Published : 11 Feb 2026, 04:57 PM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিএনপির জন্য কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি তাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। চার দশকের অধিককালের রাজনৈতিক যাত্রায় বিএনপি বহুবার সংকটে পড়েছে, কিন্তু এবার তারা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে কঠিন। কারণ এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে দলটি ভবিষ্যতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকবে কি না।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুই শক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নির্বাচনি আচরণ এবং ক্ষমতার পালাবদলের প্রধান ভিত্তি ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের পতনের পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী—যা বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনি পরিসংখ্যানের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাংঘর্ষিক।
জামায়াতের অতীত ভোটের হার দেখলে বোঝা যায়, তারা কখনোই দেশের প্রধান শক্তি ছিল না। ১৯৯১ সালে তারা পেয়েছিল ১৮টি আসন (১২.১৩ শতাংশ ভোট), ১৯৯৬ সালে ৩টি (৮.৬১ শতাংশ), ২০০১ সালে ১৭টি (৪.২৮ শতাংশ), ২০০৮ সালে মাত্র ২টি (৪.৬ শতাংশ)। নিবন্ধন না থাকার ফলে ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থীরা কোন আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। এই পরিসংখ্যান বলে দেয় যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব ছিল সীমিত এবং ২০০১ সাল থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছিল। ফলে তাত্ত্বিকভাবে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা নয়। বরং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে খালি মাঠে বিএনপির জন্য একটি বড় জয়—অন্তত দুই শতাধিক আসনে জিতে আসার অবারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে—এমন ভাবাটাই ছিল স্বাভাবিক।
আওয়ামী লীগ পতনের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিএনপির জন্য এমন এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার জন্য দলটির কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। বিএনপি ভেবেছিল—আওয়ামী লীগ সরে গেলে রাজনৈতিক মাঠ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের দিকে ঝুঁকবে, আর আপাতত প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে কিছু থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। পতনের পর যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা বিএনপির ধারণার বাইরে ছিল। নির্বাচনি মাঠে জামায়াত যে অপ্রত্যাশিত শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে, তা বিএনপিকে এমন এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যা তারা আগে অনুমান করতে পারেনি।
এই চ্যালেঞ্জ কেবল ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে জামায়াতের দীর্ঘদিনের সামাজিক ভিত্তি, সংগঠনের কঠোর শৃঙ্খলা, প্রচারের ধারাবাহিকতা এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলা প্রস্তুতি। বিএনপি যেখানে ভেবেছিল—জামায়াতের ভোটশক্তি সীমিত, তাই তাদের নিয়ে ভাবার কিছু নেই—সেখানে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের শক্তি ভোটের শতাংশে নয়, বরং তাদের সংগঠনগত গভীরতায়। তারা যে নীরবে, ধীরে, কিন্তু অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করেছে—তার ফল আজ নির্বাচনি মাঠে স্পষ্ট।
জামায়াতের মূল শক্তি সবসময়ই তাদের কঠোর শৃঙ্খলায় বাঁধা সংগঠন, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং গ্রাম–মফস্বলের গভীরে প্রোথিত দীর্ঘদিনের উপস্থিতি। এই শক্তি কখনোই হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি বহু বছরের ধারাবাহিক কাজের ফল। গত দেড় দশকে বিএনপি যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে থেকে নিজেদের সংগঠন ধরে রাখতে হিমশিম খেয়েছে—কখনো মামলা, কখনো দমন-পীড়ন, কখনো নেতৃত্বের অস্থিরতায়—তখন জামায়াত নীরবে তাদের সামাজিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিএনপির মাঠপর্যায়ের সংগঠন যেখানে দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে জামায়াতের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে।
ফলে আজ যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা বিএনপির জন্য শুধু বিস্ময়কর নয়—বরং এ পরিস্থিতি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ বিএনপি যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে বহু বছর ধরে নিজের পাশে রেখে রাজনীতি করেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বীই আজ তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ পতনের পর বিএনপি ভেবেছিল রাজনৈতিক শূন্যতায় তারা লাভবান হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—সেই শূন্যতা পূরণে জামায়াত প্রস্তুত, সংগঠিত এবং সক্রিয়।
এখন প্রশ্ন হলো—এই নির্বাচনে যদি বিএনপি অন্তত ১৫১টি আসন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়াবে? এর অর্থ হবে—দেশের দীর্ঘদিনের দুই-মেরু রাজনীতির যে কাঠামো সেটা ভেঙে পড়েছে। কারণ যে কোনো দেশের রাজনীতিতে প্রধান দুটি দল মুখ্য ভুমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও এতদিন সেটা ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঘিরে। কিন্তু বিএনপি যদি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে পরাজিত হয়, তাহলে তারা এই দুই-মেরুর একটি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারচুপির কারণে পরাজয় হলে বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হবে এবং সেটা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি এমনটা ঘটে বিএনপি দাবি করতে পারবে তাদের হারানো হয়েছে অন্যায়ভাবে এবং সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। কিন্তু যদি নির্বাচন সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু হয় এবং জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে এবং তারপরও বিএনপি পরাজিত হয়—তাহলে সেটি হবে দলের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।
কারণ তখন জনগণের একটি অংশ ধরে নেবে যে বিএনপি আর দেশের প্রধান বিকল্প শক্তি নয়। এতে দলটির প্রতি আস্থা কমে যাবে, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং সংগঠনগত দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের জন্য এটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইতিহাস বলে—যে দল একবার রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র থেকে সরে যায়, তাদের ফিরে আসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
জামায়াতের উত্থান এই প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পায়, তাহলে তারা আর চতুর্থ শক্তি থাকবে না; বরং দেশের দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এতে বিএনপির অবস্থান আরও দুর্বল হবে। তখন বিএনপি আর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না; বরং ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে নেমে যাবে, যেখানে জাতীয় রাজনীতির মূল প্রতিযোগিতা তাদের বাইরে গড়ে উঠবে।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—তরুণ ভোটারদের আচরণ। দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের একটি বড় অংশ বিএনপিকে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারেনি। অন্যদিকে জামায়াত তাদের আদর্শিক অবস্থান, সংগঠিত প্রচার এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তরুণদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকেও ভাঙন দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তা কেবল একটি নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ নয়; এটি অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ। এই নির্বাচনে তারা জয়ী হলে দলটি নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে, জনগণের আস্থা ফিরে পাবে এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারবে। কিন্তু যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে—যেখানে বিএনপি আর প্রধান শক্তি থাকবে না।
এই নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিএনপি কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজেদের নতুনভাবে দাঁড় করাতে পারবে, নাকি ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোত থেকে সরে যাবে—তার ইঙ্গিত মিলবে আগামীকাল।