১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সাগর-রুনি হত্যা: তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কি তথ্য লুকানোর ফল?

বারবার তদন্তের হাতবদলে 'চেন অব কাস্টডি' ক্ষুণ্ন হয়ে ল্যাপটপ, ফোন ও সিসিটিভির স্পর্শকাতর তথ্য-প্রমাণ কি তবে পরিকল্পিতভাবেই হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে?

সাগর-রুনি হত্যা: তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কি তথ্য লুকানোর ফল?
চৌদ্দ বছরে ১২৯ বার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে; আজও ফাইলের লাল ফিতায় বন্দি সাগর-রুনি হত্যার আসল রহস্য।

এ টি এম জিয়াউল হাসান এ টি এম জিয়াউল হাসান

Published : 06 Sep 2026, 01:51 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

সরকার বদলেছে, ফাইলের আচরণ বদলায়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকের আসনে নতুন মুখ এলেও বিচারহীনতার যে দীর্ঘ ছায়া গত চৌদ্দ বছর ধরে সাগর-রুনি হত্যা মামলাকে ঘিরে রেখেছে, তার অবসান ঘটেনি। তদন্তের দায়িত্ব এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় গেছে, বিচারিক তারিখ পিছিয়ে ১২৯ বার স্পর্শ করেছে, অথচ অপ্রমাণের ফাইলেই বন্দি রয়ে গেছে প্রকৃত অপরাধীদের নাম। রাষ্ট্র যেখানে সুরক্ষার প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে বারবার স্পষ্ট হয়েছে—এই দীর্ঘ বিলম্ব কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; সত্য ঢাকা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প।

১. ঘটনা ও চৌদ্দ বছরের নথিপত্র

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি; পরে রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

তদন্তের হাতবদলের ধারাটিই মামলার মূল রোগলক্ষণ: প্রথমে থানা পুলিশ, চার দিন পর ডিবি, দুই মাসেও রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় হাইকোর্টের নির্দেশে ১৮ এপ্রিল ২০১২ থেকে র‍্যাব। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনি ধরার ঘোষণা কার্যত কথার কথাই থেকে যায়। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর এক রিটে আদালত তদন্ত র‍্যাবের কাছ থেকে সরিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন চান।

১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। ফল? সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেয়, আর প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে মোট ১২৯ বার। নতুন তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

২. নতুন সূত্র: যা বলা হচ্ছে, আর যা এখনো প্রমাণিত নয়

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গত ৩০ অগাস্ট জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা তদন্তে কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনার সময় হঠাৎ করেই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র উদ্ধার করে। তিনি বলেন, একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে—তবে এটি পৃথক হত্যা মামলা হওয়ায় বিচার হবে সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতে, ট্রাইব্যুনালে নয়।

সংবাদমাধ্যমে এরপর যে বিবরণ এসেছে, তা প্রসিকিউটরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়—দুটি পত্রিকায় আমি দেখেছি, তারা ট্রাইব্যুনালের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদন করে লিখেছে, নিহত সাংবাদিক দম্পতি পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন; প্রকাশের আগেই তাদের হত্যা করে সেসব দখলে নেওয়া হয়। প্রতিবেদনগুলোর একটিতে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে র‍্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসান অভিনেত্রী ও নাট্যনির্মাতা রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে বিশ বারের বেশি কথা বলেন; হত্যার দুই দিন পর এক বিশ্বস্ত সহকারীকে পাঠালে তিনি ল্যাপটপে ব্যবহৃত দুটি পেনড্রাইভ দেন, যেগুলোতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ডকুমেন্টারি ছিল, এবং দুই দিন পর সেগুলো ফেরত নেওয়া হয়।

৩. চৌদ্দ বছর ধরে রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হলো?

