Published : 20 Apr 2026, 03:28 PM
যাদবপুরের সুকান্ত সেতুর নিচে বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ৮৬ বছরের এক বৃদ্ধকে যখন দ্রুত পায়ে মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটতে দেখা যায়, তখন হঠাৎ মনে হতে পারে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বিমান বসুর সেই টানটান শরীরী ভাষা আর চোখেমুখে এখনো ফুটে থাকা জেদ মনে করিয়ে দেয়, পশ্চিমবাংলার রাজনীতি থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হওয়া এক মহাশক্তি এখনো নিশ্বাস ফেলছে। কিন্তু রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতা এই যে, বিগত বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভেতরে ‘লাল ঝান্ডা’র কোনো উপস্থিতি ছিল না। একুশের নির্বাচনে সম্পূর্ণ ‘শূন্য’ হয়ে যাওয়ার সেই ঐতিহাসিক লজ্জা নিয়ে যখন ২০২৬-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বামপন্থিরা আবার ‘রেজারেকশন’ বা পুনরুত্থানের ডাক দিচ্ছেন, তখন প্রশ্ন জাগে—বাংলার মানুষ কি সত্যিই তাদের এই নতুন করে চিনে নেওয়ার ডাকে সাড়া দেবে?
২০১১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এক দশকের ধারাবাহিক পতন তাদের অস্তিত্বকে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেকিয়েছে। এক সময়কার ৪০ শতাংশ ভোট শেয়ারের মালিকরা যখন ৪-৫ শতাংশে এসে থিতু হয়, তখন লড়াইটা আর কেবল ক্ষমতা দখলের থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ প্রাসঙ্গিক থাকার। ২০২৬-এর নির্বাচন তাই বামেদের জন্য কোনো ভোটযুদ্ধ নয়, বরং এটি তাদের জন্য ‘মেক অর ব্রেক’ মুহূর্ত। এবার যদি অন্তত গুটিকতক আসনও তারা না পায়, তবে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বামপন্থা কেবল একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম হয়েই থেকে যেতে পারে।
২০১১ সালে মমতার ঝড়ে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বামপন্থিরা তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছরে সেই দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই ভোট নেমে আসে ৬ শতাংশে, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল যে বাম সমর্থকরা দলে দলে বিজেপির দিকে সরতে শুরু করেছেন। এখন সেখানে বামদের বিদ্রুপ করতে তৃণমূল কংগ্রেস প্রায়ই ‘যিনি বাম তিনিই রাম’ বুলি করে থাকে।
২০২১-এ বিধানসভা থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিদায় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব শূন্যতার সৃষ্টি করে। এই দীর্ঘ খরা কাটানোর চেষ্টায় এবার আলিমুদ্দিনের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিমান বসুর মতো প্রবীণরা এখনো অভিভাবকের ভূমিকায় থাকলেও, লড়াইয়ের সামনের সারিতে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে একঝাঁক শিক্ষিত তরুণ মুখকে। মহম্মদ সেলিমের মতো নেতারা একে বলছেন ‘ফ্রেশ ক্রপ’ বা নতুন ফসল। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কলতান দাশগুপ্ত, শতরূপ ঘোষ, দীপ্সিতা ধর, আফরিন বেগম, সৃজন ভট্টাচার্যের মতো নেতারা আজ বামেদের মুখ ও কণ্ঠস্বর।
সাক্ষাৎকারে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় যখন বলেন যে লড়াইটা মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নের, তখন তাতে গ্রামীণ বাংলার প্রতিবাদের মেজাজ ফুটে ওঠে। অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী দীপ্সিতা ধর যখন টিভির পর্দায় তার ‘ফটোক্রমেটিক’ চশমা আর ডান হাতের ঘড়ি নিয়ে নীতি-পুলিশির মুখে স্মার্টলি কথা বলেন, তখন তা এক আধুনিক, শিক্ষিত বামপন্থার ছবি তুলে ধরে। তারা পলিটিক্যালি আর্টিকুলেটেড এবং রাজনৈতিক কল্পনাতে অনেক বেশি সপ্রতিভ।
কিন্তু বিশ্লেষক হিসেবে বড় প্রশ্নটা হলো—এই ‘স্মার্ট’ আর ‘শিক্ষিত’ ইমেজ কি বাংলার প্রান্তিক শ্রমজীবী, গ্রামীণ কৃষক বা সংখ্যালঘু ভোট টানতে যথেষ্ট? শহুরে ড্রইংরুমে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও, মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুফল পাওয়া গ্রামের সেই গরিব মহিলাটি কি মীনাক্ষীর রুটি-রুজির আন্দোলনে নিজেকে খুঁজে পাবেন?
