Published : 09 Oct 2025, 06:16 AM
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পার্থক্যটা ঠিক কী কী বিষয় দিয়ে সূচিত হয়? ভাষা, জীবনাচরণ, মূল্যবোধ, বিবেচনার দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাজাত যাত্রা। কোনটি? বয়সের আবশ্যিক প্রাকৃতিক পার্থক্য অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই বয়সের পার্থক্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য বিভেদকগুলো তুলে দেয় তাতে বদলে যায় দেশ, কাল, সমাজের চেহারা আর গন্তব্য।
আমাদের যে প্রজন্মটির নাম জেনারেশান এক্স কিংবা জেনারেশন মিলেনিয়াম তাদের লালিত মূল্যবোধ ভালো কী মন্দ, এই সময়ের নিরিখে কতখানি উপযোগী কিংবা অনুপযোগী এই প্রশ্নটি উহ্য রেখেই যদি বলি জীবনাচরণ, মূল্যবোধ একটা সময়ের সঙ্গে আরেকটা সময়ের যে মৌলিক পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ওই পার্থক্য মেনে নেওয়া আমাদের জন্য কঠিন আর সহ্য করা কঠোর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পার্থক্য বিগত প্রজন্মগুলোতে এতটা প্রকট ছিল না। কেন এই অসম আর অসহনীয় পার্থক্য? এর শুরু কবে, কীভাবে এবং কেনইবা এর শুরু এবং মহামারীময় বিস্তার?
আমাদের প্রজন্মের কৈশোর আর যৌবন কেটেছে বলতে গেলে দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক পৃথিবীতে। পূর্ব ইউরোপ তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘সুষম সমাজের’ একটা মডেল নানা পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনা নিয়ে আমাদের সামনে বর্তমান ছিল। স্বসমাজে শিক্ষক কিংবা রাজনৈতিক নেতা কিংবা ধার্মিক ব্যক্তিদের অনুকরণযোগ্য আদর্শিক অবস্থান ছিল। সুষম সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবী কর্মী ছিল, আদর্শের জন্য ত্যাগের উদাহরণ ছিল। শালীনতা আর বিবেক শাসিত সামাজিক কাঠামো ছিল।
যদিও আদর্শ বিষয়টি আপেক্ষিক, তবু এর একটা মানদণ্ড ছিল সময়ের নিরিখে যা কিনা মানুষকে সমাজে মাথা উঁচু করে চলার শক্তি দিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটা গন্তব্যের দিকনির্দেশনা দিতে পারত। যা কোনোভাবেই নগদ বস্তুগত লাভকেন্দ্রিক কিংবা যেনতেনভাবে তা উপার্জন করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল না। নীতি এবং দুর্নীতির সুস্পষ্ট বিভেদ মানুষকে সৎ আর সরল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করত।
বৈশ্বিকভাবে রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার প্রাথমিক কারণ কিনা এই বিতর্ক আপাতত পুরানো। তবে স্বদেশে প্রজন্মান্তরে ভাবনা-চিন্তার জগতের সঙ্গে আমাদের বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। আর এই দূরত্বের অন্যতম ও অসহনীয় প্রকাশ ঘটেছে ভাষার ব্যবহারে। এই দূরত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রজন্মের শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত ভাব আমাদের কাছে প্রায় দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। দুর্বোধ্য বলছি এ কারণে যে, প্রজন্ম হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবে যে শব্দ উচ্চারণ করছে আমাদের কাছে তা হয়ে উঠেছে অশ্লীলতার নামান্তর। কিন্তু তারা এই ভাষা ব্যবহারে নির্বিকার। তারা এসব বলছে নৈমিত্তিক আটপৌরে ভাব বিনিময়েও।
শ্লীল কিংবা অশ্লীল বিষয়টিও আপেক্ষিক। দেশ, কাল, সমাজ ভেদে ভিন্ন। নারী এবং যৌনতা বিষয়ক যেসব শব্দ আমাদের মূল্যবোধে অশ্লীল উচ্চারণ হিসাবে প্রকাশ্যে বলা অভদ্রোচিত মনে হতো কিংবা উচ্চারিত হতোই না, ওইসব শব্দ ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকলেও আমাদের প্রজন্মের হয়তো আপত্তির কিছু থাকত না। কিন্তু না, ওইসব শব্দ এখন হয়ে উঠেছে প্রকাশ্য স্লোগানের ভাষা। আমরা যারা আমাদের মূল্যবোধে এই ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিব্রত হচ্ছি তখন তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের উপহাসের প্রসঙ্গ।
একটা সময় ছিল ভাষা দিয়ে নির্ধারণ করা যেত সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাগ। অর্থনৈতিকভাবে যারা দরিদ্র, যাদের জীবনযাপনের মান নিম্ন তাদের মুখের ভাষা প্রায়শই অশ্লীল ও অশ্রাব্য হতো। যা অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্পষ্টতই একটা পার্থক্য তৈরি করে দিত। সম্ভবত জীবনযুদ্ধজনিত ক্লান্তি মানুষের মধ্যে যে বঞ্চিতের হাহাকার এবং অসহিষ্ণুতা জন্ম নেয় মুখের ভাষায় তার প্রতিফলন ঘটে। বস্তিতে বস্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষ ঝগড়া কিংবা নিত্যদিন যে ভাষা ব্যবহার করত, তুলনামূলক অর্থনৈতিকভাবে সম্পন্ন কিংবা শিক্ষিত ঘরে এসব ভাষার ব্যবহার কল্পনাও করা যেত না।
বর্তমানে এই শ্রেণিবৈষম্যটির বিলুপ্তি ঘটেছে। আমরা খুব সুখি হতাম যদি মানুষে মানুষে বাস্তবিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপ হতো। কিন্তু না, বিলুপ্ত হয়েছে ভাষার বৈষম্য। তবে কি এই প্রজন্মের ভাষার বিবর্তন নানা ধরনের অস্থিরতা আর অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ?