ব্যর্থতা নয়, এটি সফল প্রতিরোধ—শুধু জনগণের দিক থেকে দেখলে ব্যর্থতা মনে হয়। এর ছয়টি স্তর:

প্রথম স্তর—ঘটনাস্থল: থানা  ডিবি  র‍্যাব, চার দিন ও দুই মাসের ব্যবধানে দুইবার হাতবদল। প্রতিটি হস্তান্তরে চেইন অব কাস্টডি ভাঙে, ল্যাপটপ-ফোন-সিসিটিভির প্রাথমিক স্ন্যাপশট হারায়। এটি যদি ইচ্ছাকৃত না-ও হয়, ফল একই।

দ্বিতীয় স্তর—সন্দেহভাজনের ঘরেই তদন্ত: নতুন সূত্র যদি আদৌ সত্য হয়, তবে ২০১২ সালে র‍্যাবের গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, আর ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে তদন্তের দায়িত্বে ছিল র‍্যাব। এটি তদন্ত নয়, আত্মরক্ষা।

তৃতীয় স্তর—নজরদারির একচেটিয়া মালিকানা: সিডিআর, টাওয়ার ডাম্প, আইপিডিআর—এই একই তথ্যভাণ্ডার এনটিএমসির অধীনে ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সেই একই কর্মকর্তা। যিনি প্রমাণের ভাণ্ডারের চাবি রাখেন, তিনি নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণের অস্তিত্ব নির্ধারণ করেন। এখানেই প্রশ্ন আসে, কেন সর্বশেষ সূত্রটি বেরিয়ে এল? তাও আবার অন্য একটি মামলার সিডিআর থেকে, মূল মামলার তদন্তকারীদের হাতে নয়।

চতুর্থ স্তর—বিকল্প বয়ান: ‘ডাকাতি’, ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’, ‘অজ্ঞাতনামা’—প্রতিটি বয়ান তদন্তকে রাজনৈতিক অভিমুখ থেকে সরিয়ে রাখে। নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদসহ যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তাদের কেউ কেউ জামিনে, একজন জামিনের পর পলাতক। চৌদ্দ বছরে একটি চার্জশিটও হয়নি—কারণ চার্জশিট হলে তা আদালতে যাচাইযোগ্য হয়ে যেত। স্থগিতাদেশ চার্জশিটের চেয়ে নিরাপদ।

পঞ্চম স্তর—আদালতের সহনশীলতা: ১২৯টি তারিখ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি কৌশল, এবং এটি কাজ করেছে কারণ প্রতিটি তারিখে ‘সময় চাই’ বলার খরচ শূন্য ছিল। ব্যক্তিগত দায় ছাড়া সময়সীমা চাওয়া কেবল ভদ্র অনুরোধ, এবং বিচারক তা অনুমোদনের মাধ্যমে বিচার প্রাপ্তি দীর্ঘায়িত করেছেন মাত্র।

ষষ্ঠ স্তর—রাজনৈতিক আশীর্বাদ: যদি প্রকাশিত মোটিভ (পিলখানা ডকুমেন্টারি) কাছাকাছিও সত্য হয়, তবে হত্যাকাণ্ডটি ছিল তথ্য দমনের অভিযান, আর তদন্ত-ব্যর্থতা ছিল সেই একই অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ। এই ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থা ব্যর্থ হয়নি—তারা দায়িত্ব পালন করেছে, ভিন্ন প্রভুর স্বার্থে।

৪. তদন্তকারীরাই যদি অপরাধী হয়, রাষ্ট্র কী বিচার দিতে পারে?

সৎ উত্তর: স্বাভাবিক ব্যবস্থায় কিছুই না। তিনটি কারণে—

প্রমাণ-একচেটিয়া: অপরাধের প্রমাণ থাকে অভিযুক্ত সংস্থার সার্ভারে। মামলা তখন ‘বাদীর সাক্ষ্য বনাম সংস্থার অস্বীকারে’ নেমে আসে।

সময়-একচেটিয়া: রাষ্ট্র অপেক্ষা করতে পারে, ভুক্তভোগীর পরিবার পারে না। সাগরের সন্তান মেঘ এখন প্রাপ্তবয়স্ক—এটিই কৌশলটির সাফল্যের পরিমাপ।

বৈধতা-একচেটিয়া: যে বাহিনী গুম করে, তারাই সাক্ষী সুরক্ষা দেয়। এটি স্ববিরোধ, ভুল নয়।

