Published : 09 Jan 2026, 04:33 PM
প্রাইমারি স্কুলে বাঁশ বেয়ে বানরের ওপরে ওঠার অঙ্কটা হয়তো এখনও অনেকের মনে রয়েছে। অঙ্কটি ছিল এমন—একটি তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে একটি বানর প্রথম মিনিটে ৩ মিটার ওঠে, কিন্তু দ্বিতীয় মিনিটে ২.৫ মিটার নেমে আসে। বাঁশের উচ্চতা ৫০ মিটার হলে বানরটির শীর্ষে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে? ছোট্ট মাথায় এই অঙ্কটা করতে আমার অনেক কষ্ট হতো।
এখন যে অঙ্কটা আমি বোঝার চেষ্টা করছি, তা হলো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। গত দেড় বছর ধরে এই দুই দেশের সম্পর্ক যেন একটা তৈলাক্ত বাঁশ, চড়তে চাইছে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে, কিন্তু কোনোভাবেই পারছে না। আর এর কারণগুলো বোঝা আরও কঠিন।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কয়েকদিন আগে কত তেল পুড়িয়ে বিশেষ বিমানে ঢাকায় এসেছিলেন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দিল্লি ফিরেও ইতিবাচক কথা বলেছেন। মনে হয়েছিল, বানরের বাঁশ উত্তরণ এবার আর পিছলাবে না।
কিন্তু ঠিক তখনই আরেকটা ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। আসলে বোর্ডই তাকে তালিকায় রেখেছিল, যার ভিত্তিতে কেকেআর ৯ কোটি রুপিতে তাকে কিনে নিয়েছিল এবারের খেলার জন্য। কিন্তু বাদ দেওয়ার নির্দেশে কোনো কারণ দেখানো হয়নি।
তবে এটা বুঝতে কারোর অসুবিধে হয়নি যে, ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের দাবি ও হুমকির মুখে ভারতীয় বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উগ্রবাদীরা আনন্দে নাচছে, বলছে, ‘এটা ভারতের হিন্দুদের জয়’। মুস্তাফিজ মাঠে থাকলে হামলা ও উইকেট ভেঙে দেবে বলে হুঙ্কার দিয়েছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। আইপিএলে উগ্রবাদী মবের উত্তেজনার ঝুঁকি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নিতে চায়নি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভা সদস্য শশী থারুর প্রশ্ন তুলেছেন, আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটা দেশকে, একজন খেলোয়াড়কে নাকি তার ধর্মকে?
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্ত যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করতে পারত। কিন্তু তা না করে ওপরমহলের সিদ্ধান্তে মুস্তাফিজকে বাদ দিয়ে দিল।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যখন এই সিদ্ধান্ত নিতে নিজেদের ক্রিকেটের ভালো-মন্দ নিয়ে বৈঠক করছিল, তখন সরকারের উচ্চমহল এটাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় এগিয়ে এলেন। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নির্দেশ দিলেন, বাংলাদেশ ভারতে ক্রিকেট খেলতে যাবে না এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের প্রস্তাব দিলেন। তিনি ‘গোলামির দিন শেষ’ বলে ভারত-বিরোধিতার নতুন ‘রেড মিট’ ছুড়লেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে।
পরে ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে ক্রিকেট বোর্ডের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে না। উপদেষ্টা আগেই বলে দিয়েছেন, তাই আর কোনো উপায় ছিল না। সভা শেষে আসিফ নজরুল বললেন, “আমরা আশা করি আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হব। আইসিসি আমাদের যুক্তিগুলো সহৃদ্য়তার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে আমরা কষ্ট করে যেটা অর্জন করেছি সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমাদের খেলার সুযোগ করে দেবে।”
যারা আইসিসি ও ভারত ক্রিকেট বোর্ডের সম্পর্ক জানেন না, তাদের শুধু বলব, আইসিসির প্রেসিডেন্ট ভারতের কট্টর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। গত দশক ধরে জয় শাহ-ই ভারতীয় ক্রিকেটের কলকব্জা নাড়ছেন এবং এখন আইসিসির।
আসিফ নজরুল যদি মনে করেন তিনি আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহকে বোঝাতে পারবেন, তাহলে বলব তিনি খুব আশাবাদী মানুষ। ভারত থেকে যেসব খবর আসছে তাতে এটা পরিষ্কার, জয় শাহ বোর্ডে গিয়ে বলে দিয়েছেন বাংলাদেশের দাবি মানা হবে না। বাংলাদেশ ভারতে না গেলে পয়েন্ট হারাতে হবে। বিশ্বকাপে তাহলে কি বাংলাদেশের দুয়ার বন্ধ হতে যাচ্ছে?
