Published : 31 Dec 2025, 04:54 PM
এক লড়াকু জীবনের অবসান হলো ৮০ বছর বয়সে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী সামাজিক পরিসরের সকল বাধা অতিক্রম করে এক বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর জীবনের সম্মানজনক সমাপ্তি ঘটল। আমরা যে যেভাবেই জন্মগ্রহণ করি না কেন তাতে আমাদের হাত থাকে না, মানুষের হাত থাকে তার কর্মে। সেই কর্মের হাত ধরে একদিন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি জীবনাবসানের প্রাক্কালে কি পরিবেশে ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু ঘটে।
খালেদা জিয়া দলীয় রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন, জেল-জুলুম-বিচার-দণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় পেয়েছেন অরাজনৈতিক সরকার এবং সর্বজনের অসামান্য সম্মান। এটা এক বিরল সৌভাগ্য। রাজনীতিতে তার প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, যিনি তার সম্পর্কে সবসময় অশালীন-অভব্য বক্তব্য রেখেছেন, সেই পলাতক-জনপ্রত্যাখ্যাত-পতিত ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনাও তার মৃত্যুতে শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অবদান অপরিসীম। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমি বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৬ অগাস্ট নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৭ অগাস্ট, ২০২৪ রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সামনে প্রথম ভার্চুয়ালি বক্তব্যে খালেদা জিয়া উচ্চারণ করেছিলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ বলেছিলেন, ‘দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি, গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আমাদের নির্মাণ করতে হবে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ছাত্র-তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণরা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায় বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে নির্মাণ করতে হবে শোষণহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’
জাতির সেই অভাবনীয় শূন্যকালে, বিপদ ও দুর্ভাবনা এড়াতে জাতির রাজনৈতিক অবিভাবক হিসাবে খালেদা জিয়ার আহবান ছিল, ‘শান্তি-প্রগতি আর সাম্যের ভিত্তিতে আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণে আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি।’ ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের ফলাফল হিসাবে নিজের কারামুক্তির কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন এই বলে, ‘দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আপনাদের সামনে কথা বলতে পারার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আমার কারাবন্দি অবস্থায়, আপনারা আমার কারামুক্তির জন্য সংগ্রাম ও রোগমুক্তির জন্য দোয়া করেছেন। সে জন্য আমি আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা ফ্যাসিবাদী অবৈধ সরকারের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছি।’
এটা ছিল রাজনীতিবিদ হিসেবে তার প্রজ্ঞা ও সুস্থিতির শেষ জনপ্রকাশ। সেদিনের দুর্দিনে আর রাজনৈতিক শূন্যতার কালে সেটাও অনেক দুর্ঘটনার প্রতিষেধক হিসাবে টনিকের মতো কাজ করেছে জাতির জীবনে।
স্বৈরাচার সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আপসহীন ভূমিকাই রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার সবচাইতে বড় অবদান। সকল দেশী-বিদেশী সিভিল-মিলিটারি ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথে সুস্থির থাকার প্রত্যয় ও লড়াইয়ের মাধ্যমে সেদিন তিনি শুধু নিজের আপসহীন ইমেজই তৈরি করেননি, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে শক্ত জনভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। মধ্যবয়সে এক অকুতোভয় রাজনৈতিক সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি ও দলের জনভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা সেদিন দেশের তরুণসমাজকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেটাই ১৯৯১ সালে তাকে প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হতে সাহায্য করেছিল। সেদিন খালেদা জিয়া দলের বহু বর্ষীয়ান নেতার অভিলাস ও চক্রান্তকে অতিক্রম করে ভারতীয় আধিপত্যবাদের ফাঁদে পা না দিয়ে এক জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। সেটাই বেগম জিয়ার রাজনীতির সবচাইতে বড় সাফল্য।