বালিগঞ্জের সিপিআইএম প্রার্থী আফরিন বেগমের লড়াইয়ের ভঙ্গিটিও এই নতুন প্রজন্মের রাজনীতির এক বলিষ্ঠ উদাহরণ। এক প্রাক্তন হেভিওয়েট মন্ত্রীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে আফরিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সংগ্রাম কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংঘাত নয়, বরং তৃণমূল ও বিজেপির ‘মানুষ মারার’ রাজনীতির বিরুদ্ধে এক আদর্শিক লড়াই । তার মতে, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার নেপথ্যে আসলে এই দুই দলেরই গোপন আঁতাত রয়েছে।
বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক আবহে, যখন টেলিভিশনের পর্দায় কোনো প্রভাবশালী নেতার বান্ধবীর আবাসন থেকে উদ্ধার হওয়া ৫১ কোটি টাকার নোটের স্তূপ কিংবা ১১ কেজি সোনার গয়নার ছবি বারবার ভেসে ওঠে, তখন তা সাধারণ মানুষের নৈতিকতায় চরম আঘাত করে। নিয়োগ দুর্নীতির এই পাহাড়প্রমাণ কেলেঙ্কারির আবহে যখন দুর্নীতির এই জৌলুসপূর্ণ ছবিগুলো সংবাদের শিরোনাম হয়, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অবচেতনে এক প্রবল বৈপরীত্যের মতো ভেসে ওঠে এক ভিন্ন ঘরানার রাজনীতিকের ছায়া।
আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের তিনতলার একচিলতে অগোছালো ঘরে থাকা ৮৬ বছরের ‘তরুণ’ বিমান বসুর জীবনযাত্রা যেন সেই কলুষিত রাজনীতির বিপরীতে এক জীবন্ত প্রতিবাদ। যার নিজের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই, আয়ের উৎস বলতে স্রেফ পার্টির সামান্য ভাতা। এবং যিনি আজও রান্নাঘরের সেই পুরনো মেস জীবন থেকে বেরিয়ে ছাদের ঘরে আশ্রয় নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই এক ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাসী’র মতো দিন কাটাচ্ছেন।
এক সাম্প্রতিক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যখন জানা যায় যে, ১৯৬৬ সালের ৯ ডিসেম্বর পুলিশের লাঠির মারে তাঁর পিঠের চামড়া ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং সেই ক্ষত আজও শরীরে সাদা দাগ হয়ে ত্যাগের সাক্ষ্য দিচ্ছে, তখন সেই অনাড়ম্বর ভাবমূর্তি বর্তমানের জৌলুসপূর্ণ দুর্নীতির বিপরীতে এক শক্তিশালী নৈতিক ঢাল হিসেবে দাঁড়ায়।
মীনাক্ষী বা দীপ্সিতাদের মতো নতুন প্রজন্মের লড়াইয়ের জমি আসলে তৈরি করে দিচ্ছে প্রবীণদের এই পুরনো ত্যাগের বনিয়াদি কাঠামো। মহম্মদ সেলিম যেমন গর্বের সঙ্গে দাবি করেন যে, তৃণমূল বা বিজেপির মতো ‘রিসাইকেল বিন’ থেকে আসা ক্যান্ডিডেট তাদের নেই, বরং তাদের ঝান্ডা ধরে আছে এক ‘ফ্রেশ ক্রপ’ বা নতুন প্রজন্মের লড়াকু বাহিনী। কিন্তু এখানেও এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক জটিলতা রয়ে গিয়েছে। বিগত বাম আমলে অনিল বিশ্বাস বা বিমান বসুর জমানায় যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘বসিজম’ বা পার্টির একাধিপত্যের অভিযোগ উঠত, বর্তমান নেতৃত্ব কি তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পেরেছেন?
