Published : 28 Feb 2026, 09:45 PM
রাজশাহী গোদাগাড়ির খিদিরপুর গ্রাম। বরেন্দ্রভূমির লালচে শক্ত মাটির এই গ্রামে দুপুরের রোদ কড়া, ধূলিময় শুষ্ক বাতাস। কিন্তু এর চেয়েও শুষ্ক আরেকটি জিনিস আছে এখানে–এ মাটির মানুষের ভাষার জীবন। সেই ভাষার নাম ভূমিজ। একসময় অস্ট্রো এশিয়াটিক মুন্ডা ধারার প্রাচীন ভাষাস্রোতের অংশ ছিল। এখন খিদিরপুরের চারটি পরিবার মিলে সাকুল্যে কয়েকটি শব্দে ওই ভাষার স্মৃতি ধরে রেখেছে। ভূমিজ ভাষা একা নয়। এই ভূখণ্ড থেকে এরই মধ্যে অন্তত ১০টি ভাষা হারিয়ে গেছে বলে গবেষণা ও মাঠতথ্যে উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে আছে বীরহড়, খেরওয়ার, রাজোয়ার, তুরি, হদি, হো, ভিল, বানাই ও ডালু।
গ্রামের এক প্রান্তে বসে কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ রণজিৎ ভূমিজের সঙ্গে। বয়সের ছাপ তার কপালে, কিন্তু স্মৃতির ভেতর এখনও ছড়িয়ে আছে নিজ ভাষার শব্দ, ঐতিহ্যের গল্প। মাতৃভাষার শব্দ সহযোগে কুশল বিনিময় করতেই তিনি একটু হাসলেন। কষ্টেসৃষ্টে কয়েকটি শব্দ বললেন। তারপর থামলেন। বাক্য খুঁজতে গিয়ে তিনি ভূমিজ, সাদরি আর বাংলা মিশিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। ভাষার ভেতরেই হারিয়ে গেল তার মাতৃভাষার পথনির্দেশ।
ভূমিজ ভাষা অস্ট্রো এশিয়াটিক কোল-মুন্ডা ভাষা পরিবারের একটি প্রাচীন ভাষা, যার শিকড় এই উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে প্রোথিত। ভাষাবিদ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন তার ভাষাতাত্ত্বিক জরিপে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এ ভাষার বিস্তৃতি ও তাদের ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছিলেন। ভূমি, বন আর মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়ানো ভাষা। অথচ আজ সেই ভূমিজ ভাষা খিদিরপুরের চারটি পরিবারের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ। রণজিৎ ভূমিজ জানালেন, আশির দশকেও এই এলাকায় আরও বেশকিছু ভূমিজ পরিবার বসবাস করত। সংখ্যাগুরু সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারাও ধীরে ধীরে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।
হারানোর এই গল্প শুধু খিদিরপুরের নয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের বৃহত্তর ময়মনসিংহও একসময় ছিল বহু ভাষার মিলনভূমি। ময়মনসিংহ, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও রংপুরজুড়ে খেরওয়ার, বীরহড়, ভূমিজ, রাজোয়ার, তুরি, হদি, হো, বানাই, ভিল ও ডালু জনগোষ্ঠীর নিবাস ও তাদের নিজস্ব ভাষা প্রচলিত ছিল। বীরহড়রা বননির্ভর যাযাবর জীবনযাপন করত, রাজশাহী অঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে তাদের বসতি ছিল। খেরওয়াররা চা বাগান ও সমতল অঞ্চলে বিস্তৃত বৃহত্তর এক ভাষা ও সাংস্কৃতিক ধারার অংশ ছিল।
ঔপনিবেশিক যুগে আন্তঃজাতি যোগাযোগের ভাষা হিসেবে সাদরির বিস্তার, পরে শিক্ষা ও প্রশাসনে বাংলার প্রভাব ভাষিক প্রতিস্থাপনের একটি ধাপ তৈরি করে, মাতৃভাষা থেকে সাদরি এরপর সাদরি থেকে বাংলা। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই মূল ভাষা দূরে সরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জাতিসত্তার নাম রয়ে গেলেও ভাষা হারিয়ে যায়। মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, এই ভাষাগুলোর কোনটিরই লিখিত রূপ, অভিধান, ব্যাকরণ বা সংরক্ষিত নথি নেই। তারা হারিয়েছে নিঃশব্দে। অবশ্য নথিতে থাকলেও যে খুব একটা লাভ হতো তাও নয়। ভাষা যখন মুখ থেকে সরে যায় তখন তা আর কাগজে ফিরিয়ে আনা যায় না। ভাষা বাঁচে মানুষের ব্যবহারে। ব্যবহার থেমে গেলে ইতিহাসে শুধু নামটুকু থেকে যায়।
