Published : 12 Apr 2026, 07:55 PM
বাগেরহাটে খানজাহান আলীর মাজারের দিঘির ঘাটে নিরুপায় কুকুরটির ছটফটানি আর জলের নিচ থেকে ধেয়ে আসা শীতল মৃত্যু কেবল একটি প্রাণীর সাধারণ মৃত্যুদৃশ্য নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার গায়ে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কেউ বলছেন, এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা, আবার কেউ একে স্রেফ দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু এই তর্কের মাঝে যে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে, তা হলো প্রাণের প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা। একটি অবলা প্রাণী যখন কয়েক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের চোখের সামনে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে, তখন আমাদের মানবিকতা সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা কেন পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করতে পছন্দ করি, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অতীতের পাতায় চোখ ফেরাতে হবে।
আমার দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি দুটোই বাগেরহাটে। ছেলেবেলা থেকেই সেখানে যাওয়া-আসা। পাঁচ বোনের পর একমাত্র ভাই হিসেবে ছোটবেলায় নানা অসুখ লেগেই থাকত। ওই সময় মা- বাবা আমার সুস্থতার জন্য খানজাহান আলীর মাজারে গিয়ে কুমির ‘কালাপাহাড়’কে মুরগি মানত করতেন। প্রায় চার দশক আগের কথা। ফেইসবুক কী জিনিস কেউ জানত না, ‘ভাইরাল’ শব্দটার অস্তিত্বই ছিল না তখন। মাজারে জীবন্ত মুরগি কুমিরের দিকে ছুড়ে দেওয়া হতো তখন—একটি নয়, একের পর এক। শিশু মনে ওই দৃশ্য তীব্র ছাপ ফেলেছিল; কারণ বাড়িতে আমার পোষা মুরগি ছিল, যেগুলোকে খেলার সাথী ভাবতাম।
৪০ বছর পর আজ যখন একই জায়গায় একটি কুকুরকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও দেখি, তখন মনে হয় সময় বদলেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনস্তত্ত্ব বদলায়নি একটুও। তবে আশার কথা হলো, প্রশাসন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং মৃত প্রাণীর ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। একটি বীভৎস দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সরকারি বা প্রশাসনিক তৎপরতা কেবল ঘটনার পরেই সীমাবদ্ধ না থেকে ‘প্রতিরোধের সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা জরুরি।
ঘটনাটি নিয়ে এখন নানা মুখরোচক ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, এটি মাজারের ঐতিহ্য নষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ মহলের অপপ্রচার। আবার কারও মতে, এটি মাজারে চলে আসা দীর্ঘদিনের ‘প্রাণী বলি’রই অংশ। মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখনই কোনো সংকটে পড়ি, তখন কোনো না কোনো ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বের করে নিজেদের দায় এড়াতে চাই। মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, কুকুরটি পাগল ছিল এবং এটি একটি দুর্ঘটনা। স্থানীয় কিছু মানুষ বলছেন, এটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের লোকেদের কাজ।
কুকুরটি যদি পাগলও হয়ে থাকে, তবে তাকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করা হলো না—এটি আক্ষেপের বিষয়। আমরা অবলা প্রাণীর যন্ত্রণার চেয়ে নিজেদের ধর্মীয় বা মতাদর্শিক ব্যাখ্যাকে বড় করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটি অসুস্থ প্রাণীকে সেবা দেওয়া বা নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখা সমাজের দায়িত্ব ছিল। তাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়াটাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। ভিডিওতে কুকুরটির ওই আকুল দৃষ্টি, যা পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ের দিকে নিবদ্ধ ছিল, তা আমাদের বিবেকে দংশন করা উচিত ছিল। আমরা কেবল ভিডিও করতেই শিখেছি, হাত বাড়িয়ে কোনো প্রাণ বাঁচাতে শিখিনি। আজ বিচার আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। এই ঘটনাকে স্রেফ দুর্ঘটনা না বলে আমাদের পচে যাওয়া মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন বলাই শ্রেয়! কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত না করে একবার আমাদের নিজেদের আয়নায় মুখ দেখা উচিত।
আমাদের সমাজ অন্ধ বিশ্বাসের মোড়কে আসলে এক ধরনের সংবেদনহীনতাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। ঐতিহ্য মানে কেবল নিষ্ঠুরতা টিকিয়ে রাখা নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে আরও মানবিক করে তোলা। কুমিরকে জ্যান্ত প্রাণী না খাইয়ে বাজার থেকে আনা মাংস খাওয়ানো খুব কঠিন কোনো কাজ না। এর উত্তর আমাদের সবারই জানা অবশ্য। আমরা সংস্কারের চেয়ে কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরতেই বেশি পছন্দ করি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রথাগুলো আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। যে মানুষ একটি কুকুরের কষ্টে বিচলিত হয় না, তার পক্ষে অপর মানুষের দুঃখেও বিচলিত হওয়া কঠিন।
আমাদের চারপাশ দিন দিন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। বনের বানরকে ঢিল মারা থেকে শুরু করে অতিথি পাখিকে বিষ দিয়ে মারা—সবই যেন আমাদের বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গলির কুকুরের লেজে বাজি ফোটানো, বিড়ালের ছানাকে বস্তাবন্দি করে পানিতে ফেলে দেওয়া—এগুলো কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়।
প্রতিবেশীকে জব্দ করতে তার প্রিয় পোষা প্রাণীকে বিষ খাইয়ে মারা বিকৃত মস্তিষ্কের লক্ষণ। আমাদের শিশুরা অবলা প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে কেন আনন্দ পায়, ওই শিক্ষার উৎস আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের পরিবারগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মা ছোটবেলায় পাড়ার ছেলেদের পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন; ওই চেষ্টার মূল্য আজ উপলব্ধি করি।
আসলে পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা শুধু আইনি অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। যতক্ষণ না আমরা প্রতিটি প্রাণকে সম্মান করতে শিখব, ততক্ষণ আমাদের কোনো উন্নয়নই সার্থাক হবে না। বাগেরহাটের ঘটনাটি আমাদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—ধর্ম বা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে নিষ্ঠুরতাকে জায়েজ করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। আমাদের উচিত একটি সুন্দর সহাবস্থানের সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ আর প্রাণী উভয়েই নিরাপদে থাকবে। প্রাণীর প্রতি মমতাকে বিলাসিতা মনে না করে একটি প্রাণ বাঁচানোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশাসনের কাছে আবেদন, তদন্ত দ্রুত শেষ করুন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনুন। পাশাপাশি প্রাণী নিষ্ঠুরতা রোধে সচেতনতামূলক কাজও জরুরি। শুধু আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কিছুই বদলাবে না। আমরা ওই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার রাষ্ট্র ও সমাজ সমানভাবে নিশ্চিত করবে এবং আমাদের আর কোনো ট্র্যাজেডি ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না।
পরিশেষে বলতে চাই, খানজাহান আলীর মাজারের দিঘির কুমির শতাব্দীর সাক্ষী। চল্লিশ বছর পরও একই জায়গায় একই ধরনের নিষ্ঠুরতা দেখে প্রশ্ন উঠছে, আমরা সত্যিই বদলেছি কি না? চলুন, অন্তত নিজেদের জায়গা থেকে একটু মানবিক হওয়ার চেষ্টা করি। একটি বিড়ালের ছানা বা পথের কুকুরের প্রতি সামান্য মমতা দেখানোই হতে পারে আমাদের মানবিক হওয়ার প্রথম পাঠ।