার শীর্ষে চলে যেতে পারত।
কিন্তু আমরা পারিনি। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আমাদের শাসকরা তাদের বিবেক মাঝেমধ্যে বর্গা দিয়েছে, আর সেই বর্গায় কেবলই আগাছা ফলেছে। হিংসাত্মক মনোবাসনা আরও জোরালো হয়েছে, এবং সামনের দিনগুলোতেও আবারও তা হবে। এই চক্রব্যুহ থেকে আমাদের কেউ মুক্তি দিচ্ছে না। রক্তপাত ঝরিয়ে ক্ষমতার মসনদ তৈরি করা যেন আমাদের নেশায় পরিণত হচ্ছে।
৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে আমাদের চোখের সামনে অনেক ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষ যে একটি মোহনায় মিলিত হতে চায়, তার প্রমাণ আমাদের সামনে কয়েকবার এসেছে। অন্যন্য দিকগুলোর কথা এখানে বিবেচনা করলাম না, কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে যে দু’টি বিষয় নজর কেড়েছে, তা অবশ্যই আলোচনায় আসা উচিত।
একটি ঘটনা ঘটেছে এই বছরের ১৫ অগাস্ট। জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসন ব্যবস্থার প্রতি আক্রোশের অভিযোগ তুলে, এই দেশে 'বঙ্গবন্ধু' সম্পর্কিত বিষয়গুলোর প্রতি ব্যাপক আক্রমণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তার নাম মুছে ফেলা থেকে শুরু করে ভাস্কর্য ভাঙার কাজ করেছে একদল মানুষ। শুধু ভাস্কর্য নয়, ফ্যাসিবাদের ছুঁতো দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নাম্বার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এইসব দেখে দেশের মানুষ যখন অতিষ্ঠ, তখন মনে ভেতর পুষে থাকা ক্রোধের আগুন থেকে এবারের ১৫ অগাস্ট জাতি-দল-মত নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদানকে মানুষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেছে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ধরনের ঘটনার নজির ছিল না।
অন্যদিকে, এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন সারা দেশের মানুষ তার আরোগ্য কামনায় ব্যস্ত। যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত, সেই দলের অনেক নেতা-কর্মী ও সমর্থক দুই হাত তুলে তার জন্য দোয়া করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে এই ধরনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার খবর নিঃসন্দেহে এই অস্থির সময়ে আমাদের নতুন করে পথ দেখাচ্ছে এবং নতুন করে ভাবাচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেই যে তার চরিত্রহরণমূলক বক্তব্য দেওয়া বা আক্রোশের খেলা চালানো হয়, তা থেকে মানুষ যে মুক্তি চায়, তা আমাদের সাধারণ মানুষ বার্তা দিয়ে দেখাচ্ছে। সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার হাতছানি দিচ্ছে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নীতি চর্চা থাকা উচিত, তা স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।
তবে এই কথা সত্য যে, দিন শেষে বায়োলজিক্যাল বয়সের যে 'বাস্তবতা' আমাদের গ্রহণ করতে হয়, সেই কথা আমরা নেহাত 'রাজনৈতিক মেরুকরণের' নেশায় ভুলে যাই। আজকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছেছেন এবং আগামীতে হয়ত আর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে এই পথে যাত্রা করতে হবে। একই পথে আমাকে-আপনাকেও যেতে হবে। কিন্তু মুমূর্ষু ব্যক্তির প্রতি দোয়া বা ভালোবাসা জানানো কেবল সেই রাজনৈতিক দলটির নেতা-কর্মীদের জন্য হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও, এবং সর্বাপরি সারাদেশের মানুষের মধ্যেও।
কারণ, এই মানুষটি আপনার দেশের জন্য সময় দিয়েছেন এবং কাজ করেছেন। নাগরিক হিসেবে অবশ্যই আপনার দায়িত্ব থাকবে সেই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। আর এটাই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, এটাই হলো সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চার অংশ। এই ছোট কাজটি করতে যদি আপনি ভয় পান বা মনে করেন আপনার রাজনৈতিক আদর্শিক পদ-পদবি হারিয়ে যাবে, তাহলে মনে রাখুন, এই নোংরা সংস্কৃতি আপনাকেও একদিন অন্যদের শ্রদ্ধাবোধ থেকে বিরত রাখবে।
যারাই আমাদের দেশের জন্য সেবা করেছেন এবং আগামীতেও করবেন, তাদের প্রাপ্য সম্মানটি আমাদের অবশ্যই দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক আদর্শিক মতভেদ থাকবে, ভোটারের কাছে ভোটের কৌশল থাকবে, কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই দেশের এবং মানুষের জন্য কাজ করি—এটি প্রমাণ করার দায়িত্ব আমাদের সকলের রয়েছে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশ তখনই বড় হয়, যখন সেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হয়।
আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ ও সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সরকারিদল কিংবা বিরোধীদল কাগজে-কলমে থাকলেও, আমরা সবাই যে বাংলাদেশি একই সুতোয় গাঁথা, সেটিই মুখ্য বিষয় হবে। রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নতা থাকুক, কিন্তু মননে কেবল দেশটাই থাকুক। আসুন, আমরা সব ভেদাভেদ ও প্রতিহিংসাকে দূরে ঠেলে দিই এবং সবার জন্য একটি সুন্দর, উদার বাংলাদেশ গড়ে তুলি।