ভাষা বিলুপ্তির এই বাস্তবতা বিবেচনায় কিছু নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন ২০১০’ প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিলুপ্তপ্রায় ভাষাসমূহের সংরক্ষণ। ‘নৃভাষাতাত্ত্বিক সমীক্ষা’ও হয়েছিল ২০১৪ সালে। কিন্তু সেই সমীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়। দেশে কয়টি জাতি ও ভাষা সক্রিয়, কয়টি বিলুপ্তির পথে, আর কয়টি ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে এ বিষয়ে তাই নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত তথ্যের ঘাটতি রয়ে গেছে। আবার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বরাতে যেসমস্ত প্রকাশিত, সেগুলোর তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যের অসঙ্গতিও আছে যথেষ্ট। ফলে ভাষা বাস্তবতার প্রকৃত মানচিত্র এখনও অনেকটাই অস্পষ্ট।
একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রয়াস ‘ফ্রেন্ডস অব এনডেঞ্জার্ড এথনিক ল্যাঙ্গুয়েজেস’ (ফিল) এবং ভাষা প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ ‘ল্যাংগুয়েজ রিসোর্স হাবের’ যৌথ মাঠ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভূমিজ, বীরহড়, খেরওয়ার, হদি কিংবা ডালুর মতো হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলোর কোনটারই লিখিত ব্যাকরণ, অভিধান, অডিও ভিডিও নথি বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ নেই। এমনকি হদি ও ভূমিজের মতো যেসমস্ত ভাষার কিছু শব্দ এখনও সংশ্লিষ্ট জনজাতির স্মৃতিতে রয়ে গেছে সেগুলোও লিপিবদ্ধ নয়। যখন এই ভাষাগুলো পরিবার ও সমাজের ভেতর থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন সেগুলো নথিভুক্ত করার উদ্যোগ ছিল না। প্রজন্মান্তরে ভাষা হস্তান্তরের পরিকল্পিত কোনো কাঠামো ছিল না। ফলে ভাষাগুলো হারিয়েছে প্রায় কোনো আনুষ্ঠানিক চিহ্ন না রেখে। এখন যদি এ লক্ষ্যে কোনো প্রকল্প নেওয়াও হয়, তা হবে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা; ভাষার পুনরুজ্জীবন নয়। ভাষা টিকে থাকে মানুষের মুখে, মানুষে মানুষে বহাল সম্পর্কের ভেতরে।
কারণ, ভাষা হারানো মানে শুধু কিছু শব্দ বাক্য বা যোগাযোগের একটি মাধ্যম হারিয়ে ফেলা নয়। একটি ভাষা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রকৃতি সম্পর্কিত ঐতিহ্যিক জ্ঞান, ঔষধি উদ্ভিদের ব্যবহার, মাটি ও ঋতুর স্বভাব, আত্মীয়তার বন্ধন, গল্প, আচার, গান ও বিশ্বাসের বিন্যাস ধারণ করে। ভাষা মানুষের চিন্তার মানচিত্রও। সেই মানচিত্র ছিঁড়ে গেলে মানুষ শুধু নতুন ভাষায় কথাই বলে না, নতুন ভাষায় ভাবতেও শুরু করে। বদলে যায় চিন্তার কাঠামো এবং পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিকোণও।
