Published : 06 May 2026, 01:10 PM
পঁচিশ কার্যদিবস চলার পর জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। টানা ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনের পতনের প্রায় পৌনে দুই বছর পর শুরু হওয়া এই সংসদ নানা কারণে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে সরকার গঠন করা বিএনপিতে অভিজ্ঞরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন তরুণদের প্রতিনিধিও। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ সদস্যই নতুন। তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির চার সদস্যেরও এই প্রথমবারের মতো সংসদে আসা। ফলে সংসদীয় রীতিনীতি মেনে চলা থেকে শুরু করে প্রতিদিনকার আচরণ ও বক্তব্যে অনভিজ্ঞতার ছাপ ছিল স্পষ্ট।
বিশেষ করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৮ জন সদস্য নিয়ে সংসদে আসা জামায়াতের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ছিল সকরুণ। এত বিপুল সংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও জামায়াত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদকে প্রভাবিত করতে পারেনি। জুলাই সনদ, দুই স্পিকারের ধৈর্যশীল পরিচালনা, বিল উত্থাপন ও সেসব পাসের রেকর্ড, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের আইনজ্ঞ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সংসদের ভেতর ও বাইরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এসবকে ছাপিয়ে গেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক।
২.
বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা গেল, মুক্তিযুদ্ধের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উক্তিকে নানাভাবে ব্যবহার করে জুলাই আন্দোলনে সফল হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পরিকল্পনা সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রায় প্রতিদিনের সংসদ অধিবেশন মোটা দাগে অনুসরণ করার পর এটুকু বুঝলাম যে, জামায়াত যতদিন আছে, মুক্তিযুদ্ধ তার পিছু ছাড়বে না। এটিই তাদের নিয়তি! এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
৩.
একাত্তর প্রশ্নে কয়েক দশক ধরে জামায়াত নিজেদেরকে নরমালাইজ করার চেষ্টা করেছে। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান উদ্ভাবন থেকে শুরু করে বিজয় দিবসের সমান্তরালে ৫ অগাস্টকে ‘স্বাধীনতা ২.০’, মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে ‘জুলাই যোদ্ধা’, জয় বাংলার অনুরূপে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, তাদের এখনকার যৌথ মিশন হলো মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রচিত বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই সংবিধানের বিকল্প হিসেবে তারা এনেছে ‘জুলাই সনদ’। সংসদের প্রথম অধিবেশন জুড়ে এই জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে দল দুটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে গেছে।
পরিতাপের বিষয় এই যে, ৪৭-এর পর সরাসরি ৭৭-এ চলে আসা এই সনদের কোথাও বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি পর্যন্ত নেই। এটি পড়ে যে কারও মনে হবে যে, ৪৭-এর পর বাংলাদেশের আর কোনো ইতিহাস নেই; একাত্তর টুপ করে আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো বস্তু।
৪.
সরকারি দল হিসেবে গোটা অধিবেশন জুড়ে বিএনপি মনেপ্রাণে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে গেছে যে, জুলাই সনদ তারা শুধু মানেই না; বরং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বিবেচনায় রেখে এই সনদের প্রত্যেকটা লাইন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। কিন্তু সেই বাস্তবায়ন হবে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে। তবে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির কাছে এটি যথেষ্ট নয়। তাদের কথাবার্তা থেকে এটি স্পষ্ট যে, তাদের লক্ষ্য সংবিধানের জায়গায় জুলাই সনদ প্রতিস্থাপন করা।
কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে রোববার এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে এনসিপির নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, “সরকার সংস্কার ‘চায় না’, নতুন সংবিধানের দাবিতেই ফিরব।”
একটা স্বাধীন দেশের সংবিধান যারা বাতিল করে দিতে চায়, তারা কারা? তারা সেই শক্তি, যারা এই দেশটার অস্তিত্ব স্বীকার করে না! পরিতাপের বিষয় এই যে, এসব ধৃষ্টতা আমাদের দেখে যেতে হচ্ছে।
৫.
জামায়াতের আমির সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, “অনেকে বাহাত্তরের সংবিধানকে সম্মান করেন, আমি পারি না।” আরেক বক্তব্যে তিনি আবদার করলেন, “ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আসুন, আমরা এগিয়ে যাই।”
জামায়াতের আমিরকে সবিনয়ে এই প্রশ্নটি করতে চাই, ইতিহাস কি অল্প কিছু স্বর্ণালঙ্কার যে, আলমারিতে ভরে তালাবদ্ধ করে রেখে অফিসে এলাম, যেন সেটি চুরি হয়ে না যায়? নাকি ইতিহাস হলো সেই চলমান গল্প, যেটি কখনো বিদায় তো বলেই না; বরং যতভাবে আমরা তাকে তাড়াতে বা বিকৃত করার চেষ্টা করি, সে মুহূর্তের জন্য ছায়ায় ঢাকা পড়ে বটে; কিন্তু ঢাকা পড়ার সময় সমস্বরে বলে যায় যে, আবার দেখা হবে।
যে ইতিহাসের ওপর ভর করে দেশ পেলাম, যে ইতিহাসের ওপর ভর করে মুক্তিযুদ্ধ হলো, সংবিধান রচিত হলো—৫৪ বছর পরে এসে আপনি দেশ মানতে রাজি আছেন; কিন্তু সংবিধান মানতে রাজি নন, এ কেমন আবদার? অথচ এই সংবিধান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সময়কার ভিত্তি। মজার দিকটি হলো, একই মনোভাব জামায়াতের আদর্শিক সঙ্গী এনসিপিরও। প্রশ্ন আসে, ৭২-এর সংবিধানে এত অস্বস্তি কেন তাদের?