শেখ হাসিনার আমলে নিষ্ঠুর নিপীড়নের মধ্যেও বিএনপি যে অটুট থেকেছে, দল ভাঙেনি, তার প্রধানতম ভিত তৈরি করেছেন বেগম জিয়া। তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা-আপসহীনতা-অনমনীয়তার প্রতি দলের সাধারণ নেতা কর্মীদের যে প্রতীতি ও ভালোবাসা সেটাই এই দুর্দিনে দলকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ভারতীয় হেজিমনিসহ কোন চাপের কাছেই তিনি কখনই নতি স্বীকার করেননি।
রাজনৈতিক পরিবেশে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে শেখ হাসিনার মতো বিপরীত চরিত্রের এমন এক রাজনীতিককে যিনি হেইটস্পিচে সিদ্ধ, বাচাল, প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল, প্রতিশোধপরায়ণ, যিনি বাবার রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য উত্তরাধিকারের অংশীজন। সেখানে প্রয়াত স্বামীর উত্তরাধিকার নিয়ে পথ চলেছেন তিনি কম কথায়, শুনেছেন বেশি বলেছেন কম। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাবার দ্বিতীয় ফেইজে (২০০১-২০০৬) সেই পরম পরাক্রমশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলা করতে যেয়ে তিনি রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসনে যে দিকে ঝুঁকেছেন তার চাপ সইতে হয়েছে তাকে, তার পরিবারকে ও দলকে তো বটেই, দেশকেও। দেশ ক্রমশ এক ফ্যাসিবাদের পথে হেঁটেছে। তার বিরুদ্ধে জীবন দিয়েই তাকে লড়তে হয়েছে। ফ্যাসিবাদের নির্মম প্রতিশোধপরায়ণতা, জেল-দণ্ড-অসুস্থতা-পারিবারিক দুর্দশা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখলেও লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। এটাই বেগম জিয়ার রাজনীতির অনন্যতা।
২০১৮ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি জেলে যাওয়ার আগের দিন খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘কম বয়সে স্বামীকে হারিয়েছি। দেশের জন্য তিনি জীবন দিয়েছেন। কারাগারে থাকতে আমার মাকে হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমার ছোট সন্তানকে হারিয়েছি। বড় সন্তান দূরদেশে চিকিৎসাধীন। আমার স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব, দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’ জীবন দিয়েই সেই কথা তিনি রেখেছেন। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে মৃত্যুর হুমকি নিয়েও দেশত্যাগে রাজি হননি। বরং অসীম প্রত্যয় নিয়ে উচ্চারণ করেছেন, ‘এই দেশ ছাড়া আমার কোনো ঘর নেই। আমার জীবন ও মৃত্যু এই মাটির সাথেই মিশে আছে।’
বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপিকে এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। দলের মাথায় থাকা পরীক্ষিত, জনআস্থাভাজন রাজনৈতিক বটচ্ছায়া অনুপস্থিত। এই অবস্থায় বিএনপি রাজনীতিতে এখন এক নতুন মুডে প্রবেশ করেছে। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দেশে নির্বাচনের যে তারিখ ঘোষিত হয়েছে, সেখানে বিএনপি তার একসময়ের রাজনৈতিক মিত্রদের পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে। এখানে ধর্ম প্রশ্নে, ধর্মীয় মৌলবাদ প্রশ্নে, প্রগতি প্রশ্নে, ভারতের আধিপত্যবাদ প্রশ্নে, সুশাসন প্রশ্নে, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রশ্নে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রশ্নে–বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক নতুন বয়ান ও কর্মসূচি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক চেহারায় হাজির হয়েছে। প্রায় চার কোটি নতুন প্রজন্মের মন জুগিয়ে, দলীয় সাপোর্ট বেইজে রাজনৈতিক-আদর্শিক আস্থা এনে, সকল শ্রেণীর ভোটারের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার পথটা পরিষ্কার করাই এখন বিএনপির নতুন নেতৃত্বের বড় কাজ। বেগম জিয়ার অনুপস্থিতি এখানে একটা বড় শূন্যতা থাকছে। কেননা, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা নিজের দল তো বটেই দেশের জনগণের মনেও সাহস জোগাত। বিএনপিকে এখন সেই শূন্যতা নিয়েই সামনের পথে এগোতে হবে। সামনের নির্বাচনে বিএনপি যখন খালেদা জিয়াকে সামনে নিয়ে ভোটারদের কাছে যাবে ভোটাররাও তখন খালেদা জিয়ার কর্ম-লড়াই-ভাবমূর্তির সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের অবয়বকেও মিলিয়ে নিতে চাইবে। সেটা বিএনপির জন্য যেমন বাড়তি সুযোগ আনতে পারে তেমনি বাড়তি বিপত্তির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
খালেদা জিয়ার যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি জনহৃদয়ে জায়গা নিয়েছে, যে সম্মান ও মর্যাদায় তিনি আসীন হয়েছেন, তা কত সুদূরপ্রসারী হবে তা নির্ভর করছে আগামী দিনে বিএনপির নতুন রাজনীতি কতটা জনহৃদয় ছুঁতে পারে তার ওপর। সেটাই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।