বিমান বসু নিজে অবশ্য সমষ্টিগত নেতৃত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, ব্যক্তিগত কাজ করার স্টাইল আলাদা হতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত সবসময় যৌথ। এই যৌথতা আর ব্যক্তি-সততার মিথ কি পারবে আধুনিক বাংলার সেই সব ভোটারদের ফেরাতে, যাঁরা রাজনীতির মধ্যে কেবল নগদ সুবিধা আর সুযোগের অঙ্ক খোঁজেন?
বামেদের তুরুপের তাস সম্ভবত এখানেই— তারা সততাকে কেবল ইশতেহারের পাতায় নয়, বরং আলিমুদ্দিনের সেই অনাড়ম্বর ছাদের ঘরে দৃশ্যমান করে তুলতে চাইছেন। সততার এই ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল’ যদি ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত না হয়, তবে ‘শূন্য’ ভাঙার স্বপ্ন কেবল আবেগের বৃত্তেই আটকে থাকবে।
বামপন্থিদের এবারের ইশতেহারটি দেখলে বোঝা যায়, তারা সচেতনভাবেই মমতার ‘পপুলিস্ট’ বা জনপ্রিয় সস্তা অর্থ-বণ্টনের রাজনীতির পথ এড়িয়ে গেছেন। তৃণমূল বা বিজেপির মতো সরাসরি নগদ অর্থ সাহায্যের কোনো বড় প্রকল্প তাদের ইশতেহারে নেই। এর পরিবর্তে তারা জোর দিয়েছেন স্থায়ী কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং দুর্নীতির অবসান ঘটানোর ওপর। তাদের প্রস্তাবিত ‘নেতাজি সুভাষ যুবসেবক প্রকল্প’র মাধ্যমে বেকারদের সামাজিক কাজে নিয়োগ করে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় এবং প্রবীণদের জন্য ৬ হাজার টাকা বার্ধক্য ভাতার মতো প্রস্তাবগুলো একটি নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচয় দেয়।
আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যেখানে ‘সরাসরি সুবিধা’ বা ‘বেনিফিশিয়ারি পলিটিক্স’ বড় ফ্যাক্টর, সেখানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কাজ বা শিক্ষার অধিকারের দাবি নিয়ে লড়াই করাটা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ হয়তো বুঝতে পারছেন যে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু তারা আবার এটাও ভাবছেন যে তৃণমূল অন্তত কিছু তো হাতে দিচ্ছে। বামপন্থিদের এই নীতিনিষ্ঠ প্রস্তাবগুলো ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদী আস্থার সংকট কাটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জোট রাজনীতির জটিল অঙ্কেও এবার বামপন্থিরা একা হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী কংগ্রেস এবার বাংলার প্রায় সব আসনেই এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অধীর চৌধুরী বা মৌসম বেনজির নুরের মতো নেতারা যখন জেলা স্তরে কংগ্রেসের শক্তি সংহত করার কথা বলেন, তখন বামেদের কাছে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ে। এবার তারা সিপিআইএমএল লিবারেশন এবং নওশাদ সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ-এর সঙ্গে সমঝোতা করেছে। বিশেষ করে মালদহ বা মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে আইএসএফ-এর সঙ্গে এই জোট বামেদের ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
কিন্তু কংগ্রেসের আলাদা লড়াই শাসক দল তৃণমূলেরই সুবিধা করে দেবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক কম নয়। মহম্মদ সেলিম যদিও দাবি করছেন যে তারা বামফ্রন্টের বাইরেও এক বৃহত্তর বাম ও গণতান্ত্রিক মঞ্চ গড়ে তুলেছেন, তবুও বাস্তবে ভোট ভাগাভাগির অঙ্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলে পড়ে, তা বোঝা মুশকিল।
ভোটের মাঠের বাস্তব শক্তি ও জনমত সমীক্ষাগুলো বামেদের ভোটশেয়ারে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা আসন পাওয়ার মতো ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আরজি করের ঘটনার পর যে তীব্র গণ-আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গ দেখেছে, তা মধ্যবিত্ত সমাজে বামেদের ভাবমূর্তি অনেকটাই ফেরাতে সাহায্য করেছে। অনেক ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ ভোট বিজেপি থেকে সরে বামেদের দিকে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের চা-বলয় বা জঙ্গলমহলে যেখানে বিজেপি শক্তিশালী ছিল, সেখান থেকে বামেদের ভোট শেয়ার বাড়লে তা তৃণমূলের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে। আবার দক্ষিণ বাংলায় বামেদের শক্তি বাড়লে বিজেপির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বামেরা কি সত্যিই ‘কিংমেকার’ হতে পারবে, নাকি কেবল ভোট কেটে অন্য দলের জেতা-হারার নিয়ন্ত্রক কিংবা ‘স্পয়লার’ হয়েই থেকে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সেলিম বা মীনাক্ষীরা আত্মবিশ্বাসী যে ২০২৬-এ রেজারেকশন হবেই, কারণ মানুষ তৃণমূলের অপশাসন ও বিজেপির বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্তি চাইছে।
