Published : 31 Aug 2025, 01:07 AM
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর সংঘটিত হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ এবং শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এই হামলায় গণঅধিকার পরিষদের আরও অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে দলটি দাবি করেছে। সংখ্যা যােই হোক, এটি শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যক্তি বা একটি দলের ওপর আঘাত নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক নির্লজ্জ আক্রমণ। ১৫ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যাতে আওয়ামী লীগ ও তাদের মদদদাতা কয়েকটি দল ব্যতীত প্রায় সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে, সেখানে অনেক দাবির একটি ছিল ফ্রিডম অফ অ্যাসেম্বলি বা সমাবেশের স্বাধীনতার অধিকার। এই ঘটনাটি দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিসরের ক্রমাগত সংকোচন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মাত্রা এবং আইনের শাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবমাননার স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় হামলার শিকার হন অনেকেই। ২৯ অগাস্ট সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে এই সংঘর্ষ ঘটে। গণঅধিকার পরিষদের অভিযোগ, তারা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় জাতীয় পার্টির লোকেরাই ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে উসকানি দেয়। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির দাবি, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এরপরও বিজয়নগরে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করে, যার ফলে নুরুল হক নুর রক্তাক্ত হন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। সর্বশেষ খবর বলছে, যৌথবাহিনীর লাঠিপেটায় আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের জ্ঞান ফিরেছে। নুরের মাথায় আঘাত রয়েছে। তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে; যে কারণে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছিল। তার রক্তক্ষরণ আগেই বন্ধ হয়েছে এবং জ্ঞানও ফিরে এসেছে। তবে নুর আশঙ্কামুক্ত হয়েছেন এমনটা এখনই বলা সম্ভব নয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে যে, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর্যুপরি আঘাতে নুর রক্তাক্ত হয়েছেন। অবশ্য ‘মব ভায়োলেন্স’ থামাতে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়েছে সেনাবাহিনী— এমনটাই বলছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর। তাদের দাবি, পুলিশ ‘সহযোগিতা’চাওয়ায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষের ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা সম্পৃক্ত হন এবং ‘শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা অগ্রাহ্য’ হওয়ার পর বলপ্রয়োগে বাধ্য হন।
সামরিক বাহিনী এখনো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে রাজপথে অবস্থান করছে, যার মাধ্যমে তারা সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার বৈধতা পেয়েছে। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের সমাবেশের অধিকার রক্ষার জন্য, নাকি দমন করার জন্য বাহিনী মোতায়েন করেছে? আন্তর্জাতিক আইন (জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (ICCPR), আর্টিকেল ২১) ও বাংলাদেশের সংবিধান দুটোই পরিষ্কারভাবে বলে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, দমন করা নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটিকে ‘জুলাই বিপ্লবের গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর আঘাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সরকার এই ঘটনার ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বলেছে যে, কোনো ব্যক্তি, পদ বা প্রভাব নির্বিশেষে জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে’। তবে যখন দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণে একের পর জনগণের কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে, তখন সরকারি বিবৃতি কেবল প্রথাগত দায়সারা প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হয়।
নুরের আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটির (জাতীয় পার্টি) ভূমিকা বরাবরই বিতর্কিত। এরশাদের সামরিক শাসনকালে জন্মলগ্ন থেকে বিতর্ক জাতীয় পার্টি পিছু ছাড়েনি। সবশেষে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বরাবরই জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতাসীন দলের ‘সহযোগী’ বা ‘বি-টিম’ হিসেবে দেখা গেছে। কয়েক দশক ধরে তারা কখনো শাসকের দোসর, কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে আসলে কর্তৃত্ববাদী শাসনকেই টিকিয়ে রেখেছে। এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগের বছর ২০২৩ সালে ভারত সফর শেষে প্রকাশ্যে বলেন, “কী আলোচনা হয়েছে, ভারতের অনুমতি ছাড়া বলতে পারব না।” এটি কেবল জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই নয়, বরং বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনির্ভর রাজনীতিরও নগ্ন প্রকাশ।
গণতন্ত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া তো দূরের কথা, বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট সৃষ্টি করার প্রধান সহযোগী ছিল এই জাতীয় পার্টি এবং তারাই হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনকে ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে রাখার জন্য যা যা করার সবকিছু করেছে, এমন কি জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের গণহত্যা চালানোর সময়েও চুপ করে ছিল।
