Published : 15 Mar 2026, 08:17 AM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। ইরানের হামলার লক্ষ্য মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট মিত্র দেশগুলো। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলা ধীরে ধীরে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধের রূপ নিতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মূলে থাকা শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ত্রিমুখী সংঘাত এতদিন মূলত আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার লড়াই হিসেবেই দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বিভেদরেখাগুলো স্রেফ স্থানীয় কোন্দল হিসেবে থাকছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক সংকটের রূপ নিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ধর্মীয় বিভাজন মূলত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম মূর্ত হয়ে ওঠে ১৯৭৯ সালে। আয়তুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব এবং একটি ‘থিওক্র্যাটিক’ বা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্থান ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। শিয়া মতাদর্শের এই নতুন শক্তির উত্থানে তৎকালীন ইরাকের শাসকগোষ্ঠী যে অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে শুরু করেছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ‘ইরাক-ইরান যুদ্ধ’ (১৯৮০-১৯৮৮)। আট বছরব্যাপী সেই যুদ্ধে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তবে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কেবল প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার যে প্রবণতা তখন শুরু হয়েছিল, বর্তমান সংঘাত সেই পুরনো ক্ষতকেই যেন আরও বড় পরিসরে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।
১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষে ইরান ও ইরাক উভয় রাষ্ট্রই তাদের ক্ষতবিক্ষত সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নেতৃত্বে ইরান যখন সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগী হয়, বিপরীতে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও পিছিয়ে ছিলেন না। মধ্যপ্রাচ্যের একচ্ছত্র নেতা হওয়ার প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাদ্দামকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে বেপরোয়া করে তোলে। এই দাপুটে মনোভাবের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৯০ সালে, যখন ইরাক আকস্মিকভাবে প্রতিবেশী দেশ কুয়েত দখল করে নেয়। এর মাধ্যমেই সূচিত হয় ‘প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ’। প্রায় এক বছর ধরে চলা এই অসম লড়াইয়ে ইরাককে লড়তে হয় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এক বিশাল আন্তর্জাতিক জোটের বিরুদ্ধে। সেই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার চিরাচরিত সমীকরণকে বালির বাঁধের মতো ধসিয়ে দিয়ে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী নীরব প্রতিশোধের পালা। ক্ষমতার এই অবিরাম দ্বন্দ্ব শেষপর্যন্ত ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সরাসরি হস্তক্ষেপে ‘দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে’ রূপ নেয়। সাদ্দাম হোসেনের পতন কেবল একটি শাসনামলের অবসান ছিল না। ওই যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই জন্ম হয় ভিন্নতর শক্তির—কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সৌদি আরব হয়ে ওঠে অঞ্চলের নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। তেলের নতুন নতুন খনি আবিষ্কার এবং জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে আসায় এই দেশগুলো অভাবনীয় সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে শুরু করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি ঘটে তাদের রণকৌশলে—অন্ধ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা মনোযোগ দেয় টেকসই অর্থনীতি নির্মাণের দিকে। নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বাজারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর মধ্য দিয়ে তারা বিশ্বমঞ্চে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘস্থায়ী ও বড় মাপের যুদ্ধের বিরতি দেখেছিল। ইরান বাদে অঞ্চলের অন্য শক্তিগুলো রণসজ্জার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামে। এর ফলে মরুভূমির বুক চিরে দুবাই, আবুধাবি, দোহা, কুয়েত সিটি ও রিয়াদের মতো শহরগুলো রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বাণিজ্যিক ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে এই বাহ্যিক ঝকঝকে শান্তির সমান্তরালে বইছিল গভীর অস্থিরতার স্রোত। ইরান তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ নীতিতে অনড় থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নীরব দ্বন্দ্ব জিইয়ে থাকে। বিশেষ করে শিয়া-সুন্নি ঐতিহাসিক বিভাজনটি নতুন করে মেরুকরণের জন্ম দেয়। যদিও কোনো দেশ সরাসরি সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়নি, তবুও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সুন্নি দেশগুলো ইরাক, ইয়েমেন ও লেবাননের মতো ভূখণ্ডে প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিরাজ করলেও প্রকৃতপক্ষে এখানে আগ্নেয়গিরির মতো সুপ্ত যুদ্ধাবস্থা বজায় ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একপাক্ষিক ও দীর্ঘমেয়াদী সমরসজ্জা সুন্নি দেশগুলোতে নিরন্তর অস্বস্তির জন্ম দিয়ে আসছিল। এতদিন পাশ্চাত্যের পরোক্ষ সহযোগিতায় এই আধিপত্য রুখে দেওয়ার চেষ্টা চললেও, তা মূলত নির্দিষ্ট কিছু ‘প্রক্সি’ যুদ্ধের বাইরে বড় আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধে রূপ নেয়নি। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি সশস্ত্র হামলা সেই চেনা সমীকরণকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিয়েছে। যা ছিল আঞ্চলিক সংকট, তা এখন এক ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকটে রূপান্তরিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। বিশেষ করে, ইরানের পাল্টা আঘাতে (বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে) শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে বৈশ্বিক পর্যায়ে টেনে আনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। কাতার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানের প্রতিরোধ হামলার মাত্রা যদি বাড়তে থাকে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে এর দাবানল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করা কেবল সময়ের ব্যাপার। বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নামা দুর্যোগে। ইরানের নজিরবিহীন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ১৭শ ছাড়িয়ে গেছে—যা এমনকি ইসরায়েলের ওপর করা হামলার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। ইরান একে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অংশীদারিত্বের শাস্তি হিসেবে দাবি করলেও, আমিরাতের জনগণ বা শাসকগোষ্ঠী তা মোটেও স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। মার্কিন কারিগরি সহায়তায় আমিরাত প্রায় ৯০ শতাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও, আকাশপথের এই লড়াই মাটির গভীরের বিশ্বাসকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। এই হামলার ফলে যে নিরাপত্তা আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে তেহরান ও আবুধাবির মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে। মনে রাখা জরুরি, আরব আমিরাত ইরানের অর্থনৈতিক সুরক্ষার অন্যতম অংশীদার ছিল, কিন্তু এই হামলা তাদের বিশ্বাস ভেঙেছে। তারা ইরানের সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতির জন্য খারাপ সংকেত।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনীতির সমান্তরালে সম্প্রতি এক বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল—দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু ইরানের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সৌদি আরবও নিস্তার পায়নি। এই হামলার পর প্রয়োজন হলে সৌদি আরব যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে। সুন্নি বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী সৌদি আরব এই যৌথ অভিযানে যুক্ত হওয়া মানেই হলো অন্যান্য সুন্নি প্রধান দেশগুলোর এতে যুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হওয়া এবং এমনটা ঘটলে ইরান চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, সৌদি আরবের এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে আর কোনো আঞ্চলিক সীমানায় আটকে রাখবে না। এটি তখন একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেবে।
পাল্টা হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট হামলার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও নতুন হামলার ফলে সেই ক্ষমা প্রার্থনা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তাই বলা যায়, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং ইরান তার আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীজন দেশগুলোতে হামলা বন্ধ না করলে, এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ‘স্নোবল ইফেক্ট’ তৈরি করবে; যা ধীরে ধীরে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে বৈশ্বিক রূপ দিতে পারে। কারণ, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, বিবদমান পক্ষ কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দলভারী করতে নিয়োজিত হয়। যা ধীরে ধীরে এই জটিল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বকে বৈশ্বিক দ্বন্দ্বে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।