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল বলেছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে। সবকিছু জনসাধারণের আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে বড় সংস্থা চালানো যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তামিমের এই মন্তব্যে তাকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলে আখ্যা দিলেন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। নিজের ফেইসবুক পাতায় এই মন্তব্য করেন এই পরিচালক, যিনি বোর্ডের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানও। বলা বাহুল্য, এই মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন ব্যক্তির রুচি ও পরিমিতিবোধের চরম ঘাটতির প্রকাশ। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়কের মতো একজন ক্রীড়াবিদকে প্রকাশ্যে ‘দালাল’ আখ্যা দেওয়া কেবল অসম্মানজনকই নয়, বরং বোর্ডের ভেতরের অসহিষ্ণু রাজনীতিকেও নগ্ন করে দেয়। যারা রাজনীতিকে ক্রিকেটের মাঠে এনে খেলার অর্জনকে ধূলিসাৎ করতে চলেছেন।
অনেকেই অনেকভাবে বিষয়টা দেখবেন। ভারতীয় উগ্রপন্থীরা উল্লাস করছে, ভারতীয় সরকার ও রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে—দুদিন আগে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের কথা বলেছিলেন, এটাই কি তার নমুনা? ভারতের রাজনীতিতে এত বছর ধরে যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে তার থেকে হয়তো দেশকে রক্ষার ক্ষমতা বা ইচ্ছা হারিয়েছেন রাজনীতিবিদরা। শশী থারুর ঠিক বলেছেন, “এই লজ্জা আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি”।
ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে সরাতে চেয়েছে, পেরেছে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না গেলে তাদের উল্লাস দ্বিগুণ হবে।
আর বাংলাদেশে যারা হৈচৈ করছেন, তারা কি ক্রিকেটের কথা ভেবেছেন? কেউ বলছেন, কয়েকটা ম্যাচ পরিত্যাগ বা বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ হলে ভারতের বড় ক্ষতি। এতে অনেকে আনন্দিত। মুস্তাফিজকে পাকিস্তান লুফে নিয়েছে জেনে সান্ত্বনা পেয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু আমাদের ক্রিকেটের লাভ-ক্ষতি কে ভাবছে?
যখন মুস্তাফিজ ও ভারতে খেলা নিয়ে হৈচৈ চলছিল, ওইদিন সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সরকার ভারত থেকে ১,৫০০ কোটি টাকার ডিজেল কিনবে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি অর্থ উপদেষ্টা। ‘আর নয় গোলামী’ বলে বাতিল করতে পারতেন, কিন্তু করেননি—তিনি তো ‘রেড মিট’ ছোড়ার লোক নন।
আসিফ নজরুল প্রথমে ক্রিকেট বোর্ডকে সময় দিতে পারতেন হিসেব করতে, বিশ্বকাপ না গেলে কী লাভ-লোকসান, বা ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় মুস্তাফিজের সমস্যা সম্মানজনকভাবে সমাধানের উপায় আছে কি না। যেমন পুরো ৯ কোটি রুপি মুস্তাফিজকে দিয়ে দেওয়া বা কেকেআর-এর কলকাতার ম্যাচগুলোতে মুস্তাফিজকে খেলানো ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করাই যেত।
কিন্তু আসিফ নজরুলের তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার মতো অবিমৃষ্যকারিতায় ক্রিকেট বোর্ডের হাত-পা বাঁধা পড়ে গেল, তারাও বাংলাদেশ দল ভারতে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। এখন এই সিদ্ধান্ত নিয়েই বাংলাদেশকে ঝুলে থাকতে হবে। ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেছেন, ‘মর্যাদার বিনিময়ে’ বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ। দেশে একদল লোক ‘মর্যাদা’ পেয়ে উল্লাস করছেন, কেউ কেউ বলছেন হাডুডু-কাবাডি দেখবেন।
আমাদের ‘মান-মর্যাদা’ রক্ষা পেল, কিন্তু ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের বড্ড ক্ষতি হলো। ক্রিকেটে খেলে আমাদের ছেলেরা যে ‘মান-মর্যাদা’ বাড়িয়েছে, তাতে ছেদ পড়বে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আরও একটা কাজ করল। চলমান বিপিএল-এর উপস্থাপনা প্যানেল থেকে ভারতীয় উপস্থাপক রিধিমা পাঠককে বাদ দেয়া হলো। এতে অনেকেই খুশি, আবার কেউ বলবেন, আমরা কি আরও ভালো হতে পারতাম না?
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি তারা সহজে পুষিয়ে নিতে পারবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট যে গত কিছু বছরে বিশ্বমঞ্চে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে, তা এবার বিরাট হোঁচট খাবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে। শুধু আইপিএল নয়, বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকরা এখন ভারতীয়।
সম্ভবত আগামী অনেকদিন পাকিস্তান ক্রিকেটের মতো একঘরে হয়ে থাকতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে। পাকিস্তানিরা নিশ্চয়ই আনন্দিত, তারা একজন সাথী পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের আনন্দের কি কিছু আছে?
পরিশেষে বলব, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের বিপক্ষে খুব বাজে একটা গুগলি ছুড়ল, আর বাংলাদেশ তা সামলাতে পারল না।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক