Published : 11 Apr 2026, 02:26 PM
আমেরিকার মানুষের স্বাস্থ্য-বাসস্থান-শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক বিষয় নিয়ে সমস্যার অন্ত নেই। কিন্তু সেসব সমাধান না করে সরকার প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েই চলেছে। এবিষয়ে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট কোনো সরকারেরই ভিন্ন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই। উভয়েই ইসরায়েলের প্রতি সমান অনুগত। ফিলিস্তিনে গণহত্যা সমর্থনে, বাইডেন বা ট্রাম্প কেউই পিছিয়ে থাকেন না। আবার, আমেরিকায় ট্রাম্প বা বাইডেনের সমালোচনা করা যায় সহজেই, কিন্তু নেতানিয়াহুর সমালোচনা করা সহজ নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরায়েল নতুন করে ফিলিস্তিনিদের ওপরে গণহত্যা শুরু করলে, তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। যে বোমাগুলো গাজার মাটিতে পড়েছে, তাতে ’মেইড ইন ইউএসএ‘ লেখা। এও প্রতিষ্ঠিত যে, ইরানে যুদ্ধ শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজনই ছিল না, ইসরায়েলের প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বেশিরভাগ মুসলমান দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কথায় চলে, কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও করে। ইসরায়েল চায় পারস্য সভ্যতার উত্তরসূরি, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র আত্মপ্রত্যয়ী ও শক্তিশালী দেশ ইরানকে দুর্বল বা নিকেশ করে দিতে।
কেন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ব্যাপারে এতটাই নিবেদিত? তা বুঝতে ইতিহাস, অর্থনীতি, ধর্ম, রাজনীতি ইত্যাদির আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৬০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। পুরো বিশ্বের যেকোনো দেশে অর্থসহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এটাই সর্বোচ্চ। আর এর বেশিরভাগটাই ব্যয় হয় সামরিক খাতে। যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের দেয়া অর্থ সরাসরি ইসরায়েলের মিলিটারি মেশিনে যোগ হয়। বাৎসরিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারকে ভেঙে বলা যায়, প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ডলার যাচ্ছে ইসরায়েলে। টাকাটা ব্যয়িত হচ্ছে ফাইটার জেট, বোমা, ট্যাঙ্ক কেনা বা আয়রন ডোমের মতো মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম–এসবকিছু গড়ে তোলার জন্য। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের উদারপন্থী মানুষেরা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বেশ শ্রদ্ধা করে। কিন্তু তার সময়েই ইসরায়েলের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। ২০১৬ সালে ১০ বছরের জন্য ৩৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয় ইসরায়েলকে, যা এবছর পর্যন্ত ৩.৮ বিলিয়ান ডলার আকারে দেয়া হচ্ছিল। সরকারভেদে এর কোনো তারতম্য হবে না তা নিশ্চিতও করা হয়েছিল। আমেরিকার জনগণের জীবনযাপন-স্বাস্থ্যসেবা-শিক্ষার কী দশা হবে, তা নিশ্চিত নয়, ওদিকে ইসরায়েলের পরের যুদ্ধবিমানটি কিংবা বোমাটি কেনার টাকা নিয়ে চিন্তা রইল না।
কিন্তু লাভ সবটাই ইসরায়েলের নয়। এই অর্থের অনেকাংশ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যায়। আইন দিয়ে সিদ্ধ যে ওই অর্থের একটা বিরাট অংশ ব্যয়িত হয় আমেরিকার প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য। লকহিড মার্টিন, বোয়িং, রেথিয়ন ইত্যাদি কোম্পানির অস্ত্রই যায় ইসরায়েলে। ইসরায়েল পায় সমরাস্ত্র আর কর্পোরেশন পায় মুনাফা। আর বিল পরিশোধ করে সাধারণ আমেরিকার জনগণ। অর্থাৎ যে-টাকাটা থেকে গেল, তা গেল কর্পোরেশনের মালিকদের পকেটে। ইসরায়েলের মিসাইল প্রতিরক্ষা সিস্টেম আয়রন ডোমে ২০১১ থেকে ব্যয় হয়ে আসছে ২.