রাজনৈতিক এই অবস্থাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে, কেন বিএনপি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি জোরালোভাবে সমর্থন করছে না, যদি জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের ‘বি-টিম’ হিসেবে দেখা হয়, যদি জাতীয় পার্টিকে আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই যুক্তির পেছনে কিছু জটিল রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ থাকতে পারে।
আমরা এরই মধ্যে দেখছি, জাতীয় পার্টির কার্যালয়গুলোতে হামলা শুরু হয়েছে। শুরুটা ঢাকার বাইরে থেকে হলেও আক্রান্ত হয়েছে খোদ ঢাকার কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও। হয়তো আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টির কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ হতে চলেছে। কিন্তু নুরের দল গণঅধিকার পরিষদ কার স্বার্থে মাঠে নেমেছে, এখন কারা মাঠে আছে, এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। চলবে আরও কিছু দিন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচাল করা গেলে কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা আওয়ামী লীগের লাভালাভের প্রশ্নও সামনে আসছে। কেননা, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবিতে হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে যখন দেশ আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকার ‘সকল ষড়যন্ত্র, বাধা বা নির্বাচন বানচালের প্রচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করার’ এবং ‘জনগণের ইচ্ছার জয় হবে’ এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামী পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে আসছে শুরু থেকেই। একইভাবে, গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের হাতে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের আগে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে; যদি সরকার নতুন সংবিধান প্রণয়ন না করে, তাহলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এক্ষেত্রে, বিএনপির বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি একটি বড় উদ্বেগের কারণ। এখন জামায়াত ও এনসিপি নির্বাচনে না গেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে কেবল বিএনপি ও তাদের সহযোগীরাই থাকবে, যা একক অংশগ্রহণের কারণে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাহলে হাসিনা সরকারের ‘বি-টিম’ জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি বিএনপি করছে না কি এই কারণেই?
এই হামলা এবং তাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সরাসরি সম্পৃক্ততা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক পরিসরের মারাত্মক সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। যখন রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকারকে দমন করতে সহিংস পথ অবলম্বন করে, তখন তা আইনের শাসন এবং মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি চরম অবমাননা।
সরকার একদিকে হামলার নিন্দা জানাচ্ছে এবং তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে হামলার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিরোধীদের বা রাজনৈতিক দলকে দমনে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই দ্বৈত নীতি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। যখন ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর হামলা হয় এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো তাতে জড়িত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়। এটি রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
যখন মানুষ রাষ্ট্রকে আর নিরপেক্ষ মনে করে না, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়, তবে ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ দানা বাঁধে জনমনে। এই হামলা রাজনৈতিক পরিসর সংকোচনের চেষ্টা, ভিন্নমত দমনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ এবং আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে গণতান্ত্রিক অধিকার যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তার স্পষ্ট সংকেত। একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং সকল নাগরিকের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষা অপরিহার্য। এই হামলার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই বার্তাটি প্রতিষ্ঠিত করা না গেলে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হয় রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সমাবেশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, অথবা দমন-পীড়নের পথ ধরে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।
এই মুহূর্তে সরকারের দায়িত্ব কেবল নিন্দা প্রকাশ নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উন্মুক্ত রাখা। জনগণের ইচ্ছা যেন কোনো শক্তি দ্বারা ‘ক্ষুণ্ন না হয়’, তার জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সকল নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নয়তো, গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যের পর বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার পরিবর্তে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে পারে। নুরের রক্ত এই অনিশ্চিত বাস্তবতা আমাদের সামনে নগ্নভাবে হাজির করেছে।