ভোটারের অবচেতনে কি এখনো বাম শাসনের শেষ দিকের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো কাজ করছে না? সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন, পার্টি-সোসাইটির একাকার হয়ে যাওয়া কিংবা ক্যাডার রাজের সেই দাপট এখনো প্রবীণ ভোটারদের অনেকের মনে অমলিন। যদিও নতুন প্রজন্মের শতরূপ, মীনাক্ষী, আফরিন বা দীপ্সিতারা সেই ইতিহাসের দায় সরাসরি নিজেদের কাঁধে না নিয়ে আগামীর কথা বলছেন, তবুও সিপিএমের মতো রেজিমেন্টেড দলে অতীত থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন।
প্রতীক-উর রহমানের মতো উদীয়মান ছাত্রনেতার দল ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া বা দলের ভেতরে এখনো ‘বসিজম’ থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা আস্থার সংকটকে আরও উসকে দেয়। মানুষ যখন দেখে যে ৩৪ বছরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ দল এখন স্রেফ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তারা তাদের মূল্যবান ভোটটি ‘নষ্ট’ করতে চান না।
এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বিমান বসু বলেছিলেন, ‘শূন্য সবসময় শূন্য থাকে না।’ কথাটি তত্ত্বগতভাবে সত্য হলেও বাস্তব রাজনীতিতে সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করার জন্য যে বিপুল জনসমর্থন প্রয়োজন, তা এখনো বামেদের কাছে মরীচিকা হয়েই রয়েছে।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণে আসা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামপন্থা কোনো আর্দশ বা দল নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল একটি ব্যালট যুদ্ধের লড়াই নয়, এটি বামপন্থিদের হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের লড়াই।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কি আবারো এই শিক্ষিত, তরুণ, নীতিনিষ্ঠ বামপন্থিদের ওপর ভরসা করবে? এর কোনো সহজ এক লাইনের উত্তর নেই। একদিকে রয়েছে নতুন প্রজন্মের সতেজ লড়াই ও শিক্ষিত মুখ, অন্যদিকে রয়েছে তৃণমূলের মজবুত বেনিফিশিয়ারি ভোটব্যাঙ্ক এবং বিজেপির আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই লড়াইয়ের মেজাজটা আসলে এক বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের মতো দেশে যখন ‘জেন-জি’ বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জয়ের রথ ছুটছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে তরুণ মুখ নিয়ে লড়াইয়ে নামা বামপন্থিরাও এক নতুন আশার আলো দেখতেই পারেন।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের হাওয়া কি তবে গঙ্গার পাড়েও লাগবে? সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথ—এই তিন দিক ধরে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বামেরা যদি সত্যিই শূন্য দশা কাটাতে চায়, তবে তাদের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আবেগের সঙ্গেও মিশতে হবে।
তারা কি পারবেন লাল ঝান্ডাকে আবারো বিধানসভার ভেতরে নিয়ে যেতে? না কি বাংলার রাজনীতিতে তারা কেবল এক উজ্জ্বল অতীতেরই দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে যাবেন? উত্তরটা হয়তো ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোট গ্রহণ শেষেই অনুমান করা যাবে। এবার পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হচ্ছে। প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোসহ মোট ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে কলকাতা, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ও নদীয়াসহ মোট ১৪২টি আসনে। ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।