৬ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিজ, রাস্তাঘাট কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারত। কিংবা উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে যেসব শিক্ষার্থী ঋণভারে জর্জরিত তার কিছু অংশ মওকুফ হতে পারত। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ লাখ লোক গৃহহীন, তাদের জন্যও কিছু করা যেত। শতকরা ১০ ভাগের কাছাকাছি আমেরিকান স্বাস্থ্যবীমা ছাড়াই বা চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াই জীবনযাপন করছে। সেসবে পরিবর্তন আসতে পারত। জনগণের করের টাকা তো জনগণের উন্নয়নের জন্যই ব্যয়িত হবার কথা। না, তার একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে, মিলিটারি খাতে, গাজা-লেবাননের শিশুদের মারতে সেই টাকা ব্যবহৃত হচ্ছে। যে অংশটি যুক্তরাষ্ট্রে থাকছে, তাও ঢুকছে বিলিয়নারদের পকেটে, সেবা আকারে জনগণের কাছে ফিরছে না।
প্রশ্ন তো উঠবেই যে, কেবল ৯০ লাখ লোকের একটি দেশ কেন সীমাহীন মার্কিন ট্যাক্স ডলার পাচ্ছে, যেক্ষেত্রে তিন কোটির বেশি আমেরিকানের মৌলিক চাহিদা পূরণের টাকা নেই?
এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলার দেয়াটা দাতব্য কাজও নয়। একে বলা যায় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রেরই সামরিক কারখানা চত্বরে বিনিয়োগ। এই প্রতিটি ডলারের বিনিয়োগের পেছনে রয়েছে মহাশক্তিশালী নেটওয়ার্কের লবি ও রাজনৈতিক প্রভাব, যাতে এই প্রক্রিয়াটি চলমান থাকে। প্রক্রিয়াটি হলো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুনাফা অর্জন।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সংস্থা, এইপ্যাক–আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি। বহু যুগ ধরেই ওয়াশিংটনে সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণি লবি সংগঠন এটি। এইপ্যাকের বাৎসরিক সম্মেলনে হাজার হাজার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, অনুদান সংস্থার সদস্য অংশ নেন। যেদলেরই হোক, আমেরিকান প্রেসিডেন্টও ওই সম্মেলনে হাজির থাকেন আনুগত্য বা প্রীতি প্রদর্শনের জন্য। এই লবি প্রতিষ্ঠান যেমন পছন্দের রাজনীতিবিদদের পেছনে টাকা ঢালে, তেমনি ইসরায়েলের নীতির সমালোচকদের রাজনীতিতে বাতিল করে দেয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ডেমোক্রেট রাজনীতিবিদ মেরিল্যান্ডের ডোনা এডওয়ার্ডস ও মিশিগানের অ্যান্ডি লেভিনের ওপর হামলা হয়েছে, কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য দেখায়, সেবিষয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরিষ্কার বার্তা দেয়া হয়, যদি এবিষয়ে প্রশ্ন করো, তবে তুমি শেষ।
এইপ্যাক ছাড়াও আরো সংস্থা আছে, যারা এই বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে কাজ করে। তেমনই হলো, ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল। আছে অ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ। এরা রাজনীতিবিদদের লাইনে রাখে, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করে, ওয়াশিংটনে দিনমান লবি করে যাতে কংগ্রেসে ও সিনেটে ইসরায়েলের পক্ষে নীতি ও আইন প্রণীত হয় বা পাশ হয়। কেবল তাই নয়, মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তাদের লোক উপস্থিত এবং পাবলিক ডিসকোর্স এভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মিডল ইস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি–এরা পলিসি ডায়লগ করে, পত্রিকায় কলাম লেখে, গবেষণা করে এবং প্রতিষ্ঠা করে যে ইসরায়েল হলো আমেরিকার সবচাইতে বিশ্বস্ত ও প্রয়োজনীয় মিত্র।
