Published : 27 Sep 2025, 01:27 PM
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে যাওয়া কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সফর সাধারণত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আর নানা আন্তর্জাতিক আলোচনার ভেতর দিয়ে গুরুত্ব পায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বিশেষ স্বাদ মিশে গেলে সেই সফরের খবর হয়ে ওঠে কেবল নিউ ইয়র্কের অভিজাত কূটনীতি নয়, দেশের ডিমের রাজনীতি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ডিম ছোড়ার ইতিহাস বেশ লম্বা—এটা কখনও হয়েছে ক্ষোভের ভাষা, কখনও অপমানের প্রতিশোধ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আদালতের বারান্দায় ডিম নিক্ষেপের মহড়া যখন নতুন নিয়মে পরিণত হলো, তখন সেই একই নাটক আবার মঞ্চস্থ হলো নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দরে। পার্থক্য শুধু অভিনেতার, চিত্রনাট্য তো একই—প্রতিপক্ষকে বেইজ্জত করার এই ‘ডিম মব’ যেন এক নয়া ‘গণতান্ত্রিক কৌশল’।
ফলাফল? নিউ ইয়র্কে ইউনূসের অভিজাত বৈঠকগুলো বাংলাদেশের ভেতরে আলোচনার জন্ম দিল কম, বরং রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে উড়ে যাওয়া ডিমই দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় তুলল। জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গীদের বিশাল বহর, কিংবা কূটনৈতিক অর্জন-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা—সব ছাপিয়ে এখনও প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে আছে সেই ‘ডিম কূটনীতি’।
জাতিসংঘ ৮০তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন ছয়জন রাজনীতিবিদ। ‘জাতিসংঘে ইউনূসের সফরসঙ্গী: আন্তর্জাতিক কূটনীতি নাকি বাংলাদেশের রাজনীতি? বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেই এই শিরোনামে আমার আগের লেখায় আমি লিখেছিলাম চারজনের কথা—দুজন বিএনপির, একজন করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির। পরে দেখলাম জামায়াত ও এনসিপি থেকে আপত্তির কারণে সংখ্যা বাড়িয়ে ছয় জন করা হয়েছে। জামায়াত ডাকসু-জাকসুতে জিতে এখন নিজেদেরকে দেশের সবচেয়ে বড় দল মনে করছে। তাই সফরে তাদের ‘আসন’ বাড়াতে হলো । এনসিপি যদিও ডাকসু-জাকসুতে শোচনীয়ভাবে হেরেছে, কিন্তু তারা সরকারের কাছের লোক, তাদেরকেও আরেকটা আসন দিতে হলো সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য। তাই রাজনৈতিক প্রতিনিধি এখন ছয় জন।
এই সরকার আবার প্রমাণ করল, তারা সব রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পক্ষপাতী । যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম দেশে নিষিদ্ধ, তারা এইসব সুযোগ পাবে না। নিশ্চয়ই এটাই হচ্ছে ন্যায্যতার নতুন সংজ্ঞা—এক ধরনের বিশেষ ‘নিষিদ্ধ সমানতা’।
প্রতিনিধিদল কি বড় না ছোট?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, এই বছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বহর ছিল ১০৪ জনের এবং তারা এ বড় বহরের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলছে, এবারের প্রতিনিধিদলে সদস্য সংখ্যা ৬২। এখানে কোনো পক্ষের গণনায় বিভ্রাট রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমর্থনে বলতে হয়, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা—খালেদা জিয়া হোক বা শেখ হাসিনা—কখনও এত কম প্রতিনিধি নিয়ে সাধারণ অধিবেশনে যাননি। তাদের দলে থাকতেন দলীয় সমর্থক, পোষা আমলা, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক—সবাই রাষ্ট্রীয় খরচে ‘বেড়াতে’ যেতেন।
২০২৪ সালের অধিবেশনে ড. ইউনূসের সফরসঙ্গী ছিলেন ৫৭ জন। প্রথমে বলা হয়েছিল মাত্র ১৭ জন যাবেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, দেশের খরচ কমানোর জন্য সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে। পরে এই নীতি পরিবর্তিত হয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় সরকার কি স্বতঃসিদ্ধভাবে খরচ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