৬.
জামায়াতের অস্বস্তি মূলত সংবিধানে নয়; বরং সংবিধানের ইতিহাসে! কারণ তারা সেই দল, যারা ১৯৭১ সালে সংগঠিতভাবে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল; স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজাকার, আল বদর ও আল শামসের মতো নৃশংস গোষ্ঠী গঠন করে গণহত্যা ও ধর্ষণে সরাসরি যুক্ত ছিল কারা?
৭২-এর সংবিধান নিয়ে জামায়াতের গাত্রদাহের আরেকটি কারণ হলো, ১৯৭২ সালের সংবিধান শুধু দেশকে আইনি কাঠামোই দেয়নি, দিয়েছে নৈতিক ভিত্তি; স্পষ্ট করেছে কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে; ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে ধর্ম ব্যবসাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর জামায়াত ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতির কথা বলে। ফলে এই সংবিধান ফেলে দিতে পারলে লাভ কাদের?
ঠিক এ কারণেই যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসে, রাজাকার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে, ঠিক তখনই তাড়াহুড়ো করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়। আমিরে জামায়াত করুণ কণ্ঠে বলে ওঠেন, “চলেন অতীত ভুলে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই।”
জাতীয় ঐক্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঐক্যের নামে মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদ, চার লাখ ধর্ষণের ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে নয়। ঐক্যের আগে সত্যকে স্বীকার করে নিতে হয়, করতে হয় জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। সমঝোতার নামে স্মৃতিভ্রংশের নাম কি ঐক্য?
ইতিহাসের সত্য স্বীকার না করে মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করা হলে, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে দাবি করা হলে, সংসদে দাঁড়িয়ে নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যাবে বটে; তবে তাতে দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার গ্লানি ছাড়া আর কিছুই সামনে আসবে না। ফজলুর রহমান নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে বলবেন—“এই বাংলায় শুধু বেলি-চামেলি আর জুঁই ফুল ফোটে না, এ দেশে শুধু কোকিল ডাকে না। এ দেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও থাকে। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে; রাজাকার কোনোদিন এই দেশে জিতবে না।”
৭.
অধিবেশনের সমাপনী দিনে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের বক্তব্য নিয়ে দুটি কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। জামায়াতের আমিরের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি বললেন, “মুজিব বাহিনীর লেখা সংবিধান মানি না।” মুক্তিযুদ্ধের পর নাকি মুজিব বাহিনী খুঁজে খুঁজে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর বাকিদের হত্যা করেছে। তার ভাষায়, “৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফও-র অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল তারা। বাহাত্তরের সংবিধান উত্তরাধিকারসূত্রে অগণতান্ত্রিক... স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত।”
সত্যের কি অপলাপ! মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিখতে হচ্ছে নাহিদ ইসলামের কাছ থেকেও!
৮.
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে হওয়া মুক্তিযুদ্ধে অনেকগুলো স্বতন্ত্র বাহিনী ছিল, যেমন: কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আফসার বাহিনী, সিরাজ শিকদার বাহিনী ইত্যাদি। এসব বাহিনীর সদস্যরা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকেছে। দেশে ফিরে পাকিস্তানি ও তার এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
মুজিব বাহিনী অবশ্য স্বতন্ত্র বাহিনীগুলোর মত নয়। মুজিববাহিনীর কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মণি। শুধু আওয়ামী লীগাররা নয়, বিএনপি নেতা শাজাহান সিরাজ, জয়নুল আবেদিন ফারুক, আ ন ম এহসানুল হক মিলন, আবদুস সালামেরাও তো একাত্তরে মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে বেশ কয়েকবার নাম পরিবর্তন করে নিউক্লিয়াস, স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস, জয় বাংলা বাহিনী, মুজিব বাহিনী—নানা নাম ধারণ করেছে।
এই যে বাংলাদেশ নামক দেশের জাতীয় পতাকা নির্ধারণ, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ, জাতীয় চার মূলনীতি প্রণয়ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ধ্বনি–‘জয় বাংলা’ স্লোগান–সবই এসেছে এই বাহিনীর নেতৃত্বস্থানীয়দের মাথা থেকে।
৯.
৫ অগাস্টের পর থেকে এটি স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে নাহিদ ইসলামদের শিক্ষা খণ্ডিত। তার চেয়ে জরুরি কথা হলো, নাহিদ ইসলামদের সমর্থিত সরকারের টিকা কিনতে ব্যর্থতা ও দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের মহামারী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা দেশ বিক্রির চুক্তি নিয়ে ৩৩ মিনিটের বক্তব্যে টুঁ শব্দ না করা, একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে জোট করে বিরোধী দলের চিফ হুইপ হওয়া নাহিদ ইসলামের কাছ থেকে আর যাই হোক, অন্তত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাতিকে শিখতে হবে না।
ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য কারো কথায় মিথ্যে হয়ে যাবে না।