ভূমিজ ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন সাংস্কৃতিক স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ভেঙে পড়া। বীরহড় ভাষার বিলুপ্তি মানে বননির্ভর এক যাযাবর জীবনধারার স্মৃতি মুছে যাওয়া। খেরওয়ার ভাষার অন্তর্ধান মানে উত্তরবঙ্গের ভাষাগত ইতিহাসের একটি প্রবাহ থেমে যাওয়া। রাজোয়ার ভাষা হারানো মানে সীমান্তবর্তী সমতলের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক সত্তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। তুরি ভাষা হারানো মানে স্থানীয় শ্রমজীবী এক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব অভিব্যক্তির ভাঙন। বানাই ভাষার বিলুপ্তি মানে উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক সংস্কৃতির একটি স্তর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। ভিল ভাষার বিলীন মানে প্রাচীনতম এক জাতির আত্মপরিচয় বিপন্ন হয়ে যাওয়া। হো ভাষার অন্তর্ধান মানে একটি প্রাচীন জাতিসত্তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাওয়া। ডালু ভাষা হারানো মানে গারো পাহাড় সংলগ্ন ভূখণ্ডের ইতিহাসের একটি অধ্যায় মুছে যাওয়া। আর হদি ভাষার হাতে গোনা তেত্রিশটি শব্দ টিকে থাকা মানে একটি ভেঙে পড়া সভ্যতার কঙ্কালচিহ্ন দেখে তার পূর্ণ দেহাবয়ব কল্পনা করার ব্যর্থ চেষ্টা।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই ১০টি ভাষা আমাদের চোখের সামনেই বিলুপ্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ তালিকায় এসব ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ থাকলেও এদের ভাষার খোঁজ নেওয়া হয়নি, সংরক্ষণের উদ্যোগ তো পরের কথা। ২০১৯ সালের সরকারি গ্যাজেটের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর’ তালিকায় ভূমিজ, বীরহড়, খেরওয়ার, রাজোয়ার, তুরি, হদি, হো, ভিল, বানাই ও ডালুর নাম আছে, কিন্তু তাদের ভাষাগুলোর কোনো নথিভুক্ত রেকর্ড নেই। এতে করে এই ভাষাগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ব্যবহার থেকেই হারিয়ে যায়নি, জ্ঞান, গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণের দিক থেকেও অদৃশ্য হয়ে গেছে।
খিদিরপুরের রণজিৎ ভূমিজ নিজভাষায় একটি পূর্ণ বাক্য বলতে গিয়ে থেমে গেলে, তার হাজার বছরের লালিত সভ্যতার ইতিহাসও সেই সঙ্গে থেমে যায়। কারণ, ভাষাই ধরে রাখে একটি জাতির চিন্তা, জ্ঞান, গল্প এবং আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা। ভাষার ধারক যখন থমকে যায়, তখন তার নিঃশব্দ প্রভাব চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে শব্দ ফিকে হয়ে আসে, বাক্যগুলো ছোট হয়ে পড়ে। পরের প্রজন্ম ঘরের বাইরে ভাষা ব্যবহার করা কমিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির উঠোনে, খেলার মাঠে, সামাজিক উৎসবে–যাপিত জীবনের সবখানে।
ভাষার এই নির্বিরোধ নিঃশব্দ বিলোপ একটাই প্রশ্ন রাখে আমাদের সামনে–আমরা কি একটি ভাষাকে শুধু সংখ্যার বিচারে মাপব, নাকি তার ভেতর লুকানো মানবজগৎকে বুঝতে চেষ্টা করব! রাষ্ট্র তার শিক্ষা ও গবেষণার কাঠামো কাজে লাগিয়ে অমূল্য এই ইস্যুতে সময়মতো সাড়া না দিলে, আগামীতে একইভাবে আরও আরও ভাষা কেবল কয়েকজন রণজিৎ ভূমিজের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তখন আমরা শুধু ভাষার নাম জানব, কিন্তু সেইসব ভাষার জীবন জানবো না। ভাষার সুরক্ষা ও সংরক্ষণ মানে তাই যেমন অতীতের প্রতি দায় স্বীকার, একইসঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতারও নামান্তর। কারণ, একটি হারিয়ে যাওয়া ভাষা মানে পৃথিবীকে দেখার একটি জানালা বন্ধ হয়ে যাওয়া। জানালা কমে যাওয়া মানে দৃষ্টিকোণ আরও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া। সম্মিলিত মানুষের আরাধ্য অগ্রগতির স্বার্থে আমরা অবশ্যই এরকম সংকীর্ণতা চাই না।