জাতিসংঘের নিয়মে মাত্র ১০ জন প্রতিনিধিকে অনুমতি দেওয়া হয়—পাঁচ জন মূল প্রতিনিধি এবং পাঁচ জন পরিপূরক প্রতিনিধি। এর বাইরে আসা সবাইকে ‘এক্সট্রা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন ছাড়া বেশিরভাগ দেশ সীমিত সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে সাধারণ পরিষদে যোগ দেয়। ভারতের প্রতিনিধি সংখ্যা থাকে ৩০–৩৫ জন। সাধারণ পরিষদে বিরাট বহর নিয়ে আসা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার ‘বিশেষ সুনাম’ আছে। এবারের বাংলাদেশের ৬২ জন প্রতিনিধিও অবশ্য কম নয়।
ডিম রাজনীতি ও নিরাপত্তার নাটক
বাংলাদেশের ৬২ জন প্রতিনিধির মধ্যে ২০ জনই নাকি নিরাপত্তা রক্ষী। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল—সাধারণত রাজা-বাদশাহরা এত রক্ষী নিয়ে সফর করেন। নিউ ইয়র্কে প্রতিনিধি দলের রাজনৈতিক সদস্যদের যে হেনস্তা হয়েছে, তাতে মনে হয় আরও ২০ জন রক্ষী আনা উচিত ছিল, নতুবা রাজনৈতিক নেতাদের অন্তর্ভুক্ত না করাই ভালো ছিল।
নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দর থেকে ড. ইউনূস প্রটোকল নিয়ে বিশেষ গেইটে, বিশেষ নিরাপত্তায়, নিরাপদে বের হয়ে গেলেন। সেখানে বিপত্তি বাধল সফরসঙ্গী বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের ওপর—তাদেরকে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে বের হতে হলো। করিডোর পার হওয়ার সময় তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের মুখোমুখি হলেন। আওয়ামী লীগাররা আগেই ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে তেমন বিপত্তির মুখে পড়তে হয়নি। তাকে অভ্যর্থনা বা নিরাপত্তা দেওয়ার লোকের অভাব ছিল না। জামায়াতের সুবিধা হলো—নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি ছাড়াও পাকিস্তানি জামায়াত আছে। মোট ৩৫ থেকে ৪০ জন লোক তাহেরকে ঘেরাও করে গাড়িতে তুলে দিলেন।
বিএনপির বড় সমর্থক গোষ্ঠীও নিউ ইয়র্কে আছে, কিন্তু তারা বিমানবন্দরে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করে। মির্জা ফখরুলকে কিছু কটু কথা শুনতে হয়েছিল, তবে এর বেশি কিছু নয়।
যত বিপদ এনসিপি নেতাদের ওপর গেল—তত বেশি হয়তো কোনো নতুন দলের ক্ষেত্রে কল্পনা করা যায় না। এনসিপি এখনো নতুন, নিউ ইয়র্কে তাদের তেমন কোনো সংগঠন নেই। জুলাই আন্দোলনের পর যে সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, তা নানা কারণে উধাও হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তবে বেশি হেনস্তা ও অপদস্থ হয়েছেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারাও ছিলেন তার পাশে। কিন্তু আওয়ামী লীগের একটিভিস্টদের কেউ তাকে কিছুটা ছাড় দিয়ে বলেছিলেন—‘এই আপাকে কিছু বলবি না’। যদিও বলবি বলেও অকহতব্য কথাবার্তা জারাকেও শুনিয়েছেন তারা। অন্যদিকে আখতারের জন্য কথার তুবড়ির সঙ্গে পেছনে একের পর ডিম ছোড়া হচ্ছিল। তার জামার পেছনে বেশ কয়েকটা ডিমের দাগ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি আমরা, পরে প্রকাশিত ছবিতে।
জামায়াতে ইসলামী বড় এসকর্ট ইচ্ছা করলে বিএনপি ও এনসিপি নেতাদের সাহায্য করতে পারত। কিন্তু যেহেতু তাদের সঙ্গে বিএনপি বা এনসিপির কোনো জোট নেই, সম্ভবত তাই সাহায্য করতে এগিয়ে যায়নি।
এদেরকে এই হেনস্তা করে আওয়ামী লীগের কি লাভ হলো এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল—নিউ ইয়র্কের আওয়ামী লীগাররা যদি শান্তভাবে চিন্তা করতেন, হয়তো এত বাড়াবাড়ি করতেন না। কিন্তু দেশে এনসিপি মহলেও চরম প্রতিক্রিয়া হলো। সেটাও ‘এক্সট্রিম’। এনসিপি নেতারা দাবি করে বসলেন—অবিলম্বে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সব কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতে হবে।
প্রবাসী আওয়ামী লীগারদের অনেকের গ্রামের বাড়িতে হামলা করে ডিম ছোড়া হলো। আমাদের রাজনীতিবিদদের রুচি এক—একপক্ষ ভালো রুচি না দেখালে অন্য পক্ষ দেখাবে কেন?
গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের শীর্ষ সংবাদ কখনও কূটনৈতিক সংবাদ ছিল না। সবসময় জেএফকে এবং জ্যাকসন হাইটসে দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মিছিল, ঠেলাঠেলি ও সংঘর্ষের সংবাদই দেশজুড়ে প্রধান্য পেত। সেই মিছিলের এক গ্রুপ থাকত আনন্দ-উল্লাসে, অন্য পক্ষের মিছিল হতো প্রতিবাদে। কোন দল কোন গ্রুপে নির্ভর করত—তা নির্ভর করত আসছেন কে সফরে। বেগম জিয়া আসলে, আওয়ামী লীগের লোকেরা থাকতেন প্রতিবাদে। আবার শেখ হাসিনার সময় বিএনপির প্রবাসীরা কালো পতাকা হাতে তেড়ে আসতেন।
এইবার কি ব্যতিক্রম হলো? ভিজিটিং দলে পরিবর্তন এসেছে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। কিন্তু প্রতিবাদের তীব্রতা কমেনি; বরং দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে থাকত ব্যানার ও কালো পতাকা—এইবার যোগ হয়েছে ‘আন্ডা’।
কিছু সৌজন্য, কিছু কূটনীতি
সাধারণ পরিষদের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয় সরকার প্রধানদের বক্তৃতা শোনায় এবং কিছু সৌজন্য সাক্ষাৎ আয়োজন করে। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, “গত পাঁচ দিনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল অন্তত এক ডজন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে, যার মধ্যে ছয়টির বেশি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল।”
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত এক সংবর্ধনায় যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ২৩ সেপ্টেম্বর এই সংবর্ধনায় যোগ দিয়ে ড. ইউনূস ট্রাম্পকে সুবিধাজনক সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে বেলজিয়ামের রানি ম্যাথিল্ড প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাক্ষাৎ করেন। এগুলো সবই সৌজন্য সাক্ষাৎ। এছাড়া ড. ইউনূস এবারও পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিছুক্ষণ আগে দেখতে পেলাম ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকের খবর। এ নিয়ে প্রকাশিত খবরে জানলাম বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে।

প্রধান উপদেষ্টা ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও চলমান সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ থেকে আগত রাজনৈতিক নেতারা নিউ ইয়র্কে কী করছেন? যতটুকু জানা গেছে, সরকারি খরচে সংগঠনের সভা-সমিতি করছেন এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। এই সফরের অনেকটাই যেন ‘সৌজন্য সফর’ না হয়ে গেছে ‘ব্যক্তিগত সফর’।
মুহাম্মদ ইউনূসঅক্টোবরের ২ তারিখ পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে থাকবেন। আমি আগেই লিখেছিলাম—নেতারা যখন নিউ ইয়র্কে থাকবেন, জামায়াত জোটের আন্দোলন চুপচাপ থাকবে। বাস্তবে তাই হয়েছে—দেশে সব চুপচাপ। নির্বাচন-আন্দোলন, সংস্কার-সনদ ইত্যাদি নিয়ে নিশ্চয়ই ড. ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের কথা হবে। সমঝোতা কতটুকু হবে, তা জানা যাবে সবাই দেশে ফিরে আসার পর।