আমাদের সময় প্রেম-ঘৃণা-দ্রোহ-প্রতিবাদ যা কিছুই প্রকাশ্যে স্লোগান হয়ে উঠত তাতে থাকত কাব্যময়তা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’র মতো কাব্যময় স্লোগান আমাদের সময়ে গন্তব্য পেয়েছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ‘বিপ্লব ধ্বংস নয়, সৃষ্টির প্রসব বেদনা মাত্র’ কিংবা তীব্র প্রতিরোধে ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’ পর্যন্ত।
সম্প্রতি কয়েকটি স্লোগানে আদিরসাত্মক শব্দের ব্যবহার গত প্রজন্মকে থমকে দিয়েছে। ‘এক, দুই, তিন, চার...’ কিংবা ‘টিনের চালে কাউয়া...’ ইত্যাদি শব্দ যখন তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসাবে উচ্চারণ করে তখন আমাদের আবাল্যলালিত রুচি প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে এর উৎসের সূত্র খুঁজতে বসে।
ভাষার ব্যবহারকে কেবল ব্যক্তি রুচি দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। ভাষা সামাজিক, সমাজ থেকে উদ্ভূত আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। ব্যক্তি রুচিভেদে ভাষার পরিবর্তন হতে পারে ব্যক্তি বা পারিবারিক পর্যায়ে। মানুষের মনোজাগতিক উৎফুল্লতা, হতাশা নানাকিছু সেখানে ছাপ ফেলতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সর্বজনীন বিষয়। সে ভাষা সর্বজনগ্রাহ্য হবে এমন প্রত্যাশাই থাকে আমাদের। কিন্তু সম্প্রতি এই ভাষার অর্থগত এবং ভাবগত বিশাল অবনমন ঘটেছে। দশকের পর দশক যে ভাষা উজ্জ্বল সৃজনশীলতা আর বিদ্রোহের উত্তাপ ধারণ করেছে একই সঙ্গে, ওই ভাষা হয়ে উঠেছে নগ্নভাবে ব্যক্তি আক্রমণাত্মক। আর ওই আক্রমণ ভাষা ব্যবহারের সামান্যতম শালীনতাও রক্ষা করছে না।
এই পরিবর্তনটি আমি প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম ২০১৮-তে, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত লাল, পুলিশ কোন...’। এই আন্দোলনটিকে সমর্থন দিয়ে গেলেও স্লোগানটি মধ্যবিত্ত শ্রেণিগত রুচিতে বাধলে ফেইসবুকে এর বিরুদ্ধে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। বলা বাহুল্য তখনই তীব্র প্রতিবাদের মুখোমুখি হয়েছিলাম অনলাইনে। পোস্ট মুছে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে ভেতর থেকে এই ভাষাগত দূরত্ব মেনে নেওয়ার অক্ষমতা কেবলই ব্যক্তিগত নাকি সময়ের আবশ্যিক চ্যালেঞ্জ ভাবনাটি তাড়িত করছিল তখনই।
প্রায় সাত বছর পর নির্দ্বিধায় আমরা এসব স্লোগান শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততা এমনই যে, আদি রসাত্মক স্লোগান ছাড়া কোনো কাব্যিক, শিল্পমান সম্পন্ন প্রতিবাদের আশা দুরাশা হয়ে উঠেছে। এর সপক্ষে যুক্তিও দাঁড় করানো আছে—ক্ষোভ কিংবা বিদ্রোহের ভাষায় শ্লীল-অশ্লীল নেই। প্রজন্মের ভাষা আর সো-কল্ড ভদ্রতার ধার ধারে না।
জানি না সমাজ পরিবর্তনের ঠিক কোন ধাপে প্রজন্মের ভাষা এমন বদলে গেছে। কেন গেছে? কারা ঠিক কোন পর্যায়ে তাদের সৃজনশীল মননকে এই বিতর্কিত শব্দগুচ্ছে টেনে নিয়ে গেছে? আর এই শব্দগুচ্ছের ব্যবহারকে অতি স্বাভাবিক তো বটেই বরং এর বিপরীতে কিছু বলাটাকেই অনায্য ভেবে নিয়েছে। এসব স্লোগান তারা উচ্চারণ করছে শ্লাঘায়।
শুধু আমাদের অনভ্যস্ত শ্রবণেন্দ্রিয়, জেন এক্স কিংবা মিলেনিয়ামে গড়ে ওঠা রুচি যে এসব শুনে বিব্রত হয় তা আমাদেরই রক্ষনশীলতা। হয়তোবা হ্যাঁ, হয়তোবা না। কিন্তু আমাদের শোভন হয়ে ওঠার আজন্ম চেষ্টা ভুল ছিল এটা কোনোভাবেই নিজেকে বোঝাতে পারি না।