তবু এর একটি ইতিবাচক পাঠ আছে, এবং সেটিই সবচেয়ে বড় খবর: নতুন সূত্রটি আবিষ্কৃত হয়েছে, কারণ একটি সমান্তরাল, ভিন্ন কর্তৃত্বাধীন তদন্ত-লাইন চালু ছিল। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা মূল মামলার শৃঙ্খলের বাইরে ছিল বলেই র‍্যাবের নিজস্ব সিলমোহর অতিক্রম করা গেছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। এটিই আজকের সমাধানের সবচেয়ে বাস্তব ভিত্তি: সমাধান ‘ভালো তদন্তকারী’ নয়, সমাধান হলো সমান্তরাল ও প্রতিদ্বন্দ্বী তদন্ত-এখতিয়ার, যাতে কোনো একটি সংস্থা সত্যের একমাত্র দরজা না হয়।

৫. এই তদন্তের বন্ধ্যাত্ব থেকে উত্তরণের উপায় কী?

 নজরদারি-তথ্যের হেফাজত রাষ্ট্রীয় নির্বাহী বিভাগের বাইরে নিতে হবে: এনটিএমসি-ধরনের সংস্থার সিডিআর/আইপিডিআর আর্কাইভ যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তবে ‘এজেন্সি আর্কাইভ সংরক্ষণের আদেশ’ কার্যকর হবে না—কারণ আদেশ পালনকারী ও অভিযুক্ত একই। প্রস্তাব: স্বাধীন ডেটা-কাস্টোডিয়ান গঠন করতে হবে, যার লগ বিচারিক পরিদর্শনযোগ্য এবং যেখানে তথ্য মুছে ফেলা (ডিলিশন) নিজেই একটি স্বতন্ত্র অপরাধ।

 ‘সিস্টেম-লেভেল কেস’ ও ‘পার্সোনাল মার্ডার কেস’ সংক্রান্ত বিভাজন ভাঙা: বর্তমান কাঠামোতে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতাভুক্ত গুমের বিচার ট্রাইব্যুনালে, আর বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিচার সংশ্লিষ্ট আদালতে। সাগর-রুনি তাই দায়রা আদালতে ফিরে যাচ্ছে—অর্থাৎ সেই একই বিলম্ব-বাস্তুতন্ত্রে। প্রস্তাব: রাষ্ট্রীয় কুশীলব জড়িত থাকলে মামলা ‘বিচ্ছিন্ন’ হলেও সাক্ষ্য-নিয়ম, সময়সীমা ও সাক্ষী-সুরক্ষা একই স্তরের হতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের নথিবদ্ধকরণ, শুধু ব্যক্তির শাস্তি নয়: জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি বিষয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যক্তিটির চরিত্র নয়—পদোন্নতি বোর্ড কীভাবে সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান করেছিল সেটি। যে ব্যবস্থা একজনকে তৈরি করেছে, সেটির সংস্কার না হলে পরবর্তীজন তৈরি হতে সময় লাগবে না। প্রস্তাব: পদোন্নতি বোর্ডের ভিন্নমত লিখিতভাবে সংরক্ষণ ও পরবর্তীতে নিরীক্ষাযোগ্য রাখা—সামরিক ও পুলিশ উভয় ক্ষেত্রে।

পরিমাপযোগ্য সময়সূচি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়: ‘৪৮ ঘণ্টা’ ও ‘১২৯ তারিখ’ একই মুদ্রার দুই পিঠ—একটি অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি, অন্যটি সীমাহীন বিলম্ব। প্রস্তাব: তদন্তের বাহ্যিক সীমা অতিক্রান্ত হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সংস্থাপ্রধান উভয়ের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করা, এবং প্রতিটি সময়-আবেদনের লিখিত কারণ প্রকাশ্য নথিতে রাখা।

সবচেয়ে নির্মম মন্তব্য: চৌদ্দ বছরে তদন্ত ব্যর্থ হয়নি, তদন্তকে পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দুই বছর পরেও তারিখ ১২৯ বার পিছিয়েছে—অর্থাৎ যন্ত্রটি এখনো চালু, শুধু চালকের আসন খালি। আজ যারা ক্ষমতায়, তাদের বিরুদ্ধেও কি এই একই যন্ত্র ব্যবহার করার অভিযোগ উঠবে? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভার এখন বর্তমান সরকার ও তাদের নীতি-নির্ধারকদের ওপরই বর্তায়।

 টি এম জিয়াউল হাসান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, আর সি ডি এস, পি এস সি (অব.)।  ই-মেইল: zhasansohel241@gmail.com