এইপ্যাক বা অন্যান্য লবি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, রাজনীতিবিদ ও অন্যদের পেছনে মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়, যাতে ইসরায়েলের জন্য কংগ্রেসে বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বরাদ্দ হয়।
আমেরিকার সব প্রেসিডেন্টই এই বন্দোবস্তের অংশ। তাদের ভূমিকাকে বলা যায় পুরো বন্দোবস্তের জেনারেল ম্যানেজারের। ওদিকে কত ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেল, বাইডেন বা ট্রাম্প, রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট, অল্প কজন ব্যতিক্রম বাদে, কারোরই কিছু যায় আসে না।
তবে অর্থ আর লবি আংশিক বাস্তবতা। এর বাইরে রয়েছে আরো কিছু গভীর বাস্তবতা। আছে এক ন্যারেটিভ, যুগ যুগ ধরে এক গালগল্প বানানো হয়েছে সুচিন্তিতভাবে। একটা গল্প হলো, আমেরিকানদের বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল হলো একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। হলিউড চলচ্চিত্র বা স্কুল টেক্সটবুকে ইসরায়েলকে চিত্রিত করা হয়েছে একটি সাহসী ছোট দেশ হিসেবে যার চারিদিকে সব শত্রু রাষ্ট্র। ফিলিস্তিনিদের গল্প এক্ষেত্রে বলাই হয় না, বা যতটুকু বলা হয়, তাদের দেখানো হয় চরমপন্থী বা আগ্রাসী হিসেবে। হামাস ফিলিস্তিনের নেতৃত্বে, তাই যেন শিশুহত্যা জায়েজ! আমেরিকার সব প্রেসিডেন্টই বলে থাকেন, আমেরিকা ইসরায়েলের সঙ্গে আছে। বা বলেন, ইসরায়েলের আত্মরক্ষা করার অধিকার আছে। বুশ হোক বা ক্লিনটন কিংবা বাইডেন হোক বা ট্রাম্প–এসব বলাবলিতে পার্থক্য নেই। এই ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করা হবে যেকোনো রাজনীতিবিদের জন্য, রাজনৈতিক আত্মহত্যার সামিল।
তবে সবচেয়ে গভীরের বিষয়টি হলো ধর্ম। লক্ষ-কোটি আমেরিকান ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান বিশ্বাস করে, বাইবেলেই বলা আছে ইসরায়েল রাষ্ট্র কেন টিকে থাকতে হবে। ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েলের পাদ্রীরা প্রকাশ্যে ফতোয়া দেন কেন, খ্রিস্টানদের ইসরায়েলকে সমর্থন করতে হবে। আর এদের ভোট কোনো প্রেসিডেন্টই হারাতে চান না। ওদিকে ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানদের বলতে শোনা যাচ্ছে, আমরা ইসরায়েলের হাতে নিগৃহীত। কেবল মসজিদ নয়, চার্চেও হামলা করে ইসরায়েল। কিন্তু আমেরিকা বা ইউরোপের অনেক খ্রিস্টান চোখ বুঁজে সমর্থন করে যাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তারা কথা বলছে না। এই যে ইহুদি-খ্রিস্টান নির্বিশেষে অনেকেই ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধকেও সমর্থন দেয়, এর উদ্ভব একটি ধারণা থেকে, যার নাম জায়নবাদ। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে, ইসরায়েলে গিয়ে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাটি জায়নবাদ নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা ফিলিস্তিনদের হত্যা ও অত্যাচারের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণে ব্যবহৃত একটি ধারণায় পরিণত হয়েছে, যার গভীরে রয়েছে বর্ণবাদ। যার সমর্থন কেবল ইহুদিদের মধ্যে সীমিত নয়, অনেক খ্রিস্টানও এই মতে বিশ্বাসী। জো বাইডেন নিজেকে জায়োনিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন।
যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই যুদ্ধ করে আসছে–ভিয়েতনামে, আফগানিস্তানে, ইরাকে, আরও কত স্থানে! ওই সামরিক কারখানা চত্বরের স্বার্থেই তারা তা করে। যুদ্ধ না হলে অস্ত্র বিক্রি হবে কী করে? এমনকি যুদ্ধের পরে সমাজ পুনর্নির্মাণজনিত উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ পায় মার্কিন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ইরাকে হামলা সমাপ্ত হলে তাই ঘটেছিল। কিন্তু মানবাধিকারসংশ্লিষ্ট নানান কর্মসূচি দিয়ে হাতের রক্তের দাগ অনেকখানি মুছে ফেলতেও পারে আমেরিকা। তবে আজকাল তারও দরকার মনে করছে না দেশটির প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দায়িত্ব নেবার পরেই, ইউএসএইডের এসব ’বাজে খরচ’ বন্ধ করার নিমিত্তে খোদ ইউএসএইডকেই বন্ধ করে দিয়েছেন। আর ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন (বাইডেনের ভাষায় ’আনওয়েভারিং সাপোর্ট’), দেশটিকে এমনকি পরাশক্তি হিসেবেও অযোগ্য করে তুলেছে। পরাশক্তি কেবল হামলা করে না, বিশ্বমোড়ল হিসেবে কিছু দায়িত্বও পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি হলো, বিকারগ্রস্ত প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন এক দেশ, যে দেশটি গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর কথামতো চলে। নব্বই লক্ষ মানুষের দেশের কথামতো চলছে পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষের দেশটি। যেন জমিদারি উচ্ছন্নে দিয়ে, মাতাল জমিদার পড়েন আছে প্রিয় যৌনকর্মীর ঘরে।
যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় ইসরায়েলপন্থী অর্ধ-ধর্ম-রাজনীতির চক্রটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধিক শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পরে ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যা কিংবা পশ্চিম তীর ও লেবাননে ধারাবাহিক হামলা কিংবা ইসরায়েলের কথামতো যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলা–এসবকিছুর কারণে, বৈশ্বিক স্তরে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে কর্মসূচি ছিল, তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেছে। গাজার হাসপাতালে কিংবা ইরানের স্কুলে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাসীর কাছে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। এমনকি যে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা নেই, লেবাননে বা গাজায় ইসরায়েল হামলা করছে মানে, প্রকারান্তরে তা যুক্তরাষ্ট্রেরই হামলা। ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রই সামনে, কিন্তু ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর ফুসমন্তরে উত্তেজিত হয়েছেন, তা বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্ট পদত্যাগের সময় টুইট করে জানিয়েছেন: “আমি আমার বিবেকের বরাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মানতে পারি না। ইরান আমাদের জন্য কোনো হুমকিই ছিল না। এটা পরিষ্কার যে, আমরা এই যুদ্ধটা করছি ইসরায়েল এবং এর শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপের কারণে।”
কিন্তু ধোঁয়াশা কেটে সব পরিষ্কার হবার আগে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে গাজা, লেবানন, পশ্চিম তীর কিংবা ইরানে। মধ্যপ্রাচ্যের ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো যতই বিমাতাসুলভ আচরণ করুক, যতই জাতিসংঘ বা বিশ্বমানবতা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকুক, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথতাকে যতই সর্বশক্তিমান দেখাক, অর্থ-রাজনীতি-ধর্ম যতই লাগামছাড়া আচরণ করুক, এই অশুভ চক্রের অবসান হবে, এবং সম্ভবত সেদিন বেশি দূরে নয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্য দিয়ে ইরান আরও শক্তিশালী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো। হরমুজ প্রণালি দখলে ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেয়নি তথাকথিত মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো। পারস্য সভ্যতাকে সমূলে ধ্বংসের হুমকির আলটিমেটাম সরিয়ে, যুদ্ধবিরতির কথা ফলাও করে প্রচারের মাধ্যমে, আসলে ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথতা পরাজিত হয়েছে।
নতুন এক ওয়ার্ল্ড অর্ডারের অপেক্ষায় বিশ্ব। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে সম্ভবত এখনকার রূপে দেখা যাবে না।